বাংলাদেশে নজরুল-চর্চায় সমস্যা
· Prothom Alo

শিল্প-সাহিত্যে জনপ্রিয়তার হিসাব আলাদা; নানান কারণে লেখক-শিল্পীরা জনপ্রিয় হন, এর সঙ্গে মান ও মেধার যোগ থাকা অপরিহার্য না। এই কারণে একেক বিচারে একেক জন জনপ্রিয় হন। তাই জনপ্রিয়তার বিচারে না গিয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশে, আমার ধারণা, গ্রহণযোগ্যতার বিচারে অন্য লেখকদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই গ্রহণযোগ্যতার পেছনে যতটা না নজরুলের সামগ্রিক রচনার ‘কৃতিত্ব’ আছে, তার চেয়ে বড় ‘কৃতিত্ব’ হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতির। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চরিত্রই এমন যে সবকিছুর মধ্যে একধরনের বিভাজন তৈরি করা—কাউকে নিজের সুবিধামতো খণ্ডিত রূপে প্রতিষ্ঠা করা এবং কাউকে বিকৃত রূপে উপস্থাপনের মাধ্যমে খারিজ করে দেওয়ার ন্যারেটিভ তৈরি করা। এর বড় শিকার কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশে নজরুলের গ্রহণযোগ্যতার পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে সাহিত্যের অপাঠকদের। অর্থাৎ বাংলাদেশে যাঁরা সাধারণত গল্প-উপন্যাস-কবিতা পড়েন না, তাঁদের অনেকে হয়তো সংগীতকে ‘অ–ইসলামিক চর্চা’ মনে করে উপেক্ষাও করেন, তাঁদের কাছেও লেখক হিসেবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নাম হলো কাজী নজরুল ইসলাম। বিষয়টি আপাতভাবে ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু যখন বোঝা যায় এর পেছনের কারণটা হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা, তখন আর ব্যথিত না হয়ে উপায় থাকে না। আর এই কারণে বাংলাদেশে সঠিক নজরুলের পাঠ ও চর্চা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গ ধরেই বাংলাদেশে নজরুলচর্চার আপাত চিত্রটা বোঝার চেষ্টা করব বর্তমান গদ্যে।
আমার পর্যবেক্ষণ বলে, খণ্ডিত নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নজরুলের যে বিশালত্ব ও বহুত্ববাদ, তা থেকে যেমন নিজেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছে বাঙালি মুসলমান সমাজ, তেমনি সাম্প্রদায়িক জায়গা থেকে নজরুলচর্চা করতে গিয়ে তাঁকে অনেকাংশে খর্বিতও করছে। প্রথম ভুলটা করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করাতে গিয়ে। নব্বইয়ের দশকে আমরা মফস্সলের মানুষেরা শুনে শুনে বড় হয়েছি, প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে কাজী নজরুল ইসলামকে ধুতরা ফল খাইয়ে পাগল করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এটা করতে তিনি তাঁর মেয়ের (কোনো কোনো ভাষ্যে বোনের) সঙ্গে নজরুলের বিয়ে দেন। নজরুলকে পাগল করে দিয়েই মূলত তিনি নোবেল পুরস্কারটা বাগিয়ে নিয়েছেন। না হলে এটা নজরুলেরই পাওয়ার কথা ছিল। লজ্জা লাগে ভাবতে, সেই অপপ্রচার এমনই চতুর্মুখী ছিল যে আমি নিজেও কিছুদিনের জন্য সেটা বিশ্বাস করেছিলাম। অথচ তখন যে কথা আমাদের কেউ বলেনি, কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে, আর রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পান ১৯১৩ সালে। অর্থাৎ একজন যখন প্রতিষ্ঠার তুঙ্গে, তখন অন্যজনের আবির্ভাব ঘটে। বয়স ও অন্যান্য ব্যবধান ঘুচিয়ে এই দুই কবি পরস্পরের নৈকট্যেই ছিলেন। নজরুল ছিলেন গভীরভাবে রবীন্দ্রভক্ত। নজরুলের রচনায় বহু জায়গায় রবীন্দ্রনাথের গান, উদ্ধৃতি, বাক্য, বাক্যাংশ পাওয়া যাবে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নজরুলের কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ কবিতাও আছে। রবীন্দ্রনাথের ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে লেখা ‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি’ নামক কবিতায় নজরুল লিখেছিলেন, ‘একা তুমি জানিতে হে কবি, মহাঋষি, তোমারি বিচ্যুত-ছটা আমি ধূমকেতু।’
Visit mwafrika.life for more information.
খণ্ডিত নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নজরুলের যে বিশালত্ব ও বহুত্ববাদ, তা থেকে যেমন নিজেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছে বাঙালি মুসলমান সমাজ, তেমনি সাম্প্রদায়িক জায়গা থেকে নজরুলচর্চা করতে গিয়ে তাঁকে অনেকাংশে খর্বিতও করছে। প্রথম ভুলটা করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করাতে গিয়ে।
অন্যদিকে নজরুলের বয়স যখন ২৪। নিজের ধূমকেতু পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ লিখে কারাবন্দী হলেন নজরুল। তখন তাঁকে কবি সম্বোধন করে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটকটি উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখেন, ‘শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাম/ স্নেহভাজনেষু।’ রবীন্দ্রনাথ এই প্রথম অত্যন্ত আপনজনদের বাইরে অপরিচিত কোনো কবিকে বই উৎসর্গ করেন। এটি কম কথা নয়। মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে বই উৎসর্গ করেননি। প্রায় সমবসয়ী হয়েও মহাত্মা গান্ধী কিন্তু তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন। দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুরকে কিংবা নিজের মাকেও বই উৎসর্গ করেননি রবীন্দ্রনাথ। ফলে এই উৎসর্গ খুব তাৎপর্য বহন করে। উল্লেখ্য যে পরবর্তী সময়ে নজরুল তাঁর ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে নজরুল লেখেন, ‘বিশ্বকবিসম্রাট/ শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ শ্রী শ্রী চরণারবিন্দেষু—।’
আরও একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়, রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ৬০, নজরুলের ২২। কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরিতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত সভায় সভাকক্ষে প্রবেশ করেই নজরুল মঞ্চে উঠে রবীন্দ্রনাথের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন নজরুলের হাত ধরে সভায় নিজের পাশে বসান। নজরুল তাঁর সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের বাণী চেয়েছিলেন। প্রথম সংখ্যার প্রথম পাতায় মুদ্রিত হয় রবীন্দ্রনাথের সেই আশীর্বাণী। এবং ধূমকেতুর প্রতিটি সংখ্যাতেই মুদ্রিত হয়। রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,/ দুর্দিনের এই দুর্গ শিরে/ উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।/ অলক্ষণের তিলক রেখা/ রাতের ভালে হোক না লেখা,/ জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/ আছে যারা অর্ধচেতন।’
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯ –১৯৭৬), কবি ভবন, রোড ২৮, ধানমন্ডি, ঢাকা। ২৪ মে ১৯৭৪এই দুজনের মধ্যে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি সিনেমায় সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। ছবিটা মুক্তি পাওয়ার সময় বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড থেকে আপত্তি ওঠে। বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে সাতটি রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করা এবং সুর বিকৃতির অভিযোগ ওঠে নজরুল ও চিত্রপরিচালকের বিরুদ্ধে। আটকে যায় ছবির রিলিজ। নজরুল চলে যান রবীন্দ্রনাথের কাছে। সব শুনে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বলেন, ‘তুমি শিখিয়েছ আমার গান, আর ওরা কোন আক্কেলে তার দোষ ধরে? তোমার চেয়েও আমার গান কি তারা বেশি বুঝবে? আমার গানের মর্যাদা কি ওরা বেশি দিতে পারবে?’ বলে অনুমতিপত্রে সই করে দেন তিনি।
নজরুল-রবীন্দ্রনাথের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। কিন্তু এই গদ্যের উদ্দেশ্য সেটি নয়। বিষয়টি এই কারণে উল্লেখ করা যে নজরুল নিজে যখন রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন, রবীন্দ্রনাথ যখন নজরুলকে পরম স্নেহ ও আস্থার সঙ্গে মূল্যায়ন করেছেন, সেখানে বাংলাদেশে একটি মহল নিজেদের সাম্প্রদায়িক জিঘাংসা চরিতার্থ করতে দুজনকে প্রতিপক্ষ করে তুলেছে। সচেতনভাবে নজরুল যে পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি, সেই পরিচয়টাই তার ওপর আরোপ করা হয়েছে বা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ লেখালেখির শুরু থেকেই নজরুল সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বমানবিক চেতনার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চেয়েছেন। লেখক হিসেবে তাঁর অবস্থানটা ছিল পরিষ্কার। তিনি শুধু নিজের রোমান্টিক ভাব প্রকাশের জন্য কলম ধরেননি। সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক বিনোদনের অংশ ছিল না। ছিল কর্তব্যবোধের নান্দনিক প্রকাশ।
রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ৬০, নজরুলের ২২। কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরিতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত সভায় সভাকক্ষে প্রবেশ করেই নজরুল মঞ্চে উঠে রবীন্দ্রনাথের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন নজরুলের হাত ধরে সভায় নিজের পাশে বসান। নজরুল তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের বাণী চেয়েছিলেন।
নজরুল তাঁর ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে সাহিত্যকে দুটি ধারায় ভাগ করেছেন। তাঁর মতে, একটি ধারা শেলির ‘Shylark’-এর মতো, মিল্টনের ‘Bird of Paradise’-এর মতো এই ধূলিমলিন পৃথিবীর ঊর্ধ্বে উঠে স্বর্গের সন্ধান করে। স্বপ্নলোকের সংগীত শোনায়। অন্যধারা হুইটম্যানের মতো মাটির পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরে থাকে। দুঃখময় পৃথিবীকে বাদ দিয়ে সে স্বর্গ চায় না। দ্বিতীয় ধারার লেখকেরা স্বর্গকে মাটিতে নামিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
নজরুল বলছেন, ‘দুই দিকেই বড় বড় রথী–মহারথী। একদিকে নোগুচি, ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি dreamers স্বপ্নচারী; আর এক-দিকে গোর্কি, যোহান, বোয়ার, বার্নার্ড শ, বেনাভাঁতে প্রভৃতি।’
দৃশ্যত দ্বিতীয় ধারার লেখকদের প্রতি নজরুলের পক্ষপাত স্পষ্ট। নজরুলের মতো মানবতার পূজারি, বহুত্ববাদ ও সাম্যবাদের প্রচারক লেখক শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বসাহিত্যেই বিরল। অথচ তাঁকেই কিনা একক সম্প্রদায়ের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বাঙালি মুসলমানের একটি অংশ। এই চেষ্টা একবার করেছিলেন ইব্রাহীম খাঁ—উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজ-সংস্কারক। তিনি নজরুলকে মুসলমান সমাজের কবি হয়ে ওঠার জন্য এবং ইসলামি ধারার কবিতা রচনার আহ্বান জানিয়ে একটি পত্র লেখেন।
কবি কাজী নজরুল ইসলামপত্রে নজরুকে ইব্রাহীম খাঁ লেখেন, ‘বাংলায় মৌলানা রুমীর আসন খালি পড়ে রয়েছে, তুমি তাই দখল করে ধন্য হও, বাংলার মুসলিমকে, বাংলার সাহিত্যকে ধন্য করো। তাই আজ বড়ো আশায়, বড়ো ভরসায়, বড়ো সাহসে, বড়ো মিনতির স্বরে তোমায় বলছি, ভাই, কাঙাল মুসলিমের বড়ো আদরের ধন তুমি, তুমি এই দিকে, পতিত মুসলিম সমাজের দিকে, এই অবহেলিত ইসলামের দিকে একবার চাও; তাদের ব্যথিত চিত্তের করুণ রাগিণী তোমার কণ্ঠে ভাষা লাভ করে আকাশ-বাতাস কাঁদিয়ে তুলুক, তাদের সুপ্ত প্রাণের জড়তা তোমার আকুল আহ্বানের উন্মাদনায় চেতনাময়ী হউক, ‘ইসলামের মহান উদার উচ্চ আদর্শ তোমার কবিতায় মূর্তি লাভ করুক, তোমার কাব্য-সাধনা ইসলামের মহাগীতিতে চরম সার্থকতায় ধন্য হোক। আমীন।’
এই পত্রের উত্তরে নজরুল লেখেন: ‘...আমায় মুসলমান সমাজ “কাফের” খেতাবের যে শিরোপা দিয়েছে, তা আমি মাথা পেতে গ্রহণ করেছি। একে আমি অবিচার বলে কোনো দিন অভিযোগ করেছি বলে তো মনে পড়ে না। তবে আমার লজ্জা হয়েছে এই ভেবে, কাফের আখ্যায় বিভূষিত হবার মতো বড়ো তো আমি হইনি। অথচ হাফেজ-খৈয়াম-মনসুর প্রভৃতি মহাপুরুষদের সাথে কাফেরের পংক্তিতে উঠে গেলাম।...হিন্দুরা লেখক-অলেখক জনসাধারণ মিলে যে স্নেহে যে নিবিড় প্রীতি-ভালোবাসা দিয়ে আমায় এত বড়ো করে তুলেছেন, তাঁদের সে ঋণকে অস্বীকার যদি আজ করি, তা হলে আমার শরীরে মানুষের রক্ত আছে বলে কেউ বিশ্বাস করবে না। অবশ্য কয়েকজন নোংরা হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখক ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে আমায় কিছু দিন হতে ইতর ভাষায় গালাগালি করছেন, এবং কয়েকজন গোঁড়া ‘হিন্দুসভাওয়ালা’ আমার নামে মিথ্যা কুৎসা রটনাও করে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু এঁদের আঙুল দিয়ে গোনা যায়। এঁদের অবিচারের জন্যে সমস্ত হিন্দুসমাজকে দোষ দিই নাই এবং দেবও না।... প্রথম গালাগালির ঝড়টা আমার ঘরের দিক অর্থাৎ মুসলমানের দিক থেকেই এসেছিল—এটা অস্বীকার করিনে; কিন্তু তাই বলে মুসলমানেরা যে আমায় কদর করেননি, এটাও ঠিক নয়।...’
কাজী নজরুল ইসলামএই চিঠির শেষটা আমাদের নজরুলকে আরও পরিষ্কারভাবে চিনিয়ে দেয়। তিনি শেষটা করেছেন এই বলে, ‘আপনার “মুসলিম-সাহিত্য” কথাটার মানে নিয়ে অনেক মুসলমান সাহিত্যিকই কথা তুলবেন হয়তো। ওর মানে কি মুসলমানের সৃষ্ট সাহিত্য, না মুসলিমভাবাপন্ন সাহিত্য? সাহিত্য যদি সত্যিকার সাহিত্য হয়, তবে তা সকল জাতিরই হবে। তবে তার বাইরের একটা ফর্ম থাকবে নিশ্চয়। ইসলাম ধর্মের সত্য নিয়ে কাব্য-রচনা চলতে পারে, কিন্তু তার শাস্ত্র নিয়ে চলবে না—ইসলাম কেন, কোনো ধর্মেরই শাস্ত্র নিয়ে কাব্য লেখা চলে বলে বিশ্বাস করি না।...বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলমানের উভয়েরই সাহিত্য।…আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী।’
নজরুলের এই স্পষ্ট অবস্থানের কারণে সমকালে কেউ তাঁকে যবন, কেউ কাফের বলে গালি দিয়েছেন। নজরুল তাঁদের জবাব দিয়েছেন এই বলে, ‘আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু-মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’
এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছেন: ‘উন্মুক্ত পথের পথিক বলেই অতি অনায়াসে সর্বগামী হয়েছেন তিনি। হিন্দু-মুসলমানের মিলন তাঁর লেখার মধ্যে যেমন ঘটেছে, রাজনীতিতে, বা সাহিত্যে তেমন কোথাও ঘটেনি বাংলাদেশের।’
অনেক বাঙালি মুসলমান বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পূর্ববঙ্গ এবং মুসলমানবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান। তাঁদের এ–ও জানা উচিত, রবীন্দ্রনাথের মতো নজরুলও ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান-আন্দোলনের স্পষ্ট বিরোধী ছিলেন নজরুল। দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের অন্তঃসারশূন্যতা অনুধাবন করে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্তান’।
এখানে আরও স্মর্তব্য যে নজরুল শুধু তাঁর রচনা বা বচনে না; কর্মে-মর্মে, এমনকি যাপনেও যে এই মহৎ এবং ভারতবর্ষের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় চেষ্টাটা করে গেছেন, তার নমুনা তাঁর পারিবারিক জীবন থেকে পাওয়া যায়: প্রথম স্ত্রী সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিসের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি বিয়ে করেন হিন্দুধর্মাবলম্বী আশালতা সেনগুপ্তাকে। নজরুল তাঁর নাম দেন প্রমীলা দেবী। চার সন্তানের নাম রাখেন পর্যায়ক্রমে: কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (ডাকনাম বুলবুল), কাজী সব্যসাচী (কথিত যে কবি চীনের বিপ্লবী নেতা সান-ইয়াৎ সেনের নাম থেকে সানি নামে ডাকতেন) ও কাজী অনিরুদ্ধ (কথিত যে লেনিনের নাম অনুসরণে কবি ‘নিনি’ নামে ডাকতেন)। তাঁর এক পুত্রবধূ উমা (মুখোপাধ্যায়) কাজী, অন্যজন কল্যাণী কাজী। নির্বাক ও প্রায় স্মৃতিশক্তিহীন নজরুল ইসলামকে আমৃত্যু সেবিকার যত্নে, কন্যার ভালোবাসায় এবং মায়ের স্নেহে আগলে রেখেছিলেন যিনি, তিনিই উমা কাজী, ব্রাহ্মণ পরিবারের এই নারী। কাজেই নজরুলকে যদি গ্রহণ করতেই হয়, তাহলে সামগ্রিক নজরুলকে গ্রহণ করতে হবে। নজরুলকে চর্চা করতে হলে তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার চর্চা করতে হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষচর্চা আর নজরুলচর্চা এক হৃদয়ের কাজ না।
অনেক বাঙালি মুসলমান বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পূর্ববঙ্গ এবং মুসলমানবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান। তাঁদের এ–ও জানা উচিত, রবীন্দ্রনাথের মতো নজরুলও ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান-আন্দোলনের স্পষ্ট বিরোধী ছিলেন নজরুল। দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের অন্তঃসারশূন্যতা অনুধাবন করে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্তান’। তিনি সকৌতুকে লেখেন, ‘এক খুঁটিতে বাঁধা রামছাগল, এক খুঁটিতে বাঁধা খোদার খাসি, কারুর গলার বাঁধন টুটল না, কেউ মুক্ত হল না, অথচ তারা তাল ঠুকে এ ওকে ঢুস মারে। দেখে হাসি পায়।’ নজরুল হিন্দু–মুসলিম সম্মিলিত স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্র চেয়েছিলেন বলে ধরে নিতে পারি। কারণ, ১৯৪২ সালে নবযুগে তিনি লেখেন, ‘বাঙালী যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে— “বাঙালীর বাংলা” সেদিনই তারা অসাধ্য সাধন করবে। বাঙালীর ছেলেমেয়েদেরকে ছেলেবেলা থেকে যে মন্ত্র শেখাতে হবে তা হল বাংলাদেশ (অখণ্ড বাংলা) আমাদের, এখান থেকে আমরাই তাড়াবো পরদেশী দস্যু ও ডাকাতদের, রামা’দের গামা’দের।’
কাজী নজরুল ইসলামের ৬৮তম জন্ম দিবসে কলকাতায় কবির বাড়িতে নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় হারমোনিয়াম সহযোগে সংগীত পরিবেশন করছেন, পাশে মনযোগ সহকারে শুনছেন কল্যাণী কাজী (কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ), অভিনয়জগতের কিংবদন্তি শিল্পী অনুপ কুমার, রবি ঘোষসহ স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম।এরপর ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান তৈরি হলে নজরুল কিন্তু পরিবার নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গে চলে আসেননি বা তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন না এই বিবেচনায় বলা যায়, তাঁর পরিবার তাঁকে নিয়ে পূর্ববঙ্গে চলে আসেনি। এক হিসেবে নিজের দেশেই থেকে গেছেন নজরুল। তাঁর জন্মভূমি তো পূর্ব পাকিস্তান না। তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে দেশভাগের প্রায় ২৫ বছর পরে। তিনি অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় চলে গেছেন ১৯৪২ সালে। সুস্থ থাকলে নজরুল বাংলাদেশে আসতেন কি না, আমরা সুনিশ্চিত না। তাঁকে বাংলাদেশে আনা ও পরিচর্যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমৃত্যু রবীন্দ্র ও নজরুলপ্রেমী ছিলেন। সে সম্পর্কে অনেক রেফারেন্স দেওয়া যাবে। এখানে শুধু এটুকু উল্লেখ করতে হয়, তিনি নজরুল থেকে গ্রহণ করেন দলীয় এবং মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’। অন্যদিকে বলা হয়ে থাকে, ‘বাংলাদেশ’ নামটি তিনি গ্রহণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে। রবীন্দ্রনাথ থেকে নিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতও। এখন ভেবে দেখার বিষয়, রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সংগীত যারা বাদ দিতে চায়, নজরুল ‘হিন্দু-লেখক’ হলে তারা কি তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে মেনে নিত? সম্ভবত না। তার মানে নজরুলকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বড় করে তোলা হয়েছে, অথচ সেই পরিচয়কে তিনি আদৌ নিজের প্রধান পরিচয় করে তুলতে চাননি।
নজরুলকে বাংলাদেশে না আনা হলে বর্তমান সাম্প্রদায়িক মুসলমানরা তাঁকে ভারতীয় কবি হিসেবে কীভাবে গ্রহণ করত জানি না। তবে এটা ঠিক, পশ্চিম বাংলার চেয়ে বাংলাদেশের বেশি প্রয়োজন ছিল নজরুলের মতো একজন বজ্রকঠিন অসাম্প্রদায়িক ‘মুসলিম’ কবিকে। কারণ, নজরুলই হতে পারতেন বাঙালি মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক মানসিকতার প্রতিরোধক, প্রতিষেধক। কিন্তু সেটা যে হয়নি, বরঞ্চ নজরুলকেই সাম্প্রদায়িক করে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা করা হয়েছে, সেটা নিয়েই আমার এই আলাপ। এবং আপত্তিও।
কবি ভবনে (বাঁ দিক থেকে) উমা কাজী, মিষ্টি কাজী, কাজী নজরুল ইসলাম, বাবুল কাজী ও খিলখিল কাজীলক্ষ করলে দেখা যাবে, যে কবিকে বাঙালি মুসলমানের একটা বড় অংশ নিজেদের একক সম্পত্তি করে তুলতে চান, সেই কবি যদি আজকের এই সময়ে থেকে লিখতেন, ‘কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আফিম-নেশা / ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী পেশা / ভাঙি মন্দির, ভাঙি মসজিদ/ ভাঙিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত/ এক মানবের একই রক্ত মেশা / কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা।’ কিংবা নিজের সন্তানের নাম রাখতেন ‘কৃষ্ণ মুহাম্মদ’, তাহলে ওরাই হয়তো আজ নজরুলকে ধর্মানুভূতিকে আঘাত হানার অভিযোগে ফাঁসিয়ে দিতেন কোনো মামলায়! যে নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে মেনে নিয়ে উদ্যাপন করছে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোকজন, তাদের কারণেই হয়তো নজরুল দেশে থাকতে পারতেন না।
যে-হৃদয় বিষাক্ত, সে-হৃদয় ফুলের মধুকেও বিষ হিসেবে গ্রহণ করে। তা দিয়ে মধুর গুণবিচার করা চলে না। কাজী নজরুল ইসলামকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁকে সামগ্রিক অবস্থান থেকে গ্রহণ করতে হবে। নজরুলের গজলও সত্য, শ্যামাসংগীতও সত্য। সত্য ধর্মীয় ভণ্ডামি ও কূপমণ্ডূকতাবিরোধী উচ্চারণ। আর এই কারণেই ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতিরোধ হিসেবে ভারত এবং বাংলাদেশ দুই দেশেই নজরুল-চর্চা অনস্বীকার্য। এবং সেটা সম্পূর্ণ নজরুল, ভারতে শ্যামাসংগীতের নজরুল, বাংলাদেশে গজল সংগীতের নজরুল, এমন খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ নজরুল নয়।
নজরুল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। মানুষ হিসেবেও সুমহান। এই সম্পদকে বাঙালিকে নিজেদের স্বার্থেই যথার্থরূপে চিনে নিতে হবে।