ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্যাকেজে নেটফ্লিক্স-চরকির মতো ওটিটিসেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা

· Prothom Alo

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ওভার দ্য টপ (ওটিটি)—এই দুই সেবার খরচ এবার একটি প্যাকেজের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। অর্থাৎ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মাসিক বিলের সঙ্গেই যুক্ত হতে পারে নেটফ্লিক্স, চরকিসহ অন্যান্য ওটিটি–সেবার সাবস্ক্রিপশন খরচ।

Visit turconews.click for more information.

সম্প্রতি দুটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (আইএসপি) কাছ থেকে এমন প্রস্তাব পেয়ে তা বিবেচনা করছে বিটিআরসি। এই লক্ষ্যে বিটিআরসি একটি নীতিমালা করতে চায়। বিটিআরসির নথিপত্র থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

বিটিআরসিতে প্রস্তাব পাঠানো আইএসপি প্রতিষ্ঠান দুটি হলো—নেশনওয়াইড আইএসপি রেস অনলাইন লিমিটেড ও আইসিসি কমিউনিকেশন লিমিটেড।

বিটিআরসি সূত্র বলছে, এই আইএসপি প্রতিষ্ঠান দুটি নিজেদের অনুমোদিত ইন্টারনেট ট্যারিফ প্যাকেজের সঙ্গে ওটিটি স্ট্রিমিংসহ অন্যান্য ডিজিটাল সেবা বান্ডেল আকারে দেওয়ার অনুমতি চেয়েছে।

কমিশনের নথিপত্র থেকে জানা যায়, রেস অনলাইনের প্রস্তাবের নাম ‘অরবিট ইন্টারনেট প্যাকেজ’। গত ৫ জুলাই দেওয়া এই প্রস্তাবে নির্দিষ্ট গতির ইন্টারনেটের সঙ্গে টকটাইম, ই-হেলথ সুবিধা ও বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

রেস অনলাইনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ এমবিপিএসের (মেগাবিট প্রতি সেকেন্ড) ৫০০ টাকার প্যাকেজে থাকবে ৫০ মিনিট টকটাইম ও ই-হেলথ সুবিধা। ৩৫ এমবিপিএসের ৬০০ টাকার প্যাকেজে যুক্ত হবে ওটিটি সেবা—বঙ্গ। ১০০ এমবিপিএসের ১ হাজার টাকার প্যাকেজে একসঙ্গে থাকবে বঙ্গ ও চরকি। আর সর্বোচ্চ ৬৫০ এমবিপিএসের প্যাকেজে ওটিটি সেবার পাশাপাশি টকটাইমও বাড়বে।

অন্যদিকে আইসিসি কমিউনিকেশন ভিন্ন এক মডেল প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবে নির্দিষ্ট গতির ইন্টারনেটের সঙ্গে গ্রাহক কতটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করবেন, তার ওপর নির্ভর করবে প্যাকেজের দাম। যেমন—একটি ওটিটিসহ ৩০ এমবিপিএসের প্যাকেজের দাম হবে ৮০০ টাকা। পাঁচটি ওটিটিসহ ৮০ এমবিপিএসের প্যাকেজের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা। ওটিটির সম্ভাব্য তালিকায় আছে—চরকি, বঙ্গ, আয়না, দীপ্ত, আই স্ক্রিন, টফি, বায়োস্কোপ+সহ দেশীয় প্ল্যাটফর্ম। পাশাপাশি নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, সনি লিভ, হইচই, ট্যাপ ম্যাডের মতো আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মও তালিকায় আছে।

দুটি আইএসপি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের ধরন ভিন্ন। তাই বিটিআরসি মনে করছে, শুধু একটি–দুটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন অনুমোদন না দিয়ে সব আইএসপির জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করা দরকার।

এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, এই সুযোগ নিশ্চিত করতে কোনো একটি সংস্থার একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিটিআরসি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, মোবাইল অপারেটর, আইএসপিসহ অন্যান্য সেবাদাতাদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে হবে।

বিদেশি ওটিটিতে শর্ত

কমিশনের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক প্রস্তাবে দেশি ও বিদেশি ওটিটির ক্ষেত্রে আলাদা নীতির কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিশনের অনুমোদিত ট্যারিফের সিলিং প্রাইসের মধ্য থেকেই দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বান্ডেল করতে আইএসপিদের আলাদা অনুমোদন লাগবে না।

তবে বিদেশি ওটিটিসহ অন্য কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বান্ডেল করতে করতে চাইলে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য কমিশনের অনুমোদন নিতে হবে বলে প্রাথমিক প্রস্তাবে উল্লেখ আছে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইনগত অবস্থান, কর ও রাজস্ব পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ লেনদেন, রাজস্ব ভাগাভাগির মতো বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

একইভাবে ই-হেলথ, ই-এডুকেশন বা ই-অ্যাগ্রিকালচারের মতো সামাজিক সেবামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেও সাধারণ বিনোদনভিত্তিক ওটিটি থেকে আলাদা রাখা হয়েছে প্রাথমিক প্রস্তাবে। সংবেদনশীল তথ্য ও জনস্বার্থের বিষয় বিবেচনায় এসব সেবাও আলাদা অনুমোদনের আওতায় থাকবে।

কেন এই উদ্যোগ

মোবাইল অপারেটররা দীর্ঘদিন ধরে ডিরেক্ট অপারেটর বিলিং, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসসহ বিভিন্ন বান্ডেল অফারের মাধ্যমে ওটিটি সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে আইএসপিদেরও একই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিটিআরসির কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, এমনটা করা হলে গ্রাহক আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী ডিজিটাল সেবা পাবেন। তাই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্যাকেজে ওটিটি সেবা যুক্ত করা যেতে পারে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব ও ক্ষতিকর নয়—এমন সবকিছু গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকা উচিত।

অন্য দেশে কী অবস্থা

ইন্টারনেটের সঙ্গে ওটিটি বান্ডেল করার চর্চা বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। যেমন—ভারতে রিলায়েন্স জিও, ভারতী এয়ারটেল তাদের বিভিন্ন ব্রডব্যান্ড ও পোস্টপেইড প্যাকেজে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, জিওহটস্টার যুক্ত করে সেবা দিচ্ছে। ভোডাফোন আইডিয়াও বিভিন্ন পোস্টপেইড প্যাকেজে ওটিটি সেবা দেয়।

রিলায়েন্স জিওর ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, মাসিক ৮৮৮ রুপির ফাইবার প্যাকেজে ৩০ এমবিপিএস গতির আনলিমিটেড ইন্টারনেটের সঙ্গে নেটফ্লিক্সসহ ১৫টি ওটিটি সেবা থাকছে।

অন্যদিকে ভারতী এয়ারটেলের ৯৯৯ রুপির প্যাকেজে ১০০ এমবিপিএস গতির সঙ্গে নেটফ্লিক্স, অ্যাপল টিভি প্লাস, প্রাইম ভিডিওসহ ২০টির বেশি ওটিটি সেবা যুক্ত আছে।

শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশেও প্রায় একই ধরনের বান্ডেল প্রচলিত আছে।

প্রশ্নও আছে

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে চার ক্যাটাগরিতে ২ হাজার ৮০৪টি প্রতিষ্ঠানের আইএসপি লাইসেন্স আছে।

তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ধারণা, অবৈধ মিলিয়ে এই সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি হবে।

বিটিআরসির প্রাথমিক পরিকল্পনাটি নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে। কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনার নথিতে ওটিটি অংশের মূল্য নির্ধারণে আলাদা কোনো নীতির উল্লেখ নেই। ফলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের নামে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের সুযোগ থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

আবার বান্ডেলে থাকা কনটেন্ট নিয়ে আইনি দায়দায়িত্ব পুরোপুরি ওটিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ আছে। কিন্তু কোনো আইএসপি প্রতিষ্ঠান যদি অননুমোদিত বা বিতর্কিত সেবা যুক্ত করে, তাহলে দায় কার হবে, সেটিও পরিষ্কার নয়।

প্রাথমিকভাবে পুরো বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে আইএসপিদের সংগঠন আইএসপিএবি। সংগঠনটির মহাসচিব নাজমুল করিম ভূঁঞা প্রথম আলোকে বলেন, এ নিয়ে এখনো বিটিআরসি তাঁদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। তবে উদ্যোগটি ইতিবাচক। সম্মিলিতভাবে কাজ করে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে তা ভালোই হবে।

Read full story at source