৫৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফার পরও সংকটে বিপিসি

· Prothom Alo

এক দশকে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। অথচ এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়াতেই নগদ অর্থের সংকটে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপিসিকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতও দ্রুত কমতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের আমদানি অব্যাহত রাখতে সরকারের কাছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা চেয়েছে সংস্থাটি।

Visit extonnews.click for more information.

বিপিসির পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী ও অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (এলসি) খুলতেও অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে জ্বালানি তেল আমদানির একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসি, যারা প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫ লাখ টন অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে এ প্রতিষ্ঠানের ওপর। তবে গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে বিপুল মুনাফা করাএকটি প্রতিষ্ঠান কয়েক মাসের মূল্যবৃদ্ধিতেই কেন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জ্বালানি আমদানি ও বিক্রিতে সংস্থাটির আর্থিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে মার্চে ২ হাজার ২৪৮ কোটি, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি এবং জুনের প্রথম ২৩ দিনে ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। একই সময়ে ৭২টি চালানে প্রায় ১৯ লাখ ৭০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। বিপিসির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়লেও দেশের বাজারে সেই হারে মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় এ আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে বিপিসির সাম্প্রতিক আর্থিক সংকটের সঙ্গে অতীতের মুনাফার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলছেন, গত এক দশকে বিপিসির অর্জিত মুনাফার কতটা সরকারের কোষাগারে গেছে, কতটা সংস্থার কাছে সংরক্ষিত ছিল এবং কতটা উন্নয়ন ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে, সেই সব হিসাব স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তার একটা মূল্যায়ন ছাড়া বর্তমান নগদ সংকটের প্রকৃত কারণও পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

চার মাসেই নগদসংকট

বিপিসি তেল বিক্রি করে দীর্ঘদিন লোকসান দিয়েছে। ২০১৩ সালের পর সংস্থাটি মুনাফা করতে শুরু করে। এর মধ্যে বিপিসির প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এর মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।

তবে এ সময়ে মুনাফার বড় অংশ (৩৪ হাজার কোটি টাকা) সরকারের কোষাগারে লভ্যাংশ, কর ও অন্যান্য বাবদ জমা দেওয়া হয়েছে। কিছু অর্থ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং পরিচালন ব্যয়েও ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে অতীতের পুরো মুনাফা নগদ অর্থ হিসেবে বিপিসির হাতে ছিল না। কিন্তু বর্তমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, বৈশ্বিক বাজারে এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় মোকাবিলার জন্য সংস্থাটি নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতায় কতটা প্রস্তুত ছিল।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর পড়েছে। নগদ অর্থের চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বিপিসি। অর্থ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এখন পর্যন্ত দেশে জ্বালানি আমদানি বা সরবরাহে কোনো সমস্যা হয়নি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি।গত কয়েক বছরে বিপিসি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা করেছে। সে মুনাফার কতটা সরকারের কোষাগারে গেছে, কতটা সংস্থার কাছে সংরক্ষিত ছিল এবং কতটা অন্য খাতে ব্যয় হয়েছে, সেটিও জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

প্রকল্পের টাকা ভেঙে জ্বালানি আমদানি

নগদ অর্থের সংকট সামাল দিতে প্রথমে নিজস্ব বিভিন্ন তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে বিপিসি। কিন্তু সেটিও যথেষ্ট না হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত অর্থ চলতি মূলধনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। বিপিসির পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্প থেকে। এ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৯ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা চলতি মূলধনে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ৩ হাজার কোটি এবং বিভিন্ন আয়ের খাত থেকে আরও ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় মেটাতে এভাবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধনে স্থানান্তর করেছে বিপিসি।

শুধু প্রকল্পের অর্থই নয়, ব্যাংকে থাকা আমানতও দ্রুত কমে এসেছে। বোর্ড সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, গত ৯ মার্চ বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল প্রায় ৩৬ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ২৮ জুন সেই স্থিতি কমে হয় ১৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসের কিছু বেশি সময়ে ব্যাংকে থাকা অর্থ কমেছে প্রায় ১৮ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। এই সময়ে বিভিন্ন তফসিল ব্যাংকে রাখা অব্যবহৃত আমানত থেকেও প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা তুলে চলতি মূলধনে নেওয়া হয়।

এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিপিসির পরিচালনা পর্ষদ। পর্ষদ সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (এলসি) খুলতে গুরুতর তারল্যসংকটে পড়তে পারে বিপিসি। এতে শুধু আমদানি কার্যক্রম নয়, দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ চলতি ব্যয়ে ব্যবহৃত হওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাস্তবায়নেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মাধ্যমে ১৪ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা চেয়ে চিঠি দেয় বিপিসি। পর্ষদের সুপারিশে বলা হয়, এ সহায়তা পাওয়া গেলে তারল্যসংকট কাটিয়ে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখা এবং সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা সহজ হবে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

যুদ্ধ, বিশ্ববাজার ও মূল্য সমন্বয়ের চাপ

নগদ অর্থ নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এ সংকটের সূত্রপাত ঘটে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতা থেকে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগর থেকে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এর প্রভাবে শুধু অপরিশোধিত তেলের দামই বাড়েনি, বেড়েছে জাহাজভাড়া, যুদ্ধঝুঁকির বিমা, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য আমদানিসংশ্লিষ্ট খরচও। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, সেহেতু এর প্রভাব সরাসরি পড়ে বিপিসির ব্যয়ের ওপর।

বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে প্ল্যাটসের সূচক অনুসরণ করে জ্বালানি কেনে। সংস্থাটির হিসাবে, যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের গড় মূল্য ছিল ৮৬ মার্কিন ডলার। জুনে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে প্রতি ব্যারেল অকটেনের দাম ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে ওঠে। জুনের শেষ দিকে কিছুটা কমলেও জুলাইয়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে।

বিশ্ববাজারে দাম অনেক বেড়ে গেলে দেশেও গত এপ্রিলের মাঝামাঝি দাম বাড়ানো হয়। এরপর মে মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুন মাসের জন্য তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। এরপর জুলাইয়ে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। চলতি আগস্টেও তা বহাল রয়েছে। বিপিসির হিসাব বিভাগের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে ডিজেল। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রিতে গড়ে প্রায় ৬০ টাকা ঘাটতি হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিপিসির নগদ অর্থের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

মুনাফার পরও কেন তারল্যসংকট

বিপিসির বর্তমান নগদ অর্থের সংকটের মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে; গত এক দশকে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা করা একটি প্রতিষ্ঠান কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধিতেই কেন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল?

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান আর্থিক চাপের মূল্যায়ন করতে হলে শুধু চলতি লোকসান নয়, আগের বছরের মুনাফা ব্যবহারের দিকটিও দেখতে হবে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বিপিসি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা করেছে। সে মুনাফার কতটা সরকারের কোষাগারে গেছে, কতটা সংস্থার কাছে সংরক্ষিত ছিল এবং কতটা অন্য খাতে ব্যয় হয়েছে, সেটিও জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, যদি আগের বছরের মুনাফার একটি অংশ সংস্থার কাছেই থেকে থাকে, তাহলে বর্তমান আর্থিক চাপের কিছুটা সেখান থেকেও মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারত। একই সঙ্গে বিপিসির প্রকৃত তারল্যসংকট কতটা গভীর, সেটিও একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

Read full story at source