দেশে–বিদেশে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ–অবরুদ্ধ
· Prothom Alo

দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগে দেশে–বিদেশে থাকা প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই সম্পদের মধ্যে আছে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও), বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ তহবিল ইত্যাদি।
আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব–সম্পর্কিত কমিটির প্রথম বৈঠক সংসদ ভবনে হয়। কমিটির সভাপতির অনুপস্থিতিতে কমিটির সদস্য ইকরামুল বারী টিপুর সভাপতিত্বে এ সভা হয়।
Visit afsport.lat for more information.
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশের চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগসমূহের সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক প্রতিবেদন কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয়। অনুমিত হিসাব–সম্পর্কিত কমিটিতে বাংলাদেশের চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার সম্পর্কে আলোচনা এবং পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
কমিটির কাছে আগস্ট মাস পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, ঋণের অর্থ অবৈধভাবে স্থানান্তর এবং পরবর্তী সময়ে বিদেশে পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ছয় ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীকে নির্বাচিত করা হয়েছে। এগুলো হলো—আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ। তাদের নির্বাচন করার পেছনে চারটি কারণ বিবেচনা করা হয়েছে। কারণগুলো হলো—বেশি খেলাপি ঋণ; বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তরে বিদ্যমান গোয়েন্দা তথ্য ও প্রমাণ; ব্যাংক থেকে গোপন বা অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে ঋণ গ্রহণের তথ্য; তদন্তের মধ্যে থাকা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে এই ছয় গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলার।
আজ অনুমিত হিসাব–সম্পর্কিত কমিটিতে আরও জানানো হয়, ঋণের পরিমাণ এবং বিদেশে অবস্থিত সম্পদের তথ্যের ভিত্তিতে আরও ৪০ টি ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় পর্যায়ে দেওয়ানি কার্যক্রম করা হবে। তাদের ঋণের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার।
বৈঠকে কমিটির সদস্য (সংসদ সদস্য) মো. সেলিম রেজা, মো. আবদুল আজিজ, মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ জাকির হোসেন, মোসাম্মৎ সাম্মী আক্তার, মো. রফিকুল ইসলাম খান ও মো. মাসুদ পারভেজ অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংসদ সচিবালয়ের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিদেশে পলায়ন বা তাদের সম্পদ স্থানান্তর প্রতিরোধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় ইন্টারপোলে রেড নোটিশ অনুরোধ পাঠানোর পাশাপাশি পাচার করা অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য কমিটি সুপারিশ করে।
দেশে সম্পদ ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি
অনুমিত হিসাব–সম্পর্কিত কমিটিতে উপস্থাপিত তথ্য অনুসারে, আদালতের আদেশের আওতায় থাকা মোট সম্পদের মধ্যে দেশে রয়েছে ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের মূল্য ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
বিদেশে থাকা সম্পদের মূল্য ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
সম্পদ উদ্ধারে টাস্কফোর্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও আর্থিক অপরাধ মোকাবিলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এ কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে পাচার করা সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর নাম অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স বা এআরটিএফ। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে।
টাস্কফোর্সে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি), কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, আইন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
১৪২ মামলা, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ১৫৮ জনের
বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৪২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় আদালতে ছয়টি মামলায় রায় হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, রায় হওয়া মামলার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) মামলাও রয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে পালানো বা সম্পদ স্থানান্তর ঠেকাতে ১৫৮ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের কাছে ১০টি রেড নোটিশের অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে ১৬টি বিচারিক এখতিয়ারের কাছে মোট ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ বা এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। এসব অনুরোধ ও চুক্তি বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, অনুসন্ধান, নিয়ন্ত্রণ এবং পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সম্পর্কিত। মালয়েশিয়া ও চীনের হংকংয়ের সঙ্গে দুটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি বা এমএলএটি সম্পন্ন হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক–ইউএনওডিসির স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ বা স্টার ইনিশিয়েটিভ, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সঙ্গে কাজ করছে।
ছয় কনসোর্টিয়ামের দায়িত্বে আট ব্যাংক
অনুমিত হিসাব–সম্পর্কিত কমিটিতে জানানো হয়েছে, দেওয়ানি কার্যক্রমে কনসোর্টিয়ামভিত্তিক পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আলাদাভাবে কাজ না করে সম্মিলিতভাবে সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেবে।
প্রতিটি ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর জন্য এক বা একাধিক প্রধান বা লিড ব্যাংক ঠিক করা হয়েছে। লিড ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান, আইন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করবে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত সব ব্যাংকের পক্ষে সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মধ্য থেকে আটটি ব্যাংককে ছয়টি কনসোর্টিয়ামের লিড ব্যাংক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এ কার্যক্রমে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। অর্থ উদ্ধারের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে গোপনীয়তা চুক্তি বা এনডিএ সম্পন্ন হওয়ার পথে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। পরবর্তী ধাপ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করা।