জ্বালানি খাতকে প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দিলে জবাবদিহি থাকে না: জামায়াত
· Prothom Alo

বিদ্যুৎ, রেল, বিমান ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে চাইলেই প্রাইভেট সেক্টরের (বেসরকারি খাত) হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দিলে অনিয়ম–দুর্নীতি হয়, ধর্মঘট হয়, অডিট হয় না ও জবাবদিহি থাকে না। তবে সরকারের হাতে থাকলে জবাবদিহির জায়গা থাকে।
Visit turconews.click for more information.
আজ শনিবার বেলা সোয়া তিনটার দিকে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন।
‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’–এর ওপর জামায়াতে ইসলামীর পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য তুলে ধরার লক্ষ্যে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘ঢালাওভাবে আমরা বেসরকারীকরণের বিরোধী নই। কিন্তু যেখানে দুর্নীতির দরজা খুলে, যেখানে সরকারের উচ্চপর্যায়ে লুটপাট, ভাগাভাগির কোনো চক্র ও সিন্ডিকেট দৃশ্যমান হয় কোনো একটা খাতকে প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে, তার তো প্রতিবাদ না করে আমরা পারব না।’
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান মিয়া গোলাম পরওয়ার। এতে বলা হয়, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রত্যেক মানুষকে এর চড়া মূল্য দিতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার পর জ্বালানি খাতকে বেসরকারি কোনো শিল্প গ্রুপের হাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ আরও একধাপ এগিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়েও বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিক্রির নীতিমালা করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়েছিল বলে লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়। এতে বলা হয়, জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বিশাল ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও শত শত কোটি ডলারের ব্যাংক লাইন দরকার। বাংলাদেশে এই সক্ষমতা আছে হাতে গোনা তিন থেকে চারটি গোষ্ঠীর। জ্বালানি খাত প্রাইভেট সেক্টরের হাতে গেলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে যাবে এবং বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হবে। এর ফলে এই খাতের ওপর সংসদের কোনো জবাবদিহি থাকবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহের সংকটকে ঢাল বানিয়ে তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে উল্লেখে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বর মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র জমার সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংকটকালে দ্রুততা প্রয়োজন, তবে দরপত্র জমা দেওয়ার সময় এত বেশি কমানো হলে আন্তর্জাতিক বড় সরবরাহকারীরা অংশ নেওয়ারই সুযোগ পায় না। এটি কম দরদাতা, বেশি দাম ও সিন্ডিকেটের জন্য দুর্নীতির প্রশস্ত রাস্তা।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সব উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে; খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশ্যে উন্মুক্ত করতে হবে, কমপক্ষে ৬০ দিনের জনমত গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে; সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি করতে হবে, যেখানে বিরোধী দল, ক্যাব, সিপিডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে; বেসরকারীকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার—স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই–জিপি বাধ্যতামূলককরণ, প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণের তথ্য উন্মুক্তকরণ।
দাবির মধ্যে আরও রয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল–২) ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং জ্বালানি খাতের শ্রমিক–কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ প্রত্যাহার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম প্রমুখ।