সংগ্রাম থেকে উত্তরণের স্বপ্ন

· Prothom Alo

পাহাড়ের সৌন্দর্য।

আমরা যেখানে সামান্য অসুস্থ হলেই কাছের হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাওয়ার সুযোগ পাই, সেখানে একটি জীবন বাঁচানোর জন্য একজন মানুষকে কাঁধে করে কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়। এরপর নদীপথে আরও কয়েক ঘণ্টার যাত্রা। পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে এমন অসংখ্য কষ্টের গল্প লুকিয়ে আছে, যা একজন পর্যটক কয়েক দিনের ভ্রমণে সহজে বুঝতে পারে না।

শুভকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বড় হয়ে কী হতে চায়। উত্তরে বলেছিল, ডাক্তার হতে চায়। তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডাক্তার হতে চাও কেন?’ তার উত্তর ছিল, নিজের বোন যেভাবে চিকিৎসার অভাবে সময়মতো সেবা না পেয়ে মারা গেছে, সে চায় ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে অন্য কারও জীবন বাঁচাতে।

Visit newsbetting.cv for more information.

গত পর্বে আমরা জেনেছিলাম, পাহাড়ি কিশোর শুভর নিজের বোন চিকিৎসার অভাবে পথেই মারা গিয়েছিল, যে খবর শুনে আমরা সবাই হয়ে পড়েছিলাম স্তব্ধ। এবার জানা যাক, এ ঘটনা তার জীবনে ঠিক কী প্রভাব ফেলেছিল।

একজন ক্লাস টেনে পড়া পাহাড়ি কিশোরের এই স্বপ্ন আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। হয়তো তার বোনকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই শোকই তার ভেতরে নতুন একটি স্বপ্ন তৈরি করেছে, অন্যের জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, শুভর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন শুধু তার ব্যক্তিগত নয়; এই স্বপ্ন পাহাড়ের মানুষের বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।

জিন্নাপাড়া ও আশপাশের পাহাড়ি জনপদের মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক। তাঁরা এই দেশেরই অংশ। তাঁদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা ও জীবনধারা বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। আর পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক যায়। পর্যটনকে কেন্দ্র করেই পাহাড়ের অনেক মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা, খাবারের ব্যবস্থা করা, পথ দেখানো, গাইড হিসেবে কাজ করা—এসবই তাঁদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরে এসেছি মানুষের গল্প নিয়ে।

আমরা যারা পাহাড়ে ভ্রমণ করতে যাই, আমাদের নিরাপদে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে শুভর মতো অসংখ্য পাহাড়ি তরুণ কাজ করে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। যে পাহাড় শীতকালে সুন্দর ও শান্ত মনে হয়, বর্ষায় তা হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। পাহাড়ধস, দুর্গম রাস্তা ও সাঙ্গু নদীর তীব্র স্রোতের কারণে অনেক অঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক সময় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও স্থবির হয়ে পড়ে। এই সময়ে পর্যটনও সীমিত বা বন্ধ থাকে। ফলে যাঁদের জীবিকা মূলত পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়েন।

এ কারণে পাহাড়ি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত ধাত্রীবিদ্যা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় করা যেতে পারে। দুর্গম এলাকাগুলোতে কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার। বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনী বা অন্যান্য সংস্থার উদ্যোগে পাহাড়ি এলাকায় মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালিত হয়। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও নিয়মিত করা গেলে দুর্গম এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

পাহাড় শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়। পাহাড় মানুষেরও বাড়ি।

পাহাড়ি মানুষের জীবনের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সরাসরি জড়িত। একটি ভালো যোগাযোগব্যবস্থা শুধু ভ্রমণ সহজ করে না; এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও জরুরি সেবার সুযোগও বাড়ায়। তবে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন অবশ্যই এমনভাবে করতে হবে, যাতে পাহাড়ের প্রকৃতি ও পরিবেশ অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পর্যটন খাতেও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় গাইডদের আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে—বিশেষ করে পর্যটকদের নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে। পাহাড়ে ভ্রমণে আসা পর্যটকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অবৈধ বা নিষিদ্ধ রুটে ভ্রমণ, বিশেষ করে বর্ষাকালে বিপজ্জনক এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা, শুধু নিজের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষ ও উদ্ধারকর্মীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

যেহেতু পর্যটন অনেক পাহাড়ি পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, তাই অফ-সিজন বা ভ্রমণ সীমিত থাকার সময় পর্যটননির্ভর মানুষের জন্য প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তাদের স্থানীয় পণ্য ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে টেকসই অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করা সম্ভব। আমাদের উন্নয়নের মূলধারায় পাহাড়ি মানুষদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির সময় তাঁদের জীবন, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন শুধু রাস্তা বা স্থাপনা নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন হলো মানুষের প্রয়োজনকে বুঝে তার জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধান করার চেষ্টা।

বন্ধুদের সঙ্গে।অন্ধকার পাহাড়পথ ও শুভর নীরব ভালোবাসা

জিন্নাপাড়ায় কয়েক দিনের ভ্রমণ আমাকে শুধু নতুন কিছু পাহাড়, ঝরনা ও খুম দেখায়নি। এই ভ্রমণ আমাকে পাহাড়ের মানুষের জীবনকে অন্যভাবে দেখতে শিখিয়েছে। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরে এসেছি মানুষের গল্প নিয়ে। দেবতা পাহাড়ের খাড়া ঢাল, আমিয়াখুমের জলধারা, ভেলাখুমের সবুজ পানি কিংবা পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা দূরের অসংখ্য পাহাড়—সবই আজও স্মৃতিতে। এই সব সৌন্দর্যের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে শুভর কথা।

ক্লাস টেনে পড়া সেই কিশোর, যে আমাদের ফেলে দেওয়া ময়লা কুড়িয়ে পাহাড় পরিষ্কার রাখে; যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ি পথে হাঁটলেও ক্লান্ত হয় না; যে নিজের অসুস্থ বোনকে চিকিৎসার জন্য কাঁধে করে পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়ার করুণ বাস্তবতা দেখেছে; আর যে বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়—যাতে আর কোনো মানুষকে হয়তো তার বোনের মতো সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে হারিয়ে যেতে না হয়। আমার কাছে এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন হয়তো কোনো ছবি নয়। সবচেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন শুভর সেই স্বপ্ন।

আমিয়াখুম জলপ্রপাতে।শহরবন্দী মেঘমালা জপে, মোদের তৃষিত চোখ

পাহাড়কে আমরা অনেক সময় শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখি। পাহাড়ে যাই, ছবি তুলি, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করি এবং ফিরে আসি। কিন্তু পাহাড়ের মানুষ থেকে যায় সেখানেই—আমাদের ছবির পেছনের সেই পাহাড়ে, প্রতিদিনের সংগ্রাম নিয়ে।

পাহাড় শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়। পাহাড় মানুষেরও বাড়ি। সেই মানুষগুলোর জীবনকে আরও নিরাপদ, সম্মানজনক ও উন্নত করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার।

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source