হিজবুল্লাহ নিয়ে ইরানের নতুন কৌশল
· Prothom Alo

১ অক্টোবর ইরান দক্ষিণ লেবাননে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠায়। দলে ছিলেন ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন ইয়েকতা (যিনি সদস্য সংগ্রহ ও আদর্শিক দীক্ষাদানের কাজে যুক্ত) এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা আলিরেজা পানাহিয়ান। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তাঁরা দুজনেই সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে একই ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এমন এক তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে তাঁদের এই সফর, যখন হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে দুর্বল, রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে এবং ক্রমে ইরানের দিকনির্দেশনার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
Visit bettingx.bond for more information.
এ থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না যে প্রতিনিধিদলটিকে হিজবুল্লাহ পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে সফরের সময় ও প্রতিনিধিদলের সদস্যদের পরিচয় জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয়, তেহরানের উদ্বেগ কেবল হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইরান সম্ভবত এমন একটি বিষয় পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, যেটি ধ্বংস করা আরও কঠিন—হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক স্থিতিস্থাপকতা।
ইরান যুদ্ধে হিজবুল্লাহ যেভাবে ‘ফিনিক্স পাখি’র মতো জেগে উঠলএটি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে। কয়েক দশক ধরে তেহরান হিজবুল্লাহকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটিতে পরিণত করতে সহায়তা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর যুদ্ধ সেই মডেলের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করে দিয়েছে।
জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা নিহত হয়েছেন, অবকাঠামোতে অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে, অস্ত্রের মজুত কমেছে এবং গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও চাপের মুখে পড়েছে। ফলে যুদ্ধের আগে হিজবুল্লাহ যেমন ছিল, আবার ঠিক তেমন হয়ে ওঠার প্রয়োজন তার নেই। বরং সংগঠনটিকে টিকে থাকতে হবে, পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে এবং পুনর্গঠিত হওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে।
সামরিক পরাশক্তি থেকে টিকে থাকতে সক্ষম বাহিনী
হিজবুল্লাহর যুদ্ধক্ষেত্রের আচরণেই এই রূপান্তরের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা বা এসিএলইডির তথ্য অনুসারে, গোষ্ঠীটি ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু ও গেরিলা যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করেছে। বড় বাহিনী ও দীর্ঘস্থায়ী সরাসরি সংঘর্ষের পরিবর্তে তারা ছোট ছোট ইউনিট, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উৎক্ষেপণস্থল, ড্রোন, গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র এবং বাছাই করা রকেট হামলার ওপর নির্ভর করছে।
২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত লেবাননে হিজবুল্লাহর নথিভুক্ত সংঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের মাত্র ১১ শতাংশ ছিল সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষ। অথচ ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের স্থল অভিযানের সময় এ হার ছিল ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে আত্মঘাতী ড্রোনের ব্যবহার ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশ হয়েছে। ফাইবার-অপটিক ফার্স্ট-পারসন-ভিউ বা এফপিভি ড্রোন (যা ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর অভিযানে দৃশ্যত অনুপস্থিত ছিল) মোট হামলার ২১ শতাংশে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই পরিবর্তন কেবল কৌশলগত নয়। এর মধ্যে একটি সাংগঠনিক শিক্ষাও রয়েছে। বড় ও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত কোনো সশস্ত্র সংগঠন উল্লেখযোগ্য মাত্রার আক্রমণক্ষমতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সেটি সহজে শনাক্তযোগ্য কমান্ড কাঠামো, সরবরাহ কেন্দ্র এবং হামলার লক্ষ্যও তৈরি করে। তুলনামূলকভাবে ছোট ও বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ককে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা অনেক কঠিন। এর ইউনিটগুলো অধিকতর স্বাধীনভাবে কাজ করতে, ক্ষয়ক্ষতি সামলে নিতে এবং ইসরায়েলের বড় ধরনের অভিযানের পর পুনর্গঠিত হতে পারে। হিজবুল্লাহর পাশাপাশি ইরানও এই শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ইরান যেভাবে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের কল্পনা করছেমার্চে রয়টার্স জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের যুদ্ধের পর হিজবুল্লাহর সামরিক কমান্ড পুনর্গঠনে সহায়তার জন্য আইআরজিসি প্রায় ১০০ কর্মকর্তাকে লেবাননে পাঠিয়েছিল। ইরানি কর্মকর্তারা যোদ্ধাদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, নতুন করে অস্ত্রসজ্জা এবং সংগঠনটির পুনর্বিন্যাস তদারক করেছেন বলে জানা যায়। গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ও জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের হারানোর কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কমাতে সংগঠনটিকে ছোট ও বিকেন্দ্রীকৃত ইউনিটে পুনর্গঠনেও তাঁরা সহায়তা করেন।
তেহরানের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য সেই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান কেবল হিজবুল্লাহর পুরোনো সামরিক কাঠামো ফিরিয়ে আনছে না; বরং এমন এক পরিবেশে টিকে থাকার উপযোগী করে সংগঠনটিকে বদলে দিচ্ছে, যেখানে ইসরায়েল কমান্ড নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ, শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং স্থায়ী অবকাঠামোতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাই এই কৌশলের লক্ষ্য প্রচলিত অর্থে বিজয় অর্জন নয়; লক্ষ্য হলো টিকে থাকার সামর্থ্য তৈরি করা।
পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রটি তাই শুধু দক্ষিণ লেবানন নয়। হিজবুল্লাহ যে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে টিকে থাকতে চায়, সেটিও এখন যুদ্ধক্ষেত্র। হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই শুধু একটি সশস্ত্র সংগঠন নয়। এর স্থিতিস্থাপকতা নির্ভর করেছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক সেবা, আর্থিক নেটওয়ার্ক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটি বিস্তৃত ব্যবস্থার ওপর। এই ব্যবস্থা টিকে থাকলে সামরিক ক্ষতি অনিবার্যভাবে সাংগঠনিক পরাজয়ে রূপ নেয় না। এ কারণেই পুনর্গঠন এত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের জন্য এটিই কৌশলগতভাবে মূল্যবান হতে পারে। তেহরানের স্বার্থ রক্ষায় হিজবুল্লাহর ইসরায়েলকে পরাজিত করতে হবে না। ভবিষ্যতে ইরানের ওপর ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে তার পাল্টা মূল্য আরোপ, সংঘাত আরও বাড়ানোর হুমকি এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রাখার মতো সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। ছোট আকারের একটি হিজবুল্লাহ যদি টিকে থাকতে এবং পাল্টা আঘাত হানতে পারে, তাহলে একটিমাত্র অভিযানে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এমন বড় বাহিনীর তুলনায় সেটি শেষ পর্যন্ত আরও টেকসই প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
হিজবুল্লাহর সমস্যা এখন আর কেবল আক্রমণক্ষমতার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানবসম্পদ ও সাংগঠনিক সক্ষমতারও সমস্যা। এ কারণেই আইআরজিসিতে সদস্য সংগ্রহ ও আদর্শিক তৎপরতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইয়েকতার উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
ইরান শুধু অস্ত্রভান্ডার নয়, ব্যবস্থা পুনর্গঠন করছে
পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রটি তাই শুধু দক্ষিণ লেবানন নয়। হিজবুল্লাহ যে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে টিকে থাকতে চায়, সেটিও এখন যুদ্ধক্ষেত্র। হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই শুধু একটি সশস্ত্র সংগঠন নয়। এর স্থিতিস্থাপকতা নির্ভর করেছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক সেবা, আর্থিক নেটওয়ার্ক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটি বিস্তৃত ব্যবস্থার ওপর। এই ব্যবস্থা টিকে থাকলে সামরিক ক্ষতি অনিবার্যভাবে সাংগঠনিক পরাজয়ে রূপ নেয় না। এ কারণেই পুনর্গঠন এত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর হিজবুল্লাহর নেতা নাঈম কাসেম ঘোষণা করেন, যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লেবানিজদের আবাসন প্রকল্পে সংগঠনটি সহায়তা করবে। সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রামের বাসিন্দারাও এই সহায়তার আওতায় থাকবেন। সংঘাতের সময় ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। রয়টার্স জানিয়েছে, বাড়িঘর ধ্বংস হওয়া অথবা ইসরায়েলি বাহিনী এখনো তাঁদের বসবাসের এলাকা দখল করে রাখায় তিন লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।
এর গুরুত্ব মানবিক হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকও। ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ রাজনৈতিক বৈধতাও পুনর্গঠন করতে পারে। দক্ষিণ লেবাননের মানুষ মনে রাখবেন, কে তাঁদের ঘরে ফিরতে সহায়তা করেছে, কে মেরামতের অর্থ দিয়েছে এবং রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে কে তাঁদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে—হিজবুল্লাহ সেটি ভালোভাবেই জানে।
হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাশেমওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে, পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া অনিচ্ছাকৃতভাবে হিজবুল্লাহকে শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ও তার রাজনৈতিক মিত্ররা যদি দাতাদের অর্থ কোথায় ব্যয় হবে এবং দক্ষিণ লেবানন পুনর্গঠনের রাজনৈতিক কৃতিত্ব কারা পাবে, তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
এ কারণেই শুধু নিরস্ত্রীকরণ হয়তো হিজবুল্লাহ সংকটের সমাধান করবে না। কোনো গোষ্ঠী তার সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ হারিয়েও রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে পারে, যদি তার সামাজিক অবকাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে। বিপরীতে, লেবানন রাষ্ট্র অস্ত্রের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে; কিন্তু সমমানের নিরাপত্তা, সেবা ও অর্থনৈতিক সুযোগ দিতে না পারলে সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য কঠিন হবে।
ইরান এই সমীকরণটি বোঝে। হিজবুল্লাহকে আবার আধিপত্যশীল শক্তিতে পরিণত করা তেহরানের কৌশলগত স্বার্থ না-ও হতে পারে। বরং হিজবুল্লাহ যাতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে না পড়ে, সেটিই তাদের লক্ষ্য। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান ছোট আকারের হিজবুল্লাহ মেনে নিতে পারে। কম সক্রিয় বা তুলনামূলক নীরব হিজবুল্লাহও তার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এমনকি সাময়িকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়িয়ে চলা হিজবুল্লাহকেও তেহরান মেনে নিতে পারে। কিন্তু সাংগঠনিক সংহতি, সামাজিক ভিত্তি ও পুনর্গঠিত হওয়ার সক্ষমতা হারানো একটি হিজবুল্লাহ ইরানের পক্ষে সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
ইসরায়েলের আক্রমণ সামলে হিজবুল্লাহ যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেতবে এই কৌশলের মধ্যে একটি গুরুতর বৈপরীত্য রয়েছে। ইরান যত বেশি সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে, হিজবুল্লাহর পক্ষে নিজেকে একটি লেবানিজ আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করা তত কঠিন হবে। লেবাননের কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ইরানি প্রভাব কমিয়ে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহ তার অস্ত্রভান্ডার এবং লেবানন রাষ্ট্রের বাইরে স্বাধীনভাবে তৎপরতা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে।
হিজবুল্লাহ পুনর্গঠনে সিরিয়াও একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠায় এই সংকট আরও জটিল হচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সীমান্তপারের চোরাচালান ও সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর তৎপরতা নিয়ে সেপ্টেম্বরে তুরস্কে হিজবুল্লাহ ও সিরীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে গোপন আলোচনা হয়েছে। সিরিয়ার কর্মকর্তারা লেবাননে অস্ত্র চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু হিজবুল্লাহ সেই দাবির বিরোধিতা করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর যুদ্ধ থেকে ইরান একটি কঠিন শিক্ষা নিয়েছে—কোনো প্রক্সি বাহিনীর কাঠামো অত্যন্ত দৃশ্যমান, কেন্দ্রীভূত এবং নেতৃত্ব ধ্বংসকারী হামলার কাছে অরক্ষিত হলে শক্তিশালী সেই বাহিনীই দায়ে পরিণত হতে পারে। এর বিপরীতে, কম শক্তিশালী কিন্তু অধিকতর স্থিতিস্থাপক একটি প্রক্সি বাহিনী অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। উদীয়মান হিজবুল্লাহ মডেলের পেছনে এই কৌশলগত যুক্তিই কাজ করছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঐতিহাসিকভাবে সিরিয়া ছিল ইরান ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। সেই পথ কম নির্ভরযোগ্য হয়ে পড়লে হিজবুল্লাহ পুনর্গঠন আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হবে। ফলে লেবাননে সামরিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি পুরো লেভান্ট অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত একটি সরবরাহগত সমস্যাও ইরানকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এর ফল হিসেবে আরও সতর্ক একটি কৌশল দেখা যাচ্ছে—ছোট অস্ত্র, ছড়িয়ে থাকা নেটওয়ার্ক, স্থানীয়ভাবে সদস্য সংগ্রহ, রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রোথিত হওয়া এবং সামাজিক পুনর্গঠন। এটি ক্ষমতার শীর্ষে থাকা আগের হিজবুল্লাহ নয়। বরং এটি সম্ভবত ভিন্ন ধরনের একটি সংগঠন—কম দৃশ্যমান, অধিকতর বিকেন্দ্রীকৃত এবং আধিপত্য বিস্তারের পরিবর্তে টিকে থাকার উপযোগী করে তৈরি।
হিজবুল্লাহর টিকে থাকাই হতে পারে তেহরানের প্রকৃত বিজয়
হিজবুল্লাহ কত দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার পুনর্গঠন করতে পারে কিংবা কতজন যোদ্ধা নিয়োগ দিতে পারে—এসব প্রশ্নের ভিত্তিতে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের প্রবণতা রয়েছে। এসব সূচক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাতে বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনটি উপেক্ষিত থেকে যায়।
ইরানের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্ভবত আরও সরল—হিজবুল্লাহকে টিকিয়ে রাখা; এর নেটওয়ার্কগুলো সচল রাখা; সামাজিক ভিত্তি অক্ষুণ্ন রাখা; ইসরায়েলকে চাপে রাখার মতো ন্যূনতম সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং সর্বোপরি লেবানন, ইসরায়েল বা ইরানকে ঘিরে ভবিষ্যতের যেকোনো সমঝোতায় উপেক্ষা করা যাবে না—এমন একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে হিজবুল্লাহকে রক্ষা করা।
এ কারণেই ১ অক্টোবরের প্রতিনিধিদলের সফরটি মনোযোগ দাবি করে। প্রতিনিধিদলের সদস্যদের পরিচয় এমন একটি বিস্তৃত পুনর্গঠন প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে অস্ত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে সদস্য সংগ্রহ, আদর্শিক সংহতি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা। তেহরান প্রতিনিধিদলটিকে ঠিক কী দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিল, বিদ্যমান তথ্য থেকে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিন্তু হিজবুল্লাহর কমান্ড কাঠামোয় ইরানের আগের হস্তক্ষেপ এবং পরে গোষ্ঠীটির বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধকৌশলের দিকে ঝুঁকে পড়ার যে ধারা দেখা যাচ্ছে, এই সফর তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর যুদ্ধ থেকে ইরান একটি কঠিন শিক্ষা নিয়েছে—কোনো প্রক্সি বাহিনীর কাঠামো অত্যন্ত দৃশ্যমান, কেন্দ্রীভূত এবং নেতৃত্ব ধ্বংসকারী হামলার কাছে অরক্ষিত হলে শক্তিশালী সেই বাহিনীই দায়ে পরিণত হতে পারে। এর বিপরীতে, কম শক্তিশালী কিন্তু অধিকতর স্থিতিস্থাপক একটি প্রক্সি বাহিনী অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। উদীয়মান হিজবুল্লাহ মডেলের পেছনে এই কৌশলগত যুক্তিই কাজ করছে।
ড. জান্নুস টি এইচ সিয়াহান লেখক ইন্দোনেশিয়ার একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।