নিয়ত কেন সকল কাজের নিয়ামক

· Prothom Alo

মানবজীবনে কাজের বিশালতার চেয়েও বড় হলো অন্তরের চালিকা শক্তি। ইসলামে একে বলা হয় ‘নিয়ত’ বা সংকল্প।

Visit syntagm.co.za for more information.

নিয়ত হলো এমন এক অদৃশ্য রূপান্তরকারী শক্তি, যা সাধারণ অভ্যাস বা জাগতিক কাজকেও অত্যন্ত সওয়াবের ইবাদতে পরিণত করতে পারে।

জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিয়তের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং তা বিশুদ্ধ রাখা মুমিনের অন্যতম আত্মিক কাজ।

কর্মের ভিত্তিই নিয়ত

মানুষের কাজের মূল্যায়ন কেবল তার বাহ্যিক ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে অন্তরের বিশুদ্ধতার ওপর। নিয়ত যদি সঠিক না থাকে, তাহলে বিরাট সাফল্যও আল্লাহর দরবারে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আল্লাহ–তাআলা বান্দার অন্তরের খবরও জানেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে রাসুল, আপনি মানুষদের বলে দিন, তোমাদের অন্তরে যা কিছু আছে, তোমরা তা গোপন করো বা প্রকাশ করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত আছেন...।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২৯)

রাসুল (সা.) নিয়তের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘কাজের প্রতিদান তো নিয়তের ওপরই নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।হীনমন্যতা যেভাবে মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করছে

অভ্যাস যখন ইবাদত হয়

নিয়তের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজকর্ম ইবাদতে রূপান্তরিত হয়। জীবিকা নির্বাহ, পরিবারকে সময় দেওয়া, শারীরিক সুস্থতার জন্য আহার গ্রহণ বা বিশ্রাম করা ইত্যাদি মানুষের প্রাত্যহিক অভ্যাস।

এসবের পেছনে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের বিশুদ্ধ নিয়ত থাকে, তবে তার প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

‘বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬২)

একজন মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো তাঁর প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা। পার্থিব প্রয়োজন পূরণের সময়ও যখন অন্তরে সওয়াবের আশা থাকে, তখন তা আর সাধারণ কাজ থাকে না, বরং ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে।

লৌকিকতার ক্ষতি

নিয়ত বিশুদ্ধ না থাকার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ‘রিয়া’ বা লোক দেখানোর মানসিকতা। কোনো সৎকাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেয়ে লোকচক্ষুর প্রশংসা বা সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার উদ্দেশ্যটা মুখ্য হয়, তখন সে কাজও ক্ষতির মুখে পড়ে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব বড়ই দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য যারা তাদের নামাজে উদাসীন। যার লোক দেখানোর জন্য তা করে।’ (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)

রাসুল (সা.) এ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ওপর যে বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করি ছোট শিরক সম্পর্কে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ছোট শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘“রিয়া” বা লোক দেখানো আমল।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)

আরেক বর্ণনায় এসেছে, আমলের প্রতিদান দিবসে আল্লাহ–তাআলা রিয়াকারীদের বলবেন, ‘তোমরা ওই লোকেদের কাছে যাও, যাদের দেখিয়ে দুনিয়াতে আমল করতে। আর চেষ্টা করো তাদের কাছ থেকে কোনো বিনিময় বা কল্যাণ পাও কি না?’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৬৮৩১)

সমস্যায়–সংকটে ইসলামে মুক্তির দিশা
যেকোনো ভালো কাজ বা দায়িত্ব শুরু করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা, কাজটি আমি কেন করছি? এটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য?

নিয়ত যেভাবে সংশোধন করব

নিয়ত অন্তরের বিষয়, যা এক অবস্থায় স্থির থাকে না। প্রতিনিয়ত অন্তরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তাই প্রতিদিনের কাজে নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য কিছু চর্চা প্রয়োজন।

১. কাজের পূর্বে নীরব চিন্তা: যেকোনো ভালো কাজ বা দায়িত্ব শুরু করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা, কাজটি আমি কেন করছি? এটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য? যদি উত্তর হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাহলে শুকরিয়া আদায় করে কাজ শুরু করা। আর উত্তর বিপরীত হলে নিয়তকে শুধরে নিয়ে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কাজ শুরু করা।

২. গোপন ইবাদত: নফল ইবাদত, দান-সদকা বা অন্যান্য ভালো কাজ সম্পূর্ণ গোপনে করার অভ্যাস করা। এগুলো অন্তরে একনিষ্ঠতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

৩. ইস্তিগফার ও দোয়া: অন্তরের অবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইস্তিগফার ও দোয়া অনেক বড় হাতিয়ার। তাই অন্তরের কলুষতা দূর করার জন্য আল্লাহর দরবারে হেদায়েত ও নিয়তের বিশুদ্ধতা চেয়ে দোয়া করা।

আমাদের জীবন সীমিত সময়ের। এ অল্প সময়ে প্রচুর বাহ্যিক কাজ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সামান্য কাজকেও বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত করা। তাই বাহ্যিক কাজকর্মের সময় বারবার অন্তরের একনিষ্ঠতা যাচাই করে নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখাই বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর

আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিদর্শন

Read full story at source