প্রতিমা গড়ার কাজে অভাব ঘুচেছে শ্রীকান্তের, শেখাচ্ছেন অন্যদেরও
· Prothom Alo
বাঁশের কাঠামোয় খড় জড়িয়ে গড়ে ওঠে অবয়ব। তার ওপর মাটির প্রলেপ। এরপর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় ফোটে চোখ-মুখের আদল। সবশেষে রংতুলির আঁচড়ে যেন প্রাণ পান দেব–দেবী। প্রতিটি ধাপে লাগে দক্ষতা, ধৈর্য আর গভীর মনোযোগ। প্রতিমা তৈরির এই কাজই বদলে দিয়েছে বগুড়ার শেরপুর শহরের দক্ষিণ সাহাপাড়ার শ্রীকান্ত সরকারের (৩৭) জীবন।
Visit sport-tr.bet for more information.
গত শনিবার সকালে দক্ষিণ সাহাপাড়ার ষোলআনা মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গা প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে শিল্পীদের ব্যস্ততা। কেউ মাটির কাজ করছেন, কেউ অবয়ব ঠিক করছেন, কেউ রংতুলিতে ব্যস্ত। মাঝখানে শ্রীকান্ত। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে প্রতিমাগুলো।
একসময় অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে শ্রীকান্ত যে কাজ শিখতে শুরু করেছিলেন, সেটিই এখন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম আর একাগ্রতায় তিনি দক্ষ প্রতিমাশিল্পী। তাঁর তৈরি প্রতিমার সুনাম ছড়িয়ে আছে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায়। প্রায় এক দশক ধরে নিজে প্রতিমা বানাচ্ছেন। খরচ বাদ দিয়ে বছরে আয় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা। এই আয়ে সংসার চলছে, করছেন সঞ্চয়। সম্প্রতি জমি কিনে এক ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি তৈরির কাজও শুরু করেছেন।
মাটিতে বসে রং তৈরির কাজ করছেন শ্রীকান্তের সহকারী লিটন দাস। গত শনিবার বিকেলে শেরপুর শহরের দক্ষিণ সাহাপাড়ার ষোলআনা মণ্ডপেঅভাবই দেখিয়েছিল পথ
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট শ্রীকান্ত। বাবা সিপেন সরকার। ছোটবেলার তাঁর স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে চাকরি করবেন। কিন্তু বাবার অসুস্থতা আর পরিবারের অসচ্ছলতায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অল্প বয়সেই উপার্জনের পথ খুঁজতে হয়েছে তাঁকে।
শ্রীকান্ত জানান, বাবার ইচ্ছায় একসময় প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত হন। কাজ শিখতে যান সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। সেখানে এক প্রতিমাশিল্পীর সহকারী হয়ে কাটিয়েছেন টানা ১২ বছর। বাঁশের কাঠামো, খড়ের অবয়ব, মাটির প্রলেপ, মুখাবয়ব, রং—সবই শিখেছেন হাতে-কলমে। দীর্ঘ অনুশীলনে আত্মবিশ্বাস এলে নিজেই কাজ শুরু করেন। তাঁর নিজের কাজের এক দশক পেরিয়ে গেছে।
শ্রীকান্ত সরকার, প্রতিমাশিল্পীপরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছিলাম। প্রথমে অন্যের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছি। এখন নিজেই প্রতিমা তৈরি করি। এই কাজ করেই সংসার ভালোভাবে চালাতে পারছি।শ্রীকান্ত বলেন, ‘পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছিলাম। প্রথমে অন্যের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছি। এখন নিজেই প্রতিমা তৈরি করি। এই কাজ করেই সংসার ভালোভাবে চালাতে পারছি।’
প্রতিমায় মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন কারিগর শ্রাবণ শীল। গত শনিবার বিকেলে শেরপুর শহরের বারোদুয়ারি হাটখোলার পাশেসারা বছরই কাজ
শ্রীকান্তের ব্যস্ততা শুধু দুর্গাপূজায় সীমাবদ্ধ নয়। লক্ষ্মী, কালী, সরস্বতী, গণেশ, বিশ্বকর্মা ও মহাদেবের প্রতিমাও বানান তিনি। সারা বছর নানা পূজায় কাজ থাকে, তবে দুর্গাপূজার আগে চাপ বাড়ে কয়েক গুণ। গত বছর ২০টি দুর্গা প্রতিমা বানিয়েছিলেন। এবারও নিয়েছেন একইসংখ্যক কাজ। আকার, নকশা ও কাজের ধরন অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিমার দাম ৩০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকার বেশি। শ্রীকান্তের ভাষ্য, উপকরণের দাম বাড়লেও সে তুলনায় প্রতিমার দাম তেমন বাড়েনি।
একার পক্ষে এত কাজ সামলানো কঠিন। শ্রীকান্তের তাই আটজন সহকারী আছেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও অভিজ্ঞ শ্রমিক দুই-ই আছেন। কাজের ধরন অনুযায়ী তাঁদের দৈনিক পারিশ্রমিক ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা।
সহকারীদের একজন এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সৈকত সরকার (১৯)। তিনি দক্ষিণ সাহাপাড়ার বাসিন্দা। এই কাজ করে দিনে পান ৩০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘প্রতিমা তৈরির কাজ করে যে টাকা পাই, তা আমার লেখাপড়ার খরচ চালাতে অনেক উপকারে আসে।’
শ্রীকান্তের কাছে প্রতিমা তৈরি শুধু জীবিকা নয়, নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের জায়গাও। প্রতিটি প্রতিমা সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে তাঁকে সময় দিতে হয়, নজর রাখতে হয় খুঁটিনাটি বিষয়ে।
উত্তর সাহাপাড়ার লিটন দাস (৩২) ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বেলতা গ্রামের পলাশ সরকার (৩৫) দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন। এই আয়ে তাঁদের সংসারের খরচ মেটে। দুর্গাপূজার পাশাপাশি অন্য পূজার প্রতিমা বানিয়েও তাঁরা রোজগার করেন।
গড়ে তুলেছেন চার কারিগর
শ্রীকান্তের গল্প শুধু নিজের সচ্ছলতায় থেমে নেই। তাঁর কাছে কাজ শিখে আরও চারজন কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন দক্ষিণ সাহাপাড়ার শ্রাবণ শীল (২০), শহরের সকাল বাজার এলাকার শোভন ঘোষ (২০), নন্দীগ্রাম উপজেলার সজীব সরকার (২২) এবং জামালপুরের মাদারগঞ্জের রাজিব দাস (৪০)। একসময় শ্রীকান্তের সহকারী ছিলেন সবাই। প্রায় দুই বছর ধরে তাঁরা নিজেরাই প্রতিমা বানাচ্ছেন।
শেরপুর শহরের বারোদুয়ারি হাটখোলার পাশে প্রতিমা তৈরি করেন শ্রাবণ শীল। তিনি জানান, ২০২৫ সালের শারদীয় দুর্গোৎসবে তিনি আটটি প্রতিমা বানিয়েছিলেন। এবারও নিয়েছেন আটটি প্রতিমা তৈরির কাজ। সব খরচ বাদ দিয়ে এবার দুর্গাপূজায় দেড় লাখ টাকার মতো আয়ের আশা করছেন তিনি।
কাজে মগ্ন শ্রীকান্ত সরকার। গত শনিবার বিকেলে শেরপুর শহরের দক্ষিণ সাহাপাড়ার ষোলআনা মণ্ডপেশুধু জীবিকা নয়, শিল্পের টান
শ্রীকান্তের কাছে প্রতিমা তৈরি এখন শুধু জীবিকা নয়, নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের জায়গাও। প্রতিটি প্রতিমা সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে তাঁকে সময় দিতে হয়, নজর রাখতে হয় খুঁটিনাটি বিষয়ে। দুর্গাপূজার আগে নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা পৌঁছে দিতে তাঁকে ও সহকারীদের দিনরাত খাটতে হয়।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের শেরপুর উপজেলা কমিটির সদস্যসচিব বাঁধন কুমার কৃষ্ণ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের উপজেলা কমিটির সভাপতি বিদ্যুৎ সরকার এবং উপজেলা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক জয়কিশোর মুন্সী জানান, শেরপুরে এবার ৯৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে। এসব মণ্ডপের প্রতিমা গড়তে লাগে শ্রীকান্তের মতো কারিগরদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। প্রতিমা তৈরিতে শ্রীকান্ত সরকারের দক্ষতা আছে। নিজের শেখা বিদ্যা ছড়িয়ে দিয়ে অন্যদের জন্যও তিনি তৈরি করেছেন কর্মসংস্থান।