কচু খেলে কেন গলা ধরে? পুষ্টির ভাণ্ডার হলেও কাদেরকে বুঝেশুনে খেতে হবে

· Prothom Alo

কচু খেলে গলা ধরে অনেক সময়ই। কিন্তু কেন তা জানেন কি? এদিকে পুষ্টির ভাণ্ডার হলেও এই সবজি বুঝেশুনে খেতে হবে কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে। ছবি তুলেছেন পারভীন আলী

'কাঠবিড়ালি তুমি মরো, তুমি কচু খাও'। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের খুকি ও কাঠবিড়ালি কবিতার এই পঙ্ক্তির খুকির মতো রেগেমেগে গেলে আমরা মজা করে সামনের মানুষটিকে প্রায়ই কচু খেতে বলি। আবার কোনো কিছুই হলো না বোঝাতে বলি, 'আরে, কচু হয়েছে!' ভাষায় এমন তাচ্ছিল্যপূর্ণ ব্যবহার থাকলেও পুষ্টির বিচারে কচু মোটেও তুচ্ছ নয়।

Visit rouesnews.click for more information.

এতে আছে খাদ্য আঁশ, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ। তবে কিছু স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে কচু খাওয়ার ক্ষেত্রে হতে হবে একটু সতর্ক। এদিকে কচু খেলে অনেকেরই গলা ধরে বা মুখ-গলা চুলকায়। কিন্তু কেন এমন হয়, জানেন কি?কী করলে কচু খেলেও গলা ধরবে না সেটিও জানার বিষয় রন্ধনশিল্পীদের জন্য।

পুষ্টিগুণের পাশাপাশি কচুর স্বাদের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। রসুনের বাগাড় দেওয়া কচু ভর্তা, ইলিশ বা চিংড়ি দিয়ে কচু, কচুর মালা বড়া, কচুর কোরমা—কতভাবেই না রান্না হয় এই সবজি। হালের আলোচিত ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-এর কচুবাটার কথাও বাদ দেওয়া যায় না। গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আশপাশে এমনিতেই জন্মায় নানা জাতের কচু। মানকচু, দুধকচু, পানিকচু, নারকেলি কচু, বিষকচু, পঞ্চমুখী কচু—নাম ও জাতেরও যেন শেষ নেই। এখন অবশ্য বাণিজ্যিকভাবেও কচুর চাষ হচ্ছে। ফলে বাজারে এর কদরও বেড়েছে।


কচুর গোড়ায় আছে শর্করা, যা শরীরে শক্তি জোগায়। পাশাপাশি আছে খাদ্য আঁশ, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। আর কচুর কান্ডের সবুজ অংশে পাওয়া যায় ভিটামিন ও খনিজের আরও বৈচিত্র্যময় সমাহার। তাই সঠিকভাবে রান্না করে পরিমিত পরিমাণে খেলে কচু হতে পারে সুষম খাদ্যতালিকার ভালো একটি অংশ।

কচুর গোড়া শর্করার ভালো উৎস। রান্না করা কচুর প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৩০–৩৫ গ্রাম শর্করা থাকতে পারে। তবে জাত ও রান্নার ধরনভেদে এই পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে। শর্করা শরীরের অন্যতম প্রধান শক্তির উৎস।
তাই কচু খেলে একই বেলায় ভাত, রুটি বা অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণও বিবেচনায় রাখা ভালো। বিশেষ করে যাঁরা ওজন বা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবারের মোট পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

কচুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণ হলো খাদ্য আঁশ। আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। আঁশযুক্ত খাবার খেলে কিছুটা বেশি সময় পেট ভরা অনুভূত হয়। ফলে অকারণে বারবার নাশতা করার প্রবণতাও কমতে পারে। তবে পর্যাপ্ত আঁশ খাওয়ার পাশাপাশি পানি পান করাও জরুরি।

কচুতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পটাশিয়াম পাওয়া যায়। শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখা, স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং পেশির সংকোচনে এই খনিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরে পটাশিয়াম জমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই কিডনির জটিলতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের কচুসহ পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার কতটা খাবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

কচুর গোড়ার পাশাপাশি কচুর সবুজ অংশও অত্যন্ত পুষ্টিকর। এতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফোলেটসহ বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। কচুশাক আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামেরও উৎস।

ভিটামিন এ চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে শোষণে সহায়তা করে। ফোলেট প্রয়োজন কোষ বিভাজন ও রক্তকণিকা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে।

কচুতে থাকা আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে প্রয়োজনীয়। আর ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের গঠন এবং পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে তুলনামূলক কম শোষিত হয়। তাই কচুশাকের সঙ্গে লেবু বা ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ অন্য খাবার খেলে আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে।

কচু খেলে গলা ধরে কেন?

কচু খেলে মুখ বা গলা চুলকানো কিংবা গলা ধরা বেশ পরিচিত অভিজ্ঞতা। এর অন্যতম কারণ হলো কচুতে থাকা ক্যালসিয়াম অক্সালেটের সূক্ষ্ম স্ফটিক। কাঁচা বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা কচুতে এগুলো মুখ ও গলায় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
এ কারণে কচু ভালোভাবে পরিষ্কার করে পর্যাপ্ত সময় রান্না করা জরুরি। কাঁচা বা আধা সেদ্ধ কচু না খাওয়াই ভালো। যাঁদের কিডনিতে অক্সালেটজনিত পাথরের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের কচু খাওয়ার পরিমাণের বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ

কচুর পুষ্টিগুণ পাওয়ার ক্ষেত্রে রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেল দিয়ে ভাজা বা রান্না করলে খাবারটির ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সেদ্ধ, ঝোল বা অল্প তেলে রান্না করা কচু তুলনামূলক হালকা হতে পারে। কচুশাক রান্নার সময়ও অযথা দীর্ঘক্ষণ রান্না না করাই ভালো। কারণ পানিতে দ্রবণীয় কিছু ভিটামিন দীর্ঘ সময় রান্না করলে কমে যেতে পারে।

ডায়াবেটিসে কচু খাওয়া যাবে?

কচু শর্করার উৎস। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কচু খাওয়ার পরিমাণের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। তবে ডায়াবেটিস আছে মানেই কচু পুরোপুরি বাদ দিতে হবে—এমন নয়। কতটা কচু খাওয়া হচ্ছে এবং একই বেলায় ভাত, রুটি বা অন্য শর্করাজাতীয় খাবার কতটা থাকছে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। রান্নায় অতিরিক্ত তেল বা চিনি ব্যবহার করা হলে খাবারটির মোট ক্যালরিও বেড়ে যাবে।

কচু তাই শুধু গলা ধরানো সবজি নয়। বরং সঠিকভাবে রান্না করে পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি হতে পারে পুষ্টিকর খাদ্যতালিকার একটি অংশ। তবে কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে নিজের মতো করে বেশি কচু না খেয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

Read full story at source