আর্জেন্টিনাসহ লাতিন দেশগুলো কেন ইসরায়েল সমর্থক হয়ে উঠছে

· Prothom Alo

লাতিন আমেরিকাজুড়ে এখন এক তীব্র বিভাজন স্পষ্ট। একের পর এক জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। গাজায় তাদের তিন বছরের আগ্রাসনকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে গণহত্যা হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।

অথচ উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে নতুন এক ডানপন্থী সরকারের তরফ থেকে। এল সালভাদোর, আর্জেন্টিনা, চিলি, ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, হন্ডুরাস, কোস্টারিকা এবং এখন কলম্বিয়ায় এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তারা ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক জোরদার করছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে।

Visit bettingx.bond for more information.

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেছে গত মাসে কলম্বিয়ায়। সেখানে সাবেক গেরিলা ও বিদায়ী বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ক্ষমতা হারিয়েছেন। পেত্রো গত বছর নিউইয়র্কে এক ফিলিস্তিনপন্থী সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। এরপর ওয়াশিংটন তাঁর ভিসা বাতিল করে। এখন তাঁর জায়গায় ক্ষমতায় এসেছেন অ্যাবেলিয়ার্ডো দে লা এস্প্রিয়েলা। তিনি এমন একজন আইনজীবী, যিনি আধা সামরিক গোষ্ঠীর পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন। সামরিক স্বৈরশাসক এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

আর্জেন্টিনা কেন ইসরায়েলের এত বড় বন্ধু হয়ে গেল

পেত্রোর অভিযোগ, জুনের নির্বাচনে কলম্বিয়ার ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে ইসরায়েলি সাইবার-গোয়েন্দা সংস্থা ‘ব্ল্যাককোর’ অর্ধমিলিয়ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছে। সেই হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনে দে লা এস্প্রিয়েলা ১ শতাংশের কম ব্যবধানে জয়ী হন।

এই বিতর্ক মেটার আগেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উদ্‌যাপন শুরু করেন। তিনি নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানান এবং অনলাইনে ঘোষণা করেন, ‘ইসরায়েলের বন্ধুরা জয়ী হতে চলেছে’। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলে প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি এবং ৫ লাখ ইহুদি বসবাস করেন।

দে লা এস্প্রিয়েলা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফিলিস্তিনে কলম্বিয়ার দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা তিনি স্থগিত করবেন। একই সঙ্গে জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তরিত করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায় বোগোটার সক্রিয় অবস্থান ভেস্তে যাবে।

কলম্বিয়া হলো একের পর এক পতনের সাম্প্রতিক উদাহরণ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর প্রথম লাতিন আমেরিকান দেশ হিসেবে বলিভিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। কিন্তু গত ডিসেম্বরে নতুন মধ্য ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজের অধীন তারা আবার পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে। পাজ নির্বাচিত হওয়ার পরপরই নেতানিয়াহু নিজে ফোন করে এই সমঝোতা নিশ্চিত করেন।

লাতিন আমেরিকার জনগণ দিন দিন ইসরায়েলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হলেও এই নতুন ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী সরকারগুলো তাদের প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। আর এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে নজরদারি প্রযুক্তি সংস্থা, অস্ত্র চুক্তি এবং ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো প্রচার অভিযান।

মার্কিন পুতুল

ভেনেজুয়েলার নামমাত্র সমাজতান্ত্রিক সরকার আমেরিকার তীব্র চাপে রয়েছে। দেশটিতে কার্যত মার্কিন–সমর্থিত একধরনের ঔপনিবেশিক শাসন চলছে। তারা আমেরিকান সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে আতিথ্য দিয়েছে, আবার ইসরায়েলি মানবিক ও কূটনৈতিক পথও খোলা রেখেছে। সম্প্রতি তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ত্যাগের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। কারাকাস এখন অঞ্চলের মার্কিন স্বার্থের পুতুলে পরিণত হয়েছে এবং ক্রমেই চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে।

দশকজুড়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় বিধ্বস্ত কিউবা এখন আমেরিকা–সমর্থিত অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে হাঁটছে। যদিও তাদের ওপর নতুন করে আরও নিষেধাজ্ঞা চাপানো হচ্ছে। তবে তারাও খুব একটা পিছিয়ে নেই।

শীতল যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ হাভানা থেকেই তাদের কার্যক্রম চালাত। পুরো অঞ্চলে বামপন্থী ও সোভিয়েত এজেন্টদের শনাক্ত করতে তারা সিআইএকে সহায়তা করত। অর্থাৎ গাজা সংকটের অনেক আগে থেকেই লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলি তৎপরতা বিদ্যমান।

নিরাপত্তাসংক্রান্ত চুক্তিগুলো এসবের মূল চালিকা শক্তি হলেও সাধারণ লাতিন আমেরিকানদের এখানে কিছু বলার থাকে না। ‘পেগাসাস’-এর মতো অনুপ্রবেশকারী ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার পুরো অঞ্চলে সন্ত্রাসী বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে নয় বরং সাংবাদিক ও বিরোধী নেতাদের টার্গেট করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ব্রাজিলের পুলিশ বাহিনী এই অঞ্চলের সবচেয়ে মরণঘাতী বাহিনীগুলোর একটি। বস্তিগুলোতে তারা প্রচুর ইসরায়েলি অস্ত্র ব্যবহার করে। ব্রাজিলজুড়ে পুলিশি সহিংসতায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলে হিজবুল্লাহর কথিত উপস্থিতি তদন্তে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা কাজ করেছে।

আর্জেন্টিনা কেন তার এই ইতিহাস অস্বীকার করতে চায়  

সামনে কঠিন পরীক্ষা

ব্রাজিলের অক্টোবর নির্বাচনকে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর প্রচারণা শুরু করেছেন। তাঁর পক্ষে নেতানিয়াহুর ভিডিও বার্তা এবং আর্জেন্টিনার নেতা হাভিয়ের মিলেইয়ের সমর্থন রয়েছে। মিলেই নিজেকে ‘ইসরায়েলের ভক্ত’ হিসেবে দাবি করেন এবং আর্জেন্টিনার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছেন। তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিরুদ্ধে লড়ছেন।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট লুলা লাতিন আমেরিকার হাতে গোনা কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানের একজন, যিনি এখনো গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে গণহত্যা বলতে দ্বিধা করেন না। এমনকি তিনি এর সঙ্গে হলোকাস্টের তুলনা করেছেন।

ব্রাজিল ও মেক্সিকো—উভয় দেশই ওয়াশিংটনের তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম ইহুদি ঐতিহ্যের একজন বামপন্থী নেত্রী। অর্থনৈতিক যুদ্ধ, হামলার হুমকি, নিষেধাজ্ঞা এবং সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের ওপর এই চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

এল সালভাদোরের স্বৈরাচারী শাসক নাইব বুকেলে নিজেই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। তা সত্ত্বেও তিনি ইসরায়েলি অস্ত্র ও নজরদারি সরঞ্জামের ওপর ভিত্তি করে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।

হন্ডুরাসের নতুন প্রেসিডেন্ট নাসরি আসফুরা ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে ক্ষমতায় এসেছেন। তিনিও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তিনি ইসরায়েল সফর করেছেন এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখাও করেছেন।

‘হন্ডুরাসগেট’ নামে ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা গেছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ, আসফুরা এবং মিলেই এক ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনা করছেন। অঞ্চলে বামপন্থী সরকারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে তারা হন্ডুরাসকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছিলেন। ড্রাগ পাচারের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হার্নান্দেজকে ট্রাম্প থেকে ক্ষমা পাইয়ে দিতে নেতানিয়াহু সহায়তা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

লাতিন আমেরিকার জনগণ দিন দিন ইসরায়েলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হলেও এই নতুন ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী সরকারগুলো তাদের প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। আর এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে নজরদারি প্রযুক্তি সংস্থা, অস্ত্র চুক্তি এবং ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো প্রচার অভিযান।

অভিজাত ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যবর্তী এই ব্যবধান এখন এই অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন এক যুদ্ধের ময়দান তৈরি করেছে। ব্রাজিলের আসন্ন নির্বাচন এই দূরত্ব কমাবে নাকি আরও বাড়াবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

  • জোসেফ বুশার্ড কুইবেকভিত্তিক সাংবাদিক ও গবেষক।

মিডলইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

Read full story at source