ক্যানভাসে নারীর কণ্ঠস্বর
· Prothom Alo

শিল্পকর্ম মানুষের প্রাচীনতম দৃশ্যমান প্রকাশভাষাগুলোর একটি। ভাষার প্রচলিত সীমা অতিক্রম করে শিল্পকর্ম তার রেখা, রং, আকার, বিন্যাস ও দৃশ্যমানতার মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। তবে এই যোগাযোগকে সম্পূর্ণ অর্থে সর্বজনবোধ্য বলা যায় না; কারণ শিল্প-উপকরণ, প্রতীক, সংকেত ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের পাঠ অনেক সময় নির্ভর করে দর্শকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানের ওপর। বিশেষত ধারণানির্ভর সমকালীন শিল্পে এই পাঠ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একটি শিল্পকর্মে দৃশ্যমান উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতীক, ইতিহাস, দর্শন, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ফলে শিল্পকর্মের অন্তর্নিহিত ধারণা বা প্রেক্ষাপট অনুধাবনের জন্য অনেক সময় ধারণাপত্র (কনসেপ্ট নোট) সহায়ক হয়ে ওঠে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়—কনসেপ্টের ব্যাখ্যা কি কখনো শিল্পের নিজস্ব দৃশ্যভাষাকে আড়াল করে ফেলে?
একটি শিল্পকর্মের সঙ্গে দর্শকের প্রথম সম্পর্ক তো মূলত চোখের। রং, রেখা, আকার, বিন্যাস ও সামগ্রিক দৃশ্যগত অভিঘাত থেকেই তৈরি হয় তার প্রাথমিক নান্দনিক অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যদি সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পরিবর্তে শিল্পকর্মের অর্থ উদ্ধারের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে দর্শক চিত্রকে দেখার চেয়ে তার ব্যাখ্যা পাঠে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়তে পারেন। এর ফলে শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ত আস্বাদনের সঙ্গে দর্শকের একধরনের দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
Visit grenadier.co.za for more information.
এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। ধারণানির্ভর শিল্পের পাঠ যদি বিশেষ তাত্ত্বিক জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—শিল্পের অর্থ কি কেবল তার ব্যাখ্যা জানার মধ্যেই নিহিত, নাকি ব্যাখ্যার পূর্বেই তার একটি স্বতন্ত্র দৃশ্যগত ও নান্দনিক অস্তিত্ব রয়েছে? বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্মের দীর্ঘস্থায়ী আবেদন এই দ্বিতীয় প্রশ্নটিকে সামনে আনে। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ কিংবা লেওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’—এসব শিল্পকর্মের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে দর্শকের প্রথম সংযোগ ব্যাখ্যার মাধ্যমে নয়, দৃশ্যের মাধ্যমেই ঘটে। ব্যাখ্যা সেই অভিজ্ঞতাকে গভীর করতে পারে, কিন্তু চিত্রের অস্তিত্বকে ব্যাখ্যার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করে না।
'গোধূলি', ভিনিতা করিমউল্লিখিত কথাগুলো ‘এজ গ্যালারি’তে আয়োজিত নারী শিল্পীদের ‘লবঙ্গলতিকা’ শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর ক্যাটালগে প্রকাশিত তাত্ত্বিক আলোচনা প্রসঙ্গে বলা। ক্যাটালগে শিল্পকর্মগুলোর ধারণাগত ব্যাখ্যা যে উদ্দেশ্যেই যুক্ত করা হয়ে থাকুক, সেই তাত্ত্বিক আবরণকে কিছুটা পাশে রেখে শিল্পের একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে কিংবা দর্শক হিসেবে শিল্পকর্মের দৃশ্যমান উপস্থিতি, রং, রেখা, আকার, বিন্যাস, আবেগ ও নান্দনিক অভিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রদর্শনীটিকে পাঠ করার চেষ্টা করতে চাই। কারণ, শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা যতই দুরূহ ও বিস্তৃত হোক না কেন, তার প্রথম এবং মৌলিক ভাষাটি শেষ পর্যন্ত তার দৃশ্যমানতাতেই নিহিত।
'জীবনের খেলা', সীমা মণ্ডলপ্রদর্শনীর সবচেয়ে বিশেষ দিক হলো এ দেশের প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিশ্রুতিশীল নারী শিল্পীদের কাজের সমাহার দিয়েই এটি সাজানো। যাঁরা প্রতিনিয়ত চারুকলার হালচাল লক্ষ করেন, তাঁদের কাছে এই ২৩ জন শিল্পী চেনা মুখ বলা যায়। শিল্পী ফরিদা জামান, রোকেয়া সুলতানা, কনকচাঁপা চাকমা, আইভি জামানের মতো আরও অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর কাজ রয়েছে এখানে, যাঁদের কাজের বিষয় ও শৈলী দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে শিল্পী মাকসুদা ইকবাল নিপার কথাই বলা যায়। তাঁর শিল্পভাষায় রং, বুনন ও গতির স্বতঃস্ফূর্ত মেলবন্ধন এক প্রাণময় বিমূর্ততার জন্ম দেয়। তাঁর ক্যানভাসে রং কেবল দৃশ্যমানতার উপাদান নয়, বরং অনুভূতি, শক্তি ও স্বাধীন সত্তার প্রকাশমাধ্যম। তুলির উচ্ছল গতি ও রঙের স্তরবিন্যাসে নির্মিত হয় এক অন্তর্গত ছন্দ—যেখানে বিমূর্ততা হয়ে ওঠে জীবন ও অস্তিত্বের উদ্দাম উদ্যাপন। ‘অনুভূতির বুনন’ শিরোনামের চিত্রে রং যেন ধীরে ধীরে বোনা এক অনুভূতির মালা—উজ্জ্বলতার দোলা ও স্তরে স্তরে সঞ্চিত আবেগ টেক্সচারের ভেতর স্থায়ী রূপ পেয়েছে। কাঁথার বুননের মতো ঘন রঙের বিন্যাসে মিনিমাল আকৃতির সঙ্গে প্রাণবন্ত পৃষ্ঠতলের এক নান্দনিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, যা দর্শকের অনুভূতিকে নিঃশব্দে আন্দোলিত করে।
'পাহাড়ে সন্ধ্যা', কনকচাঁপা চাকমাবিপাশা হায়াতের শিল্পে স্মৃতি, ক্ষয় ও অস্তিত্বের অনুভব এক অনির্দিষ্ট ভূদৃশ্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ম্লান একরঙা বিন্যাস, ভাঙাচোরা রেখা ও স্তরিত পৃষ্ঠ তাঁর কাজকে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের স্মৃতির মতো আবহ দেয়। কার্ডবোর্ড, মসলিন, তার ও পাথরের মতো বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহার পৃষ্ঠে তৈরি করেছে দৃঢ়তা ও ভঙ্গুরতার এক আকর্ষণীয় দ্বন্দ্ব। বিশেষত অন্ধকার পটভূমিতে সোনালি রূপের উপস্থিতি তাঁর কাজে ক্ষয় ও অন্ধকারের বিপরীতে অস্তিত্বের দীপ্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত স্মৃতিকে অতিক্রম করে তাঁর শিল্প শেষ পর্যন্ত মানব অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়িতা ও স্মৃতির স্থায়িত্বের এক নীরব দৃশ্যভাষা নির্মাণ করে।
শিল্পী মুক্তি ভৌমিকের ভাস্কর্যে আবেগই যেন প্রধান শিল্পভাষা। ছোট ছোট মানবিক অনুভূতি ও সম্পর্ককে তিনি ছোটগল্পের মতো সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর রূপে প্রকাশ করেন। মাটি থেকে ধাতুতে রূপান্তরের কঠিন প্রক্রিয়ায় তাঁর সেই অনুভূতিগুলো পায় এক স্বতন্ত্র দৃশ্যরূপ, যা বাংলাদেশের ভাস্কর্যকলায় নতুন শৈলী ও শিল্পসত্তার শক্তি হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। ভাস্কর্য নির্মাণে একটি শ্রমসাধ্য ও কৌশলনির্ভর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রদর্শনীতে আইভি জামান ও মুক্তি ভৌমিকের পাশাপাশি সিগমা হক অংকন, লেখ নেসা খাতুন ও তারানা হালিমের ভাস্কর্য নিঃসন্দেহে প্রদর্শনীকে শক্তিমত্তার বার্তা দিয়েছে।
'বাবা-মায়ের গল্প', শেখ ফারহানা পারভিন টুম্পাশিল্পী নার্গিস পলির কাজে কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তবধর্মী নির্মাণশৈলী এক স্বতন্ত্র দৃশ্যবিন্যাসে রূপ পায়। তাঁর শিল্প একদিকে দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক, অন্যদিকে সূক্ষ্ম প্রতীক ও ভাবনার মধ্য দিয়ে দর্শককে এক গভীর বৌদ্ধিক জগতে প্রবেশের আহ্বান জানায়।
শিল্পী শেখ ফারহানা পারভিন টুম্পা বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলের অবয়বকে অবলম্বন করে দেশজ ও গ্রামীণ জীবনের নানা গল্পকে চিত্রভাষায় রূপ দিয়েছেন। প্রাথমিক রং, মাটির ছোট ছোট অবয়ব ও লোকজ উপাদানের সমন্বয়ে তাঁর ক্যানভাস যেন গ্রামবাংলার জীবন, অনুভব ও স্মৃতির এক জীবন্ত দৃশ্য-দলিল হয়ে ওঠে।
নবীন শিল্পী সীমা মণ্ডলের কাজে বাস্তবানুগ অবয়ব ও যন্ত্রপাতির ভগ্নাংশের ইল্যুশন-নির্ভর কোলাজ এক বিশেষ বর্ণনাভঙ্গি তৈরি করে, যেখানে উজ্জ্বল রং আবেগ ও গল্পকে আরও তীব্র করে তোলে। তাঁর চিত্রে প্রতীকী কল্পনার এক আকর্ষণীয় মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। সীমা মণ্ডলের মতো নবীন প্রজন্মের তুলসী রানী দাস, শারমিন আক্তার লিনা ও সুবর্ণা মোর্শেদার কাজেও এক স্বাতন্ত্র্যশীল শিল্পভাষা রয়েছে।
'সোনালি সময়', বিপাশা হায়াত‘লবঙ্গলতিকা’ প্রদর্শনীর সার্থকতা এখানেই যে এটি নারী শিল্পীদের কেবল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং তাঁদের স্বতন্ত্র শিল্পভাষা, সৃজনশীল শক্তি ও সক্রিয় শিল্পচর্চাকে সামনে এনেছে। অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের প্রত্যেকের কাজেই নিজস্ব শৈলী ও শিল্পভাবনার দৃঢ় উপস্থিতি লক্ষ করা যায়—যা বাংলাদেশের নারী শিল্পীদের ক্রমবিকাশমান শিল্পসত্তা ও জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
আমাদের সমাজবাস্তবতায় নারী হিসেবে শিল্পচর্চার নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে নানান মাধ্যমে তাঁদের এই সক্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত অবস্থান ‘লবঙ্গলতিকা’কে কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, সমকালীন বাংলাদেশের নারী শিল্পীদের আত্মশক্তি ও সৃজনক্ষমতার এক তাৎপর্যপূর্ণ সম্মিলিত স্বাক্ষরে পরিণত করেছে। এ ছাড়া ২৯ আগস্ট দর্শকদের সঙ্গে শিল্পীদের মুখোমুখি হয়ে নারীত্ব, পরিচয়, স্বাধীনতা এবং সমাজকে কেন্দ্র করে শিল্প, ভাবনা ও আলোচনার এক অন্তরঙ্গ সন্ধ্যার আয়োজনও প্রশংসনীয়।
‘লবঙ্গলতিকা—কার্টোগ্রাফিস অব দ্য ফেমিনিন’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি রাজধানীর গুলশানে এজ গ্যালারিতে ১৪ আগস্ট শুরু হয়েছে এবং দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।