পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন কলোনি থেকে পাঁচ লাখ সদস্য উধাও
· Prothom Alo

দক্ষিণ মহাসাগরের নির্জন এক আগ্নেয় দ্বীপ জাভোদোভস্কি। একসময় এখানে বাস করত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইনের দল। কিন্তু সম্প্রতি এই দ্বীপ থেকে পাঁচ লাখের বেশি চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন হারিয়ে গেছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন আবাসস্থলের খেতাব হারিয়েছে দ্বীপটি। জনমানবহীন এই দ্বীপ থেকে বিপুলসংখ্যক পেঙ্গুইন উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
Visit salonsustainability.club for more information.
পেঙ্গুইন কেন উড়তে পারে নাকিন্তু ২০২৩ সালে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের গবেষকেরা জাভোদোভস্কি দ্বীপটিতে গিয়ে দেখেন, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
দুর্গম দ্বীপে পেঙ্গুইনের আবাস
থুতনির নিচে কালো পালকের সরু একটি রেখা দেখে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন খুব সহজেই চেনা যায়। এরা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। দক্ষিণ মেরুর উত্তরে সাউথ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জের অংশ পাথুরে জাভোদোভস্কি দ্বীপ এদের বসবাসের জন্য বেশ উপযোগী হলেও সারা বছরই সেখানে প্রবল বাতাস থাকে। এই দ্বীপে চিনস্ট্র্যাপের পাশাপাশি বাস করে ম্যাকারনি পেঙ্গুইন, যাদের মাথায় হলুদ পালকের ঝুঁটি থাকে। ২০১১ সালে জাভোদোভস্কি দ্বীপকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন কলোনির আবাসস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের গবেষকেরা দ্বীপটিতে গিয়ে দেখেন, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
প্রাণিজগতের অদ্ভুত ও মজার ৭ ছবিব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের পেঙ্গুইনবিষয়ক গবেষক ও এই গবেষণার প্রধান নরম্যান র্যাটক্লিফ মতে, মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই বিপুলসংখ্যক পেঙ্গুইন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
১৪ বছরে কমেছে ৬৩ শতাংশ
৭ অক্টোবর কারেন্ট বায়োলজি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর দ্বীপটি থেকে পাঁচ লাখেরও বেশি চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন হারিয়ে গেছে। এটা দ্বীপটির মোট পেঙ্গুইনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আকাশ থেকে তোলা ছবি ও কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের দখলে থাকা বাসার সংখ্যা ৬৩ শতাংশ কমে গেছে।
ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের পেঙ্গুইনবিষয়ক গবেষক ও এই গবেষণার প্রধান নরম্যান র্যাটক্লিফ বলেন, ‘অ্যান্টার্কটিকার কোনো একটি জায়গায় প্রাণীদের প্রজাতিগত গঠনে এত বড় পরিবর্তন আগে কখনো দেখা যায়নি।’ তাঁর মতে, মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই বিপুলসংখ্যক পেঙ্গুইন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। র্যাটক্লিফ আরও বলেন, ‘উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন বেশ পরিষ্কার সংকেত দিচ্ছে।’
সব পাখি কেন উড়তে পারে নাআকাশ থেকে তোলা ছবি ও কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের দখলে থাকা বাসার সংখ্যা ৬৩ শতাংশ কমে গেছে।
দুই সপ্তাহের দুর্গম যাত্রা
জাভোদোভস্কি দ্বীপের অবস্থান অত্যন্ত দুর্গম। নিকটতম স্থায়ী জনবসতি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল। পরিবেশ বেশ প্রতিকূল হওয়ায় বিজ্ঞানীরা খুব কমই সেখানে যাওয়ার সুযোগ পান। দ্বীপটিতে পৌঁছাতে গবেষকদের যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে। উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে তাঁদের সময় লেগেছিল দুই সপ্তাহ। পথে ভয়ংকর ঝড়ের কবলে পড়ে কয়েকবার ফিয়র্ডের (হিমবাহের ক্ষয়ের কারণে তৈরি হওয়া গভীর ও সংকীর্ণ উপত্যকা) ভেতর আশ্রয় নিতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁরা দ্বীপের এমন একটি অংশে পৌঁছান, যেখানে খাড়া পাহাড় আর উত্তাল স্রোত তুলনামূলক কম। পাথরের ওপর তাঁবু খাটিয়ে সেখানে তিন দিন কাটান গবেষকেরা। এ সময় তাঁরা ড্রোন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে অবস্থানরত একটি ব্রিটিশ উড়োজাহাজ থেকে তোলা ছবি এবং পেঙ্গুইনের শরীরে লাগানো বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পাখিগুলোর সংখ্যা ও চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করেন।
পাখি টানা কতদিন আকাশে উড়তে পারে২০১৬ সালে দ্বীপটিতে একটি অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য সেটি দায়ী নয়। কারণ, অগ্ন্যুৎপাতের কয়েক বছর আগেই সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল।
কেন কমছে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমার ঘটনা বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, আশির দশকের আগের জরিপের তুলনায় অ্যান্টার্কটিকার কয়েকটি দ্বীপে এই পেঙ্গুইনের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। তবে দীর্ঘদিন ধারণা করা হতো, অন্য জায়গায় সংখ্যা কমলেও জাভোদোভস্কি দ্বীপের পেঙ্গুইনেরা এই প্রবণতার বাইরে রয়েছে।
কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেল, দ্বীপটিতে পেঙ্গুইনের সংখ্যা হঠাৎ করেই বিশাল মাত্রায় কমেছে। বর্তমানে পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় জাভোদোভস্কি দ্বীপে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমার হার সবচেয়ে বেশি। র্যাটক্লিফ জানিয়েছেন, সেখানে প্রতিবছর পেঙ্গুইনের সংখ্যা প্রায় ৭ শতাংশ করে কমছে, যা অন্য জায়গার তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি।
২০১৬ সালে দ্বীপটিতে একটি অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য সেটি দায়ী নয়। কারণ, অগ্ন্যুৎপাতের কয়েক বছর আগেই সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। বাসা বাঁধার জায়গা নিয়ে প্রতিযোগিতা কিংবা আশপাশের সমুদ্রে ক্রিল ধরার নৌযানের প্রভাবও এর প্রধান কারণ নয় বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
বিদ্যুতের তারে পাখি বসলে শক লাগে না কেন২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, আশির দশকের আগের জরিপের তুলনায় অ্যান্টার্কটিকার কয়েকটি দ্বীপে এই পেঙ্গুইনের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
তাঁদের মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হলো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট দূষণ। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে এবং সমুদ্র উষ্ণ হচ্ছে। এতে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের অন্যতম প্রধান খাবার ক্রিলের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ক্রিল নামের ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী খাবার ও আশ্রয়ের জন্য সামুদ্রিক বরফের ওপর নির্ভর করে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় ক্রিলগুলো দক্ষিণ দিকে সরে যাচ্ছে। চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের পক্ষে এদের অনুসরণ করা কঠিন। কারণ, আরও দক্ষিণের সাগরে বরফ অনেক বেশি থাকায় খাবার সংগ্রহ করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। র্যাটক্লিফ বলেন, ‘চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন বিশেষ ধরনের পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল একটি প্রজাতি। পৃথিবীতে এদের বসবাসের এলাকা এমনিতেই সীমিত। এখন সেই এলাকাও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।’
কিছু পাখি কেন মানুষের মতো কথা বলেক্রিল নামের ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী খাবার ও আশ্রয়ের জন্য সামুদ্রিক বরফের ওপর নির্ভর করে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় ক্রিলগুলো দক্ষিণ দিকে সরে যাচ্ছে।
ম্যাকারনি পেঙ্গুইন বাড়ছে, ঝুঁকিতে চিনস্ট্র্যাপ
গবেষণাটিতে কিছু আশার খবরও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দ্বীপটিতে ম্যাকারনি পেঙ্গুইনের সংখ্যা ২৮ শতাংশ বেড়েছিল এবং এরপর থেকে এদের সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। র্যাটক্লিফের মতে, ম্যাকারনি পেঙ্গুইনের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করার ধারণাকে আরও জোরালো করে। কারণ, তুলনামূলক উষ্ণ পানিতে থাকতে এদের সমস্যা হয় না এবং এরা নানা ধরনের খাবার খেতে পারে। ফলে ক্রিলের ওপর এদের নির্ভরশীলতাও কম।
জাভোদোভস্কি দ্বীপে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়া এবং অ্যান্টার্কটিকার অন্যান্য এলাকায় এদের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হতে পারে। বর্তমানে অবশ্য প্রজাতিটিকে সবচেয়ে কম উদ্বেগজনক শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের আরেক গবেষক পিটার ফ্রেটওয়েল পেঙ্গুইনের সংখ্যা পর্যবেক্ষণে দূর অনুধাবন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘সাউথ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জ মানুষের বসতি থেকে অনেক দূরে। পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের বাস সেখানে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে এরাও রক্ষা পাচ্ছে না।’
সূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান ও পেঙ্গুইন ম্যাপ ডটকমপৃথিবীতে এত পাখি থাকতে আমরা শুধু মুরগি খাই কেন