ডাকাতিয়া নদীতে ৭৩৬ দখলদার, আছে বরফকল, চালকল ও গুদাম
· Prothom Alo

চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে কত দখলদার রয়েছে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা এত দিন সরকারি কোনো সংস্থার কাছে ছিল না। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের যৌথ জরিপে উঠে এসেছে, দখলদারের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৩৬। জরিপটি গত বছর হয়েছে। নদীর সীমানার ভেতরে থাকা দখলদারদের উচ্ছেদ করতে শিগগিরই অভিযান শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
দখলদারদের পাশাপাশি কারা নদী দূষণ করছে, সেই তালিকাও করেছে বিআইডব্লিউটিএ ও চাঁদপুর জেলা প্রশাসন। দূষণকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারাই ডাকাতিয়া নদী ও তীর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে, আমরা প্রশাসনকে বলেছি সবাইকে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে উচ্ছেদ করা হয়। কাউকেই যেন ছাড় দেওয়া না হয়।’
দখলদারদের তালিকায় চাঁদপুর নতুন বাজার এলাকার ইলামা শাহরিন বরফকল, নিউ পূবালী অটো রাইস মিল ও বিসমিল্লাহ অটো রাইস মিলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শহরের মুখার্জিঘাট থেকে স্ট্যান্ড পর্যন্ত এলাকায় রয়েছে শতাধিক বহুতল ভবন ও প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে দুটি বিদ্যালয়, পুস্তক গুদামসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামও আছে। শহরের পুরানবাজার অংশেও ডাকাতিয়া নদীর দক্ষিণ পাশে অবৈধভাবে অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।
শেখ ফরিদ আহমেদ, সংসদ সদস্য, চাঁদপুর-৩ আসনযারাই ডাকাতিয়া নদীতীর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে, আমরা প্রশাসনকে বলেছি তাদের সবাইকে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে উচ্ছেদ করা হয়। কাউকেই যেন ছাড় না দেওয়া হয়।ডাকাতিয়া নদীকে দখলমুক্ত রাখতে ইতিমধ্যে শহরের বড় স্টেশন মোলহেড থেকে গাছতলা ব্রিজ পর্যন্ত ৬২টি সীমানাখুঁটি স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, আরও ২৮টি সীমানাখুঁটি স্থাপনের কাজ চলমান আছে।
তালিকায় থাকা তিনটি ভবন ও দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের দাবি, জেলা প্রশাসন থেকে লিজ (ইজারা) নিয়েই বেশ কয়েক বছর আগে বাড়ি ও ভবন তৈরি করেছেন। তাহলে তাঁদের নাম দখলদারের তালিকায় কীভাবে ওঠে?
তালিকা ধরে হবে উচ্ছেদ অভিযান
কয়েক বছর ধরেই দখল ও দূষণে ডাকাতিয়া ক্রমেই সংকুচিত ও নাব্যতা হারাচ্ছে। সরকারি রেকর্ড ও নকশা অনুযায়ী, নদীটির গড় প্রস্থ প্রায় ২২০ ফুট। তবে চাঁদপুরের বিভিন্ন অংশে অবৈধ দখলের কারণে কোথাও কোথাও তা ৩০ থেকে ৪০ ফুটে নেমে এসেছে। এসব স্থাপনার মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অবৈধ দখলদারদের তালিকা ধরে খুব শিগগিরই চাঁদপুর শহরের ডাকাতিয়া নদীর দুই পাশে থাকা অবৈধ স্থাপনায় উচ্ছেদ অভিযান চালাব।’
জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর জরিপে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান দেশ এনার্জি লিমিটেডকে ডাকাতিয়া নদীর অন্যতম বড় দখলদার ও দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি সিএস নকশা (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে ম্যাপ) অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি একাই ২৮৫ শতাংশ জমি দখলে রেখেছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দেশ এনার্জি লিমিটেডের ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট বিভাগের প্রধান এনায়েত কবির গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিএস খতিয়ানে (বাংলাদেশ সার্ভে) অন্তর্ভুক্ত জমি কিনেছেন। নদীর কোনো জায়গা তাঁরা দখল করেননি।
অভিযান যাতে লোকদেখানো না হয়
চাঁদপুর পৌর এলাকার গৃহস্থালি ও কঠিন বর্জ্য প্রতিদিন ডাকাতিয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। নদীর আশপাশের কলকারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক এবং বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালের বিপজ্জনক মেডিক্যাল বর্জ্যও মিশছে এই পানিতে। প্লাস্টিক, পলিথিন এবং চালকলের তুষ ফেলার কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পানি কালচে ও দুর্গন্ধ হয়ে গেছে।
বিআইডব্লিউটিএ এমন ১৫টি স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে বড় স্টেশন ভিআইপি ঘাট, ৫ নম্বর ঘাট, চৌধুরী ঘাট, পৌর কসাইখানা, সদর হাসপাতালের সামনে, পুরান বাজারের ভূঁইয়া ঘাট, চাউলপট্টি ও ইচলী ফেরিঘাট এলাকা রয়েছে।
পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, দূষণের ফলে ডাকাতিয়া নদীতে অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নদী থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জেলেদের জীবিকায়। একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় মালবাহী ট্রলার ও লঞ্চ চলাচল করলেও বর্তমান নাব্যতা-সংকটের কারণে নৌযোগাযোগব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানিনিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে চাঁদপুর সেচ প্রকল্প এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অববাহিকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে।
স্থানীয় পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও বাবুরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোশারেফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, উচ্ছেদ অভিযান যাতে লোকদেখানো কার্যক্রমে পরিণত না হয়। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নদী দখলদারদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে ড্রেজিং বা খনন করে ডাকাতিয়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।