যেমন বাবা তেমন ছেলে

· Prothom Alo

ঘটনাটা শুনে একটু বয়স্ক ফুটবলপ্রেমীরা অবাক না-ও হতে পারেন। উল্টো বলতে পারেন, ‘আরে, রোনাল্ড কোমানের ছেলে তো! পজিশন যা-ই হোক গোল করবেই!’

Visit afsport.lat for more information.

এই কথাকে এখন আর ভুল বলার সুযোগ নেই। ১৯৮৮ ইউরোজয়ী কোমান ডাচ ফুটবলের সূর্যসন্তান। মার্কো ফন বাস্তেন, রুদ খুলিত, ডেনিস বার্গক্যাম্পের সেই দলটির রক্ষণভাগের সেনানী। খেলতে পারতেন মিডফিল্ড কিংবা সুইপার হিসেবেও। তবে ডিফেন্ডার হিসেবেই পরিচিতিটা বেশি। কিন্তু স্মৃতির পাতা হাতড়ে ডিফেন্ডার কোমানকে আসলে খুব বেশি মনে পড়ে না।

কোমান মানেই ১৯৯২ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে বার্সেলোনাকে জেতানো সেই গোল। কোমান মানেই ডিফেন্ডার হয়েও দূরপাল্লার শট, ফ্রি-কিক কিংবা পেনাল্টি থেকে গোল করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। কোমানকে তাই মনে পড়লেই তাঁর গোল ঠেকানোর সামর্থ্যের তুলনায় গোল করার স্মৃতিগুলোই বেশি মনে পড়ে। বেশির ভাগ সময় ডিফেন্ডার হিসেবে খেলে কেউ দুই শর বেশি গোল করলে স্মৃতির অ্যালবামে এমন প্রতারণাই তো স্বাভাবিক!

রোনাল্ড কোমান জুনিয়র যেন সেসব স্মৃতি আরও উসকে দিলেন।

সন্তান বাবার পথে হাঁটলে অনেকে আহ্লাদে বলেন, ‘বাপকা বেটা, সেপাইকা ঘোড়া।’ জুনিয়র যেন এই কথার আক্ষরিক সংস্করণ। বাবার মতোই গোল ঠেকানোটা তাঁর কাজ। পার্থক্য শুধু, বাবা গোল ঠেকাতে দাঁড়াতে একটু এগিয়ে—রক্ষণভাগের লাইনে। ছেলে দাঁড়ান পোস্টে—গোলকিপার। কিন্তু কাজে-কর্মে বাবাকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন জুনিয়র। কোমান সিনিয়র যেমন মাঠে গোল ঠেকানোর ফাঁকে সুযোগ পেলেই গোল করতেন, কোমান জুনিয়রও তেমনি গোল করছেন গোল ঠেকানোর ফাঁকে সুযোগ পেলে।

এই তো গতকাল রাতে নেদারল্যান্ডসের শীর্ষে লিগে গোল করলেন জুনিয়র। কাম্বুরের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্রয়ে তাঁর দল টেলস্টারের হয়ে দুটি গোলই ৩১ বছর বয়সী জুনিয়রের! কাম্বুর ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ৬৩ মিনিট ও যোগ করা সময়ের ১১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে দুটি গোল করেন জুনিয়র। তার আগে ২২ মিনিটে ১০ জনের দলে পরিণত হয় টেলস্টার।

ডাচ কিংবদন্তি রোনাল্ড কোমান। নেদারল্যান্ডস ও বার্সেলোনার কোচও ছিলেন সাবেক এ ডিফেন্ডার

ভাবছেন, গোলকিপারের কাছ থেকে গোল পাওয়াটা আর নতুন কী! রোজারিও চেনি, হোসে লুই চিলাভার্টরা তো বহু আগেই এসবে অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন। তা বটে, তবে দলের ভীষণ প্রয়োজনের মুহূর্তে গোল করা খেলোয়াড়দের জাতটা একটু আলাদা হয়।

যেমন ধরুন ১৯৯৪ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করেছিলেন কোমান সিনিয়র। ১৯৮৮ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে বেনফিকার বিপক্ষে টাইব্রেকারেও প্রথম গোলটি কোমান সিনিয়রের। জুনিয়র এখনো অতটা এগোতে না পারলেও ধারাটা কিন্তু সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে। শুধু কাম্বুরের বিপক্ষে হার এড়ানো নয়, টেলস্টার যে এই মৌসুমে ডাচ শীর্ষ লিগে খেলছে, সেটা তো গত মৌসুমে জুনিয়রের একটি গোলের কল্যাণে!

গত মে মাসে ডাচ লিগে (এরদেভিসিয়ে) অবনমন হওয়া দলগুলো নিশ্চিতের শেষ দিনে ভোলেনডামের বিপক্ষে ম্যাচে ১ পয়েন্ট দরকার ছিল টেলস্টারের। তাহলেই অবনমন এড়িয়ে শীর্ষ লিগে টিকে থাকত টেলস্টার। এমন ম্যাচে টেলস্টার শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পর ২-১ গোলে জেতে ৮৯ মিনিটে পেনাল্টি থেকে কোমান জুনিয়রের গোলের কল্যাণে। অথচ মাঠে ছিলেন সে মৌসুমে টেলস্টারের সর্বোচ্চ দুই গোলদাতা—জোখেম রিটমেস্টের ও প্যাট্রিক ব্রাউয়ার। তাদের বাদ দিয়ে পেনাল্টি নেওয়ার গুরুদায়িত্ব চেপেছিল জুনিয়রের ওপর। অর্থাৎ, পেনাল্টি নেওয়ার অভ্যাসটা তাঁর রপ্ত করাই ছিল।

সেদিন ম্যাচ শেষে টেলস্টারের তৎকালীন কোচ অ্যান্থনি কোরিয়া বলেছিলেন, ‘রোনাল্ড কোমান জুনিয়র একজন কিংবদন্তি। তাঁর নামে ভাস্কর্য বানানো উচিত।’

নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলে কখনো ডাক পাননি কোমান জুনিয়র

কী বানানো উচিত—সেটা ঠিক করার জন্য এখনো যথেষ্ট সময় বাকি। আপাতত বাপ-বেটার পেনাল্টি থেকে গোলের অভ্যাসটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়। কোমান সিনিয়রের ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যা ২৩৯—এর মধ্যে পেনাল্টি থেকে ১৩১ বারের প্রচেষ্টায় পেয়েছেন ১১৫ গোল।

পেশাদার ক্যারিয়ারে পেনাল্টি থেকে কোমান জুনিয়রের পেনাল্টি থেকে গোল মাত্র ৩টি। এর মধ্যে শেষ দুটি গোলে ডাচ লিগে জুনিয়র এমন এক রেকর্ড গড়েছেন যেটা কেউ কখনো ভাঙতে পারবে না। নেদারল্যান্ডসের এই শীর্ষ লিগে এক ম্যাচে দুটি গোল করা প্রথম খেলোয়াড় এখন রোনাল্ড কোমান জুনিয়র।

তা, জুনিয়রের পেনাল্টি নেওয়ার অভ্যাসটা হলো কীভাবে? ভোলেনডামের বিপক্ষে সেই ম্যাচ শেষে ইএসপিএনকে গল্পটা বলেন জুনিয়র, ‘ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার এই শট নিতে গিয়ে মিস করেছি। এখন ভালো শট নিচ্ছি। মৌসুমের প্রথমার্ধে আমরা দুটি (পেনাল্টি) মিস করেছি। এরপর স্পার্টার বিপক্ষে হাফটাইমে কোচ জানতে চেয়েছিলেন আমি এখন থেকে পেনাল্টি নিতে পারব কি না? বলেছি, কেন নয়?’

স্পার্টার বিপক্ষে সেই ম্যাচে পেনাল্টি পায়নি টেলস্টার। ভোলেনডামের বিপক্ষে প্রথম পেনাল্টি নেওয়া নিয়েও জুনিয়র বলেন, ‘কোচের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, আমার কি শটটা নেওয়া উচিত? কারণ, তালিকায় আমার নামটাই ১ নম্বরে ছিল, তবে তখন খেলার ফল ছিল ১-১। তখন তিনি বললেন, অবশ্যই, তুমিই নাও।’

১৯৯৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাও পাওলোর ফ্রি-কিক ও পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব ছিল ব্রাজিলের গোলকিপার রোজারিও চেনির কাঁধে। এই দীর্ঘ সময়ে ১২৯টি গোল করেন চেনি। গিনেজ বইয়ে চেনি গোলকিপার হিসেবে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তবে কলম্বিয়া জাতীয় দলের সাবেক গোলকিপার রেনে হিগুইতাও পিছিয়ে নেই।পেনাল্টি থেকে ৩৫টিসহ তাঁর মোট গোল ৪৩টি। প্যারাগুয়ের সাবেক গোলকিপার হোসে লুইস চিলাভার্টের গোলসংখ্যা ৬০, এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোল ৮টি।

কোমান জুনিয়র চেনি-চিলাভার্টদের পথে যাচ্ছেন কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। গোল করাটা লাতিন আমেরিকান গোলকিপারদের জন্য আলাদা এক ঐতিহ্য। তবে কোমান জুনিয়রেরও আছে গোল ঠেকানোর কাজে নেমে পেনাল্টি থেকে গোলের পারিবারিক ঐতিহ্য। সে জন্যই সম্ভবত কোমান জুনিয়র এখন পেনাল্টি শটে টেলস্টারের প্রথম পছন্দ।

পেনাল্টি থেকে সর্বশেষ গোলের পর সে কথাই বললেন জুনিয়র, ‘(টেলস্টারের) তালিকার শীর্ষে এখন আমার নাম। আমি ভালো পেনাল্টি শট নিতে পারি, নিজের ওপর এই আত্মবিশ্বাস আমার আছে। এটা নিয়ে আমার মনে কোনো সংশয় নেই।’

কোমানের ছেলে ভালো পেনাল্টি শট নেবে, পজিশন যেটাই হোক সুযোগ পেলেই গোল করবে—এ বিষয়ে নিশ্চয়ই ফুটবলপ্রেমীদেরও এখন আর কোনো সন্দেহ নেই!

Read full story at source