মহানবী (সা.) যেভাবে নিজের ইন্তেকালের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন

· Prothom Alo

নবম হিজরিকে বলা হয় প্রতিনিধিদলের বছর। এ বছর আরবের নানা অঞ্চল থেকে দলে দলে মানুষ এসে ইসলাম গ্রহণ করছিলেন। তাঁদের ইসলামের বিধান শেখানোর জন্য রাসুল (সা.) বিভিন্ন সাহাবিকে শিক্ষক ও প্রশাসক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।

এই ধারাবাহিকতায় বিশিষ্ট সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবালকেও রাসুল (সা.) ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নবীজির খুব কাছের একজন সাহাবি। মদিনা থেকে সুদূর ইয়েমেনের পথে তাঁকে বিদায় জানানোর সময় নবীজি এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যেন এ-ই তাঁদের শেষ দেখা। তাঁর এই প্রিয় সাহাবি হয়তো ফিরে এসে আর তাঁকে দেখতে পাবেন না।

Visit rouesnews.click for more information.

সেদিনের দৃশ্যের বর্ণনা আমরা হাদিসের মাধ্যমে জানতে পারি।

মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) ইয়েমেনের পথে রওনা হচ্ছেন। সওয়ারির ওপর বসে আছেন। আর আল্লাহর রাসুল (সা.) পায়ে হেঁটে তাঁকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিচ্ছেন। বিদায়ের মুহূর্তে তিনি বললেন, ‘হে মুয়াজ, হয়তো এ বছরের পর তুমি আর আমার সাক্ষাৎ পাবে না। হয়তো তুমি আমার এই মসজিদ আর আমার কবরের পাশ দিয়ে যাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২০৫২)

আরও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ছিল সুরা আন-নাসরে। এই সুরার ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, এটি নবীজির আয়ু শেষ হয়ে আসার সংবাদ; আল্লাহ তাঁকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। ওমরও তাঁর বক্তব্য সমর্থন করেছেন।

আসলে সাহাবিদের গোটা জীবন গড়ে উঠেছিল ওহির ওপর ভিত্তি করে। সে সময় নবীজির কাছে ওহি আসত। কোরআনের আয়াতের পাশাপাশি তাঁর মুখে তাঁরা শুনতেন ধর্মের শিক্ষা ও নির্দেশনা।

কোনো বিষয়ে সংশয় জাগলে তাঁরা তাঁকেই জিজ্ঞেস করতেন। কখনো তাঁদের প্রশ্নের উত্তর নেমে আসত আসমান থেকে। উত্তরাধিকার কীভাবে ভাগ হবে, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ কীভাবে মিটবে, যুদ্ধের গনিমত কীভাবে বণ্টিত হবে—জীবনের এসব প্রশ্নের সমাধান তাঁরা পেয়েছেন তাঁদের মাঝে থাকা নবির কাছ থেকে

তাঁদের জন্য এ কথা ভাবা কঠিন ছিল যে একদিন এ মানুষটি থাকবেন না। আসমান থেকে তাঁর কাছে ওহি আসার এই ধারাও থেমে যাবে। সেই কষ্টের গভীরতা বোঝা যায় ইন্তেকালের দিনের ঘটনায়। ওমর (রা.) দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করেননি।

আবু বকর (রা.) এসে নবীজির চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে চুমু খেলেন। তারপর মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠ করলেন, ‘মুহাম্মদ একজন রাসুল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে বহু রাসুল অতিবাহিত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান কিংবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে?’ (সুরা আলে ইমরান: ১৪৪)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৬৭–৩৬৬৮)

মানুষের যেন মনে হলো, আয়াতটি তাঁরা আগে কখনো শোনেননি। আয়াতটি শুনে ওমর (রা.) স্থির থাকতে পারেন নি, মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। বুঝলেন, নবীজি সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৫২–৪৪৫৪)

‘সরল পথ’ দেখাতে নবীজির মোহরাঙ্কিত ১০ অসিয়ত

কোরআনে নবীজির ইন্তেকালের কথা আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৩০)

যিনি আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তাঁকেও একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। আল্লাহর রাসুল হলেও দুনিয়ার জীবন তাঁর জন্য চিরস্থায়ী নয়।

আরেক আয়াতে এসেছে, ‘আপনার পূর্বে আমি কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দিইনি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৪)

আগের নবীরাও পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। শেষ নবীকেও একদিন চলে যেতে হবে। সাহাবিদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষটি তাঁদের মাঝে চিরদিন থাকবেন না—এ বিষয়টি কোরআনে আগেই নাজিল হয়েছিল।

আরও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ছিল সুরা আন-নাসরে। এই সুরার ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, এটি নবীজির আয়ু শেষ হয়ে আসার সংবাদ; আল্লাহ তাঁকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। ওমরও তাঁর বক্তব্য সমর্থন করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৭০)

বিদায় হজের ময়দানে যখন নাজিল হলো, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম পূর্ণ করে দিলাম।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩)

যে ধর্ম মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁর আগমন, তার পূর্ণতার ঘোষণা এল তাঁর জীবনের শেষ হজে।

মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২০৫২হে মুয়াজ, হয়তো এ বছরের পর তুমি আর আমার সাক্ষাৎ পাবে না। হয়তো তুমি আমার এই মসজিদ আর আমার কবরের পাশ দিয়ে যাবে।

হাদিসে ইন্তেকালের আভাস

জীবনের শেষ দিকে নবীজি (সা.) এক ভাষণে বলেছিলেন, আল্লাহ এক বান্দাকে দুনিয়া আর তাঁর কাছে যা আছে—এই দুইয়ের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন; বান্দা আল্লাহর কাছে যা আছে, সেটিই বেছে নিয়েছেন। উপস্থিত অনেকে বুঝতে পারেননি, কিন্তু আবু বকর (রা.) কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, সেই বান্দা আর কেউ নন, তাঁদের প্রিয় নবীজি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৪)

শেষ রমজানের ঘটনাতেও ছিল বিদায়ের ইঙ্গিত। ফাতিমাকে নবীজি বলেছিলেন, জিবরাইল (আ.) প্রতিবছর একবার আমার সঙ্গে কোরআনে দাওর (পরস্পরকে শোনানো) করতেন, এ বছর দুবার করেছেন। আমি মনে করি, আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬২৩–৩৬২৪)

সেই বছর তিনি ইতিকাফও করেছিলেন দশ দিনের বদলে বিশ দিন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৯৮)

ওহুদের শহীদদের জন্য তিনি এমনভাবে প্রার্থনা করেছিলেন, যেন জীবিত ও মৃত—উভয়ের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০৪২)

মহানবী (সা.)–এর মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর পাশে ছিলেন যিনি

আর বিদায় হজের ভাষণে সমবেত সাহাবিদের সামনে তিনি সাক্ষ্য নিয়েছিলেন, ‘আমার সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা তখন কী বলবে?’ সবাই বললেন, ‘আমরা সাক্ষ্য দেব যে আপনি পৌঁছে দিয়েছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কল্যাণ কামনা করেছেন।’ তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে, তারপর মানুষের দিকে নির্দেশ করে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)

মুয়াজকে নবীজির বিদায়বার্তা

মুয়াজ (রা.) ছিলেন আকাবার বাইআতে অংশ নেওয়া একজন তরুণ আনসারি সাহাবি। বদরসহ বিভিন্ন অভিযানে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। নবীজি (সা.) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘হালাল-হারাম সম্পর্কে আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী মুয়াজ ইবনে জাবাল।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৯১)

একদিন তাঁর হাত ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘হে মুয়াজ, আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ এরপর প্রতিটি নামাজের শেষে পড়ার জন্য তাঁকে একটি দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫২২)

ইয়েমেনে পাঠানোর সময়ও তাঁকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেখানকার মানুষ ছিল আহলে কিতাব, তাই কীভাবে দাওয়াত দিতে হবে, কীভাবে জাকাত নিতে হবে, সব তাকে বলে দিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৯৬)

সেদিন এমন একজন প্রিয় মানুষকে বিদায় দিতে গিয়ে নবীজি (সা.) নিজেই তাঁর ইন্তেকালের কথা বলেছিলেন। সাহাবিরা তাঁকে কতটা ভালোবাসতেন, তা তিনি জানতেন। তাঁর অনুপস্থিতি তাঁদের জন্য কত কঠিন হবে, সেদিনের বিদায়ের দৃশ্যেই তার আভাস পাওয়া যায়। তাঁর কথাগুলো যেন সেই কঠিন বিচ্ছেদের জন্য আগাম প্রস্তুতির বার্তা ছিল।

তিনি যখন বলছিলেন হে মুয়াজ, ‘হয়তো এ বছরের পর তুমি আর আমার সাক্ষাৎ পাবে না’—কথাটি শুনে মুয়াজ (রা.) নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। প্রাণের চেয়ে প্রিয় রাসুলের সঙ্গে আর দেখা হবে না এই ভেবে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। তখন নবীজি (সা.) মদিনার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তারাই, যারা মুত্তাকি—তারা যে-ই হোক না কেন, আর যেখানেই থাকুক না কেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২০৫২)

এই হাদিসে আমাদের জন্য গভীর একটি শিক্ষা রয়েছে। নবীজির নৈকট্য যদি শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব দিয়ে নির্ধারিত হতো, তাহলে মুয়াজের জন্য ইয়েমেনের পথে সেই যাত্রা কঠিন হতো!

তিনি নিশ্চয় চাইতেন আরও কিছুদিন মদিনায় রাসুলের সান্নিধ্যে থেকে যেতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই নবীজি তাঁকে জানিয়ে দিলেন, দূরে গেলেই তিনি দূরের হয়ে যাবেন না।

পরে মুয়াজ (রা.) মদিনায় ফিরেছিলেন আবু বকরের খেলাফতকালে। তত দিনে নবীজির ইন্তেকাল হয়ে গেছে। মদিনায় তাঁর মসজিদ ছিল, তাঁর কবর ছিল; তিনি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।

  • নাজমুস সাকিব : এম ফিল গবেষক, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মহানবী (সা.)-র জীবনের শেষ ১৫ দিন

Read full story at source