মক্কা চুক্তি সৌদিতে বাংলাদেশিদের কোনো উপকারে আসবে?

· Prothom Alo

সম্প্রতি মক্কায় যে চুক্তি হয়েছে, তার নামের মধ্যেই আবেগ আছে, রাজনীতিও আছে। মুসলিম বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি সামরিক সমঝোতা নয়; মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বদলে যাওয়া ভূরাজনীতিরও একটি বার্তা।

বাংলাদেশ এই নতুন সমীকরণের কোথায় দাঁড়াবে, সেটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মক্কায় স্বাক্ষরিত নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে নিরাপত্তা, মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্কের কৌশলগত সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে।

Visit h-doctor.club for more information.

কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনার আরেকটি অত্যন্ত বাস্তব কিন্তু প্রায় অনিবার্য প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে: সৌদি আরবে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের এতে কী লাভ?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরব বাংলাদেশের কাছে শুধু একটি কূটনৈতিক অংশীদার, বন্ধুপ্রতিম মুসলিম দেশ বা মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র নয়।

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের কী করা উচিতমক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, না ঝুঁকি

এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলোর একটি।

বছরের পর বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান বিপুল।

ফলে কোনো নতুন কৌশলগত সম্পর্কের মূল্যায়নে সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকের নিরাপত্তা, মজুরি, চাকরির নিশ্চয়তা, নিয়োগব্যয় এবং আইনি সুরক্ষা—এসবকে প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

অথচ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বড় বড় আলোচনায় সেই শ্রমিকের নিরাপত্তা, মজুরি, অধিকার ও মর্যাদা প্রায়ই ফুটনোট হয়ে থাকে।

মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত আবেগ সরিয়ে বাস্তবসম্মত হিসাব করা।

একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। মক্কা চুক্তি কোনো শ্রমিক অধিকার সনদ নয়। এর মূল বিষয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা।

অর্থাৎ কোনো পক্ষ সশস্ত্র হামলার শিকার হলে অন্য পক্ষ তার পাশে দাঁড়াবে—এমন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতিই এর কেন্দ্রবিন্দু। এর উদ্দেশ্য শ্রম অধিকার, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা বা বিদেশি কর্মীদের সুরক্ষা নয়।

মক্কা চুক্তি সাক্ষরের পর সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মাদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

এটি শ্রমিক সুরক্ষার চুক্তি নয়

বাংলাদেশ এতে যোগ দিলেও চুক্তির বর্তমান কাঠামো থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকের বেতন, নিয়োগপ্রক্রিয়া বা কর্মপরিবেশ উন্নত হবে—এমন কোনো কারণ নেই।

সুতরাং এই চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকের বেতন বাড়বে, নিয়োগদাতা পাসপোর্ট ফেরত দেবে, বকেয়া মজুরি দ্রুত পরিশোধ হবে কিংবা নির্যাতিত কোনো নারী গৃহকর্মী রাতারাতি আইনি সুরক্ষা পাবেন, এমন আশা করার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের জন্য এর কোনো শ্রম সুরক্ষা মূল্যই নেই? আছে, তবে সেটি চুক্তির সরাসরি ফল হিসেবে নয়, বরং কূটনৈতিক দর-কষাকষির সুযোগ হিসেবে। এখানেই কূটনীতির আসল জায়গা।

মক্কা চুক্তি শ্রমিকদের সরাসরি সুরক্ষা দেবে না, কিন্তু চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ কী আদায় করতে পারে, সেটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রগুলো বন্ধুত্বের কথা বলে; পরিণত রাষ্ট্রগুলো সেই বন্ধুত্বের মূল্যও নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ এই দর-কষাকষিতে কতটা সক্ষম বা প্রস্তুত, সেটিই এখন দেখার পালা।

হুতির হামলায় মক্কা চুক্তি কি কার্যকর হবেমক্কা চুক্তি আসলে কাদের স্বার্থের পক্ষে যাবে

বন্ধুত্বের মূল্য কোথায়?

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ধর্মীয় যোগাযোগ, শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সহযোগিতা—সব মিলিয়ে সম্পর্কটির ভিত্তি বিস্তৃত। কিন্তু এই সম্পর্কের একটি মৌলিক বৈপরীত্য আছে।

বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলে, সৌদি আরবকে বাংলাদেশি শ্রমিকের অধিকার নিয়ে ততটা শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায় না। এটি শুধু কূটনৈতিক দুর্বলতা নয়; এটি নীতিগত দুর্বলতাও।

একজন বাংলাদেশি শ্রমিক যখন সৌদি আরবে যান, তিনি শুধু নিজের জন্য যান না। তাঁর পাঠানো অর্থে একটি পরিবার চলে, সন্তান পড়াশোনা করে, বাড়ি তৈরি হয়, গ্রাম-শহরের অর্থনীতি সচল থাকে।

রাষ্ট্রও তাঁর রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পায়। অর্থাৎ শ্রমিকের শরীর বিদেশে থাকলেও তাঁর অর্থনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের ভেতরেই। তাহলে তাঁর অধিকার রক্ষাকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় করা হবে না কেন!

বাংলাদেশের উচিত এখন এই প্রশ্নটিই সামনে আনা: সৌদি আরবের নিরাপত্তা যদি বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে সৌদি অর্থনীতিতে অবদান রাখা বাংলাদেশি মানুষের নিরাপত্তা কি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল হবে মক্কা চুক্তিকে শুধু প্রতীকী ‘মুসলিম ঐক্যের’ একটি প্রকল্প হিসেবে দেখা এবং শ্রমিক সুরক্ষার প্রশ্নটি তার ভেতরে স্বতঃসিদ্ধভাবে সমাধান হয়ে যাবে বলে ধরে নেওয়া।

বাস্তবে ঠিক উল্টোটা দরকার। বাংলাদেশ যদি সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়, তাহলে সেই সম্পর্কের বিনিময়ে রিয়াদের কাছ থেকে শ্রমিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সমস্যার শুরু অনেক সময় সৌদি আরবে নয়, বাংলাদেশেই।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুরু হয় বাংলাদেশেই

সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি শ্রমিকদের শ্রমবাজারে কিছু সংস্কার এনেছে।

চাকরি পরিবর্তন ও দেশত্যাগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মীদের স্বাধীনতা বেড়েছে। তবে গৃহকর্মীরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ শ্রম আইনি সুরক্ষার বাইরে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ তাই শুধু আইন পরিবর্তন নয়; কার্যকর প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিয়েও।

শ্রমিক সুরক্ষার আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই সৌদি নিয়োগদাতার দিকে আঙুল তুলি। সেটি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের নিজের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সমস্যার শুরু অনেক সময় সৌদি আরবে নয়, বাংলাদেশেই।

অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, দালালনির্ভরতা, চুক্তির সঙ্গে বাস্তব চাকরির অমিল, বেতন আটকে যাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট জব্দ, নির্যাতন এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার জটিলতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

নারী গৃহকর্মীরা বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছেন; অতীতে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে। শ্রমিক সুরক্ষার দায় শুধু সৌদি নিয়োগকর্তার নয়, বাংলাদেশেরও।

বিদেশ যাওয়ার জন্য ঋণ, জমি বন্ধক বা সম্পদ বিক্রির পর একজন শ্রমিক প্রতিশ্রুত চাকরি ও বেতন না পেলে তাঁর বিকল্প সীমিত হয়ে যায়। মক্কা চুক্তির বাস্তবায়নে তাই দুই দেশেরই দায়িত্বশীলতা জরুরি।

বাংলাদেশকে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি ও ভুয়া প্রতিশ্রুতি বন্ধ, রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহি নিশ্চিত এবং বিদেশযাত্রার আগে চুক্তি, বেতন, কর্মঘণ্টা, নিয়োগকর্তা ও আবাসনের তথ্য ডিজিটালভাবে যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিদেশে পৌঁছানোর পর নয়—শ্রমিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে দেশ ছাড়ার আগেই।

এই চুক্তি নিজে শ্রমিকের মজুরি বাড়াবে না বা দুর্নীতি দূর করবে না, তবে কার্যকর কূটনৈতিক দর-কষাকষির মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য বাস্তব সুবিধা আদায়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেই সুযোগ যদি শুধু রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এর প্রভাব শ্রমিকের জীবনে পৌঁছাবে না।

ভূরাজনীতি যেন শ্রমিককে ভুলিয়ে না দেয়

মক্কা চুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশকে আবেগের বশে কোনো একক ভূরাজনৈতিক শিবিরে ঝুঁকে না পড়ে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

সামরিক বা কৌশলগত সহযোগিতা শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও প্রবাসীদের স্বার্থও জড়িত।

এই চুক্তি নিজে শ্রমিকের মজুরি বাড়াবে না বা দুর্নীতি দূর করবে না, তবে কার্যকর কূটনৈতিক দর-কষাকষির মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য বাস্তব সুবিধা আদায়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সেই সুযোগ যদি শুধু রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এর প্রভাব শ্রমিকের জীবনে পৌঁছাবে না।

সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার ও নিরাপত্তাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

তাই সৌদি নিরাপত্তা যদি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় হয়, বাংলাদেশি শ্রমিকের নিরাপত্তাকেও একই গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার চুক্তিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে মূল বার্তাটি এখনই স্পষ্ট হওয়া উচিত: আমরা নিরাপত্তা সহযোগিতা চাই, পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা, সুরক্ষা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও চাই।

মক্কা চুক্তি কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য আনবেমক্কা চুক্তি যেভাবে মধ্যপ্রাচ্য নতুন বাস্তবতা হাজির করলমক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে যে কারণে দুশ্চিন্তায় ভারত

বাংলাদেশ কী চাইতে পারে

বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করে, রাষ্ট্রীয় দর-কষাকষির বিষয় হিসেবে কয়েকটি জিনিস চাইতে পারে:

প্রথমত, বাংলাদেশের উচিত সৌদি আরবের সঙ্গে একটি স্বতন্ত্র শ্রমিক সুরক্ষা প্রটোকল চাওয়া। সেটি মক্কা চুক্তির অংশ হোক কিংবা আলাদা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি—কিন্তু তার মধ্যে বাস্তব দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। যেমন বেতন আটকে গেলে কত দিনের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি হবে।

নিয়োগকর্তা চুক্তি ভঙ্গ করলে শ্রমিক কীভাবে চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন। পাসপোর্ট আটকে রাখলে কী ব্যবস্থা হবে।

নির্যাতনের অভিযোগ করলে শ্রমিক কোথায় আশ্রয় পাবেন। আইনি সহায়তা কে দেবেন। মৃত বা গুরুতর আহত শ্রমিকের পরিবার কীভাবে দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাবে।

এসব বিষয়ে অস্পষ্ট কূটনৈতিক ভাষা নয়, প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি।

দ্বিতীয়ত, নিয়োগ ব্যয় কমানোর বিষয়টি হতে হবে বাংলাদেশের প্রধান কূটনৈতিক দাবি। একজন শ্রমিক বিদেশে গিয়ে প্রথম কয়েক মাস শুধু ঋণ শোধ করতেই ব্যস্ত থাকলে সে স্বাভাবিকভাবেই শোষণের বিরুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।

তাই বাংলাদেশকে সৌদি নিয়োগকর্তা, বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও যাচাইযোগ্য নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার আগেই তার চাকরি, বেতন, কর্মঘণ্টা, আবাসন এবং নিয়োগকর্তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, চুক্তির ভাষা ও বাস্তব চাকরির মধ্যে ফাঁক বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিক যে বেতন ও কাজের বিবরণে ভিসা পান, সৌদি আরবে গিয়ে সেটিই পাচ্ছেন কি না, এটি যাচাই করার যৌথ ব্যবস্থা থাকা দরকার।

একটি জাতীয় ডিজিটাল কন্ট্রাক্ট রেজিস্ট্রি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার আন্তসংযোগ এই সমস্যার বড় অংশ সমাধান করতে পারে।

চতুর্থত, বাংলাদেশকে সৌদি আরবে নিজের কনস্যুলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দূতাবাস ও কনস্যুলেটের শ্রম উইংকে সেবার পরিধি ও মান দুটোই বাড়াতে হবে।

একজন শ্রমিকের কাছে দূতাবাস যেন কেবল পাসপোর্ট নবায়ন বা কাগজপত্রের জায়গা, বা মৃতদেহ দেশে ফেরানোর দপ্তর না হয়। সেটি হতে হবে তাঁর শেষ আশ্রয়।

অভিযোগ গ্রহণ, আইনি সহায়তা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে মধ্যস্থতা, শ্রম আদালতে সহায়তা, জরুরি আশ্রয় এবং দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব ক্ষেত্রে দূতাবাসের সক্ষমতা বাড়াতেই হবে।

বাংলাদেশ সৌদি আরবকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে; সৌদি আরবও বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ থেকে উপকৃত হয়।

এখানে একটি ডিজিটাল ব্যবস্থাও করা যায়। সৌদি আরবে থাকা প্রত্যেক বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল প্রোফাইল থাকতে পারে, যেখানে তাঁর চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তার তথ্য, বেতন এবং জরুরি যোগাযোগ থাকবে।

কোনো অভিযোগ করলে সেটির অগ্রগতি শ্রমিক নিজেই দেখতে পারবেন। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক তখন আর কেবল কাগজের থাকবে না।

পঞ্চমত, শ্রমিক সুরক্ষাকে পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর বানাতে হবে। বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক কতটা ভালো, তা শুধু কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলো বা কত বিনিয়োগ এল এসব দিয়ে মাপা উচিত নয়।

বরং প্রতিবছর কত শ্রমিকের বেতন আটকে ছিল, কত অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, কতজন প্রতারণার শিকার হয়েছেন, গড় নিয়োগ ব্যয় কত কমেছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত।

এগুলো কোনো ‘উপকার’ চাওয়া নয়, বরং অংশীদারত্বের স্বাভাবিক দাবি। সবশেষে, মক্কা চুক্তিতে যোগদান যেন সৌদি আরবের প্রতি একমুখী আনুগত্য না হয়।

বাংলাদেশ সৌদি আরবকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে; সৌদি আরবও বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ থেকে উপকৃত হয়।

কিন্তু এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় মানবিক ভিত্তি: বাংলাদেশি শ্রমিক। তাই সৌদি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও নীতির আলোচনায় অগোচরে থেকে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষাকে নিরাপত্তা অংশীদারত্বের কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করাই এই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সুযোগ।

  • ড. সেলিম রেজা, সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

    * মতামত লেখকের নিজস্ব।

Read full story at source