কেক
· Prothom Alo

আমার নতুন চাকরির দ্বিতীয় দিনে একটা কেক খাইয়ে আমার টিমের অর্ধেক মানুষকে শেষ করে দিয়েছিলাম।
পত্রিকা আর সোশ্যাল মিডিয়া কিছুদিন শোরগোল তুলে ভুলে গেছে। শুধু আমি ভুলতে পারিনি; কারণ, আমি জানি ওই দিন আসলে কী ঘটেছিল এবং যা ঘটেছিল, তার ব্যাখ্যা আমার কাছে ছিল না।
Visit umafrika.club for more information.
এটা শুধু মৃত্যুর ঘটনাই না, মৃত্যু হলে বরং আরও সহজ হতো। যা ঘটেছিল, তা এই জগতের চেনা কিছু না।
গোড়া থেকে বলি। আমার নাম রাফি। বারোটা ইন্টারভিউ ফেল করার পর তেরো নম্বরটায় আমার চাকরি হয়েছিল নর্থস্টারে। নামটা শুনেই বুঝছেন, দেশের সেরা করপোরেট জায়ান্ট কোম্পানিগুলির একটা। কাচের হাইরাইজ টাওয়ার, বিশাল স্পেস, ফ্রি লাঞ্চ, জিমসহ অফিস; আর নিয়োগপত্রের সঙ্গে একটা সুন্দর গুডি বাক্স, যাতে লেখা, ওয়েলকাম টু দ্য ফ্যামিলি।
ফ্যামিলি। শব্দটা মনে রাখবেন। করপোরেট–দুনিয়ায় এ শব্দটা যত বেশি শুনবেন, বুঝবেন তত বড় বিপদে আছেন। আসল পরিবার কখনো বলে না আমরা সবাই একটা পরিবার। বলার দরকার পড়ে না।
আমার জয়েন করার দিন ছিল আরেকজনের বিদায়ের দিন। সাদমান ভাই। জয়েন করার আগেই ওনার গল্প শুনেছি। নর্থস্টারের কিংবদন্তি। টানা ছয় বছরের বেস্ট পারফরমার, যার ডেস্কের বাতি নাকি কেউ কোনো দিন নিভতে দেখেনি, যার সেলস টার্গেট ছিল বসের স্বপ্নের চেয়েও বড় এবং যিনি হঠাৎ, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া নাকি কিছুদিন আগে রিজাইন করেছেন। হিউম্যান রিসোর্সের ভাষায়, উনি নিজের প্যাশন ফলো করতে যাচ্ছেন।
উনার বিদায়ের দিনে আমাদের টিমের ছয়জনের একটা ডিনার হলো। দ্য লাস্ট সাপার! অফিসের কাছেই একটা দামি রেস্টুরেন্টের কোনার টেবিলে। আমিই কিছুদিন ট্রেনিং নিয়ে সাদমান ভাইয়ের রিপ্লেসমেন্ট হতে যাচ্ছি। যাকে বিদায় দেওয়া হচ্ছে আর যে খালি জায়গাটি নিতে নিচ্ছে, দুজনকেই একসঙ্গে খাওয়ানোর মধ্যে করপোরেটের একটা নিষ্ঠুর আনুষ্ঠানিকতা আছে। কারখানার পুরোনো যন্ত্রের সামনেই নতুন যন্ত্রের মোড়ক উন্মোচন।
ওই রাতের কথা আমার মিনিটে মিনিটে মনে আছে। এবং এখানেই আমি প্রথম থমকে যাই, কারণ পরে জেনেছি, ওই রাতটার হিসাব মেলে না। সেই প্রসঙ্গে আসছি।
ছয়জন মানুষ। শোয়েব স্যার, আমাদের টিম লিড, যিনি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকেও ল্যাপটপে টাইপ করছিলেন। মিতু আপা, সিনিয়র অ্যানালিস্ট, দুই বাচ্চার মা, যাঁদের ছবি ওনার ডেস্কে আছে, কিন্তু তাদের কোনো স্কুলের অনুষ্ঠানে উনি গত দুই বছরে যেতে পারেননি। জাহিদ আর তমাল, আমার টিমের দুই কলিগ, যারা প্রমোশনের জন্য একে অপরকে এমন মধুর ভাষায় খুন করত, কিন্তু বাইরের লোক ভাবত বন্ধুত্ব, আমি আর টেবিলের মাথায় সাদমান ভাই।
সাদমান ভাইকে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। কিংবদন্তির চেহারা তো এমন হওয়ার কথা না। রোগা, চোখের নিচে কালি, কিন্তু চোখ দুটোর গভীরে এমন একটা দুঃখী শান্তি, যেটা আমি কাছের মানুষের জানাজা পড়ে আসা মানুষদের চোখে দেখেছি। সব ঝামেলা হিসাব চুকিয়ে ফেলার পর মানুষের চোখের যে প্রশান্তি, সেটা।
কাঁটা চামচ দিয়ে ফ্রায়েড রাইস নাড়তে নাড়তে উনি একটা প্রশ্ন করলেন, খুবই সাধারণ গলায়, ‘আচ্ছা, আপনারা ছোটবেলায় কে কী হতে চাইছিলেন?’
টেবিলটা চুপ হয়ে গেল। এমন চুপ, যেন উনি খুব অস্বস্তিকর একটা প্রশ্ন করেছেন। কিছু বললে চাকরি থাকবে না।
শোয়েব স্যার প্রথমে হাসলেন। ‘কী সব যে বলেন সাদমান ভাই। ছোটবেলার কথা কি মনে থাকে!’
‘থাকে না?’ সাদমান ভাই মুখ তুললেন। ‘জাহিদ, তুমি বলো।’
জাহিদ কাঁটা চামচ নামিয়ে ভাবল। অনেকক্ষণ। বলল, ‘মনে করতে পারতেছি না ভাই। সত্যি মনে করতে পারতেছি না। কিছু একটা হইতে তো চাইছিলাম।’
একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করা হলো। মিতু আপা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘গান শিখতাম। স্কুলে নজরুলসংগীত গেয়ে পুরস্কার পেয়েছিলাম দুয়েকবার।’ বলে উনি নিজেই চমকে উঠলেন, যেন কথাটা অন্য কেউ বলেছে ওনার গলা দিয়ে।
তমাল বলল ক্রিকেট। শোয়েব স্যার বিরক্ত মুখে বললেন, ‘এসব আলাপের পয়েন্ট কী?’
সাদমান ভাই আমার দিকে তাকালেন। ‘তুমি? নতুন জয়েন করছ, তোমার তো এখনো মনে থাকার কথা।’
আমি বললাম, ‘লেখক।’
উনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, ‘লিখে রাইখো কথাটা। কাগজে। কারণ, এই অফিসের ঢোকার পর কথাটা ভুলেও যাইতে পারো।’
শোয়েব স্যার এবার সত্যিই বিরক্ত। ‘সাদমান ভাই, আপনি যাইতেছেন, ইমোশনাল হইছেন, বুঝলাম। কিন্তু পোলাপানের মাথা খারাপ কইরেন না। প্র্যাকটিক্যাল দুনিয়ায় এই সব শখ দিয়া সংসার চলে না। পারফরম্যান্স লাগে, ডেডিকেশন লাগে, ডেলিভারি লাগে।’
‘পারফরম্যান্স!’
‘শোয়েব ভাই, মনে আছে আপনার ফাহিমের কথা? কনটেন্ট মার্কেটিংয়ের ফাহিম? কোয়ার্টার শেষ হিসাবের রাতে ডেস্কে মাথা রাখল, আর তুলল না। বয়স ছিল তেত্রিশ! মনে আছে কোম্পানি কী করছিল? জানাজার আগেই ওর ম্যানেজার ফ্যামিলিরে ফোন দিয়া জিগাইছিল, ভাবি, ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডটা যদি একটু বলতেন, গুরুত্বপূর্ণ হ্যান্ডওভারটা আটকায়া আছে।’
উনি টেবিলে চোখ বোলালেন।
‘জাপানে অতিরিক্ত কাজে মৃত্যুর জন্য একটা আলাদা শব্দ আছে, কারোশি। এটা কোনো লেখকের বানানো শব্দ না, সরকারি পরিভাষা। জাপান সরকার প্রতিবছর শত শত মৃত্যুকে আনুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত কাজজনিত বলে সার্টিফাই করে, পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়। আমাদের দেশে তো এর কোনো নামও নাই।’
তমাল উঠে দাঁড়াল। ওর হাতে তখনো ল্যাপটপ ধরা, স্ক্রিনে এক্সেল খোলা। ও মনিটরের দিকে তাকিয়ে ছিল এমনভাবে, যেভাবে মানুষ বিদেশি অচেনা ভাষার সাইনবোর্ড দেখে। তারপর খুব স্পষ্ট গলায় বলল, ‘এইগুলা কী? এই ঘরগুলাতে সংখ্যা ভইরা আমি কী করতেছি চার বছর ধরে?’ বলে ও হাঁটা দিল। লিফটে না, সিঁড়ি দিয়ে। নয়তলা থেকে নিচে নেমে ও পার্কিং লটে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন বৃষ্টি। কাচের জানালা দিয়ে আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, ও দুই হাত ছড়িয়ে মুখ তুলে ভিজছে, আর হাসছে।
উনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন, ‘ফাহিমের ডেস্কটা খালি থাকে নাই এক সপ্তাহও। আমরা কেউ এখানে অপরিহার্য না, তবু আমরা জীবনটা দিই এমনে, যেন আমরা ছাড়া কোম্পানি অচল। করপোরেট–দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জাদুটা কী জানো? কোম্পানির খাতায় আমাদের দাম এক–দুই মাসের নোটিশ। আর আমরা কোম্পানিরে দিই এমন সব জিনিস, যেগুলার কোনো নোটিশ পিরিয়ড নাই। যৌবন গেলে আর ফেরে না। বাচ্চার প্রথম হাঁটা আর প্রথম বাবা ডাক একবারই হয়। বাপের জানাজা মিস হইলে আর পড়া যায় না। আর ওই রাতগুলা। আকাশভরা জোছনার রাত, ঝুম বৃষ্টির রাত, যেই রাতে প্রিয় মানুষটার হাত ধরে হাঁটার কথা ছিল, সেই রাতগুলা ডেডলাইনের নিচে চাপা পড়ে ক্যালেন্ডার থেকে ঝরে যায়। রিপ্লেসমেন্ট যার সাত দিনে পাওয়া যায়, তার কাছ থেকে আদায় করা হয় সেই জিনিস, যার রিপ্লেসমেন্ট সাত জনমেও পাওয়া যায় না।’
টেবিলে তখন শুধু কাঁটা চামচের টিং টিং শব্দ।
‘আমি ছয় বছরে কী কামাইছি জানো?’ উনি বলে চললেন। ওনার গলাটা তখন বড় হয়ে যাচ্ছিল, টেবিল ছাপিয়ে, রেস্টুরেন্ট ছাপিয়ে। ‘তিনটা বেস্ট পারফরমার ক্রেস্ট, একটা ফ্যাটি লিভার, আর একটা আবিষ্কার। আবিষ্কারটা বলি। মানুষ ভাবে, কোম্পানি তার সময় কেনে। ভুল। কোম্পানি কেনে মনোযোগ। তুমি বাসায় যাও, শরীরটা তোমার সাথে যায়, ভাবনাটা অফিসে ওভারটাইম করে। বউয়ের সাথে শুয়ে তুমি ক্লায়েন্টের প্রেজেন্টেশন নিয়ে ভাবো, বাচ্চার জন্মদিনে কেক কাটার সময়েও ডেডলাইন গোনো। একটা সময়ে দেখবা, তোমার ভিতরে সব খালি হয়ে গেছে। শরীরটা অফিস করে, প্রমোশন পায়, ইএমআই বিল দেয়, লিংকডইন–ফেসবুক পোস্ট দেয়। ভিতরের ঘরটা খালি। ওই ঘরে কিছু আর অবশিষ্ট নেই।’
উনি বলে চলেন, ‘ওরা স্বপ্নরে মারে গলা টিপ দিয়া, না পারলে ওরা স্বপ্নরে পিছাইতে শেখায়। এই প্রজেক্টটা শেষ হইলেই। এই প্রমোশনটা পাইলেই। এই লোনটা শোধ হইলেই। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে অবসরে গিয়া গিটার শিখবা, উপন্যাস লেখবা, দুনিয়া ঘুরবা। তত দিনে বাতের ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস, চোখে ছানি। আর যেই মানুষটার লগে ঘুরার কথা ছিম, সে হয় থেকেও নাই অথবা আসলেই নাই। স্বপ্ন জিনিসটারও তো একটা এক্সপায়ার্ড ডেট আছে।’
‘তাইলে ছেড়ে দিলেই হয়,’ তমাল বলল, একটু তাচ্ছিল্যের গলায়। ‘দরজা তো খোলা।’
‘হুম!’ সাদমান ভাই হাসলেন। ‘এইটাই তো জাদু। খাঁচার দরজাটা খোলাই থাকে। কেউ তালা দেয় না। তালা দিলে পাখি জানত সে বন্দী, আর বন্দী পাখি পালানোর চেষ্টা করে। ওরা করে কী, খাঁচাটা বানায় সোনা দিয়া। ভিতরে খাবার, বাইরে সংসারের চাহিদার লিস্ট। পাখির ডানার নাম হয়ে যায় লায়াবিলিটি। উড়াল দিবে কই, ঘরের ভাড়া? বাজার সদাই? বাচ্চার স্কুলের বেতন? পাখি তখন নিজেই ঠিক করে, উড়ব না। কয়েক বছর পরে আরও ভয়ংকর জিনিসটা ঘটে। পাখি খাঁচাটারেই আকাশ ভাবা শুরু করে। এক পাশের রেলিং থেকে আরেক পাশের রেলিংয়ে লাফানোটারেই ভাবে উড়া। শুক্র–শনিবার এই মিথ্যা উড়াউড়ির দিন। আর বছরে একবার কক্সবাজারের ছবি দিয়ে ক্যাপশন লেখে, ফ্রি অ্যাজ আ বার্ড।’ উনি আমার দিকে তাকালেন। ‘খাঁচার পাখির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কী জানো? তারে জোর করে আটকাইতে হয় না। সে নিজেই পাহারা দেয় নিজেরে।’
খাওয়া শেষে সাদমান ভাই ব্যাগ থেকে একটা সাদা বাক্স বের করলেন। ‘একটা কেক বানাইছি। নিজের হাতে। আম্মার রেসিপি।’ উনি হাসলেন। ‘আম্মা বেঁচে থাকতে প্রতি জন্মদিনে বানাইতেন। শেষ কয়েক বছরে আমি অফিসের প্রেশারে আম্মার কাছে যাইতেও পারি নাই, খাইতেও পারি নাই। যা–ই হোক। আম্মা আজ আর নাই। তবে কাজের ফাঁকে আমি এই অফিসের রান্নাঘরে মাঝেমাঝে যাইতাম, রেসিপি আমার মুখস্থ।’
এবার আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘রাফি, যেহেতু সবাই ভরপেট, আর তোমার সাথে বড় ব্যাকপ্যাক আছে, তুমিই নিয়ে যাও কেকটা।’ উনি বাক্সটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন, ‘কাল এটা সবার জন্য নিয়ে যাইয়ো অফিসে। পুরা টিমরে খাওয়ায়ো, নাইন্থ ফ্লোরের সবাইরে। আমার শেষ ট্রিট।’
বাক্সটা হাতে নিয়ে আমি বললাম, ‘আপনি আসবেন না কালকে?’
উনি আমার দিকে কেমন শীতল দৃষ্টিতে তাকালেন। ওই দৃষ্টিটা আমি জীবনেও ভুলব না। উনি বললেন, ‘আমার নোটিশ পিরিয়ড শেষ, ভাই। কোম্পানির নিয়ম বড় কড়া। শেষ দিনের পরে আর থাকা যায় না।’
পরদিন লাঞ্চের পর আমি ডাইনিংয়ে কেকটা কাটলাম। সাদা ক্রিমের ওপরে চকলেট দিয়ে লেখা, ‘হে বন্ধু, বিদায়!’
আমি ভেবেছিলাম বিদায়ী রসিকতা। নাইন্থ ফ্লোরের অনেকে এল। তেরোজনের মতো। কেউ কেউ নিল না, শোয়েব স্যার ডায়েটে, দুইজনের ডায়াবেটিস, কয়েকজন মিটিংয়ে। বাকিরা বেশ তৃপ্তি নিয়েই খেল।
প্রথম পনেরো মিনিট কিছুই হলো না। তারপর আস্তে আস্তে পরিস্থিতি অদ্ভুত হতে শুরু করল।
তমাল উঠে দাঁড়াল। ওর হাতে তখনো ল্যাপটপ ধরা, স্ক্রিনে এক্সেল খোলা। ও মনিটরের দিকে তাকিয়ে ছিল এমনভাবে, যেভাবে মানুষ বিদেশি অচেনা ভাষার সাইনবোর্ড দেখে। তারপর খুব স্পষ্ট গলায় বলল, ‘এইগুলা কী? এই ঘরগুলাতে সংখ্যা ভইরা আমি কী করতেছি চার বছর ধরে?’ বলে ও হাঁটা দিল। লিফটে না, সিঁড়ি দিয়ে। নয়তলা থেকে নিচে নেমে ও পার্কিং লটে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন বৃষ্টি। কাচের জানালা দিয়ে আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, ও দুই হাত ছড়িয়ে মুখ তুলে ভিজছে, আর হাসছে। এমপ্লয়ি অব দ্য মান্থ তমাল, ভরা অফিস টাইমে ফরমাল টাই–শার্ট পরা অবস্থায়, ঝুম বৃষ্টিতে ভিজছে।
আমি পাগলের মতো টিমের বাকিদের ধরলাম। শোয়েব স্যার আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি ওনার সময় নষ্ট করছি। ‘কালকে রাতের ডিনার? হ্যাঁ, তোমার ওয়েলকাম ডিনার ছিল। আমরা পাঁচজন ছিলাম। ছয় নম্বর কেউ ছিল না, রাফি। কেকটা তুমিই আনছিলা পরদিন, বাসা থেকে। ভুলে গেছ?’
পরক্ষণেই মিতু আপা ফোন হাতে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একটা নম্বরে ডায়াল করছিলেন, বারবার। পরে জেনেছি, ব্যস্ততা আর মান–অভিমানে মা–বাবাকে অনেক দিন কলই দেননি।
জাহিদ নিজের ডেস্কের ফটো ফ্রেম, ক্রেস্ট, আইডি কার্ড সব একটা কার্টনে ভরল—শান্ত, গোছানো হাতে। তারপর কার্টনটা ডেস্কেই রেখে খালি হাতে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ধন্যবাদ।’ কিসের ধন্যবাদ, বলল না।
এ অংশটা লিখতে আমার হাত কাঁপছে।
রউফ সাহেব। অ্যাকাউন্টসের রউফ সাহেব, বয়স পঞ্চান্ন, এই কোম্পানিতে আটাশ বছর, রিটায়ারমেন্টের বাকি ছয় মাস। উনি কেকের টুকরাটা খেয়ে নিজের ডেস্কে ফিরে গিয়েছিলেন, চুপচাপ। হঠাৎ দেখি উনি চেয়ারে হেলান দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন, আর প্রথমে আস্তে, তারপর বেশ জোরে জোরে শব্দ করে হাসছেন। একটু একটু করে, যেভাবে ভোর ফোটে আর সূর্যের আলো তীব্র হয় তেমন। আটাশ বছরে কেউ রউফ সাহেবকে হাসতে দেখেনি। উনি জানালার কাচের ওপারে আকাশের দিকে কী যেন দেখছিলেন, যেটা আমরা কেউ দেখছিলাম না। তারপর প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘খাঁচাটা খুলছে রে।’
তারপর ওনার মাথাটা এলিয়ে পড়ল।
অস্বস্তিকর বিষয় ছিল ওনার মুখে লেগে থাকা অতি শান্তিময় হাসিটা, চোখের দৃষ্টি স্থির।
আর বাকি কয়েকজন! তারা চেয়ারেই বসে রইল। নড়ল না। চোখ ঘোলা ও খোলা। সবাই পাগলা কুকুরের মতো জিব বের করে ঘড়ঘড় শব্দে নিশ্বাস নিচ্ছে আর লালা পড়ছে, কিন্তু ডাকলে কোনো সাড়া নেই। চোখের সামনে হাত নাড়লে পলক পড়ে। ব্যস, ওইটুকুই। মনে হচ্ছে শরীর জীবিত, কিন্তু তার ভেতরে কেউ নেই, শুধু কুকুরের ঘড়ঘড় শব্দ। এরপর তাদের মুখেও রউফ সাহেবের সেই অট্টহাসি। পরক্ষণেই একসঙ্গে সবাই এলিয়ে পড়ল মাটিতে।
এরপর নাইন্থ ফ্লোরে যা শুরু হলো, তার জন্য বাংলায় একটাই শব্দ আছে। কেয়ামত। চিৎকার, কান্না, ফোনের ক্যামেরা। সব কয়টা ক্যামেরা একসময় ঘুরে গেল আমার দিকে। শোয়েব স্যার আঙুল তুলে চিৎকার করছিলেন, ‘ওই ছেলে! ও–ই কেকটা আনছে! নতুন ছেলেটা!’ যারা কেক খায়নি, তারা আমাকে ঘিরে দাঁড়াল। ওদের বৃত্তটা ছোট হতে হতে আমার নিশ্বাস আটকে আসছিল। কেউ একজন আমার কলার ধরল। আমি তখনো হাতে কেক কাটার প্লাস্টিকের ছুরিটা ধরে দাঁড়িয়ে। পরে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ঠিক ওই দৃশ্যটাই দেখা গিয়েছিল। ছুরি হাতে নতুন ছেলে, চারপাশে লাশ আর পাগলপ্রায় বাদবাকি লোকজন।
আমি যতই বলি, ‘এটা সাদমান ভাইয়ের কেক’, কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না।
পুলিশ আমাকে নিয়ে গেল সেই সন্ধ্যায়। ছাব্বিশ ঘণ্টা আমি একটা জানালাহীন ঘরে বসে ছিলাম, চোখের ওপরে ছিল তীব্র আলোর বাতি, যেখানে তিনজন মানুষ পালা করে আমাকে একই প্রশ্ন ছাব্বিশ রকমভাবে করেছে। কেকে কী মিশাইছিলি? কার নির্দেশে? কত টাকা পাইছস? বিদেশি কানেকশন আছে? রাজনৈতিক মোটিভ কী? আমার মেসে তল্লাশি হলো, আমার ল্যাপটপ গেল, আমার গ্রামের বাড়িতে পুলিশ গেল। টিভি স্ক্রলে আমার নাম গেল: কেক–রহস্য, ঘাতক নাকি ষড়যন্ত্র? তিন দিনের মাথায় আমার বিরুদ্ধে হত্যা মামলার প্রস্তুতি শুরু হলো। ছয়টা লাশ, সাতাশজন প্রত্যক্ষদর্শী, আর ভাইরাল সব ভিডিও। সঙ্গে ফেসবুক–বোদ্ধাদের আকাশ–পাতাল বিশ্লেষণ করা পোস্ট ও ভিডিও, যেন তাঁরাও আমার সঙ্গে ছিলেন ঘটনার সময়।
চতুর্থ দিনে থানায় আমার সাথে দেখা করতে এলেন একজন। নর্থস্টারের লিগ্যাল হেড। দামি স্যুট, ঠান্ডা চোখ, আর মুখে সুন্দর হাসি। উনি আমার সামনে একটা ফাইল রাখলেন। বললেন, ‘রাফি, কোম্পানি তোমার পাশে আছে।’
আমি তখনো জানতাম না, করপোরেট অভিধানে পাশে থাকা মানে কী। পাশে থাকা মানে, আমরা ঠিক করব, ঘটনা যা–ই ঘটুক। ফাইলে ছিল কয়েকটা কাগজ। আমি সই করলে কোম্পানির সেরা উকিলরা আমার মামলা দেখবে। ফরেনসিক যেহেতু কেকে বিষাক্ত বা সন্দেহজনক কিছু পায়নি, মামলা এমনিতেও দাঁড়াবে না, ঘটনাটা হয়ে যাবে বিল্ডিংয়ের গ্যাস লিক, দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা। বিনিময়ে আমি কোনো দিন, কোথাও, কারও কাছে ঘটনার একটা টুঁ শব্দ উচ্চারণ করব না। এ ছাড়া আমাকে যে পরিমাণ স্যালারি অফার করা হলো, সেটা কখনোই আমার লেভেলে পাওয়া সম্ভব নয়।
উনি চলে যাওয়ার আগে দরজায় থেমে ঘুরলেন।
‘আরেকটা কথা। রিজাইন করবা না। এখন রিজাইন করলে লোকে ভাববে তুমিই দোষী। কোম্পানি চায়, তুমি থাকো। আমাদের চোখের সামনে।’
আমি সই করেছিলাম। আপনি করতেন না? ছাব্বিশ ঘণ্টার জানালাহীন ঘর আপনার দেখা হয়নি বলেই বীরত্বের কথাটা এত সহজে ভাবতে পারছেন হয়তো।
ছাড়া পেয়ে আমি প্রথম যে কাজটা করলাম, এইচআরে গিয়ে বললাম, অন্তত নিজেদের রেকর্ডের জন্য হলেও লিখে রাখেন, কেকটা সাদমান ভাইয়ের। উনি বিদায়ী ডিনারে দিয়েছেন আমাকে পরের দিন অফিসে এনে সবাইকে খাওয়ানোর জন্য। ছয়জন ছিলাম টেবিলে।
এইচআরের মেয়েটা ল্যাপটপে অনেকক্ষণ কী যেন দেখল। তারপর অবাক হয়ে মুখ তুলে বলল, ‘সাদমান নামের কারও রেকর্ড তো আমাদের সিস্টেমে নাই।’
‘মানে? উনি ছয় বছর কাজ করছেন! বেস্ট পারফরমার! ওনার ক্রেস্টের ছবি লবিতে…’
আমরা লবিতে গেলাম। বেস্ট পারফরমারদের ছবির দেয়াল। ছয়টা ফ্রেম। ছয়টাতেই অন্য মুখ।
আমি পাগলের মতো টিমের বাকিদের ধরলাম। শোয়েব স্যার আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি ওনার সময় নষ্ট করছি। ‘কালকে রাতের ডিনার? হ্যাঁ, তোমার ওয়েলকাম ডিনার ছিল। আমরা পাঁচজন ছিলাম। ছয় নম্বর কেউ ছিল না, রাফি। কেকটা তুমিই আনছিলা পরদিন, বাসা থেকে। ভুলে গেছ?’
একজন মানুষ, যে এই সিক্রেট রেসিপিটা জানত, যে একদিন ঘাতক এই রেসিপির প্রতিষেধক খাবার বানাল। একটা কেক, যার ফরেনসিকে ময়দা ডিম চিনি ক্রিম কোকো ছাড়া কিছু নেই, কারণ যা মেশানো ছিল সেটা রান্নার কোনো উপাদানই না। একটা টিম, যারা কেক খেয়ে হয় জেগে উঠল, নয় মরেই গেল।
পাঁচজনের চারজনই একই কথা বলল। ছয় নম্বর চেয়ারটা কারও মনে নেই। শুধু মিতু আপা হাসপাতালে নেওয়ার আগে, আমার হাতটা চেপে ধরে উদ্ভ্রান্তের মতো চিৎকার করতে করতে বলেছিলেন, ‘আমার মনে আছে, উনি ছিলেন। আমার ছোটবেলার গানবাজনা শেখার কথাটা উনিই মনে করাইছিলেন। উনাকে স্পষ্ট দেখেছি।’ তারপর মিতু আপাকে নিয়ে যাওয়া হলো। কোম্পানির মেডিক্যাল লিভের কাগজে ওনার অবস্থার নাম লেখা হলো, স্ট্রেস ইনডিউসড ডিলিউশন।
মামলাটা সত্যিই দাঁড়াল না। ফরেনসিকে কেকের ভেতরে ময়দা, ডিম, চিনি, ভ্যানিলা, কোকো পাউডার ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি। গ্যাস লিকের গল্পটা দাঁড় করানো হলো, বিল্ডিংয়ের ভেন্টিলেশন সার্ভিসিং দেখানো হলো, মৃতদের পরিবার মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আর সমঝোতার চুক্তি পেল। আর আমি আমার সই করা কাগজগুলির কপি হাতে পেলাম। সেগুলি উল্টাতে গিয়ে আমার চোখ আটকাল পাতার নিচের ছোট্ট ছাপা লাইনে। নর্থস্টার পিপল অ্যান্ড কালচার, নাইন্থ ফ্লোর, উইং সি।
উইং সি। নাইন্থ ফ্লোরে আমি উইং সি বলে কিছু দেখিনি।
আমি খুঁজে বের করলাম। এলিভেটরের উল্টো পাশে, পেছনের করিডর, যেটার মাথায় একটা ধূসর দরজা, কোনো নামফলক নেই, শুধু একটা কার্ডরিডার। আমার কার্ডে দরজা খোলে না। আমি তিন সপ্তাহ ওই দরজাটার ওপর নজর রাখলাম। ওই দরজা দিয়ে ঢোকে শুধু নতুন জয়েন করা এমপ্লয়িরা, এইচআরের একজনের সঙ্গে, জয়েনিংয়ের প্রথম সপ্তাহে। ঢোকে হাসিমুখে। বের হয় চল্লিশ মিনিট পর, একটু ফ্যাকাশে, হাতে মাথাব্যথার ওষুধের পাতা, আর মুখে ওই বিখ্যাত বাক্য, ‘ওরিয়েন্টেশনটা দারুণ হলো।’
আমার নিজের ওরিয়েন্টেশনের কথা মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে নেই। প্রথম দিনের একটা গোটা দুপুর আমার স্মৃতিতে নেই। ক্যালেন্ডারে মিটিংয়ের নাম ছিল ‘ক্যালিব্রেশন সেশন’। আমি ঢুকেছিলাম–বেরিয়েছিলাম, মাঝখানের চল্লিশ মিনিট একটা শূন্য স্মৃতির পাতা। কোনো ঘটনা নেই।
সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। সাদমান ভাইয়ের শেষ কথাগুলি মাথায় ঘুরছিল। ভোরের দিকে, হঠাৎ, ডিনার টেবিলের একটা বাক্য মনে পড়ল, যেটা তখন কানে ঢুকেও ঢোকেনি। উনি বলেছিলেন, ‘আমি এই অফিসের রান্নাঘরেই মাঝেমাঝে যাইতাম, রেসিপি আমার মুখস্থ।’
আমি ভেবেছিলাম উনি কেকের কথা বলছেন।
উনি কেকের কথা বলছিলেন না।
তিনটা মাস ধরে ঘুম নষ্ট করে হিসাবটা এখন আমি মিলিয়েছি। একটা কোম্পানি, যার নতুন কর্মীদের প্রথম দিনে চল্লিশ মিনিটের একটা সেশন হয়, যেটার কথা কারও মনে থাকে না। তারপর মানুষগুলি বদলাতে থাকে। মনোযোগের পুরাটা অফিস পায়, বাইরেরটা কেমন যেন মিলিয়ে যায়, যাকে সবাই বলে প্রফেশনাল ক্যালিব্রেশন। আরও একটা জিনিস বুঝলাম, অফিসের অধিকাংশ দক্ষ স্টাফেরা হয় সিঙ্গেল, ডিভোর্সড অথবা তারা অসুখী বিবাহিত জীবনে আছে।
একজন মানুষ, যে এই সিক্রেট রেসিপিটা জানত, যে একদিন ঘাতক এই রেসিপির প্রতিষেধক খাবার বানাল। একটা কেক, যার ফরেনসিকে ময়দা ডিম চিনি ক্রিম কোকো ছাড়া কিছু নেই, কারণ যা মেশানো ছিল সেটা রান্নার কোনো উপাদানই না। একটা টিম, যারা কেক খেয়ে হয় জেগে উঠল, নয় মরেই গেল।
জেগে ওঠা মানুষ শুধু তারাই, যাদের ভেতরে তখনো কিছু স্বপ্ন, একটা নিজস্ব সত্তা, কিছু নিজস্ব ভাবনা বেঁচে ছিল। তমাল ভেতরে ক্রিকেট মাঠের একটা ছেলে, মিতু আপার ভেতরে গান করতে চাওয়া একটা মেয়ে। কেকটা দেয়াল ভেঙেছে, আর ভেতরের বন্দী মানুষটা বেরিয়ে এসে নিজের জীবনটা ফেরত নিয়েছে।
আর শেষ ঘটনাটা। কাল রাত দুইটা সাতচল্লিশে আমার ফোনে একটা ই–মেইল এসেছে। প্রেরক: সাদমান। সেই আইডি, যেটা এইচআরের সিস্টেমে অ্যাকটিভ নেই। সাবজেক্ট: হ্যান্ডওভার। ভেতরে একটাই লাইন: ‘কেকের বাকি টুকরাটা কার জন্য রেখে দিয়েছ?’ আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর জীবনে প্রথমবার একটা সাহসের কাজ করলাম। রিপ্লাই দিলাম। লিখলাম, ‘আপনি কে? আমি এখন কী করব?’
আর বাকি মৃত যারা চেয়ারে বসে রইল, চোখ খোলা, ভেতরে কেউ নেই। ওদের দেয়ালও ভেঙেছিল। ভেঙে দেখা গেছে, ভেতরের কিছু নেই, নেই কোনো নিজস্ব সত্তা, নেই কোনো মৌলিক ভাবনা। সবই খালি। ভেতরের মানুষটা বহু আগেই শেষ। কেকটা হয়তো ওদের মারেনি। ওরা মরে ছিল আরও অনেক আগে থেকেই, কোনো এক কোয়ার্টার এন্ডে, কোনো এক অ্যাপ্রাইজালের রাতে। আমরা কেউ খেয়াল করিনি, কারণ শরীরগুলি অফিসে এসেছিল, টার্গেট রেভিনিউ মিট করছিল, ইএমআই দিচ্ছিল।
আর সাদমান ভাই? এইচআরের সিস্টেমে যার রেকর্ড নেই, লবির ছবিতে যার মুখ নেই, পাঁচজনের চারজনের স্মৃতিতে যে নেই?
গত মাসে আমি অফিসের এক পিয়নকে চা–নাশতা খাইয়ে বকশিশ দিয়ে অনেক কথা বের করেছি। বুড়ো মানুষ, পঁচিশ বছর এই টাওয়ারে। উনি সাদমান ভাইকে চিনতেন। উনি আমাকে যেটা বললেন, সেটা শোনার পর থেকে আমি লিফটে আর একা উঠতে পারি না।
উনি বললেন, ‘সাদমান স্যার তো মারা গেছেন মেলা আগে। কোরবানি ঈদের একদিন আগে কোয়ার্টার এন্ডের এক রাইতে, তার নিজের ডেস্কে। ফাহিম স্যারের তিন মাস পরে। খুব কড়াকড়ি করে বাইরের দুনিয়ার কাছে চাপা দেওয়া হইছিল ঘটনাটা।
আমি বললাম, ‘অসম্ভব। আমি ওনার সাথে ডিনার করেছি। উনি আমার হাতে কেক দিয়েছেন। উনি আমার সাথে কথা বলেছেন।’
বুড়ো মানুষটা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গলা নামিয়ে বললেন, ‘বাবা, এই কোম্পানিতে মানুষ মরলেই কি ছুটি পায়? ওনার নোটিশ পিরিয়ড বাকি আছিল না!’
গল্প এখানেই শেষ হতে পারত। হলো না। শেষটুকু গত রবিবারের।
আমি এখনো নর্থস্টারে আছি। অবাক হচ্ছেন? হবেন না। কন্ট্যাক্ট সই করা হত্যা মামলার সন্দেহভাজন মানুষের চাকরি ছাড়ার সহজ উপায় নেই। তা ছাড়া আমার পারফরম্যান্স এখন দুর্দান্ত। তিনটা খালি ডেস্কের কাজ আমি একা টানছি, ম্যানেজমেন্ট মুগ্ধ। গত রবিবারে অফারটা এল। প্রমোশন। টিম লিডের পদ। চিঠির শেষ লাইনে লেখা, অনবোর্ডিং কমপ্লিট করতে সোমবার সকালে আপনার অ্যাডভান্সড ক্যালিব্রেশন সেশন নির্ধারিত হয়েছে। নাইন্থ ফ্লোর, উইং সিতেই হবে সেই সেশন।
চিঠিটা এখন আমার টেবিলে। আর টেবিলের অন্য পাশে, একটা ছোট্ট বাটিতে, সাদমান ভাইয়ের কেকের শেষ টুকরাটা।
হ্যাঁ। আমি পুলিশ হেফাজত থেকে ফিরে অফিসের ডাস্টবিন থেকে কায়দা করে তুলে একটা টুকরা রেখে দিয়েছিলাম। কেন, জানি না। হয়তো লেখক হতে চাওয়া ছেলেটা জানত গল্পের শেষ অঙ্কে একটা প্রপ লাগবে। টুকরাটা তিন মাসেও নষ্ট হয়নি। একই টেক্সচার আর রং। এই কেকের তৈরি প্রক্রিয়া নিয়ে আমি আর ভাবি না। মৃত সাদমান ভাইকে জিজ্ঞেস করার তো কোনো উপায় নেই।
সোমবার সকালে আমার হাতে দুইটা বিকল্প। উইং সি, যেখানে ঢুকলে আমি হয়ে যাব হয়তো সাদমান ভাইয়ের আরেক ভার্শন। অথবা এই কেকের টুকরাটা, যেটা খেলে দেয়ালটা ভাঙবে। আর আমি জানতে পারব আমার ভেতরের ঘরে লেখক ছেলেটা এখনো বেঁচে আছে, নাকি ছয় মাসেই নর্থস্টার করপোরেশন তাকেও খেয়ে ফেলেছে। মুদ্রাটার দুই পিঠই অনিশ্চিত, ভীতিকর।
আমি কী করব, সেটা বলব না।
আর শেষ ঘটনাটা। কাল রাত দুইটা সাতচল্লিশে আমার ফোনে একটা ই–মেইল এসেছে। প্রেরক: সাদমান। সেই আইডি, যেটা এইচআরের সিস্টেমে অ্যাকটিভ নেই। সাবজেক্ট: হ্যান্ডওভার। ভেতরে একটাই লাইন: ‘কেকের বাকি টুকরাটা কার জন্য রেখে দিয়েছ?’
আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর জীবনে প্রথমবার একটা সাহসের কাজ করলাম। রিপ্লাই দিলাম। লিখলাম, ‘আপনি কে? আমি এখন কী করব?’
উত্তরটা এল তিন সেকেন্ডে। অটো রিপ্লাই।
আউট অব অফিস। আমার নোটিশ পিরিয়ড শেষ।