মেন্ডেলীয় সূত্র থেকে মানব ক্লোনিং—বিজ্ঞান কত দূর এগোল
· Prothom Alo

জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর একটি বংশগতি বা জেনেটিকসের উন্মোচন। কীভাবে একটি আণুবীক্ষণিক কোষের ভেতর লুকিয়ে থাকা রাসায়নিক সংকেত পিতামাতার বৈশিষ্ট্যকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেয়, সেই কৌতূহল থেকেই আধুনিক জেনেটিকসের যাত্রা শুরু।
আধুনিক বংশগতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপিত হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। অস্ট্রিয়ান গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মঠের বাগানে প্রায় ২৯ হাজার মটরশুঁটি উদ্ভিদের ওপর দীর্ঘ সংকরায়ণ পরীক্ষা চালান। উদ্ভিদের কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, ফুলের রং ও বীজের আকৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি বংশগতির মৌলিক সূত্রগুলো আবিষ্কার করেন। কিন্তু জীবদ্দশায় তাঁর এই অসাধারণ আবিষ্কার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। জীবদ্দশায় স্বীকৃতি না পেলেও তাঁর প্রস্তাবিত ‘ফ্যাক্টর’ ধারণাই পরবর্তী সময়ে ‘জিন’ নামে স্বীকৃতি পায়।
Visit esporist.org for more information.
বিংশ শতকের মাঝামাঝি জেনেটিকস পায় এক বৈপ্লবিক রূপ। ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক ও আমেরিকান বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ডিএনএর দ্বি-সূত্রক বা ‘ডাবল হেলিক্স’ মডেল উন্মোচন করেন। এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিল রসায়নবিদ রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের ধারণকৃত বিখ্যাত এক্স-রে ছবি ‘ফটোগ্রাফ ৫১’। এই কাঠামোর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় কীভাবে চারটি ক্ষারক—অ্যাডেনিন (A), থাইমিন (T), গুয়ানিন (G) ও সাইটোসিন (C) জীবনের সব জৈবিক নির্দেশিকা বহন করে।
বর্তমান সময়ে জেনেটিকস কেবল পর্যবেক্ষণের বিষয় নয়, এটি সরাসরি জীবদেহের নকশা পুনর্লিখনের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০০৩ সালে সমাপ্ত ‘হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট’ মানুষের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার জিনের সম্পূর্ণ সিকোয়েন্স উন্মোচন করে চিকিৎসার দিগন্ত বদলে দিয়েছে।
এরপর ২০২০ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী গবেষক ইমানুয়েল শার্পেনশিয়ে ও জেনিফার ডৌডনার হাত ধরে আসে ‘ক্রিসপার-ক্যাস৯’ (CRISPR-Cas9) জিন এডিটিং প্রযুক্তি। এটি আণবিক কাঁচির মতো নিখুঁতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ডিএনএ কেটে সেখানে নতুন ডিএনএ যুক্ত করতে পারে। বর্তমানে থ্যালাসেমিয়া ও সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার মতো রক্তজনিত জটিল রোগের পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট ক্যানসারের চিকিৎসায় জিন থেরাপি সফলভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। তবে এর সমান্তরালে ভ্রূণের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে কৃত্রিমভাবে পছন্দসই সন্তান বা ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরির যে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে, তা বিজ্ঞানীদের মধ্যেই আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে জেনেটিকস ব্যাপক অগ্রসর হয়েছে। রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া থেকে মানব ইনসুলিন তৈরি করে ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগের চিকিৎসাকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করেছে। তা ছাড়া রোগীর ব্যক্তিগত জেনেটিক গঠন বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট টার্গেটেড থেরাপির প্রয়োগের মাধ্যমে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যা ক্যানসারের মতো রোগকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। জন্মপূর্ব জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর ক্রোমোজোমীয় অস্বাভাবিকতা ও জন্মগত ত্রুটি প্রাথমিক অবস্থাতেই নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা যায়। যার ফলে সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান নয়, জেনেটিকসের কল্যাণে কৃষিক্ষেত্রের ব্যাপক অগ্রসর হয়েছে। বর্তমানে অল্প জায়গায় বেশি ফসল উৎপাদন ও রোগবালাইমুক্ত ফসল চাষ করা হচ্ছে। ভিটামিন এ–সমৃদ্ধ ‘গোল্ডেন রাইস’-এর মতো অতিরিক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ শস্য উৎপাদনের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মারাত্মক পুষ্টিহীনতা দূর করা সম্ভব হচ্ছে। উন্নত কৃত্রিম প্রজনন ও জিনগত নির্বাচনের মাধ্যমে গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাংস, দুধ ও ডিমের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।
জেনেটিকসের সবচেয়ে আলোচিত পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয় ১৯৯৬ সালে স্কটল্যান্ডের রোজলিন ইনস্টিটিউটে। ভ্রূণতত্ত্ববিদ ইয়ান উইলমুট সোম্যাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার (এসসিএনটি) পদ্ধতির মাধ্যমে সৃষ্টি করেন প্রথম স্তন্যপায়ী ক্লোন—ভেড়া ‘ডলি’। প্রাপ্তবয়স্ক একটি ভেড়ার স্তনকোষের নিউক্লিয়াসকে অপর একটি ভেড়ার নিউক্লিয়াসবিহীন ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করে কৃত্রিম বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে ভ্রূণ গঠন করা হয়েছিল। ডলির জন্ম প্রমাণ করে যে পরিণত দৈহিক কোষ থেকেও একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাণী সৃষ্টি করা সম্ভব।
ডলির সফলতার পর থেকে মানব ক্লোনিং নিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল বিতর্ক চলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্লোনিংকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।
প্রথমত, এর সুবিধা। রোগীর নিজস্ব ডিএনএ ব্যবহার করে গবেষণাগারে সম্পূর্ণ ম্যাচিং টিস্যু বা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (যেমন হার্ট, কিডনি) তৈরি করা সম্ভব। এতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের তীব্র সংকট মিটবে এবং শরীর অঙ্গ প্রত্যাখ্যান করবে না। চরম বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে জেনেটিক সম্পর্কযুক্ত সন্তান জন্মদানেও এটি তাত্ত্বিকভাবে সহায়ক।
দ্বিতীয়ত, এর অসুবিধা। প্রাণী পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী ক্লোনিং অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। শত শত ভ্রূণ নষ্ট হওয়া, মারাত্মক জন্মগত বিকলাঙ্গতা, অকাল বার্ধক্য এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতার চরম ঘাটতি দেখা যায়। ডলি নিজেও অকালে বাত ও ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এ ছাড়া একজন ক্লোন ব্যক্তির স্বকীয় পরিচয়–সংকট এবং সমাজকাঠামোর বিশৃঙ্খলা এর বড় ঝুঁকি।
মানব ক্লোনিংয়ের প্রশ্নে বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো সাধারণত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি এবং অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ পূর্ণাঙ্গ মানব ক্লোনিংকে নিষিদ্ধ (হারাম) ঘোষণা করেছেন। তাদের মতে, এটি প্রাকৃতিক বংশগতি ধারা, দাম্পত্যকাঠামো এবং মাতৃত্ব-পিতৃত্বের মর্যাদাকে লঙ্ঘন করে। তবে ভ্রূণ নষ্ট না করে কোনো মারাত্মক ব্যাধি নিরাময়ের লক্ষ্যে চিকিৎসাজনিত কোষীয় গবেষণাকে (থেরাপিউটিক) শর্তসাপেক্ষে ইতিবাচক চোখে দেখা হয়। ভ্যাটিকান ও মূলধারার প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায় মানব ক্লোনিংকে ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব ও সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে মনে করে। চার্চের বিশ্বাস অনুযায়ী, মানবজীবনের সূচনা হতে হবে দাম্পত্য প্রেমের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে; গবেষণাগারের যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়। ইহুদি ধর্মে জীবন বাঁচানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় থেরাপিউটিক ক্লোনিংয়ে কিছুটা নমনীয়তা রয়েছে। তবে রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং নিরুৎসাহিত। হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনে প্রতিটি জীবনের নিজস্ব কর্ম ও প্রাকৃতিক পুনর্জন্মচক্র রয়েছে। কৃত্রিম উপায়ে একই জেনেটিক সত্তার পুনরাবৃত্তি প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করে বলে বিবেচনা করা হয়।
ডিএনএ সংশোধনের মাধ্যমে দুরারোগ্য ব্যাধি নির্মূল করার বাস্তব সম্ভাবনা মানবজাতির জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ। তবে মানব ক্লোনিংয়ের মতো সীমালঙ্ঘনকারী উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে অবশ্যই মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক স্থায়িত্ব ও নৈতিকতার পরিমণ্ডলে আবদ্ধ রাখতে হবে। বিজ্ঞান যখন জীবনের মৌলিক মর্যাদা ও প্রাকৃতিক শৃঙ্খলাকে সম্মান জানিয়ে অগ্রসর হয়, তখনই তা মানবতার জন্য স্থায়ী কল্যাণের রূপ ধারণ করে।
সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান), বাবুডাইং আলোর পাঠশালা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ