বাসরের মোহ ত্যাগ করে ধর্মের পথে

· Prothom Alo

পার্থিব জীবনের পরম সুখ, পারিবারিক মোহ এবং নববিবাহিত জীবনের সব আকর্ষণ একনিমেষে তুচ্ছ করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কীভাবে অগ্রাধিকার দিতে হয়—তার এক হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান রচিত হয়েছিল ওহুদ ময়দানে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

এই কালজয়ী ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র যুবক সাহাবি হজরত হানজালা ইবনে আবি আমির (রা.)।

পিতা ও পুত্রের বিপরীত পথ

ওহুদ যুদ্ধের সময় হানজালা (রা.) ছিলেন মাত্র ২৪ বছরের এক তেজোদৃপ্ত নওজোয়ান। ইসলামের আলো গ্রহণ করেছিলেন মাত্র দুই বছর আগে। তবে তাঁর পারিবারিক পটভূমি ছিল বেশ জটিল।

তাঁর পিতা আবু আমির ছিল সেকালে মদিনার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও ধর্মপণ্ডিত। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে সে সর্বদা আখেরি জামানার নবীর আগমনবার্তা প্রচার করত এবং জনগণকে তাঁর আনুগত্যের নসিহত করত।

নববিবাহিত জীবনের সব আকর্ষণ একনিমেষে তুচ্ছ করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কীভাবে অগ্রাধিকার দিতে হয়—তার এক হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান রচিত হয়েছিল ওহুদ ময়দানে।

কিন্তু যখন সত্য সত্যিই মহানবী (সা.) মদিনায় এলেন, তখন আত্মগরিমা ও নেতৃত্বের মোহে আবু আমির সত্য মেনে নিতে অস্বীকার করল। নিজের পুত্র হানজালা ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলেও পিতা ইমান আনলেন না।

মহানবী (সা.) তাঁর কপটতা ও ঔদ্ধত্যের কারণে তাঁকে ‘আবু আমির আর-রাহিব’ (সন্ন্যাসী)-এর পরিবর্তে ‘আবু আমির আল-ফাসিক’ (পাপাচারী) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মদিনার মানুষ যখন ইসলামে দলে দলে প্রবেশ করছিল, আবু আমির তখন নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে মক্কার কোরাইশদের সঙ্গে হাত মেলাতে চলে যায়। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৫৮, ১২৩)

যাকে ‘সাহেবে ওহুদ’ বলে ডাকতেন ওমর (রা.)

ওহুদ যুদ্ধের ডাক

ওহুদ যুদ্ধের ঠিক আগের রাতটি ছিল হানজালা (রা.)-এর জীবনের এক বিশেষ মুহূর্ত। সেদিন ছিল তাঁর বাসর রাত। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী জামিলা বিনতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে নিয়ে তখন তাঁর সুখময় নতুন জীবনের সূচনা।

কিন্তু শুক্রবার দিবাগত রাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ভোরের আলোয় মদিনার অলিগলিতে রণনিনাদ ধ্বনিত হলো—মুশরিক বাহিনী ওহুদের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত এবং মহানবী (সা.) মুজাহিদদের নিয়ে ময়দানের দিকে রওনা হয়ে গেছেন।

যুদ্ধে যোগদানের সেই আহ্বান কানে আসতেই হানজালার অন্তরে ইমানের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। তিনি তখন অপবিত্র (সহবাসজনিত) অবস্থায় ছিলেন। ফরজ গোসল করতে যতটুকু সময়ের প্রয়োজন, মহানবীর সঙ্গে জিহাদে শামিল হতে সেই সামান্যতম বিলম্বকেও তাঁর কাছে ধর্মের প্রতি অবহেলার মতো মনে হলো।

তিনি এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেন না। সদ্য পরিণীতা স্ত্রীর মায়াবী সান্নিধ্য পেছনে ফেলে, সেই অবস্থাতেই তরবারি হাতে অশ্ব ছুটিয়ে দিলেন ওহুদের ময়দানে। সেখানে পৌঁছেই তিনি নবীজির নেতৃত্বে প্রস্তুত মুজাহিদদের কাতারে গিয়ে দাঁড়ালেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ৪/১১-১২)

একপর্যায়ে তিনি কোরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হলেন। চোখের পলকে আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পায়ে তরবারির আঘাত হানলেন এবং সে মাটিতে আছড়ে পড়ল।

বীরত্ব ও শাহাদাত

রণক্ষেত্রে লড়াই যখন তীব্র রূপ নিল, অবিশ্বাসী শিবির থেকে কোরাইশদের অগ্রবর্তী দলে এসে দাঁড়াল হানজালার পিতা স্বয়ং আবু আমির। সে মদিনার আউস গোত্রকে প্রলুব্ধ করার অপচেষ্টা চালালে মুসলিম মুজাহিদরা তাকে চরম ধিক্কার দিয়ে পিছু হটতে বাধ্য করলেন।

এদিকে হানজালা (রা.) বীর বিক্রমে মুশরিকদের ব্যূহ ভেদ করে একেবারে শত্রুশিবিরের কেন্দ্রস্থলে ঢুকে পড়লেন। একপর্যায়ে তিনি কোরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হলেন। চোখের পলকে আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পায়ে তরবারির আঘাত হানলেন এবং সে মাটিতে আছড়ে পড়ল।

হানজালা যখন ইসলামের শীর্ষ শত্রুকে পরাস্ত করতে উদ্যত হলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ছুটে এল কোরাইশ যোদ্ধা শাদ্দাদ ইবনে আল-আসওয়াদ (ইবনে শাউব)। কাপুরুষের মতো পেছন থেকে অতর্কিত বর্শার আঘাত হেনে সে হানজালাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে ফেলে দিল। শহীদ হলেন তিনি। (ইমাম হাকিম, আল-মুস্তাদরাক আলাস সহিহাইন, ৩/২০৪)

সাহাবি খোবাইবের শাহাদত থেকে শিক্ষা

আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে গোসল

লড়াই শেষে যখন মুসলিমরা শোকার্ত হৃদয়ে ৭০ জন শহীদের পবিত্র দেহ একত্র করছিলেন, তখন স্বয়ং মহানবী (সা.) নিহতদের কাছে গিয়ে বেহেশতের সুসংবাদ দিচ্ছিলেন। হানজালার মরদেহের পাশে এসে নবীজি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি বিস্ময়ভরে সাহাবিদের বললেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে রুপার পাত্রে রাখা মেঘের শীতল পানি দিয়ে ফেরেশতারা তোমাদের ভাই হানজালাকে গোসল করাচ্ছে!’

ইসলামের বিধান অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দানে নিহত শহীদদের গোসল দেওয়া হয় না; বরং রক্তাক্ত পোশাকেই তাঁদের দাফন করা হয়। হানজালার ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রম দেখে মহানবী (সা.) সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা হানজালার স্ত্রীর কাছে গিয়ে খবর নাও, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তার কী অবস্থা ছিল?’

সাহাবিরা দ্রুত মদিনায় জামিলার কাছে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি সজল চোখে জানালেন—হানজালা নবীজির আহ্বান শুনে ফরজ গোসল করার সময়টুকুও নেননি; বরং অপবিত্র অবস্থাতেই রণক্ষেত্রে ছুটে গিয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) তখন বললেন, ‘এ কারণেই মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে তাঁকে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে এই বিশেষ সম্মানজনক গোসল করিয়েছেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭০৩২)

পার্থিব জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও আনন্দের রাত ছিল তাঁর বাসররাত। কিন্তু আল্লাহর ধর্ম ও রাসুলের আহ্বানের সামনে তিনি সেই সুখের মোহকে বিন্দুমাত্র স্থান দেননি।

ইতিহাসে এক অনন্য সম্মান

সেদিন থেকেই ইসলামের ইতিহাসে সাহাবিদের কাছে হানজালা (রা.) পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘গাসিলুল মালাইকা’ বা ‘ফেরেশতা কর্তৃক গোসলপ্রাপ্ত মহান ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে।

পার্থিব জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও আনন্দের রাত ছিল তাঁর বাসররাত। কিন্তু আল্লাহর ধর্ম ও রাসুলের আহ্বানের সামনে তিনি সেই সুখের মোহকে বিন্দুমাত্র স্থান দেননি।

নিজের জানমাল কিংবা নববধূর মায়াজালে আবদ্ধ না হয়ে তিনি অবলীলায় আত্মোৎসর্গ করেছিলেন সত্যের পথে। এই নিঃশর্ত প্রেমের প্রতিদান হিসেবে মহান রব তাঁকে এমন এক মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, যা কেয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির কাছে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

  • নূরুল্লাহ মারূফ: আলেম ও লেখক

যিনি ছিলেন ৫ শহীদ সাহাবির স্ত্রী

Read full story at source