বাজারের নাম কী হবে তা নিয়ে আবার সংঘর্ষ, ৩ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ

· Prothom Alo

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে বাজারের নাম নিয়ে বিরোধে আজ রোববার বিকেলে আবারও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। দুই পক্ষই প্রতিপক্ষের কয়েকটি ঘরে আগুন দিয়েছে। এতে অন্তত ১২টি ঘর পুড়ে গেছে।

Visit mwafrika.life for more information.

সংঘর্ষের কারণে ভৈরব-ময়মনসিংহ পথে প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস ভৈরব স্টেশনে প্রায় এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট আটকে ছিল। কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস কুলিয়ারচর স্টেশনে আটকা পড়ে। এতে হাজারো যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, সংঘর্ষ থামাতে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ পাঠানো হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আকবরনগর ও মিরারচর গ্রাম দুটি পাশাপাশি। ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক গ্রাম দুটির পাশ দিয়ে গেছে। সড়ক নির্মাণের পর সেখানে একটি বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সাল থেকে দুই পাশে বাজার বসতে শুরু করে। দীর্ঘদিন বাজারটি ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের একটি সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হয়। এ নিয়ে মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাঁরা সাইনবোর্ড ভাঙচুর করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হন।

ভৈরবে বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষের সময় তোলা ছবি

গত ৭ জুলাই দুই গ্রামের বাসিন্দারা আবার সংঘর্ষে জড়ান। এতে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া ও হিরণ মিয়া নিহত হন। আহত হন উভয় পক্ষের শতাধিক মানুষ। শতাধিক ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ভৈরব থানায় দুটি হত্যা মামলা হয়। মামলায় আকবরনগর গ্রামের ৮৯ জনকে এজাহারভুক্ত এবং ১৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। পরে আকবরনগর গ্রামের অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে যান। কয়েক শ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। আজ রোববার ওই দুই হত্যা মামলার আসামিরা কিশোরগঞ্জ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে ৩৯ জনকে কারাগারে পাঠান। এ খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আকবরনগর গ্রামের লোকজন বাজারে মিরারচর গ্রামের দুই ব্যক্তিকে পেয়ে মারধর করেন। পরে মাইকে মিরারচরের লোকজনকে মারধরের খবর প্রচার করা হয়। এরপর দুই গ্রামের কয়েক শ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে তাঁরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।  

একপর্যায়ে দুই পক্ষই প্রতিপক্ষের ঘরে আগুন দেয়। এতে অন্তত ১২টি ঘর পুড়ে যায়। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনকে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

আজ সন্ধ্যায় ভৈরব রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন ছাড়তে দেরি হবে জেনে অনেক যাত্রী নেমে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিলেন।

আকবরনগর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, আগের সংঘর্ষে তাঁদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকে এখনো গৃহহীন। বাজারে যেতে পারছেন না। ব্যবসা ও কাজ বন্ধ। আজ মামলার আসামিরা জামিন না পাওয়ার পর মিরারচরের লোকজন উল্লাস করছিলেন। এ কারণে ক্ষোভ তৈরি হয়।

মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের ভাষ্য, আগের সংঘর্ষে তাঁদের গ্রামের দুজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আদালত আসামিদের জামিন না দেওয়ায় মিরারচরবাসীর কোনো দায় নেই। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আকবরনগরের লোকজন তাঁদের লোকজনকে মারধর শুরু করেন। এরপর সংঘর্ষ বাধে।

আজ সন্ধ্যায় ভৈরব রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন ছাড়তে দেরি হবে জেনে অনেক যাত্রী নেমে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিলেন।

চট্টগ্রাম থেকে জামালপুর যাচ্ছিলেন ব্যাংকার তমিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, সমস্যা পাড়া কিংবা গ্রামের। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে জাতীয় পর্যায়ে। কয়েক দিন পরপর ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। প্রচণ্ড গরমে যাত্রীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। ভৈরববাসী ও প্রশাসনকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’

ভৈরব রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার ইউসুফ বলেন, বিজয় এক্সপ্রেস বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে ভৈরব স্টেশনে প্রবেশ করে। দুই মিনিট পর ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রেললাইনের দুই পাশে সংঘর্ষ চলায় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ট্রেনটি আটকে রাখা হয়। বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে ট্রেনটি গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এতে ট্রেনটির ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট অনির্ধারিত বিলম্ব হয়।

সংঘর্ষের কথা জেনে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ঘটনাস্থলে যান ভৈরব উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম। তিনি সামনে থেকে দুই পক্ষকে থামানোর চেষ্টা করেন।

আরিফুল ইসলাম বলেন, ভৈরবের ইজ্জত আর রইল না। বাজারের নাম নিয়ে এত বিরোধ ভৈরব ছাড়া আর কোথাও আছে কি না জানা নেই। দুই গ্রামের সংঘর্ষের কারণে বারবার ট্রেন ও সড়কপথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশবাসী আমাদের নিয়ে ট্রল করছে। এ আর হতে দেওয়া হবে না। এরপর যারা করবে সবাইকে থানায় নিয়ে বন্দী করে রাখা হবে। যথেষ্ট হয়েছে, আর ছাড় নেই।

Read full story at source