ফুলেল শ্রদ্ধায় আখতার হুসেনকে শেষবিদায়
· Prothom Alo
ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ১০টা ছুঁই ছুঁই। ছুটির দিনের সকালের রাজধানী তখনো ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এর কিছুক্ষণ পরেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে পৌঁছায় শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার আখতার হুসেনের মরদেহ। শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে তখন শহীদ মিনারে অপেক্ষায় ছিলেন সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন সংগঠনের মানুষ। হাতে ফুল নিয়ে একে একে এগিয়ে আসেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতা–কর্মী ও তাঁর শুভানুধ্যায়ীরা। ফুলেল শ্রদ্ধায় তাঁরা স্মরণ করেন প্রিয় এই সাহিত্যিককে।
Visit rouesnews.click for more information.
সেখানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, শিক্ষা সংস্কৃতি আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেকে আখতার হুসেনকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।
এরপর স্মৃতিচারণা করে আখতার হুসেনের ছোট ছেলে প্রমিত হুসেন বলেন, ‘আমার বাবা একজন মানবিক মানুষ ছিলেন। আমার বাবা একদিন রাতে খালি গায়ে বাসায় ফিরেছেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, বাবা খালি গায়ে কেন? তিনি বললেন, পথে এক ছেলেকে দেখেছি তাকে কয়েকজন মেরে তার শার্ট ছিঁড়ে দিয়েছে। তাই আমি তাকে শার্টটা দিয়ে এসেছি। তিনি সব সময় মানুষকে ভালোবাসতেন, সবার ভালো চাইতেন।’
প্রমিত আরও বলেন, ‘আমার বাবা যখন অসুস্থ, এবার তিনি আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সহকর্মী শিল্পীদের দৈন্যদশা দেখে খুব বেদনাতুর হয়েছিলেন। আমরা দেখেছি বাংলাদেশে অনেক শিল্পী একটু যে চিকিৎসা করার সেই সামর্থ্যও নেই। তাই আমার বাবা শেষবারের মতো বলে গিয়েছিলেন আর কোনো শিল্পী যেন এ কষ্টে না থাকে। আপনারা শিল্পীদের পাশে দাঁড়াবেন, আমাদের এই কামনা।’
সবশেষ জাতীয় সংগীত ও ছাত্র ইউনিয়নের সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় আখতার হুসেনকে। পরে গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।
মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় আখতার হুসেন কলম ধরেছিলেন দেশের সবচেয়ে গৌরবের অর্জন স্বাধীনতাসংগ্রামে আত্মনিবেদিত জাতির বীর সন্তানদের জন্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা এবং সুরকার অজিত রায়ের সুরে শিল্পী তিমির নন্দীর গাওয়া সেই কালজয়ী গান ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ আজ রুখবে তাদের কারা’ চিরকাল জাতির গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে অচ্ছেদ্য হয়ে থাকবে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনের প্রতি গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ পুলিশআজ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনকে সিরাজগঞ্জে সমাহিত করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আখতার হুসেন। গতকাল বাদ মাগরিব তেজগাঁওয়ের রেলওয়ে জামে মসজিদে আখতার হুসেনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
আখতার হুসেন ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। বাবা টি আই এম সিকান্দার রেলে চাকরি করার সুবাদে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন আখতার হুসেন। তাঁর ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদিত গ্রন্থসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিক সংখ্যক লেখার (ভুক্তি) কৃতিত্বও তাঁর।
আখতার হুসেনের বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ছোটদের ‘চারণকবি মুকুন্দদাস’।
ফুলেল শ্রদ্ধায় আখতার হুসেনকে শেষবিদায় জানাতে আসেন অনেকেসাহিত্যে অবদানের জন্য আখতার হুসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।
বাংলা একাডেমির ফেলো আখতার হুসেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। সংগঠনটির প্রথম দিকের বহু নাটক রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন তিনি। শিশুসংগঠন ‘খেলাঘর’-এর সংগঠক হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আখতার হুসেন। ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের জনপ্রিয় সংগঠন সংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ তাঁরই লেখা।