‘ভাতের দিকেই চাইয়া ছিলাম’, লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে ফেরা দুই বাংলাদেশির গল্প

· Prothom Alo

‘ভাতের দিকেই চাইয়া ছিলাম ভাই, মুখে কী দিব? বিমানে ভাত দেইখাই পেট ভরে গেছে।’ লিবিয়া থেকে বাংলাদেশে ফেরার পথে ৪৫ দিন পর বিমানে ভাত পেয়ে এভাবেই বলছিলেন মশিউর রহমান।

Visit bettingx.club for more information.

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ত্রিপলির তাজুরা বন্দিশিবির থেকে বুরাক এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন তিনি। দীর্ঘ বন্দিজীবন কাটিয়ে এদিন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় দেশে এসেছেন তিনিসহ ১৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক।

বিমানবন্দরের সামনে থেকে গুলিস্তানগামী আজমেরী গ্লোরি বাসে পাশাপাশি বসেছিলেন মশিউর রহমান ও সোহেল মিয়া। দুজনের পরনে নেভি-ব্লু ট্র্যাকস্যুট। দেখলে মনে হতে পারে, শরীরচর্চা কিংবা খেলাধুলা করে ফিরছেন। কিন্তু সঙ্গে থাকা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) দেওয়া একটি নীল ব্যাগ জানিয়ে দিচ্ছিল, তাঁদের গল্পটা অন্য রকম।

বিমানবন্দর থেকে বাসে করে গুলিস্তানে যাওয়ার পথে মঙ্গলবার তাঁদের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর।

পরিবারের অমতে যাত্রা, ৩২ লাখ টাকার ঋণের বোঝা

৩৮ বছর বয়সী মশিউর রহমানের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামে। নিজের একটি খাবারের হোটেল ছিল। নিজেই ছিলেন দক্ষ কারিগর; পরোটা-শিঙাড়া বানাতে পারতেন, হোটেল ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিল। তবে ছোট ভাই পাঁচ বছর ধরে ইতালিতে থাকায় মশিউরের মনেও ইউরোপে গিয়ে ভাগ্য বদলানোর এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিল। যদিও তাঁর পরিবার ও ভাই এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় কোনোভাবেই রাজি ছিল না, কিন্তু সবার অমতেই একদিন লিবিয়ার উদ্দেশে ঘর ছাড়েন মশিউর।

মশিউরের এ যাত্রা ছিল দীর্ঘ ৯ মাসের। গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ থেকে রওনা দিয়ে প্রথম ট্রানজিট ছিল মালয়েশিয়ায় ১২ ঘণ্টার, এরপর সেখান থেকে শ্রীলঙ্কায় ২ দিন, এরপর কুয়েতে ২ ঘণ্টার ট্রানজিট পার করে তিনি পৌঁছান মিসরে। মিসরে দীর্ঘ পাঁচ মাস অবস্থান করার পর দালালের মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে ভূমধ্যসাগরের তীরের শহর আল-খমসে। সেখানের একটি ‘গেম ঘরে’ প্রায় তিন মাস রাখা হয়। এ সময় বিভিন্ন ধাপে ৩২ লাখ টাকা দিতে হয় দালালকে। বাংলাদেশে থাকা দালালের স্থানীয় প্রতিনিধির কাছে এই টাকা তুলে দিতে হয়েছে। লিবিয়ায় বন্দী করা বা মারধরের ভয় দেখিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ফোনে হুমকি দেওয়া হতো, সেই ভয়ে মশিউরের পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করে দালালের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়।

অবশেষে তিন মাস আগে খমস থেকে কাঠের নৌকায় ৩০ বাংলাদেশি ও ৪ মিসরীয়কে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া শুরু হয়। এই যাত্রা গেম নামে পরিচিত। কিন্তু আধা ঘণ্টা চলার পরই লিবিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নৌকাটি। তাঁদের নিয়ে আসা হয় ত্রিপলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে, যেখানে ৪৫ দিন বন্দী রাখা হয় মশিউরকে।

তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে মশিউর শিউরে ওঠেন। যে কক্ষে সর্বোচ্চ ২০০ জন মানুষ থাকার জায়গা হতে পারত, সেখানে রাখা হয়েছিল ৫০০ জনকে। সেখানে তদারকির দায়িত্বে থাকা নাইজেরিয়ানরা অমানবিক নির্যাতন চালাত। ভাষা না বোঝার কারণে সামান্য বিষয়েও প্রতিদিন মারধর করা হতো। দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে মশিউর বলেন, ‘লম্বা লম্বা পাইপ তাদের হাতে থাকত। কথা নাই বার্তা নাই ধুমধুাম মাইরা দিত।’

বন্দিশিবিরে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে খাবারের। ৪৫ দিনে চোখে ভাত দেখেননি মশিউর। সকাল ১০টায় নাশতা হিসেবে দেওয়া হতো একটি খুবজ (মোটা রুটি)। বেলা তিনটায় দুপুরের খাবারে দেওয়া হতো পাস্তা। সাতজনের জন্য দেওয়া হতো মাঝারি এক বাটি খাবার। দুপুরের জন্য রান্না হওয়া ওই খাবারই দেওয়া হতো রাতে। চোখ বন্ধ করে শুধু খাবার গিলতেন মশিউর। চোখের পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ত খাবারের বাটিতে। মশিউর বলেন, ‘এই খাবার না খাইয়া কোনো রাস্তা ছিল না। কারও পেটই ভরত না ভাই। খাবারের সময় কেউ না কেউ কান্না করত। আর বাকিরা সান্ত্বনা দিত।’ তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাবে। কলের লোনাপানি খেয়েই তাঁদের বেঁচে থাকতে হয়েছে।

অবশেষে গত ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পক্ষ থেকে মশিউরের দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ৩১ আগস্ট, সোমবার লিবিয়ার স্থানীয় সময় বেলা ২টার দিকে বিমানে ওঠেন তিনি। দেশে নামেন মঙ্গলবার সকালে।

লিবিয়ায় বন্দী সোহেলের ঈদ

৩৬ বছর বয়সী সোহেলের বাড়ি মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটে। দেশে একসময় অটোরিকশা চালাতেন। গ্রামের বেশির ভাগ যুবক যখন সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি, গ্রিস আর মাল্টায় যেতেন, সোহেলও স্বপ্ন দেখতেন, কিছু টাকা জমিয়ে উন্নত জীবনের পথে পাড়ি দেবেন ভূমধ্যসাগর। ১৪ মাস আগে বাড়ি থেকে রওনা দেন সোহেল। মশিউরের মতোই বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কুয়েত ও মিসর হয়ে তিনি পৌঁছান লিবিয়ায়। ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে সোহেল ধাপে ধাপে খরচ করেছেন ৩৯ লাখ টাকা। প্রথম দফায় ১৭ লাখ এবং পরে ১২ লাখ টাকা তিনি দালালের হাতে তুলে দেন। এই টাকা জোগাড় করতে তাঁর পরিবারকে নিজেদের পৈতৃক জায়গাজমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। এরপরও যখন কাজ হচ্ছিল না, তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে সুমন নামের আরেক দালালের মাধ্যমে আরও ১০ লাখ টাকা দিয়ে নিজে আলাদাভাবে ‘গেম’ দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

খমস থেকে ফাইবার বোটে করে সমুদ্রে ভাসার মাত্র এক থেকে দেড় ঘণ্টার মাথায় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন সোহেল ও তাঁর সঙ্গীরা। এরপর অন্য মানব পাচারকারী দালালের কাছে তাঁদের বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা হয়। সেখান থেকে মুক্তি পেতে আবার ১০–১২ লাখ টাকা লাগত। তাই তাঁরা সেনাদের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন, বিক্রি না করে যেন তাজুরায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যাতায়াত রয়েছে এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেখানেই ৪৮ দিন পার করে দেশে ফেরেন সোহেল।

মশিউরের মতো খাবারের অভিজ্ঞতা সোহেলের। তবে তাঁকে বেশি কষ্ট দিয়েছে প্রচণ্ড গরম। ফ্যান থাকলেও তা মানুষের তুলনায় ছিল নগণ্য, ফলে কক্ষের ভেতর দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি হতো। বন্দিশিবিরে সোহেল পার করেছেন জীবনের অন্যতম বিবর্ণ কোরবানির ঈদ। ঈদের দিন ছিল না কোনো আনন্দ। প্রতিদিনের মতোই পাস্তা খেয়েই কেটেছে ঈদের দিন। দিনটি কখনো ভুলতে পারবেন না বলে জানান সোহেল। বলেন, ‘ওইটা কি ঈদের দিন? সারা দিন কান্না করছি আর আল্লাহরে কইছি, মাবুদ, আমারে দেশ না দেখাইয়া নিয়ো না।’

৪৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়েও বাঁচানো গেল না, জানাল পরিবার

এখন কী করবেন তাঁরা

দেশে ফেরার পর তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আইনগত সহায়তার জন্য কিছু যোগাযোগ নম্বর দেওয়া হয়েছে, যাতে দালালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যেকোনো সমস্যায় আইওএমও সব সময় যোগাযোগ রাখতে বলেছে তাঁদের। তবে সোহেল আর কোনো দিন কোনো অবস্থাতেই বিদেশে যাওয়ার নাম নিতে চান না। তিনি বলেন, ‘আইওএম বলেছে, কিছু টাকা পাব আমরা। যদি দেশে একটা অটোরিকশার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, খেটেখুটে দেনা পরিশোধ করব। আর বিদেশে যেতে চাই না। পরিবার নিয়ে কষ্ট করে চলব, কিন্তু বিদেশের নাম আর নেব না।’

আর লিবিয়ার দুঃসহ যাত্রা শেষ হলেও দেশে নামার পর এখন মশিউরের মাথায় সুদের ওপর নেওয়া বিশাল ঋণের বোঝা। তবে আপাতত গ্রামে ফিরতে চান। এরপর বাকিটা ছেড়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার হাতে। সবশেষে জানতে চাওয়া হয় মশিউরের কাছে, আবারও এই পথ পাড়ি দেবেন তিনি, নাকি এবার অন্য দেশ, অন্য পথ? হাসিতে মশিউরের উত্তর, ‘ইতালির ক্যারা ভাই যার মাথায় একবার উঠেছে, আর কি নামে?’

খাবারের অভাবেই ভূমধ্যসাগরে মারা গেছেন সুনামগঞ্জের ১০ জন, জানালেন গ্রিসের ক্যাম্পে থাকা যুবক

স্বপ্ন নাকি ফাঁদ

উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় ঝুঁকি জেনেও অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। তাঁদের বড় একটি অংশের লক্ষ্য ইউরোপের দেশ ইতালি। দালালদের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা। কেউ গন্তব্যে পৌঁছালেও অনেকে সাগরপথেই হারিয়ে যান। তবু সোনার হরিণের আশায় থামছে না এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। পরিচিত অনেকের বিপদ ও জীবন হারানোর গল্প জানার পরও কেন থামছে না এই যাত্রা? মশিউর বলেন, ‘এটি একটি ফাঁদ। আরেকজন ইতালি গিয়ে লাখ টাকা বেতন পাচ্ছে, এটা দেখে কারও মাথা ঠিক থাকে না। যাওয়ার পর বোঝা যায়, এ পথ কত কষ্টের। আমার ছোট ভাইও না করেছিল, তখন বুঝিনি। সব হারিয়ে এখন বুঝতেছি।’

এরই মধ্যে বাস থামে গুলিস্তানে। দুজন নেমেই মাদারীপুরের বাসের উদ্দেশে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকেন। বাড়ি ফেরার তাড়া। দুজনের আরও কিছু ছবি নেওয়ার অনুমতি চাইলে আকুতির সুরে সোহেল বলেন, ‘ভাই, দালালরে গিয়ে ধরব। এখন যদি ছবি ছাড়েন, পরে বলবে, “তোরা তো মিডিয়াতে কথা বলছস, আর কিসের টাকা?” দালাল থেকে কিছু টাকা উদ্ধার হলে একটু বাঁচা যাবে। আমাদের জন্য আপনারা দোয়া করবেন, দেশের মানুষকে দোয়া করতে বলবেন। আর কেউ এই ভুল করবেন না, ফাঁদে পড়বেন না।’

ভূমধ্যসাগরে ১০ দিন ভাসছিল নৌকাটি, মারা যান ১০ জন

Read full story at source