ঢাকা-ময়মনসিংহ-মুক্তাগাছা: এক কাব্যিক অভিযাত্রা

· Prothom Alo

প্রতিদিন ক্লান্ত করে এই ইট, কাঠ আর কংক্রিটের শহর। সেই ক্লান্তি কাটাতে সাহিত্যের স্বপ্নে বেরিয়ে পড়ি পাঁচজন। আমাদের যাত্রা ছিল ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ-মুক্তাগাছা। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে শুরু হয়েছিল তিন দিনের এই সফর। সঙ্গে ছিল কবিতা, বন্ধুত্ব, গল্প আর হাসি-গান।

চলতে শুরু করে বাস। পেছনে পড়ে থাকে পরিচিত শহরের কোলাহল। জানালার বাইরে তাকাতেই দেখা দেয় দিগন্তজোড়া সবুজ প্রান্তর। একের পর এক পার হয় ছোট ছোট গ্রাম, মেঠোপথ আর ব্যস্ত জনপদ। এ যেন এক দূষিত জীবন থেকে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার অপার আনন্দ। এই পথচলা কেবল স্থান বদলের গল্প ছিল না, এ যেন এক কাব্যিক সফর।

Visit freshyourfeel.org for more information.

ব্রহ্মপুত্রের তীরে সাহিত্যপীঠ
প্রাচীনকাল থেকেই ময়মনসিংহ সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী জনপদ। ব্রহ্মপুত্র নদ যেখানে আপন মনে বয়ে যায়, সেখানেই গড়ে উঠেছে শিল্প-সাহিত্যের নান্দনিকতা। আমাদের উদ্দেশ্য ময়মনসিংহের বিপিন পার্ক। সেদিন ছিল ২১ আগস্ট, শুক্রবার। সকালে সেখানেই চলছিল সাহিত্য সংগঠন ‘বীক্ষণ’-এর ২২৫০তম অনুষ্ঠানের বিশেষ আসর। আয়োজক ছিল ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ।

কবিতা কেবল শব্দের শিল্প নয়; কবিতা মানুষের অনুভব, সময়ের সাক্ষ্য, অন্তরের জাগরণ। প্রেমের স্পর্শ থেকে প্রতিবাদ। কবিতা বারবার মানুষের অন্তর্গত সত্যকে উচ্চারণ করে। সেই উচ্চারণ যখন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা হয়, তখন কবিতা হয়ে ওঠে সময়ের দর্শন।

‘কবিতায় প্রেম, প্রতিবাদ ও মুক্তির উচ্চারণ’ শিরোনামটির মধ্যেই রয়েছে কবিতার বহুমাত্রিক সত্তা। প্রেম শুধু ব্যক্তিমানুষের ভালোবাসা নয়, প্রেম হয়ে উঠতে পারে মানুষ, প্রকৃতি, দেশ ও মানবতার প্রতি মমতা। সেই প্রেমই যখন অন্যায়, বৈষম্য কিংবা নিপীড়নের মুখোমুখি হয়, তখন তার ভেতর থেকে জন্ম নেয় প্রতিবাদ।

যে কবি প্রেমের অমর পঙ্‌ক্তি লেখেন, প্রয়োজনে সেই কবিই হয়ে ওঠেন শোষিতের কণ্ঠস্বর। যেখানে অনেক কথা বলা যায় না, সেখানে কবিতা কথা বলে। প্রতিবাদের কবিতা শুধু ক্ষোভ নয়, এটি স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্ন হলো অন্ধকারের বিপরীতে আলোর, শৃঙ্খলের বিপরীতে মুক্তির এবং ভয়ের বিপরীতে সাহসের স্বপ্ন। তাই কবিতার প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত মুক্তির দিকেই।

বাংলা কবিতার দীর্ঘ পথচলায় প্রেম-প্রতিবাদ পাশাপাশি। প্রেমিকের হৃদয়ের ব্যথা যেমন কবিতায় এসেছে, তেমনি মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নও বারবার কবিতায় এসেছে। কখনো কবিতা হয়ে উঠেছে স্বীকারোক্তি, কখনো সত্যের ভাষা। কবিতা মানুষের সেই আলো, যা সহজে নেভে না। প্রেম একে স্নিগ্ধ করে, প্রতিবাদ কঠিন করে, আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করে তোলে অদম্য। কবিতা ভালোবাসার কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, মুক্তির স্বপ্ন দেখায়।

অনুষ্ঠানের শিরোনাম ‘কবিতায় প্রেম, প্রতিবাদ ও মুক্তির উচ্চারণ’ কেবল একটি বিষয় নয়, এ যেন কবিতার ভেতর দিয়ে মানুষ, সময় এবং তার স্বপ্নকে নতুন করে দেখার এক আয়না।
বিপিন পার্কে কাব্যিক জলসা সেদিন সাহিত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল। মাথার ওপর খোলা আকাশ, চারপাশে সবুজ গাছ আর সামনে ব্রহ্মপুত্রের শান্ত হাওয়া। এই নান্দনিক পরিবেশে ঢাকার পাঁচজন আমন্ত্রিত অতিথির আগমন পরিবেশকে আলোকিত করেছিল। পাশাপাশি জড়ো হয়েছিলেন ময়মনসিংহের স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন কবি ও লেখক এবং বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আশফাকুজ্জামান। তিনি তাঁর বক্তব্যে কবিতা, সাহিত্য, মানবতা ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। একজন কবিকে তাঁর চারপাশের মানুষ, তাদের সংকট, স্বপ্ন, বঞ্চনা ও প্রতিবাদের ভাষা ধারণ করতে হয়। সাহিত্য যেন মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে ওঠে, সেদিকেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্মরণ করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশাল ও ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তাঁর আলোচনায় উঠে আসে, কীভাবে সাহিত্য যুগ যুগ ধরে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখিয়েছে।

কবি ও অভিনেতা শহীদুল জয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তিনি তাঁর উদ্দীপ্ত কণ্ঠে নজরুলের অমর কবিতা ‘বিদ্রোহী’ আবৃত্তি করেন। তাঁর বলিষ্ঠ বাচনভঙ্গি ও আবৃত্তি উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ ও আলোড়িত করে।
কবি বীথি কবীর কবিতা ও জীবনের মেলবন্ধন নিয়ে আলোচনা করেন এবং নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে শোনান। কবি ও কথাশিল্পী লিলি শেঠ এবং কবি ও কথাশিল্পী রীনা পণ্ডিত তাঁদের সমৃদ্ধ আলোচনা ও স্বরচিত কবিতা পাঠের মাধ্যমে পুরো পরিবেশকে সাহিত্যরসে পূর্ণ করেন।

কবি ও প্রাবন্ধিক সোহেল মাজহার কবিতা ও সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে মননশীল আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে আসে কবির সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের বিষয়টি। তিনি বলেন, ‘কবিতা শুধু সৌন্দর্য ও আবেগের প্রকাশ নয়। সময়, সমাজ ও মানুষের প্রতি একজন কবিরও দায়বদ্ধতা রয়েছে।’ পাশাপাশি বর্তমান সময়ে লেখালেখির চর্চা, পাঠাভ্যাস এবং সাহিত্যের প্রতি নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব নিয়েও কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে সাহিত্যকে আরও মানবিক ও সময়সচেতন করে তোলার প্রত্যয় স্পষ্ট হয়।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বটি হয়ে উঠেছিল স্বরচিত কবিতা পাঠের এক প্রাণবন্ত আসর। ময়মনসিংহের অভিজ্ঞ ও তরুণ কবিরা এতে অংশ নেন। একের পর এক কবিতার পঙ্‌ক্তিতে মুখর হয়ে ওঠে বিপিন পার্কের আঙিনা।
এই পর্বে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি ও প্রাবন্ধিক আলম মাহবুব, কবি বিউটি দাশ, কবি জালাল উদ্দিন জামান, ছড়াকার তাছাদ্দুক হোসেন, কবি নাফিসা মাহজাবীন দোলা, আফজালুন্নেসা রুমি, কবি টিপু চৌধুরী এবং কবি হাবিবুল্লাহ্ বাহারসহ অনেকে। তাঁদের উচ্চারিত শব্দের অনুরণনে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সভাপতি, বিশিষ্ট ছড়াকার সরকার জসীম। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জুবায়েদ ইবনে সাঈদ। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘বীক্ষণ’-এর আহ্বায়ক জিসি দেবনাথ। এ ছাড়া সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন কবি ও সাংবাদিক স্বাধীন চৌধুরী, সংস্কৃতিকর্মী সহিদ আমিনী রুমিসহ অনেকে।

স্মৃতির ক্যানভাসে মুক্তাগাছা
শেষ হলো বিপিন পার্কের সফল আয়োজন। শনিবার গন্তব্য মুক্তাগাছা। তিন দিনের এই সফর শুধুই একটি সভামঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না। ময়মনসিংহ থেকে মুক্তাগাছা পর্যন্ত এই সফর হয়ে উঠেছিল এক অপূর্ব অভিজ্ঞতার স্মারক।

মুক্তাগাছা রাজবাড়ি ময়মনসিংহের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য স্মারক। রাজবাড়িটি এখন সরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এটি সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত।

রাজবাড়িতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন। বিশাল প্রবেশদ্বার, পুরোনো প্রাসাদ ভবন, প্রাচীন ভবনের অলংকরণ, নকশা ও স্থাপত্যরীতিতে সেই সময়ের শিল্পবোধ ও রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। পুরোনো ইট-পাথরের দেয়াল, খিলান, স্তম্ভ ও বিশাল প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে সহজেই কল্পনা করা যায় জমিদারি আমলের সেই জাঁকজমকপূর্ণ দিনগুলো। রাজবাড়ির আশপাশে থাকা পুরোনো মন্দির, পুকুর ও অন্যান্য স্থাপনাও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। প্রতিটি স্থাপনার সঙ্গে যেন মিশে আছে জমিদারি ঐতিহ্যের স্মৃতি।

মুক্তাগাছা রাজবাড়ি তাই শুধু দেখার মতো একটি স্থাপনা নয়; এটি অতীতকে ছুঁয়ে দেখার, ইতিহাসকে অনুভব করার এবং বাংলার জমিদারি সংস্কৃতির স্মৃতি জানার এক অনন্য সুযোগ।

ক্যামেরার লেন্সে বন্দী হওয়া ছবিগুলো হয়তো একদিন পুরোনো হবে। কিন্তু চলন্ত বাসের আড্ডা, বিপিন পার্কের কবিতা পাঠ আর বন্ধুদের হৃদয়ের উত্তাপ থেকে যাবে বহুদিন। কিছু ভ্রমণ হৃদয়ের গভীরে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। আমাদের এই সফর প্রমাণ করেছে, পথ কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়। ভালো সঙ্গী আর সঙ্গে কবিতা থাকলে পথ নিজেই হয়ে ওঠে এক একটি অনন্য কবিতা।

Read full story at source