ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার প্রকল্প কতটা কঠোর হবে

· Prothom Alo

ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট কিছু চিন্তাশীল মানুষের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও অনেকগুলো চাওয়া ছিল, তার কিছু পূরণ হতে যাচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। এই উদ্বেগের কারণ, আমাদের খেলাপি ঋণের হার এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং বিশ্বে দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে ইউক্রেন। দেশটি যদি যুদ্ধবিধ্বস্ত না হতো, তাহলে প্রথম স্থানটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশেরই হতো।

Visit extonnews.click for more information.

আমরা জানি, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছুঁই ছুঁই করছে। শতকরা হিসাবে এই পরিমাণ মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। প্রকৃত শ্রেণীকরণ করলে এই হার যে আরও বেশি হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষে এই পরিমাণ ছিল সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার মতো।

এই হিসাবে ঘোষিত খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি, পুনঃ তফসিল করা ২ লাখ ৬৯ হাজার কোটি, উচ্চ আদালতের রায়ে স্থগিত খেলাপি ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি এবং অবলোপন করা ৮৩ হাজার কোটি টাকা মিলিয়ে মোট উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের ধারণা কিংবা এ রকম সবল উপস্থিতি আছে কি না জানা নেই।

খেলাপি ঋণ: নীতি বদলালে কি বাস্তবতা বদলাবেব্যাংক খাতের সংস্কারেও কেন খেলাপি ঋণ কমবে না

ইতালিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে একধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আছে, যাকে বলা হয় ইউটিপি (আনলাইকলি টু পে), অর্থাৎ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কম, এমন ঋণ। ধরে নেওয়া হয় এ ধরনের খেলাপি ঋণ আদায়যোগ্য, তাই এসব গ্রহীতার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে ব্যাংক। ইতালির মোট মেয়াদোত্তীর্ণ ও খেলাপি ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশই ইউটিপি শ্রেণির। এ ধরনের ঋণকে আমাদের আর্লি অ্যালার্ট (অগ্রিম সতর্কতা) শ্রেণির ঋণের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

এসব ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করলে ব্যাংকগুলোকে মূলধনসংকটে পড়তে হয় বলে এগুলোকে ইউটিপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক খেলাপি ঋণকে তিন ভাগে ভাগ করে দেখায়: মেয়াদোত্তীর্ণ, ইউটিপি এবং মন্দ ঋণ। ইউটিপি ঋণ হিসাবের কিছু লক্ষণ চিহ্নিত করা হয়েছে: গ্রাহকের পরিশোধের ধরন বদলে যাওয়া এবং ঘন ঘন কিস্তি খেলাপ, ঋণ পরিশোধের তাগাদার জবাব না দেওয়া, পরিশোধের অসমর্থতার জন্য নানা অজুহাত হাজির করা, পরিশোধের সময় বাড়ানোর ক্রমাগত অনুরোধ, গণমাধ্যমের বিরূপ সংবাদ ইত্যাদি। এই লক্ষণগুলোর সঙ্গে আমাদের খেলাপিদের আচরণের বেশ মিল দেখা যায়।

আমাদের দেশে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য একমাত্র ব্যাংকের ওপরই নির্ভরশীল। অথচ দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণের জন্য তাদের যাওয়া উচিত বন্ড বাজারে কিংবা পুঁজিবাজারে। তাই এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের জন্য ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ড ইস্যু করার মতো পদক্ষেপ সরকারের বিবেচনায় আছে বলে জানা যায়।

যাহোক, আমাদের পরিস্থিতির সঙ্গে ইউরোপের তুলনা করা যায় না। এমনকি তুলনা করা যায় না আমাদের কাছাকাছি অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গেও। ১৯৯৯ সালে ভারতের খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে যা নেমে এসেছে ২ শতাংশের ঘরে। শ্রীলঙ্কায় এই হার ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, নেপালে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এমনকি নানা সমস্যা কণ্টকিত আমাদের হালের মিত্রদেশ পাকিস্তানেও এই হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০১১ সালে যা ছিল ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশটির ব্যাংকগুলোর গড় মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০ দশমিক ৮ শতাংশ, যা স্থানীয় বিধির ন্যূনতম হারের চেয়ে বেশি।

লজ্জার বিষয়, বাংলাদেশে এই হার -২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, অর্থাৎ শূন্যের চেয়ে কম। আর একটু বাইরের দিকে দৃষ্টি দিলে, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আমাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামেও খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে। আমাদের ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা বোঝানোর জন্য আর কোনো উদাহরণের প্রয়োজন কি আছে?

ব্যাংক খাতে ‘লাইসেন্স টু লুট’, বাংলাদেশ সংস্করণব্যাংক খাতে ‘অ্যান্টি–এস আলম ল’-এর সন্ধানে

এই হতাশাজনক চিত্রের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে জেনে আশার একটা ক্ষীণ আলোর আভাস দেখা যাচ্ছে। আমাদের দীর্ঘদিনের কয়েকটি দাবি ছিল, যেমন খেলাপি গ্রহীতাদের ছবিসহ নামের তালিকা প্রকাশ করে প্রচার ও প্রদর্শন করার ব্যবস্থা করা, খেলাপি ঘোষণা না করার জন্য রিটের বেলায় অনাদায়ি ঋণের একটা নির্দিষ্ট অংশ জমা দেওয়ার বিধান করা, পুরো ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পুঁজিবাজার ও বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের বিধান যুক্ত করা ইত্যাদি।

তবে খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের সময় ছবি ও নামের সাইজ উল্লেখ করে দিতে হবে, তা না হলে একটা স্ট্যাম্প সাইজের ছবি এবং ১০ পয়েন্টের টাইপে নাম প্রকাশ করে দেয়ালে সেঁটে দিলে আইন মানা হবে, কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হবে না।

বর্তমানে নগদ ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া আছে ঋণদাতা ব্যাংকের মূলধনের ১৫ শতাংশ। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ বের করে নিতে পারে। এই প্রবণতা রোধ করার জন্য ভারতে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণ গ্রহণের সীমা বেঁধে দিয়ে চালু করেছিল ম্যাক্সিমাম পারমিসিবল ব্যাংক ফাইন্যান্স (এমপিবিএফ)। এই হিসাব করা হতো বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সেই প্রতিষ্ঠানের গৃহীত মোট ঋণকে বিবেচনায় এনে।

নয়-ছয় সুদহার, টাকা পাচার ও কতিপয় অসৎ ব্যাংকারটাকা পাচার, বেগমপাড়া ও দুদককে যা করতে হবে

আমাদের দেশে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য একমাত্র ব্যাংকের ওপরই নির্ভরশীল। অথচ দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণের জন্য তাদের যাওয়া উচিত বন্ড বাজারে কিংবা পুঁজিবাজারে। তাই এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের জন্য ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ড ইস্যু করার মতো পদক্ষেপ সরকারের বিবেচনায় আছে বলে জানা যায়।

আমাদের এসব চাওয়ার সঙ্গে আরও কিছু পরিকল্পনা সরকারের আছে জানার পর আমাদের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। যেমন খেলাপি ঋণ কমানো এবং মূলধনঘাটতি পূরণে ব্যর্থ ব্যাংকের পরিচালকদের মালিকানা হারানোর বিধান, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ বা মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শ্রেণীকৃত ঋণের হার বিবেচনা, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি তিন মাস পরপর গভর্নরকে আদায় অগ্রগতি জানানো, অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরিবোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি।

ব্যাংকের নতুন প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর নিজ ব্যাংকে কিংবা পূর্বতন ব্যাংকে তাঁর কর্মকালীন সময়ে শ্রেণীকৃত ঋণের হিসাবও বিবেচনায় নেওয়ার বিধান থাকা বাঞ্ছনীয়। খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যর্থ হলে পরিচালকদের মালিকানা হারানোর বিধানের পাশাপাশি আরেকটি বিধানের কথা ভাবা যেতে পারে।

আমাদের দেশে জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনের সময় খেলাপির খাতা থেকে নাম কাটানোর সময় প্রার্থীরা ন্যূনতম ডাউন পেমেন্ট দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁরা যদি আবার খেলাপি হয়ে পড়েন, তার কোনো প্রতিবিধান নেই। সুতরাং পরিচালকদের মালিকানা হারানোর বিধানটি জনপ্রতিনিধিদের জন্যও প্রযোজ্য করা উচিত, যাতে নির্বাচিত হওয়ার পর আবার খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি না নেন তাঁরা।

পরিকল্পিত পদক্ষেপগুলো আশাব্যঞ্জক নিঃসন্দেহে, যা শুরু হয়েছে এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধার মাধ্যমে, যদিও তারকা খেলাপিরা এই সুযোগ নিতে পারবেন না, কারণ তাঁরা তাঁদের ঋণের প্রায় পুরোটাই পাচার করেছেন বিদেশে, কিংবা জমি বা বাড়ি কেনার মতো অনুৎপাদনশীল খাতে আটকে ফেলেছেন। একই পরিণতি ঘটবে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি নিয়োগের বিষয়টির ব্যাপারে। কারণ, পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের মধ্যে বেনামি ও ঋণের নামে যে ব্যাপক জালিয়াতি ও তছরুপের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বন্ধকি সম্পত্তির কোনো অস্তিত্ব নেই, পুঁজি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোও কিছুই করতে পারবে না সেখানে।

তারপরও আমরা আশাবাদী হতে চাই, যার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব একমাত্র সর্বোচ্চ মহলের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছার মাধ্যমে। আগের সরকারের রাজনৈতিক অসদিচ্ছাকে এখন সদিচ্ছায় রূপান্তরিত করাই হবে বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

  • ফারুক মঈনউদ্দীন লেখক ও ব্যাংকার

    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source