‘ময়না’ ডাকলেই উড়ে আসে দুই শালিক, বলতে শিখেছে মা, বাবা, কুটুমসহ আরও শব্দ

· Prothom Alo

শুক্রবার বেলা ১১টা। বাড়ির উঠানে হঠাৎ উড়ে এসে বসল দুটি শালিক। ইটের স্তূপে ছড়িয়ে থাকা ধুন্দুলের লতা-পাতার ফাঁক দিয়ে এসে তারা ডাকতে শুরু করল, ‘সাদিক’, ‘সাদিক’। সাড়া না পেয়ে এবার ডাকল, ‘মা’, ‘বাবা’, ‘মা’, ‘বাবা’। বাড়ির কর্তা আবদুস সোবহান এগিয়ে আসতেই শালিক দুটি ডাকল, ‘কুটুম, কুটুম’। এরপর উড়ে গেল পাশের গাছের দিকে।

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বিরহলি গ্রামের আবদুস সোবহানের বাড়িতে নিয়মিত এ দৃশ্য দেখা যায়। প্রায় পাঁচ বছর ধরে বাড়িটিই শালিক দুটির ঠিকানা। খাঁচায় নয়, খোলা পরিবেশেই তাদের বেড়ে ওঠা। পরিবারের সদস্যরা আদর করে পাখি দুটির নাম দিয়েছেন ‘ময়না’। মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে শালিক দুটি এসব শব্দ শিখেছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বছর পাঁচেক আগে হরিপুর উপজেলা থেকে দুটি শালিকের ছানা নিয়ে এসেছিলেন আবদুস সোবহানের ছেলে সাদিকুল ইসলাম। খাঁচায় বন্দী না রেখে বাড়িতেই তাদের লালন-পালন শুরু করেন। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি মানুষের নিয়মিত সান্নিধ্য পেতে থাকে তারা। ধীরে ধীরে বাড়ির পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়েও ওঠে।

এরপর প্রায় দুই বছর বয়সে পরিবারের সদস্যদের মুখে শোনা কয়েকটি শব্দ অনুকরণ করতে শুরু করে পাখি দুটি। এখন কেউ ডাকলেই কাছে আসে। খাবারের সময় বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি করে। কখনো উঠানে, কখনো সামনের দোকানে গিয়ে বসে। অনেক দূরে উড়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে এই বাড়িতে।

গতকাল শুক্রবার সাদিকুলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, উঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছে শালিক দুটি। কখনো পানিতে পাখা ভেজাচ্ছে, কখনো ধুন্দুলের লতায় গিয়ে বসছে। আবার উড়ে যাচ্ছে সামনের দোকানের দিকে। এই প্রতিবেদককে দেখে তারা উড়ে এসে বসে উঠানে। এরপর ডাকতে থাকল, ‘কুটুম, কুটুম’।

শালিক দুটির শেখা শব্দগুলো শোনার চেষ্টা করছেন প্রতিবেশী রবিউল ইসলাম

বাড়িতে অপরিচিত কেউ এলেই শালিক দুটি ‘কুটুম, কুটুম’ শব্দ করে বলে জানান সাদিকুলের মা সিদ্দিকা বেগম। তিনি বলেন, এভাবে ডেকে পাখি দুটি জানান দেয় যে নতুন কেউ বাড়িতে এসেছেন।

আলাপের এই পর্যায়ে সিদ্দিকা বেগম ডাকলেন, ‘ময়না, ময়না’। ডাক শুনে মুহূর্তেই ছুটে এল শালিক দুটি। এরপর তিনি কয়েকটি শব্দ বলতেই সেগুলো অনুকরণ করতে শুরু করল তারা। একে একে শোনা গেল, ‘সাদিক’, ‘মা’, ‘বাবা’, ‘ভাই’, ‘ভাবি’, ‘আল্লাহ’ প্রভৃতি শব্দ। কিছুক্ষণ পর মুরগির ডাকও অনুকরণ করল তারা।

একপর্যায়ে উঠানে পলিথিন বিছিয়ে তাতে পানি ঢেলে দিলেন সিদ্দিকা। পানি পেয়ে শালিক দুটি নেমে পড়ল। কিছুক্ষণ পাখা ভেজানোর পর উড়ে গিয়ে রোদে দাঁড়াল। পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে চলতে থাকল নানা শব্দের অনুকরণ।

সিদ্দিকা বেগম লালন-পালন করতে করতে পাখিগুলোর প্রতি মায়া জমে গেছে। ওরাও আমাদের ছেড়ে কোথাও যায় না।

সিদ্দিকা বেগম বলেন, ‘লালন-পালন করতে করতে পাখিগুলোর প্রতি মায়া জমে গেছে। ওরাও আমাদের ছেড়ে কোথাও যায় না।’ আবদুস সোবহান বলেন, ‘সন্তানকে যেভাবে লালন-পালন করেছি, শালিকজোড়াকেও আমরা সেভাবেই বড় করেছি।’

এর মধ্যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে গ্রামটিতে। কাজ থেকে বাড়ি ফেরেন সাদিকুল ইসলাম। তাঁকে দেখে শালিক দুটি ডাকতে শুরু করল, ‘সাদি...কুল’, ‘সাদি...কুল’।

সাদিকুল জানান, পাখি দুটির জন্য বাড়িতে আলাদা বাসা তৈরি করে দিয়েছেন। কোথাও উড়ে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকে না। খাবারের সময় বাড়ির আশপাশেই ঘুরঘুর করে, আর করে নানা শব্দ।

সাদিকুলদের বাড়ির সামনের রবিউল ইসলামের চা-পিঁয়াজুর দোকানেও নিয়মিত যায় শালিক দুটি। দোকানের খদ্দেরেরা তাদের খাবার দেন। গ্রামের মানুষও তাদের সঙ্গে কথা বলেন। কেউ কেউ নতুন শব্দ শেখানোর চেষ্টা করেন। শালিক দুটিও কখনো সেসব শব্দ অনুকরণ করে।

রবিউল ইসলামের ভাষ্য, শালিক দুটি এখন শুধু সাদিকুলদের বাড়ির নয়, এলাকার মানুষের কাছেও পরিচিত। অনেকে তাদের দেখতে ও কথা বলতে আসেন। বিষ্ময় নিয়ে কেউ কেউ কিনতেও চান। আর এ বিষয়ে সাদিকুলের সহজ উত্তর, ‘এত সাধের পাখি কি বিক্রি করা যায়!’

পাখি দুটির কথা বলার খবর ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকায়ও। দূর থেকেও কেউ কেউ আসে তাদের দেখতে।

কোনো জায়গায় খাবার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে শালিক সেই জায়গার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বলে জানান ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষক মাজেদ জাহাঙ্গীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সাদিকুলের বাড়িটিও শালিক দুটির কাছে তেমন একটি নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে। তাই বাইরে উড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তারা আবার সেখানে ফিরে আসে।

জাহাঙ্গীর আলম, পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পাখির গলায় মানুষের স্বরযন্ত্রের মতো ‘সিরিংক্স’ নামের একটি অঙ্গ রয়েছে। এর সাহায্যে তারা বিভিন্ন সুর ও শব্দ তৈরি করতে পারে। শালিক মানুষের কথা ও আশপাশের পরিবেশের শব্দ শুনে তা মনে রাখতে এবং অনুকরণ করতে পারে।

মানুষের কাছাকাছি থেকে নিয়মিত কথা শুনতে শুনতেই শালিক দুটি কিছু শব্দ ও ধ্বনি অনুকরণ করতে শিখেছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিরাপদ ও খাদ্যসমৃদ্ধ পরিবেশে থাকা প্রাণীর স্বাভাবিক প্রবণতা। পাখির গলায় মানুষের স্বরযন্ত্রের মতো ‘সিরিংক্স’ নামের একটি অঙ্গ রয়েছে। এর সাহায্যে তারা বিভিন্ন সুর ও শব্দ তৈরি করতে পারে। শালিক মানুষের কথা ও আশপাশের পরিবেশের শব্দ শুনে তা মনে রাখতে এবং অনুকরণ করতে পারে। তবে মানুষের মতো শব্দের অর্থ বুঝে তারা কথা বলে না। শোনা শব্দের পুনরাবৃত্তিই করে।

Read full story at source