পানি কি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার চেয়ে বেশি গরম হতে পারে
· Prothom Alo

কল্পনা করুন, চা বানানোর জন্য আপনি মাইক্রোওয়েভে এক মগ পানি বসালেন। তিন মিনিট পর দেখলেন, পানিটা একেবারে শান্ত। কোনো বুদবুদ নেই। এবার আপনি একটি টি-ব্যাগ পানিতে ফেললেন। অমনি পানি ছোট গিজারের মতো মগের কিনারা ছাপিয়ে বেরিয়ে এল! যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এমন ঘটনার বেশ কয়েকটি রিপোর্টও সংগ্রহ করেছে। এসব ঘটনায় মানুষের হাত ও মুখের চারপাশে ত্বক গুরুতরভাবে পুড়ে যাওয়ার মতো আঘাতের কথাও উঠে এসেছে। ওই পানির তাপমাত্রা ছিল ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি, অথচ পানি ফুটছিল না!
স্কুলে আমরা শিখেছি, ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানি ফুটতে শুরু করে। এরপর আরও গরম করলে পানি বাষ্প হয়ে যায়। তাহলে মাইক্রোওয়েভের মগে পানি ১০০ ডিগ্রির চেয়েও বেশি গরম হলো কীভাবে? আরেকটি প্রশ্নও আছে। পুকুর বা ডোবা থেকে পানি বাষ্প হয়ে ওপরে উঠে যায়। তার জন্য নিশ্চয়ই অণুগুলোর বাড়তি শক্তি দরকার। তাহলে আমাদের ঘরের চারপাশে থাকা অদৃশ্য জলীয় বাষ্প কি কেটলির পানির চেয়েও বেশি গরম?
Visit extonnews.click for more information.
পানি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম হলে টগবগ করে ফুটতে শুরু করেদুটি প্রশ্নের উত্তরই আসলে একই জায়গায় লুকিয়ে আছে। আর সেটি বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে, থার্মোমিটার আসলে কী মাপে।
ফুটন্ত পানি চুলা থেকে নামালে বেশি ধোঁয়া বেরোয় কেনগ্যাসের অণুগুলো আরও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে। তারা এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায় এবং একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
তাপমাত্রা কী পরিমাপ করে
আপনার দুই হাত একসঙ্গে ঘষুন। কিছুক্ষণ পর হাত গরম হয়ে যাবে। কারণ, হাত ঘষাঘষির ফলে হাতের অণুগুলো আরও বেশি নড়াচড়া করতে শুরু করে। আমাদের শরীরসহ চারপাশের সবকিছুই অসংখ্য অণু দিয়ে তৈরি। এসব অণু কখনোই পুরোপুরি স্থির থাকে না।
গ্যাসের অণুগুলো আরও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে। তারা এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায় এবং একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। অণুগুলো গড়ে কতটা দ্রুত চলাচল করছে, তার সঙ্গেই তাপমাত্রার আসল সম্পর্ক রয়েছে। নাসার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্যাসের তাপমাত্রা হলো তার অণুগুলোর ‘গড় স্থানান্তরণ গতিশক্তি’র একটি পরিমাপ। অর্থাৎ, গড় হিসেবে গ্যাসের তাপমাত্রা যত বেশি, অণুগুলোর গতিশক্তিও তত বেশি এবং তারা তত দ্রুত চলাচল করে।
তাপ ও তাপমাত্রা এক নয়; তাহলে তাপমাত্রা কীগ্যাসের অণুগুলোও খুব দ্রুত একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। সাধারণ চাপে একটি গ্যাসের অণু গড়ে প্রতি সেকেন্ডের প্রায় ৫০ কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেই আরেকটি অণুর সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে।
ধরুন, ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এক গ্লাস পানি আপনার সামনে আছে। ওই পানির সব অণু কিন্তু একই গতিতে চলে না। কোনোটি ধীরে চলছে, কোনোটি দ্রুত। আবার কয়েকটি অণু এত দ্রুত ছুটে চলে যে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ফুটন্ত পানির অনেক অণুকেও পেছনে ফেলে দিতে পারে! এই দ্রুতগতির অণুগুলোর কারণেই ঠান্ডা দিনেও পুকুর বা ডোবার পানি ধীরে ধীরে বাষ্প হয়ে যায়। তাহলে কি একটি অণু নিজে নিজে গরম হতে পারে? না। একটি অণুর গতিবেগ আছে, কিন্তু তার কোনো তাপমাত্রা নেই। তাপমাত্রা হলো অনেক অণুর সম্মিলিত আচরণের একটি পরিমাপ।
গ্যাসের অণুগুলোও খুব দ্রুত একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। সাধারণ চাপে একটি গ্যাসের অণু গড়ে প্রতি সেকেন্ডের প্রায় ৫০ কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেই আরেকটি অণুর সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ১ অ্যাটমোসফিয়ার চাপে আর্গন গ্যাসের জন্য এমন নিখুঁত হিসাব দিয়েছে ওপেনস্ট্যাক্স। আবার পানি থেকে বেরিয়ে আসা একটি অণুও খুব অল্প সময়ের মধ্যে আশপাশের বাতাসের অণুগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তার বাড়তি শক্তি ছড়িয়ে দেয়। তাই তাপমাত্রা কোনো একটি নির্দিষ্ট অণুর বৈশিষ্ট্য নয়। এটি বিপুলসংখ্যক অণুর গড় আচরণের পরিমাপ।
গ্যাসের তাপীয় প্রসারণযুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর লিডভিল শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। সেখানে বায়ুচাপ মাত্র ৬৮ কিলোপ্যাসকেল। ফলে পানি সেখানে প্রায় ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই ফুটে যায়!
স্ফুটনাঙ্ক কী এবং এটি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কেন
এবার আসা যাক সেই পরিচিত ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কথায়। ঘরের তাপমাত্রাতেও পানির কিছু অণু পানির পৃষ্ঠ ছেড়ে বাষ্প হয়ে বাতাসে চলে যায়। তখন তারা আশপাশে চাপ সৃষ্টি করে। একে বলে বাষ্পচাপ। ঘরের তাপমাত্রায় পানির বাষ্পচাপ প্রায় ২০ মিলিমিটার পারদচাপ, যা বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ৩ শতাংশেরও কম। তাই পানি তখন শুধু ওপরের পৃষ্ঠ থেকে বাষ্পীভূত হয়, ভেতর থেকে বুদবুদ তৈরি করে ফুটতে শুরু করে না। পানিকে গরম করলে এর বাষ্পচাপ বাড়তে থাকে। একসময় পানির বাষ্পচাপ আশপাশের বায়ুর চাপের সমান হয়ে যায়। তখন পানি ফুটতে শুরু করে। সহজ করে বললে, পানির বাষ্পচাপ = বাইরের।
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর লিডভিল শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিতএই অবস্থায় শুধু পানির ওপরের পৃষ্ঠে নয়, পানির ভেতরেও বুদবুদ তৈরি হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠে স্বাভাবিক বায়ুচাপে এই ঘটনা ঘটে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কারণ, ওই তাপমাত্রায় পানির বাষ্পচাপ ১ অ্যাটমসফিয়ারে পৌঁছে যায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। পানির স্ফুটনাঙ্ক সব সময় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নয়। এটি বাইরের চাপের ওপর নির্ভর করে। চাপ বাড়ালে স্ফুটনাঙ্ক বাড়ে, আর চাপ কমালে স্ফুটনাঙ্কও কমে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর লিডভিল শহরের কথা বলা যায়। শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। সেখানে বায়ুচাপ মাত্র ৬৮ কিলোপ্যাসকেল। ফলে পানি সেখানে প্রায় ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই ফুটে যায়!
পানি: সরল থেকে সরলতর, বিস্ময়ের চেয়ে বিস্ময়করকিছু ব্যাকটেরিয়া শক্ত স্পোর তৈরি করে, যা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটন্ত পানিতেও বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু প্রেশার ক্যানারের বেশি তাপমাত্রা এসব স্পোর ধ্বংস করতে পারে।
পানি কি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি গরম হতে পারে
হ্যাঁ, পারে। আর এর সবচেয়ে সহজ উদাহরণটি আপনার রান্নাঘরেই আছে—প্রেশার কুকার। প্রেশার কুকার ভেতরের বাষ্প আটকে রাখে। ফলে ভেতরের চাপ বেড়ে যায়। তখন পানি ফুটতে আরও বেশি বাষ্পচাপ তৈরি করতে হয়। অর্থাৎ, পানির স্ফুটনাঙ্ক বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, ১০ পিএসআই (PSI) চাপে পানি প্রায় ২৩৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফোটে। ১৫ পিএসআই চাপে তা প্রায় ২৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটতে পারে। অর্থাৎ, প্রেশার কুকার বা ক্যানারের ভেতরের তরল পানির তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
প্রেশার কুকার ভেতরের বাষ্প আটকে রাখে। ফলে ভেতরের চাপ বেড়ে যায়। তখন পানি ফুটতে আরও বেশি বাষ্পচাপ তৈরি করতে হয়হাসপাতালের অটোক্লেভেও একই নীতি কাজে লাগানো হয়। যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার জন্য সেখানে বাষ্পের তাপমাত্রা সাধারণত ১২১ ডিগ্রি বা ১৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেওয়া হয়। চাপ বাড়ানোর ফলে এই বেশি তাপমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়। এর একটি বড় সুবিধাও আছে। কিছু ব্যাকটেরিয়া শক্ত স্পোর তৈরি করে, যা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটন্ত পানিতেও বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু প্রেশার ক্যানারের বেশি তাপমাত্রা এসব স্পোর ধ্বংস করতে পারে। যেমন- বোটুলিজমের জন্য দায়ী Clostridium botulinum ব্যাকটেরিয়ার স্পোর। তাই কিছু খাবার নিরাপদে সংরক্ষণ করতে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়।
পৃথিবীতে যত ধরনের পানি আছেপ্রেশার কুকার ভেতরের বাষ্প আটকে রাখে। ফলে ভেতরের চাপ বেড়ে যায়। তখন পানি ফুটতে আরও বেশি বাষ্পচাপ তৈরি করতে হয়। অর্থাৎ, পানির স্ফুটনাঙ্ক বেড়ে যায়।
প্রেশার কুকার ছাড়া কি পানি ১০০ ডিগ্রির বেশি গরম হতে পারে
এফডিএ অতি-উত্তপ্ত পানি বা সুপারহিটেড পানি বলতে এমন পানিকে বোঝায়, যার তাপমাত্রা তার স্বাভাবিক স্ফুটনাঙ্কের চেয়ে বেশি। পরিষ্কার কাপের স্থির পানি মাইক্রোওয়েভে গরম করলে এমনটা ঘটতে পারে। কিন্তু পানি ফুটতে হলে শুধু গরম হলেই হবে না, বুদবুদ তৈরির জন্য একটি জায়গাও দরকার। সাধারণ পাত্রের ভেতরের ছোট আঁচড়, দাগ কিংবা আটকে থাকা ক্ষুদ্র বায়ুর পকেট সেই জায়গা তৈরি করে। এগুলোকে বিজ্ঞানীরা বলেন নিউক্লিয়েশন সাইট।
মাইক্রোওয়েভে পানি ভেতর থেকেই উত্তপ্ত হয়একটি মসৃণ মগে এমন জায়গা কম থাকতে পারে। তার ওপর মাইক্রোওয়েভে পানি ভেতর থেকেই উত্তপ্ত হয়। ফলে পানি ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হয়ে গেলেও বুদবুদ তৈরি নাও হতে পারে। পানি তখন একটি অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। এরপর আপনি যদি সেই মগে এক চামচ কফি বা চিনি দেন, হঠাৎ বুদবুদ তৈরি হতে পারে। আর তখনই পানি প্রচণ্ড বেগে ছিটকে উঠতে পারে! এফডিএ এ ধরনের দুর্ঘটনার ব্যাপারেই সতর্ক করেছে। তাই মাইক্রোওয়েভে পানি গরম করার সময় সাবধান থাকা জরুরি। গরম করার আগে কফি বা চিনি মিশিয়ে নেওয়া এবং যন্ত্রটির নির্দেশিকায় দেওয়া সময় মেনে চলা নিরাপদ।
পৃথিবীর এত পানি এল কোথা থেকেডিমের সাদা অংশ প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে জমাট বাঁধে। আর কুসুম জমাট বাঁধতে সাধারণত ৬২ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো তাপমাত্রা দরকার হয়।
মাউন্ট এভারেস্টে ডিম সেদ্ধ করা যায় না কেন
মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় বায়ুচাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে পানির বাষ্পচাপ খুব কম চাপেই বাইরের চাপের সমান হয়ে যায়। তাই সেখানে পানি অনেক কম তাপমাত্রায় ফুটতে শুরু করে। এভারেস্টের চূড়ায় পানির স্ফুটনাঙ্ক প্রায় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, পানি টগবগ করে ফুটলেও তার তাপমাত্রা সমুদ্রপৃষ্ঠের ফুটন্ত পানির মতো ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নয়।
মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পানির স্ফুটনাঙ্ক প্রায় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসডিম সেদ্ধ করার জন্য অবশ্য পানি ফুটছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল বিষয় হলো পানির তাপমাত্রা। ডিমের সাদা অংশ প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে জমাট বাঁধে। আর কুসুম জমাট বাঁধতে সাধারণত ৬২ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো তাপমাত্রা দরকার হয়। তাই এভারেস্টে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পানিতে ডিম সেদ্ধ করা সম্ভব হলেও তা অনেক ধীরে হবে। একই কারণে পাহাড়ি এলাকায় পাস্তা বা বিনস রান্না করতেও বেশি সময় লাগে। পানি ফুটছে ঠিকই, কিন্তু তা সমুদ্রপৃষ্ঠের ফুটন্ত পানির চেয়ে ঠান্ডা।
ডিম তাপ দিলে বাষ্পীভূত হয় না কেনএভারেস্টের চূড়ায় পানির স্ফুটনাঙ্ক প্রায় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, পানি টগবগ করে ফুটলেও তার তাপমাত্রা সমুদ্রপৃষ্ঠের ফুটন্ত পানির মতো ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নয়।
পানির তাপমাত্রা কি ১,০০০ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে পারে
পানির বাষ্পকে ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি গরম করা সম্ভব। কিন্তু তরল অবস্থায় পানির তাপমাত্রা ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি গরম করা সম্ভব নয়। তাহলে তরল পানি আর বাষ্পের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? স্ফুটনাঙ্ক তরলের জন্য একটি সীমা, পানির অণুর জন্য নয়। পানি একবার বাষ্পে পরিণত হলে সেই বাষ্পকে আরও গরম করা যায়। তখন তাকে থামানোর মতো কোনো স্ফুটনাঙ্ক থাকে না।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইচ্ছা করেই এমন করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশকে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বাষ্পের তাপমাত্রা ৫৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেওয়া হতো। পরে সুপারক্রিটিক্যাল নকশায় তা ৬১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। উন্নত কিছু ব্যবস্থায় লক্ষ্য তাপমাত্রা ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্টিম টারবাইন জেনারেটর। এটি চালাতে ব্যবহৃত বাষ্পের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক বেশি হতে পারে। কারণ, গ্যাসের নির্দিষ্ট স্ফুটনাঙ্ক নেইএই অত্যন্ত গরম বাষ্প মূলত টারবাইন ঘোরাতে কাজে লাগে। তবে চাপ ও তাপমাত্রা একসঙ্গে বাড়াতে থাকলে একসময় আরও অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। প্রায় ৩৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ২১৮ অ্যাটমোসফিয়ারের বেশি চাপে তরল পানি ও বাষ্পের মধ্যে আর কোনো স্পষ্ট পার্থক্য থাকে না। পানি তখন ‘সুপারক্রিটিক্যাল ফ্লুইড’-এ পরিণত হয়।
তাপমাত্রা আরও বাড়ালে পানি আর আগের অর্থে পানি থাকে না। শুধু তাপ দিয়ে পানিকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে ভাঙার প্রক্রিয়াকে বলে ‘থার্মোলাইসিস’। পানির সামান্য অংশ ভাঙতেও ২,৫০০ কেলভিনের বেশি তাপমাত্রার দরকার হতে পারে। অর্থাৎ, ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাষ্প থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ‘তরল পানি’ বলে বাস্তবে কিছু নেই।
সাগরের পানি লবণাক্ত, কিন্তু নদীর পানি নয় কেনপ্রায় ৩৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ২১৮ অ্যাটমোসফিয়ারের বেশি চাপে তরল পানি ও বাষ্পের মধ্যে আর কোনো স্পষ্ট পার্থক্য থাকে না। পানি তখন সুপারক্রিটিক্যাল ফ্লুইড-এ পরিণত হয়।
মানুষ কি ১৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বাঁচতে পারে
এখানে জানতে হবে, ১৪০ ডিগ্রি বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে—ফারেনহাইট, নাকি সেলসিয়াস? আর তাপমাত্রাটি কি বাতাসের, নাকি পানির? যুক্তরাষ্ট্রের ডেথ ভ্যালিতে সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতি গ্রীষ্মেই সেখানে মানুষ বসবাস ও কাজ করে। তাই পানি ও ছায়ার সাহায্যে প্রায় ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বাতাসে কিছু সময় বেঁচে থাকা মানুষের পক্ষে সম্ভব।
চার্লস ব্লাগডেনফিনল্যান্ডের সনায় বাতাস আরও গরম হতে পারে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় সনার বাতাসকে সাধারণত ৭০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার অপেক্ষাকৃত শুষ্ক বাতাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষ স্বেচ্ছায় সেখানে কিছু সময় বসেও থাকে।
এমনকি ১৭৭৫ সালে চিকিৎসক চার্লস ব্লাগডেন এ নিয়ে একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেছিলেন। লোহার চুলায় গরম করা একটি ঘরে তিনি প্রবেশ করেন। তাঁর সঙ্গে রয়্যাল সোসাইটির জোসেফ ব্যাঙ্কসসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। ব্লাগডেনের থার্মোমিটারে তাপমাত্রা ছিল ১৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
তাপ দিলেও যেখানে তাপমাত্রা বাড়ে না২০২৫ সালের একটি গবেষণায় সনার বাতাসকে সাধারণত ৭০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার অপেক্ষাকৃত শুষ্ক বাতাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষ স্বেচ্ছায় সেখানে কিছু সময় বসেও থাকে।
পরে ড্যানিয়েল সোলান্ডার ২১০ ডিগ্রি এবং ব্যাঙ্কস ২১১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রার ঘরে প্রবেশ করেন। ব্যাঙ্কস সেখানে সাত মিনিট ছিলেন। ব্লাগডেন লিখেছিলেন, বাতাস ছিল অস্বস্তিকরভাবে গরম, কিন্তু সহনীয়। তাঁদের থার্মোমিটার অবশ্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তবে মানুষগুলোর কিছু হয়নি!
এরপর আরও একটি পরীক্ষা করা হয়। থার্মোমিটারের তাপমাত্রা প্রায় ২৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তোলা হয়। সেখানে কিছু ডিম ও একটি গরুর মাংসের স্টেক রাখা হয়। প্রায় ২০ মিনিট পর ডিমগুলো ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে যায়। একটি স্টেকও প্রায় ১৩ মিনিটে রান্না হয়ে যায়। অথচ ঘরে থাকা মানুষগুলো পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন!
ব্লাগডেনের দেওয়া ব্যাখ্যাটি আজও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীর ভেতরের তাপ কিছুটা বাইরে বের করে দিতে পারে। বিশেষ করে ত্বকের ঘাম যখন বাষ্প হয়ে যায়, তখন তা শরীর থেকে অতিরিক্ত তাপ শুষে নিয়ে যায়।
তাপমাত্রা বাড়লেই কি সব বস্তুর আয়তন বাড়ে১ গ্রাম ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাষ্প প্রথমে পানিতে পরিণত হওয়ার সময়ই প্রায় ২ হাজার ২৫৬ জুল শক্তি ছাড়ে! এরপর সেই পানি ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠান্ডা হতে আরও প্রায় ২৬৪ জুল শক্তি ছাড়ে।
১০০ ডিগ্রির বাতাস সহনীয় হলেও ফুটন্ত পানি পুড়িয়ে দেয় কেন
বাতাসের তাপ পরিবাহিতা পানির তুলনায় অনেক কম। ওপেনস্ট্যাক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাতাসের তাপ পরিবাহিতা প্রায় ০.০২৩ ওয়াট/মিটার/ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর পানির প্রায় ০.৬ ওয়াট/মিটার/ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, স্থির পানি স্থির বাতাসের তুলনায় প্রায় ২৬ গুণ দ্রুত তাপ আপনার ত্বকে পৌঁছে দিতে পারে! তাই ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পানি ত্বকে পড়লে খুব দ্রুত তাপ পৌঁছে যায় এবং ত্বক মারাত্মকভাবে পুড়ে যেতে পারে। কিন্তু একই তাপমাত্রার শুষ্ক বাতাসে ঘাম বাষ্প হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে শরীর কিছুটা তাপ বাইরে সরিয়ে নিতে পারে।
বাষ্প অবশ্য একেবারেই আলাদা। ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাষ্পে পানি ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করার সময় শোষিত অতিরিক্ত শক্তি জমা থাকে। একে বলে ‘সুপ্ত তাপ’। বাষ্প যখন ত্বকের ওপর ঠান্ডা হয়ে আবার পানিতে পরিণত হয়, তখন সেই জমানো শক্তি ত্বকে ছেড়ে দেয়।
১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাষ্পে পানি ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করার সময় শোষিত অতিরিক্ত শক্তি জমা থাকেতাই একই পরিমাণ ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পানির তুলনায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাষ্প ত্বকে অনেক বেশি তাপ দিতে পারে।
হিসাবটা দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ১ গ্রাম ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পানিকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামাতে প্রায় ২৬৪ জুল শক্তি বের হয়। কিন্তু ১ গ্রাম ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাষ্প প্রথমে পানিতে পরিণত হওয়ার সময়ই প্রায় ২ হাজার ২৫৬ জুল শক্তি ছাড়ে! এরপর সেই পানি ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠান্ডা হতে আরও প্রায় ২৬৪ জুল শক্তি ছাড়ে। অর্থাৎ, এক গ্রাম বাষ্প থেকে মোট প্রায় ২ হাজার ৫২০ জুল শক্তি বের হতে পারে। এটি একই তাপমাত্রার এক গ্রাম পানির তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি! এই কারণেই কেটলির মুখ দিয়ে বের হওয়া বাষ্পকে অবহেলা করা উচিত নয়। ফুটন্ত পানির চেয়েও বাষ্প অনেক বেশি মারাত্মকভাবে ত্বক পুড়িয়ে দিতে পারে।
দৈনিক কতটুকু পানি পান করতে হবে১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পানির কোনো চিরস্থায়ী সীমা নয়। এটি হলো স্বাভাবিক বায়ুচাপে পানির স্ফুটনাঙ্ক। চাপ বাড়ালে পানি ১২১ বা ১৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও তরল অবস্থায় থাকতে পারে।
চারপাশের জলীয় বাষ্প কি ১০০ ডিগ্রির চেয়েও বেশি গরম
পানির কোনো অণু যখন পুকুর বা ডোবার পৃষ্ঠ ছেড়ে বাষ্প হয়ে বেরিয়ে আসে, তখন তার যথেষ্ট শক্তি থাকে। ফলে সেই মুহূর্তে অণুটি আশপাশের অনেক অণুর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে। কিন্তু বাতাসে বেরিয়ে আসার পর সে আর একা থাকে না। চারপাশের বাতাসের অসংখ্য অণুর সঙ্গে বারবার ধাক্কা খেতে থাকে। ফলে তার বাড়তি শক্তি খুব দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যেই সেই অণুর শক্তি আশপাশের অণুগুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ফলে আপনার ঘরের জলীয় বাষ্পের তাপমাত্রা শেষ পর্যন্ত ঘরের তাপমাত্রার কাছাকাছিই হয়ে যায়। তাই আপনার চারপাশের জলীয় বাষ্প কোনো গোপন অতিগরম বাষ্প নয়। থার্মোমিটার দিয়ে মাপলেই তার তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পানির কোনো চিরস্থায়ী সীমা নয়। এটি হলো স্বাভাবিক বায়ুচাপে পানির স্ফুটনাঙ্ক। চাপ বাড়ালে পানি ১২১ বা ১৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও তরল অবস্থায় থাকতে পারে। আবার চাপ কমালে পানি ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রাতেও ফুটে যেতে পারে। আবার বুদবুদ তৈরির সুযোগ না থাকলে রান্নাঘরের একটি মগের পানিও অল্প সময়ের জন্য ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম হতে পারে!
বৃষ্টি পড়লে গাড়ির জানালায় বাষ্প জমে কেন?১৭৭৫ সালে চার্লস ব্লাগডেন ফুটন্ত পানির চেয়েও গরম একটি ঘরে বসে তাঁর পাশে স্টেক রান্না হতে দেখেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল থার্মোমিটার, পাশে ছিল একটি স্টেক, আর মাথায় ছিল একরাশ প্রশ্ন।
পানি বাষ্পে পরিণত করার পর সেটিকে আরও গরম করলে তাপমাত্রা ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব। তবে প্রায় ৩৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে নির্দিষ্ট চাপে তরল পানি ও বাষ্পের আলাদা কোনো পরিচয়ই থাকে না।
১৭৭৫ সালে চার্লস ব্লাগডেন ফুটন্ত পানির চেয়েও গরম একটি ঘরে বসে তাঁর পাশে স্টেক রান্না হতে দেখেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল থার্মোমিটার, পাশে ছিল একটি স্টেক, আর মাথায় ছিল একরাশ প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি তাপমাত্রা সম্পর্কে আমাদের পরিচিত ধারণাকে আরও একটু পরিষ্কার করে দিয়ে গেছেন।
লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তাসূত্র: সায়েন্স এবিসিবাষ্পায়ন কী, এটা কীসের ওপর নির্ভরশীল