বিউপনিবেশায়নের নয়া-আধিপত্যবাদী আত্মসাৎ
· Prothom Alo

সারকথা
জনপরিসর ও বিদ্যায়তনিক নানা আলাপচারিতায় সাম্প্রতিক কালে তথাকথিত ক্রিটিক্যাল থিওরির চিন্তার প্রসার ঘটেছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই প্রসারের বনিয়াদের পাটাতন যদি খোঁজার চেষ্টা করা হয় এবং যাঁরা এসব চিন্তার উল্লেখ করে বা চিন্তকদের উদ্ধৃত করে নানা বয়ানবাজি করেন, তাঁদের তৎপরতার দৃশ্যমান চেহারা ও স্বরূপ খুঁজতে গেলে বিস্ময়করভাবে দেখা যায়, এসব চিন্তাধারা উদ্দিষ্ট প্রকল্পের পুরোপুরি বিপরীত। জ্ঞানের ও চৈতন্যের ওপর অব্যাহতভাবে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের প্রভাব, নতুন ডিজিটাল নজরদারি ও এজেন্সিগুলোর নতুন নতুন দমনমূলক কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনার জন্য এসব চিন্তা ও ভাষার বিকাশ ঘটেছে এবং রূপান্তর ঘটে চলেছে। কিন্তু যেসব চিন্তা ও ভাষাব্যবস্থা প্রতিরোধের, লড়াইয়ের আর আধিপত্যের সূক্ষ্ম কৃৎকৌশলের বোঝাপড়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে বিকশিত হয়েছে, সেগুলো এখন শাসনের-নিপীড়নের-আধিপত্য বিস্তারের জ্ঞানকৌশলে যেমন আত্মসাৎকৃত হচ্ছে, তেমনই শাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্যও প্রয়োগ করা হচ্ছে। নয়া উদারনৈতিক ব্যবস্থার পরিসরে হালের দুনিয়ার ক্রমবর্ধমান কট্টরপন্থী পরিচয়বাদী আন্দোলনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রাজনীতিতে এসব উচ্চারণ ও লিখন জ্ঞানতাত্ত্বিক পাটাতন নির্মাণ করে চলেছে। প্রধানত বিভিন্ন অঞ্চলের উত্তর-ঔপনিবেশিক ও বি–উপনিবেশায়নের বিভিন্ন চিন্তক ও চিন্তাধারাকে বিবেচনায় নিয়ে এই প্রবন্ধে এমন স্ববিরোধী আত্মসাৎ-পরিমার্জন-পুনঃপ্রয়োগের প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। চার দশক বা তারও বেশি সময় ধরে উত্তর-উপনিবেশবাদী ও বি–উপনিবেশায়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন চিন্তাধারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে। এসব চিন্তা ও ভাষা বিভিন্ন মুক্তিকামী ও আধিপত্য–প্রতিরোধী লড়াইয়ে প্রভাবও ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট চিন্তকেরাও বিদ্যায়তন ও বাইরের পরিসরে উচ্চারিত ও উদ্ধৃত হতে থাকেন অনেক অঞ্চলেই। কিন্তু কট্টরপন্থী পরিচয়বাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ আর জনতুষ্টিবাদী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বয়ানে বি–উপনিবেশায়ন আর উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাষাব্যবস্থা থেকে বাছাই করা শব্দকে চটকদার বুলিতে পরিণত করা হয়েছে। বয়ানবাজির কারসাজিতে গভীর পর্যালোচনাকে জনতুষ্টিবাদী–কর্তৃত্ববাদী বয়ানে সংকুচিত করে ফেলার কিছু সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন এই প্রবন্ধে প্রস্তাব করা হয়েছে।
Visit chickenroad.qpon for more information.
পটভূমি: মুক্তিকামী চিন্তা ও বয়ানের ডিগবাজি
আমরা যদি বিংশ শতাব্দীর দিকে তাকাই, বিশেষ করে শেষার্ধে, তাহলে দেখব বিশ্বজুড়ে চিন্তার জগতে এক বিশাল তোলপাড় হচ্ছে। এই সময়েই উত্তর-ঔপনিবেশিক এবং বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বগুলোর জন্ম হয়েছিল। এই তত্ত্বগুলো যখন এসেছিল, তখন তা কেবল কিছু শুকনো একাডেমিক আলোচনা হিসেবে আসেনি; এগুলো এসেছিল মানুষের মুক্তির এক বিশাল প্রতিশ্রুতি বা প্রজেক্ট হিসেবে। এই তত্ত্বগুলোর পেছনের মূল উদ্দেশ্যটা কী ছিল? এদের উদ্দেশ্য কিন্তু খুব সাধারণ বা ভাসা ভাসা ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসন বা সাম্রাজ্যবাদের যে উত্তরাধিকার, সেটাকে এই তত্ত্বগুলো চিহ্নিত করে, পর্যালোচনা করে ও বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধের নতুন তরিকা খোঁজার চেষ্টা করছিল। এমনই অনেক চিন্তা ঔপনিবেশিকতার নানাবিধ প্রকট ও প্রচ্ছন্ন উপস্থিতিকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, সাম্রাজ্যের ও উপনিবেশের এই ‘উত্তরাধিকার’ বলতে আসলে কী বোঝায়? এটা কেবল চোখের সামনে দেখা ঔপনিবেশিক শাসকদের (যেমন ব্রিটিশ প্রশাসক, ম্যাজিস্ট্রেট বা তাদের সেনাবাহিনীর) শারীরিক উপস্থিতিকে হটিয়ে দেওয়া নয়। ব্রিটিশরা বা ফরাসিরা বা স্প্যানিশরাসহ ‘পশ্চিমারা’ চলে গেছে। তাদের সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে গেছে। এটুকুই যথেষ্ট নয়। আসল সমস্যাটা আরও গভীরে। ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান বা খাতা-কলমে স্বাধীনতা পাওয়ার পরেও আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র এবং মনের ভেতরে একধরনের অদৃশ্য অথচ সর্বগ্রাসী কাঠামো থেকে গিয়েছে। তাত্ত্বিকেরা একে বলছেন ‘ঔপনিবেশিকতা’। এই কাঠামো অত্যন্ত ছলনাময় এবং অশুভ। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের মূল লক্ষ্য ছিল এই অদৃশ্য কাঠামোটিকেই ভেঙে ফেলা।
এই তত্ত্বগুলো আমাদের হাতে অবিচারের আসল স্বরূপটা চিনতে পারার জন্য এক শক্তিশালী ভাষা বা চশমা তুলে দিয়েছিল। আগে ভাবিনি এমন কিছু ধারণা তারা আমাদের শিখিয়েছিল। যেমন ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা’ (epistemic violence), অর্থাৎ জ্ঞান তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যেই কীভাবে অন্যকে ছোট করা বা মুছে ফেলার হিংস্রতা লুকিয়ে থাকে। কিংবা ধরা যাক ‘ক্ষমতার ঔপনিবেশিকতা’, অর্থাৎ ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, তার ঔপনিবেশিক ধরন। অথবা ‘ইউরোপকেন্দ্রিক জিরো পয়েন্ট বা শূন্য বিন্দুর’ ধারণা অর্থাৎ পশ্চিম বা ইউরোপই দুনিয়ার কেন্দ্রে, যেখানকার অবস্থানে দাঁড়িয়ে পশ্চিমারা দাবি করে তাদের জ্ঞান নিরপেক্ষ এবং সকলের জন্য ধ্রুব সত্য। উত্তর–ওপনিবেশিক তাত্ত্বিক কাঠামোগুলো পশ্চিমা আধুনিকতার প্রবল দাপটকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। পশ্চিমা আধুনিকতাই একমাত্র সঠিক এবং বিশ্বজনীন রাস্তা ও গন্তব্য হওয়ার যে স্বতঃসিদ্ধ দাবি, এই তত্ত্বগুলো সেই হেজেমনিক ও আধিপত্যবাদী দাবিকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল। সেগুলো আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল এমন একটি পৃথিবীর, যেটি ‘প্লুরিভার্স’ বা ‘বহুবিশ্বের দুনিয়া’ হয়ে উঠবে। সোজা কথায়, সেটি হয়ে উঠবে এমন এক পৃথিবী, যেখানে একটিমাত্র বিশ্ববীক্ষা ছড়ি ঘোরাবে না; বরং যেখানে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন পৃথিবী বা বিশ্ববীক্ষা একে অপরের ওপর খবরদারি না করেই একসঙ্গে টিকে থাকতে পারবে।
কিন্তু এখন একটা অনেক বড় সমস্যা ও সংকটের মুখোমুখি আমরা। নয়া-উদারনৈতিক জমানায় আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীর অনেকটাই অতিক্রম করেছি। আর যত সময় যাচ্ছে, ততই একটা অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর উল্টোচিত্র বা প্যারাডক্স আমাদের সামনে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন এই উত্তর-ঔপনিবেশিক ও বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বগুলো ছিল লড়াই-সংগ্রামের হাতিয়ার। সমাজের প্রান্তে থাকা র্যাডিক্যাল অ্যাকটিভিস্টরা এগুলো ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন দিন বদলে গেছে। এখন এই তত্ত্বগুলো আর প্রান্তিক নেই। এগুলো এখন বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে, বিশাল প্রকাশনার কারখানায়, মূলধারার রাজনীতিতে, ডিজিটাল সমান্তরাল যাপনে এবং সাধারণ মানুষের পপুলার আলোচনায় একেবারে কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী, রাশিয়ার জাতীয়তাবাদী, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগড়িষ্ঠতাবাদী-পরিচয়বাদী বিভিন্ন বয়ানবাজিতে আর আধিপত্যবাদী তৎপরতায় উত্তর-ঔপনিবেশিক এবং বি–উপনিবেশায়নের বিভিন্ন বয়ান রাষ্ট্রীয় ও নৈরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পরিসরে বিভিন্ন স্বরে ও মাধ্যমে উচ্চারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জনপরিসরে ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরেও বিচিত্রভাবে এই বয়ানের সংশ্লেষ দৃশ্যমান। ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার আপাত দৃশ্যমান প্রতিরোধেও এসব বয়ান হাজির থাকছে। তেমনই ওই ব্যবস্থাগুলোর আধিপত্য জারি রাখার জন্যও ওই বয়ানবাজি চটকদার এবং ভারী ভারী বুলির কারিকুরির কারসাজিতে আত্মীকৃত ও ব্যবহৃত হচ্ছে। আপাত পরস্পরবিরোধী এমন আত্মীকরণ কেবল রাষ্ট্রীয় কিংবা বহুজাতিক সংস্থা অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই ঘটছে না; জনপরিসরের জনতুষ্টিবাদী বয়ানবাজিতে বিবদমান পক্ষগুলোও এই ভারী ভারী চটকদার বয়ান রপ্ত করে প্রয়োগ করছে। একটা উদাহরণ দিই। ২০১৭ সালে ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, ক্ষমতাশীল ভারতীয় জনতা পার্টিসহ বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী ও নয়া-হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গ ‘মননের বি–উপনিবেশায়ন’ শিরোনামে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে।
শুনতে হতবুদ্ধিকর মনে হলেও ওই সম্মেলনে হিন্দুত্ববাদী থিংকট্যাংকগুলোর অন্যতম সদস্য অধ্যাপক রাকেশ শর্মা উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তার অন্যতম দুজন প্রভাবশালী তাত্ত্বিকের উল্লেখ করেন (সিনহা ২০১৭)। দীপেশ চক্রবর্তী আর গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের চিন্তা থেকে বাছাই করে বি–উপনিবেশায়নের ভাষা ও ভাবনা গ্রহণ করার আহ্বান জানান। হিন্দু ভারতীয় চিন্তার মাধ্যমে নতুন করে পশ্চিমকে উপনিবেশায়িত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উত্তর-উপনিবেশবাদী ভাবনাচিন্তা ভারতের প্রাক্-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যগুলো বুঝতে আর ইউরোপকে প্রভিনশিয়ালাইজ করতে সাহায্য করে। তিনি নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চায় কীভাবে ভারতীয় প্রাক্-ঔপনিবেশিক হিন্দু চিন্তার সংশ্লেষ চিহ্নিত করা সম্ভব, তা–ও বলেন। কিন্তু তিনি দীপেশ চক্রবর্তী ও গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে ‘চালাক মার্ক্সবাদী’ আখ্যায়িত করে সতর্ক থাকার কথাও বলেন।
ভারতের নয়া-হিন্দুত্ববাদী তত্ত্বায়ন আর জনপরিসরের বয়ানবাজিতে বি–উপনিবেশায়নের আর উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব ও বয়ানের বিভিন্ন ধারণা ও বনিয়াদি ধারণা ও পরিভাষাকে আত্মসাৎ করায় এসব প্রবণতা প্রবলভাবেই হাওয়াল বুলির কারিকুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, এমন বয়ানবাজি ও ভারী ভারী বুলির ব্যবহার পৃথিবীর বিভিন্ন উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সমাজে যেমন প্রবল হয়ে উঠেছে, তেমনই বহুজাতিক বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি সংস্থাসহ রাষ্ট্রান্তরী (ট্রান্সন্যাশনাল) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নয়া-উদারনৈতিক ব্যবস্থায়ও জনপ্রিয় রসদে পরিণত হয়েছে। এখানে একটি তর্ক যুগ্ম-বৈপরীত্যমূলকভাবে (বাইনারি হিসেবে) আলাপ করা হয়: তত্ত্বের সমস্যা নাকি তত্ত্বের ব্যবহারের সমস্যা (অনেকটা বিজ্ঞান নিয়ে একসময়ের বিতর্কের মতো। আণবিক বোমা বা নতুন নতুন হাতিয়ার প্রযুক্তি কি বিজ্ঞানের বা বৈজ্ঞানিকদের সমস্যা নাকি বিজ্ঞান যারা ব্যবহার করছে হত্যা ও ধ্বংসের জন্য, তাদের সমস্যা?)
কেউ কেউ মনে করেন, প্রকৃত সমস্যা তত্ত্বায়ন, বয়ান এবং চর্চার না; বরং সেই চিন্তা ও চর্চাকে কীভাবে কারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করছেন, সেটা বিশ্লেষণ করতে হবে। আর বি–উপনিবেশায়নের বা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বায়নের দুনিয়া সমরূপ নয়, একশিলা নয়। বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় জারিত হয়ে নানা ধারা বিকশিত হয়েছে। এমনকি একজন চিন্তকের চিন্তাভাবনাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিধ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। কোনো চিন্তককে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে অথবা কোনো চিন্তাধারাকে হরেদরে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে পুরো বি–উপনিবেশায়ন ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বায়নের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাবকে খারিজ করা বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধও বটে। ওপরে উল্লিখিত দীপেশ চক্রবর্তী বা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক উভয়েই ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কঠোর সমালোচক। সুতরাং তাঁদের হিন্দুত্ববাদীদের মিত্র বা সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করাটা জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থীদের অন্য একটি ধারার সমালোচনা হিসেবেও দেখেন এই পক্ষের চিন্তকেরা। জনতুষ্টিবাদী উগ্রপন্থী চিন্তাধারার বিভিন্ন উদাহরণ টেনে তাঁরা দাবি করেন, ধ্রপদি ফ্যাসিবাদ বা নাৎসিবাদ অথবা উগ্র জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন মতবাদ ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই প্রতিপক্ষ ও বিরোধী চিন্তাভাবনা থেকে বাছাই করে আত্মসাৎ করছে। একই সঙ্গে তাঁদেরসহ অন্যান্য উত্তর-উপনিবেশবাদী ও বি–উপনিবেশায়নের তাত্ত্বিকদের চিন্তাকে একরৈখিকভাবে ও বাছাই করে পাঠ করার কথা উল্লেখ করে এই পক্ষ বলেন, তাঁদের চিন্তার মধ্যেই একধরনের আত্মপর্যালোচনা ও পরিমার্জনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অন্যদিকে আরেক দল মনে করেন, বি–উপনিবেশায়ন আর উত্তর-ঔপনিবেশিক বিভিন্ন ধারার কোনো কোনো প্রবণতা ও কাঠামোগত তত্ত্বীয় দুর্বলতা সেগুলোকে প্রতিপক্ষের দ্বারা ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। যে সর্বগ্রাসবাদী এবং নৈমিত্তিকতার যাপনে আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করার উদ্দেশ্যে এই চিন্তাধারাগুলোর বিকাশ ঘটেছে, সেই আধিপত্য আর নিপীড়নের মতবাদগুলোই বিভিন্নভাবে আত্মসাৎ করছে চিন্তাধারাগুলোর দুর্বলতার কারণে। ভাষাগত দুর্বোধ্যতা, বয়ানকেন্দ্রিকতা আর আখ্যানকে যাপিত বাস্তবতার গঠনকারী হিসেবে হাজির করাটাও দৈনন্দিন ও পার্থিব যাপনের জটিলতা থেকে এসব তত্ত্বকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। ভারতের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইভি-লীগ বিদ্যায়তনে দাপুটে ট্রেন্ড হয়ে ওঠায় ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার হালফ্যাশনের হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েও তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতা ও চর্চার বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন তত্ত্বায়নকে বনেদি ও ভদ্রবিত্তীয় হেজিমনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে উত্তর-উপনিবেশবাদ ও বি–উপনিবেশায়নের নানামুখী তত্ত্ব আর তত্ত্বগুলো প্রসঙ্গে তর্ক–বিতর্ক নিয়ে কোনো সরল সিন্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। উদ্দেশ্য, তরিকা ও পরিণতি নিয়ে এই প্রবন্ধের আলাপে আমি উপর্যুক্ত দুই পক্ষের কোনো পক্ষকেই আপাতত ঠিক বা বেঠিক হিসেবে ঠাহর করতে চাই না। এই প্রবন্ধে আমি মনোযোগ দিতে চাই: প্রথমত, তত্ত্বায়নের বহুবিধ ধারা ও সেগুলোর ঐতিহাসিকতার দিকে; দ্বিতীয়ত, কিছু তর্ক-বিতর্ক ও সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে সংক্ষেপিতভাবে বোঝাপড়া তৈরি করার দিকে; তৃতীয়ত, কর্তৃত্ববাদী আর কট্টর পরিচয়বাদী রাজনীতিতে আর সাংস্কৃতিক সংঘাতের ভয়াবহ পরিস্থিতি বি–উপনিবেশায়ন/উত্তর-উপনিবেশবাদী ভাষা ও চিন্তার ক্রমবর্ধমান আত্মীকরণ ও প্রভাবকে স্বীকার করে কিছু প্যাটার্নকে চিহ্নিত করার দিকে।
পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উত্তর-উপনিবেশিকতা ও বি–উপনিবেশায়ন প্রসঙ্গে তাত্ত্বিক বিতর্ক বেশ আগেই শুরু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আইজাজ আহমেদ, আরিফ দির্লিক এবং সুমিত সরকারের কাজে এই ইঙ্গিতগুলো মেলে। তাঁদের মতে, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রসঙ্গগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার কারণে শ্রেণিগত, লিঙ্গীয়, নরবর্ণগত রাজনীতির ও অর্থনীতির বহুমাত্রিক বৈষম্য, একচেটিয়া লুটপাট এবং প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ দখলের জন্য সহিংসতার বোঝাপড়া হয় দুর্বল, নয়তো আড়াল হয়ে যায়। পরিণামে আদিবাসী, দলিত, ভবঘুরে, শ্রমিক ও কৃষকদের ওপর জারি থাকা পুঁজিবাদী ও বহুজাতিক করপোরেশন ও অলিগার্কদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো আশাবাদ এই তত্ত্বগুলোতে থাকে না। পাশাপাশি তাদের এই সমালোচনারও প্রতিসমালোচনা হয়েছে। যেমন দির্লিকের সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে আর অর্থনীতিকেন্দ্রিক সংকোচনবাদী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আহমেদের সমালোচনাকে কঠোর মার্ক্সবাদী হিসেবে যেমন চিহ্নিত করা হয়েছে, তেমনই আবার মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আর বি–উপনিবেশায়নের তত্ত্বায়নের মধ্যে দ্বন্দ্ব হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার আহমদের সমালোচনাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকেরা নানাভাবে আত্মীকরণ করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। মোটাদাগে বলা যায়, উত্তর–উপনিবেশবাদ, নিম্নবর্গের ইতিহাসতত্ত্ব বা বি–উপনিবেশায়নের তত্ত্বকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও বস্তুগত দশার বাস্তবতা বোঝার ব্যর্থতা, শ্রেণিগত প্রশ্নকে গৌণ করা এবং ইতিহাস বোঝাপড়ার পদ্ধতিগত প্রশ্নে সমালোচনা করা হয়েছে (আলহোজারভি ২০২১; আহমদ ১৯৯৩; গার্গ ২০২৩; ডারলিক ২০১৮; ডেভিস ও ব্যোমার ২০১৮; ল্যাজারাস ১৯৯৩; সরকার ২০০২; হাং ২০১৪; হোমার ও কেলনার ২০০৪) আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে বিবেচনা করলে লক্ষ করা যায়, পর্যালোচনামূলক ধারায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠা অনেক চিন্তক ও গবেষক আত্মপর্যালোচনা করছেন। পার্থিব দুনিয়াদারির পাশাপাশি চৈতন্যগত দশাগুলোতেও যাঁদের চিন্তাভাবনা সমস্যায়িত করেছিল, প্রতিরোধের বহুবিধ পরিসরকে মোকাবিলার প্রস্তাব পেশ করেছিল, তাঁদের অনেকেই বিহ্বল হয়ে পড়েছেন। তাঁরা ভীষণ জোরালোভাবে সতর্ক করছেন। তাঁরা বলছেন, এখনকার পরিচয়বাদী অথবা সত্তার রাজনীতিতে বি–ঔপনিবেশিক বুলিগুলোকে কখনো কোনো বাছবিচার ছাড়া অথবা কখনো বাছাই করে (চেরিপিক) আত্মসাৎ করা হয়। যেসব চিন্তা সত্তাশ্রয়ীতা (সাবজেকটিভিটি) ও নৈর্ব্যক্তিক (অবজেকটিভ) বাস্তবতার মিথস্ক্রিয়ার পরিসরে ঔপনিবেশিকতার জারি থাকাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তাঁরাই দেখছেন যে কীভাবে তাঁদেরই চিন্তা, ভাষা ও অভিব্যক্তি হাইজ্যাক করা হচ্ছে। সত্যোত্তর এক বাস্তবতা বিকশিত হয়েছে। বৈশ্বিক মাত্রা ও সুনির্দিষ্টতার স্থানিকতার মাত্রার ভেদরেখা মুছে ফেলার বি–ঔপনিবেশিক দাবির পাশাপাশি সাপেক্ষিকতাবাদী উচ্চারণগুলোও সহিংসতা, বিদ্বেষ ও নিপীড়নকে জায়েজ করে তুলছে। এই পরিস্থিতি ভয়াবহ। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা, বিদ্বেষ আর বৈষম্যকে আড়াল করার এবং মানুষকে চৈতন্যগতভাবে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার জন্য এই তত্ত্বায়নগুলোকে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মর্মান্তিক, নিরাশার আর ভয়ংকর।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করি। যেমন জটিল ও বহুস্তরায়িত নিপীড়ন-আধিপত্য-সম্মতি-সহিংসতা-আনুগত্য-প্রতিরোধের বোঝাপড়ার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করার যে পদ্ধতিগুলো তৈরি হয়েছিল নিম্নবর্গীয়/মজলুমীয় বা দমিত মানুষের সত্তাকে প্রকট ও প্রচ্ছন্ন অধস্থনতা থেকে মুক্ত করার জন্য, সেগুলোকে এখন উল্টো পথে কাজে লাগানো হচ্ছে। এখন এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে আত্মপরিচয়/অপরের পরিচয়ের নির্মাণের চতুর প্রক্রিয়ায় আরও কট্টর বা অনড় করে তোলার জন্য। ধর্ম বা সম্প্রদায় পরিচয়কেন্দ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী দৌরাত্ম্য, দখল ও কর্তৃত্বের নতুন নতুন প্রকরণের স্বাভাবিকীকরণের আর যৌক্তিকীকরণের কাজে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, বহুজাতিক সংস্থার একচেটিয়া বাণিজ্য, প্রকৃতির ওপর দখল ও ভোগবাদিতাকে স্বাভাবিক করে তোলার প্রক্রিয়ায়। ‘আমার জাতিই শ্রেষ্ঠ’, ‘আমার সম্প্রদায় হাজার বছর ধরে ভিকটিম ও মজলুম। তাই আজকে আমাদের পরিচালিত আধিপত্য ও নিপীড়ন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ’ বা ‘আমার অতীত গৌরব আর বীরত্বের; তোমরা নিকৃষ্ট কারণ তোমরা আমাদের সেই গৌরব ও বীরত্বকে ধ্বংস করেছ’, ‘আমাদের পবিত্র বাসভূমিকে দূষিত করেছ তোমরা’। ‘আমরা উৎকৃষ্ট আর তোমরা নিকৃষ্ট, জালিম। আমাদের এখনকার শাসন ও আধিপত্য তাই যৌক্তিক; তোমাদের প্রতিবাদ তাই অযৌক্তিক ও অন্যায্য’—এমন বয়ান জনপরিসরে প্রতিনিয়ত প্রণালিবদ্ধভাবে ছড়ানো হয়। বি–ঔপনিবেশিক আর উত্তর-ঔপনিবেশিক বয়ানের বাছাইকৃত অংশ ও শব্দ ডিজিটাল ও অ্যালগরিদমিক পরিসরে নয়া (অপর) বাস্তবতায় মিম, ট্রল, ‘চটকদার গালভরা ফাঁপা-বুলি’ বা বাজওয়ার্ড হিসেবে হাজির হতে থাকে জনপ্রিয়তার কারণে। বুদ্ধিজীবিতার পরিসরে মর্যাদার সূচক হয়ে দাঁড়ায় এসব বুলির বারবার উচ্চারণ। প্রতিরোধের শব্দ (যেমন: অধিকার কিংবা হক, বি–উপনিবেশায়ন, ঔপনিবেশিক জ্ঞান, বাইনারি, নিম্নবর্গ/মজলুম, পশ্চিম, আধিপত্য ইত্যাদি) হয়ে ওঠে হয় শাসনের, নজরদারির আর প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণের জন্য, অথবা বিদ্যায়তনিক কারখানায় সাফল্য অর্জনের জন্য। আমরা এই দর্শন ও শ্রবণের দাসে পরিণত হই। প্রতিরোধ করছি ধরে নিয়ে এমন তৎপরতাকে ঠিক মনে করি, গ্রহণ করি, ছড়িয়ে দিই। সরব ও নীরব সম্মতি দিতে থাকি সহিংসতা ও শাসনকে। সংখ্যাগুরুরা তাদের পরিচয়ের আখ্যান, দাপট ও রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে পবিত্র বা প্রশ্নাতীত বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে এই বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বের ভাষা, অভিব্যক্তি, আবেদন ও বৈপ্লবিক সংবেদন। ভাসা ভাসা ভাবে বিভিন্ন বয়ান স্লোগানের মতো করে বারবার উচ্চারণ করে জাতীয়তাবাদী ও আধিপত্যবাদী পরিচয়বাদকে গঠন করে ও উসকে দিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার এই কার্যক্রম বেশ সফলও বলা যায়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কুশীলবদের সঙ্গে সম্মিলিত হয়েছে অসম্ভব ক্ষমতাবান ও ধনী গোষ্ঠীগুলো, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র আর বহুজাতিক করপোরেশনের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনা। এই পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই হতবুদ্ধিকর আর স্বাভাবিক যুক্তি-বুদ্ধিকে বেসামাল করে দেওয়ার দশা তৈরি করেছে।
তাত্ত্বিক ভিত্তি: বি–ঔপনিবেশিক বিকল্প
বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্ব কীভাবে কারও হাতের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে, সেটা যদি আমরা বুঝতে চাই তবে সবার আগে আমাদের আলাপ করা দরকার এই তত্ত্বায়নগুলোর মূল ধারণাগুলোর শক্তিমত্তা আর স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। এই তত্ত্ববিশ্ব অথবা প্রস্তাবনাগুলো মূলত উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাবিদদের কাজের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। তাঁরা আধুনিকতার স্বাভাবিকীকৃত ও ধরে নেওয়া ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করেছেন আর এই আধুনিকতার সঙ্গে উপনিবেশের লেপ্টে থাকা সম্পর্ককে চিহ্নিত করেছেন। উপনিবেশের লুটপাট, দখলদারত্ব, গণহত্যা, সহিংসতার পাশাপাশি উপনিবেশের প্রচ্ছন্ন ও অদৃশ্যমান শাসন ও রূপান্তরের বহুমাত্রিকতা আর গভীর বিস্তৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আলো, প্রগতি আর উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখা আধুনিকতার নিচেই যে অন্ধকার গলিঘুঁজি আর গোলকধাঁধাময় দিকটি লুকিয়ে আছে, তার মানচিত্র আঁকতে চেয়েছেন।
উত্তর-ঔপনিবেশিক/বি–উপনিবেশায়নের তত্ত্বগুলোর সম্পর্ক ও ভিন্নতা সম্পর্কে প্রাথমিক বোঝাপড়া তৈরি করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য দরকার। বোঝাপড়া তৈরি করার জন্য আমরা বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তকের সাহায্য নেব। যেমন আশিল এমবেম্বি, হান্না আরেন্ট, ফ্রান্তজ ফানোঁ, এঁতিয়েন বালিবার, দীপেশ চক্রবর্তী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়সহ চিন্তকদের চিন্তার কিছু কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব এরপরের অংশগুলোতে। তাঁদের তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি কীভাবে বি–উপনিবেশায়নের আর উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বায়নের আত্মসাৎকরণ আর জনতুষ্টিবাদী বয়ানবাজিতে কৌশলী চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক করেছে, সে কথাও উল্লেখ করব। এই তত্ত্বগুলোর সঙ্গে আমরা মিলিয়ে দেখব সমসাময়িক বিশ্বের বিশেষ করে ভারত, রাশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা থেকে নেওয়া কিছু বাস্তব উদাহরণ বা কেস স্টাডি। এই সব কিছু মিলিয়ে এই প্রবন্ধে একটি প্রধান প্রস্তাবনা হলো: সমালোচনা বা ক্রিটিক যখন কেবলই একটি অনড় পরিচিতি বা আইডেন্টিটিতে আটকে যায় বা জমে যায়, তখন মুক্তি নিজেই নতুন এক আধিপত্য বা শোষণের রূপ নেওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল পরিসরে পৌনঃপুনিক প্রচারণার মধ্য দিয়ে মুক্তিকামী ও প্রতিরোধমূলক চিন্তা জনপ্রিয় ও পরিপ্রক্ষিতবিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠে। আবার ডিজিটাল পরিসরের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব সেসব ভাষা ও ভাবনাকেই অ্যালগরিদমিক ম্যানিপুলেশন আর বাণিজ্যিক কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে, যেগুলো চটকদার বুলিসর্বস্ব আর ভাষিক কারিকুরির কারসাজিতে/রেটোরিকে সরলীকৃত। বেশ কিছু চিন্তা ও আলাপকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য এই প্রবন্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজাত অ্যাপে (যেমন: জেমিনি) আমার প্রম্পটিং দিয়ে সৃষ্টি করা তথ্যছক (ইনফোগ্রাফ) ব্যবহার করেছি। বিভিন্ন চিন্তকের প্রাসঙ্গিক তত্ত্বায়ন ও সংশয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেবল ইনফোগ্রাফের মাধ্যমে উল্লেখ করেছি।
ক্ষমতার ঔপনিবেশিকতা এবং আধিপত্যের ম্যাট্রিক্স
বি–ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার একদম হৃৎপিণ্ডে রয়েছে পেরুর সমাজবিজ্ঞানী আনিবাল কিহানোর ‘ক্ষমতার ঔপনিবেশিকতার’ (coloniality of power) মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। কিহানো খুব সহজ, কিন্তু গভীর একটি কথা বলেছেন। তাঁর মতে, কোনো দেশ থেকে ঔপনিবেশিক প্রশাসন চলে গেছে বা তাদের শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান হওয়ার মানেই কিন্তু ঔপনিবেশিক সম্পর্কের অবসান হওয়া নয়। বিষয়টা এমন নয় যে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে সব ঔপনিবেশিকতা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল; বরং উপনিবেশবাদ যাওয়ার সময় ক্ষমতার এমন একটি ‘ম্যাট্রিক্স’ বা ছক রেখে গেছে, যা আজও সারা পৃথিবীকে প্রভাবিত করছে।
এই ম্যাট্রিক্স কীভাবে কাজ করে? কিহানো বলছেন, এই জটিল ছক কাজ করে জাতিগত শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে, শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে এবং জ্ঞানের উঁচু-নিচু বাছবিচারের (heirarchy of knowledge) মাধ্যমে (কিহানো ২০০৭)। এই ব্যবস্থা আমাদের প্রতিনিয়ত শেখাতে থাকে ‘যৌক্তিকতা’ এবং ‘সত্য’ পশ্চিমাদের নিজস্ব সম্পত্তি। আর অ-পাশ্চাত্য বা ‘বাদবাকি বিশ্ব’? তাদের স্থান কোথায়? তাদের ঠেলে দেওয়া হয় মিথ, রূপকথা, লোকগল্প বা নিছক উপাত্তের স্তরে। যেন তাদের নিজস্ব কোনো জ্ঞান নেই। তারা কেবল উপাত্তের আধার।
এই ধারণা ছিল আসলেই বৈপ্লবিক। কারণ, ধারণাটি আধুনিকতাকে আলোকায়ন (enlightenment) কোনো পৃথক বা দয়ালু দান হিসেবে দেখে না। আধুনিকতার সঙ্গে ঔপনিবেশিক সহিংসতার ওতপ্রোত বা অবিচ্ছেদ্য লেপ্টালেপ্টিকে কিহানো সামনে নিয়ে আসেন। ওয়াল্টার মিনিওলো এই ভাবনাকে আরও প্রসারিত করেছেন। তিনি নিয়ে এসেছেন ‘ইউরোপকেন্দ্রিক শূন্য বিন্দুর’ (eurocentric zero point) ধারণা। শূন্য বিন্দুটি হলো পশ্চিমাদের এমন ভান, যেন তাদের জ্ঞান বা দেখার ভঙ্গিটি হলো সর্বজনীন, নিরপেক্ষ এবং শরীরহীন। যেন তারা কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থেকে কথা বলছে না। বরং শূন্য থেকে কথা বলছে। তাই তাদের কথাই ধ্রুব সত্য। অথচ, এই ভানের আড়ালে তারা তাদের নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অবস্থানটিকেই লুকিয়ে রাখে (মিনিওলো ২০০৭)।
মুক্তির কৌশল: সীমান্তবর্তী চিন্তন এবং সংযোগ-বিচ্ছেদ
এই আধিপত্যের বিশাল ম্যাট্রিক্সের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাত্ত্বিকেরা প্রতিরোধের কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশলের প্রস্তাব করেছেন। সেসব প্রস্তাবের মধ্যে তিনটি নিচে উল্লেখ করা হলো। এই লেখায় অন্তর্ভুক্ত ছকচিত্রে আরও কিছু প্রস্তাবের কথা আছে। তবে কোনোভাবেই বহুবিধ চিন্তা ও তথ্যের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব এই উদাহরণগুলো করে না।
সীমান্তবর্তী চিন্তন (border thinking): মিনিওলো প্রস্তাবিত এমন চিন্তা ও পর্যালোচনার পদ্ধতির মানে হলো আধুনিক বা ঔপনিবেশিক বিশ্বব্যবস্থার ভেতরের নিয়মে না ভেবে, ব্যবস্থার বাইরে বা সীমান্তে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তা করা। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক কৌশল ইউরোকেন্দ্রিক সর্বজনীনতাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে না। বরং এই চিন্তা ইউরোপকেন্দ্রিকতাকে একটি বৃহত্তর ‘বহুবৈশ্বিক’ (pluriversal) দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্ভুক্ত করে। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো নিম্নবর্গের মানুষ যে জায়গা থেকে কথা বলে, সেই উচ্চারণের স্থানটিকে (loci of enunciation) নিশ্চিত করা এবং মর্যাদা দেওয়া (মিনিওলো ২০০০; ২০০৯; ২০১৭)।
সংযোগ-বিচ্ছেদ (de-linking): এটি সম্ভবত বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আলোচিত ধারণা। সংযোগ-বিচ্ছেদ মানে হলো পশ্চিমা আধুনিকতার যে জ্ঞানতাত্ত্বিক অনুমানগুলো আছে, তার সঙ্গে একটি বিচ্ছেদ ঘটানো। মিনিওলো প্রস্তাবিত এই আলাপে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছেদের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংযোগ–বিচ্ছেদের কথাও রয়েছে। দুনিয়াব্যাপী পুঁজিবাদী নয়া নয়া ব্যবস্থাপনা থেকে বিযুক্ত হওয়ার লড়াই করা এবং পাশাপাশি পরিপ্রেক্ষিতগত পর্যালোচনার মাধ্যমে পুনঃসংযোগ জারি রাখাও মিনিওলোর প্রস্তাবনার অংশ। এই প্রস্তাবনা কেবল স্লোগানসর্বস্ব এবং দেখনদারিমূলক না; পশ্চিমা কোনো লেখার বা প্রবন্ধের পরিবর্তে আরেকজন দেশজ লেখাকে প্রতিস্থাপন করে না (যেমন শেক্সপিয়ারের বদলে রবীন্দ্রনাথ পড়ানো)। কেবল আলোচনার বিষয়বস্তু পাল্টাতে বলে না, বরং আলোচনার নিয়ম বা শর্তগুলোকেই বদলে ফেলতে বলে এই প্রস্তাবনা। অর্থাৎ, আমরা কীভাবে ভাবব, সেই ভাবার পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করে। দরজা-জানালা বন্ধ করে চিন্তা ও তৎপরতাকে আবদ্ধ করার কথা বলে না।
আধুনিকান্তরিতা (transmodernity): আমরা অনেকেই উত্তর-আধুনিক সমালোচনার কথা জানি। কিন্তু র্যামন গ্রোসফুগুয়েল যুক্তি দেন যে উত্তর-আধুনিক সমালোচনাও পশ্চিমে বিকাশের কারণে শেষ পর্যন্ত ইউরোপকেন্দ্রিকই থেকে যায়। পরিবর্তে তিনি একটি আধুনিকান্তরী বিশ্বব্যবস্থার কথা বলেন, যা গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ দুনিয়ার বহু ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দেবে (গ্রোসফোগুয়েল ২০০৯)।
মুক্তির দর্শনের শিকল
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াইয়ের পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি এনরিক দুসেলের (দুসেল ১৯৮৫) ‘মুক্তির দর্শন’ এবং নেলসন মালদোনাদো-তোরেসের বিশ্লেষণ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সত্তা এবং অস্তিত্বের যাপনের দিকে। মালদোনাদো-তোরেস আলোচনা করেন ‘সত্তার ঔপনিবেশিকতা’ (coloniality of being) নিয়ে (মালদোনাদো-তোরেস ২০০৭)। তিনি দেখান, উপনিবেশবাদ কেবল জমি দখল বা সম্পদ লুট করেনি; বরং উপনিবেশিত মানুষের ‘সত্তা’/‘বিইং’-কেই নির্মাণ, রূপান্তর ও অবমানিত করেছে। তাদেরকে বি-মানব করে অদৃশ্য বানিয়ে দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে মানুষ হওয়ার যোগ্যতা কেবল কেড়েই নেয়নি, তারা নিজেরাও নিজেদের নীচ, অধস্তন আর অনুগত ভাবতে শিখেছে (মিনিওলো ২০০৭)। এই তত্ত্বগুলোর মহৎ লক্ষ্য ছিল উপনিবেশিত মানুষের হৃত মানবতাকে পুনরুদ্ধার করা। কোনো উচ্চনীচ ভেদাভেদসম্পন্ন আর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা মুক্ত একটি বিশ্ব নির্মাণ করা যেখানে জ্ঞানের, সত্তার অস্তিত্বের, আর যাপনের বিভিন্ন ব্যবস্থা সহাবস্থান করতে পারে।
গ্রোসফোগুয়েল ও মালদোনাদো-তোরেসের তত্ত্বায়ন ও প্রস্তাবনাগুলো ভিন্ন তাৎপর্য বহন করতে পারে। বিশেষ করে তাঁর সংকীর্ণ সংস্কৃতি বনাম রাজনৈতিক অর্থনীতিবাদী বি–উপনিবেশায়ন তত্ত্বগুলোর ঝগড়া অতিক্রম করে আখ্যানগত বা ডিসকার্সিভ দশা থেকে বাস্তব দুনিয়ার নৈমিত্তিক যাপনে মনোযোগী হওয়ার কারণে। উভয়েই বি–ঔপনিবেশিক ভালোবাসার ধারণা প্রস্তাব করেছেন। তুঙ্গ আবেগ বা রোমান্সের ধারণা এক অর্থে ঔপনিবেশিক ভালোবাসাকে পরিবেশন করে। এই ভালোবাসা অভিভাবকত্বমূলক আর পরিশেষে শাসন ও নিয়ন্ত্রণমূলক। কিন্তু বি–ঔপনিবেশিক ভালোবাসা যেমন জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয়ের মাধ্যমে সামষ্টিক মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতগুলো নিরাময়ের প্রস্তাব পেশ করে, তেমনই একধরনের জেদ, ক্রোধ ও ভালোবাসার মাধ্যমে সংহতি ও লড়াইয়ের প্রক্রিয়া জারি রাখে। এই তত্ত্বগুলোর মহৎ লক্ষ্য হলো উপনিবেশিত মানুষের হৃত মানবতাকে পুনরুদ্ধার করা। কোনো উচ্চনীচ ভেদাভেদসম্পন্ন আর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনামুক্ত একটি বিশ্ব নির্মাণ করা, যেখানে জ্ঞানের, সত্তার, অস্তিত্বের এবং যাপনের বিভিন্ন ব্যবস্থা সহাবস্থান করতে পারে।
ঠিক এই মহৎ লক্ষ্যের ভেতরেই একটি সুপ্ত ঝুঁকি লুকিয়ে আছে। এই তত্ত্বগুলো একটি যুগ্ম বৈপরীত্য বা বাইনারির ওপর নির্ভর করে। একদিকে ‘পশ্চিম’ (যাকে দেখা হয় আধিপত্যের উৎস হিসেবে) এবং অন্যদিকে ‘বাদবাকি দুনিয়া’ বা ‘দ্য রেস্ট’ (যাকে দেখা হয় সম্ভাব্য লড়াই, প্রতিরোধ ও মুক্তির স্থান হিসেবে)। এই যুগ্ম বৈপরীত্য অনড়, স্থির আর নির্দিষ্ট স্থানিক পরিসর নির্ভর হয়ে ওঠার বিপদও কম নয়। যদি এই কাঠামোগত সমালোচনাকে খুব সরল করে একটি অনমনীয় দুই মেরুকরণে বা যুগ্ম বৈপরীত্যে (binary) সংকুচিত করে আনা হয়, তবে তা সহজেই একটি ‘ম্যানিকিয়’ (manichean) বা ভালো-মন্দের চরমপন্থী বিশ্ববীক্ষায় পর্যবসিত হতে পারে। তখন মনে করা হয় যা কিছু অ-পশ্চিমা তাই সহজাতভাবে ভালো। আর যা কিছু পশ্চিমা, তাই সহজাতভাবে মন্দ ও অশুভ। এই যুক্তিটিকেই আজকের কর্তৃত্ববাদী ও সর্বগ্রাসবাদী শাসক ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে ব্যবহার করার বিভিন্ন কৃৎকৌশল আবিষ্কার করেছে ও ব্যবহার করছে সফলতার সঙ্গে। পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল হচ্ছে। এমন বাইনারির বিপরীতে যাওয়ার যুক্তিও বি–উপনিবেশায়নের ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বায়নের নামে বিচিত্র রূপে ও ফ্যালাসিতে রূপান্তরিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক সংঘাতের হাতিয়ারে।
একটা উদাহরণ হতে পারে বিজ্ঞানের সামাজিক অধ্যয়ন শাস্ত্রের অন্যতম পথিকৃৎ ব্রুনো লাতুরের বিশ বছর আগের আত্মসমালোচনা ও সতর্কতা (লাতুর ২০০৪)। তিনি একুশ বছর আগেই ক্রিটিক্যাল তত্ত্বচিন্তার প্রয়োগ ও প্রভাবের ভয়ংকর সব বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। বিজ্ঞানের সামাজিক অধ্যয়ন শাস্ত্রের বিভিন্ন আলাপে প্রস্তাব করা হয়েছিল, আধুনিক একটি পশ্চিমা ও আধুনিক শাস্ত্র হিসেবে অ-পশ্চিমা পরিপ্রেক্ষিতে পরিত্যাজ্য। জনপরিসরে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে যে বিজ্ঞানের সত্য বলতে কিছু নেই, বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে বৈজ্ঞানিক সত্য ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে; নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রদত্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে আধিপত্যশীল প্রতিষ্ঠান ও বয়ান ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’ নির্মাণ করে। নির্মাণবাদী (constructivist) এবং অবিনির্মাণবাদী (deconstructionist) তত্ত্বায়ন ও পদ্ধতি একদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ও স্বাভাবিকীকৃত ধারণা, বয়ান, চর্চাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা ও নিবিড় বিশ্লেষণ করতে শিখিয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যায়তন বা প্রতিষ্ঠানে ফ্যাশনেবল ও চটকদার বুলি হিসেবে অথবা অর্থ-বিপর্যয় তৈরি করে নিবিড় ও তন্বিষ্ট অনুশীলনের পরিবর্তে বয়ানবাজির কারিকুরিতে সীমাহীন রূপান্তর ও আত্মসাৎকরণ ঘটেছে। পরিণতিতে বিশাল ও শক্তিশালী জ্ঞানের কারখানা বিরাজমান নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে জারি ও পুনর্নবায়ন করতে ভূমিকা রেখেছে।
কট্টর সাপেক্ষিকতাবাদ বনাম কট্টর সাধারণীকরণের লড়াইয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ–সম্পর্কিত বহু উপাত্তকে জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারকারীরা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ‘সত্য’ হিসেবে অগ্রাহ্য করেছে। ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমা, ঔপনিবেশিক আর অসত্য হিসেবে চিহ্নিত করে ‘ভারতীয় বিজ্ঞান’ অথবা ‘ভারতীয় হিন্দুশাস্ত্রগুলোর বৈজ্ঞানিকতা’–সম্পর্কিত বয়ানবাজিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গোমূত্র বা গোবরকে সর্বরোগহারী হিসেবে অথবা পতঞ্জলীর মতো মুনাফাকামী ব্র্যান্ডকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দেশজ, হিন্দুশাস্ত্রীয় তুলনামূলকভাবে উৎকৃষ্ট বিজ্ঞান হিসেবে বাজারজারতকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন আচার, চিন্তা ও অনুশীলনকে। ‘নিরামিষ ভোজন স্বাস্থ্যসম্মত ও একমাত্র একটি হিন্দু ভারতীয় সংস্কৃতি’ অথবা ‘যোগব্যায়াম পশ্চিমা বিজ্ঞানের তুলনায় শ্রেষ্ঠ অতীত ভারতীয় হিন্দু সাধনা’—এমন সব প্রচার ‘মব জাস্টিসকে’ ন্যায্যতা দিতে ভূমিকা রেখেছে। ‘গো-রক্ষার’ নামে মুসলমান ও দলিতদের হত্যা ও হামলা করার বৈধতা দিয়েছে জনপরিসরে চটকদার বুলি হিসেবে। বি–উপনিবেশায়নের বয়ানেরই যথেচ্ছ ব্যবহার করে নয়া উদারনৈতিক বাজারব্যবস্থাকে আর লুটপাট থেকে মনোযোগ সরানো হয়েছে কে দেশজ আর কে বহিরাগত হিসেবে হত্যাযোগ্য, সেটা নির্ধারণে। ‘প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতীয় বিজ্ঞান শ্রেষ্ঠ ও উন্নততর বিকল্প’ এমন ধারণা কেবল ভারতেই নয়; বরং পশ্চিমা দুনিয়ায় আকর্ষণীয় এক্সোটিক পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। যোগব্যায়ামের হিন্দুত্ববাদী ব্র্যান্ডিং পশ্চিমের বাজারে আর অপশ্চিমের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে বিপণনযোগ্যতা বাড়ালেও, যোগব্যায়ামের অন্তর্নিহিত বিশ্ববীক্ষা (যেমন শরীর-মন-সংবেদনের অবিভাজ্যতার অনুশীলন) এই পণ্যায়নের মাধ্যমে বেমালুম মুছে ফেলা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে এসব ধারণা, আচার আর অনুশীলনের জনপ্রিয়তাকে প্রচার করা হয়েছে ‘হিন্দু ভারতীয় বিজ্ঞানের উৎকৃষ্টতার প্রমাণ হিসেবে’। পাশাপাশি হিন্দু ভারতের পুনর্জাগরণের মাধ্যমে পশ্চিমকেই এই বিজ্ঞান ও অনুশীলন দিয়ে নতুন করে উপনিবেশায়িত করার নতুন বয়ান দাবিও এখন বেশ জনপ্রিয়।
রুদ্ধতার দিকে মোড়: বিচ্যুতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
মুক্তি ও প্রতিরোধের রাস্তা থেকে সরে এসে কর্তৃত্ববাদের দিকে এই যাত্রাকে কোনোভাবেই আকস্মিক গন্তব্যবদল বলা চলে না। বরং প্রক্রিয়াগতভাবে সত্তার গঠনের ও পরিবেশনের যুক্তিকাঠামোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে যাত্রার অভিমুখ বদলের সম্ভাবনা। উত্তর-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের বা বাইরের সমালোচনামূলক তাত্ত্বিকেরা দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিমুখ বদল প্রসঙ্গে সতর্ক করে আসছেন। তাঁদের মতে, বহুত্ববাদের প্রতি যদি আমাদের অঙ্গীকার না থাকে, তবে পরিচিতির রাজনীতিকরণ শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে ‘রুদ্ধতার’ (closure) দিকেই নিয়ে যাবে।
আশিল এমবেম্বি: দেশজবাদের বিরুদ্ধে বি–উপনিবেশায়ন
এই সমস্যা যিনি সবচেয়ে ভালোভাবে ধরেছেন, তিনি হলেন আশিল এমবেম্বি। উত্তর-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত একজন তাত্ত্বিক হলেও এমবেম্বে সেসব আত্মসত্তা বা পরিচয় গঠনের কঠোর সমালোচনা করেন যেগুলো দেশজবাদ, ভূমিজবাদ (autochthony) বা কোনো পৌরাণিক বিশুদ্ধতার দিকে পিছু হটে। তাঁর অন দ্য পোস্টকলোনি গ্রন্থে তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক শাসনের বিচ্ছিন্নতা ও অপমান ভুলতে উত্তর-ঔপনিবেশিক সত্তারা প্রায়ই একটি কল্পিত সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতার মধ্যে আশ্রয় খোঁজে। তারা নিজেদের জন্য এমন একটি ‘আত্মবেষ্টিত অর্থজগৎ’ তৈরি করার চেষ্টা করে, যেখানে মনে করা হয় উপনিবেশিত সত্তা বা প্রজা সম্পূর্ণ নির্দোষ আর ঔপনিবেশিক শক্তি বা সাহেবরা সম্পূর্ণ দোষী (এমবেম্বি ২০০১)।
এমবেম্বির কাছে এই প্রবণতা একটি ফাঁদ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদের বর্তমান উত্তর-ঔপনিবেশিক লেপ্টালেপ্টি (entanglement) দ্বারা বিভিন্ন দশা সংজ্ঞায়িত হয়। এই দশাগুলো হলো আফ্রিকান, ইউরোপীয় এবং আদিবাসী বিশ্বের এক বিশৃঙ্খল অথচ অপরিবর্তনীয় বুনন। আপনি চাইলেই ডিমের কুসুম আর সাদা অংশ ফেটানোর পর আর আলাদা করতে পারবেন না। ঠিক তেমনি একটি বিশুদ্ধ ‘প্রাক্-ঔপনিবেশিক’ পরিচয়ের দোহাই দিয়ে এই ঐতিহাসিক বুননকে অস্বীকার করার মানে হলো, ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে একটি মিথ বা পুরাণের বিনিময়ে বেচে দেওয়া। ডিকলোনাইজিং নলেজ অ্যান্ড দ্য কোয়েশ্চন অব দ্য আর্কাইভ গ্রন্থে তিনি সতর্ক করেন, প্রকৃত বি–উপনিবেশায়ন মানে কেবল পশ্চিমা ক্যানন বা বইপত্রের জায়গায় অ-পশ্চিমা ক্যানন বসানো নয় কিংবা কোনো সভ্যতাগত বিচ্ছিন্নতাবাদও নয়। বরং জরুরি হলো এই দশাগুলোর বাস্তবতায় কর্তৃত্বকারী বর্গগুলোকে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে নড়বড়ে করে দেওয়া (epistemic unsettling) (এমবেম্বি ২০১৫) যখন বি–ঔপনিবেশিকতা একটি অনড় পরিচিতি জাহির করার ‘স্বীকৃতির রাজনীতিতে’ পরিণত হয়, তখন বি–উপনিবেশায়নের চিন্তা ও তৎপরতার আর মুক্তির শক্তি থাকে না। কে আমাদের দলের আর কে নয়, তা নির্ধারণের সীমানা পাহারা দেওয়ার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন বি–উপনিবেশায়ন।
সর্বগ্রাসবাদের প্রতিধ্বনি: আরেন্ট এবং মতাদর্শের যুক্তি
এমবেম্বি যে বিপদের কথা চিহ্নিত করেছেন, তার সঙ্গে হান্না আরেন্টের সর্বগ্রাসবাদ (totalitarianism) বিশ্লেষণের গভীর এবং জোরালো মিল পাওয়া যায়। আরেন্টের মতে, সর্বগ্রাসবাদী আন্দোলনগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ‘মতাদর্শ’ নির্ভরতা। সর্বগ্রাসবাদী আন্দোলনগুলো একটি যুক্তি যা একটি একক প্রতিপাদ্য গ্রহণ করে (যেমন নাৎসিদের ক্ষেত্রে ‘ইতিহাস হলো জাতিগুলোর সংগ্রাম’ বা স্ট্যালিনিস্টদের ক্ষেত্রে ‘ইতিহাস হলো শ্রেণির সংগ্রাম’) এবং বাস্তবতার প্রতিটি দিক ব্যাখ্যা করতে নির্মমভাবে সেই একটি সূত্রই প্রয়োগ করে। এই প্রক্রিয়ায় সত্য, তথ্য ও বহুত্ব ধ্বংস হয়ে যায় (আরেন্ট ১৯৭৩)।
আমরা আজ এই একই যুক্তির প্রতিধ্বনি শুনতে পাই, যখন বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বকে একটি সর্বগ্রাসী মতাদর্শে নামিয়ে আনা হয়। যদি ‘ঔপনিবেশিকতাই’ প্রতিটি সামাজিক ব্যাধির একমাত্র ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে এবং যদি ‘(আত্ম)পরিচয়ই’ রাজনৈতিক বৈধতার একমাত্র ভিত্তি হয়, তবে সেখানে ভিন্নমত পোষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই যুক্তির অধীনে, একটি বি–ঔপনিবেশিক দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা মানে কেবল ভুল করা নয়; বরং তাকে দেখা হয় ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার’ প্রতিনিধি হিসেবে অথবা নিজের জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে। এই ধরনের ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক রুদ্ধতার’ (epistemic closure) প্রতি এমবেম্বির প্রতিরোধ আরেন্ট বর্ণিত আদর্শিক অনিবার্যতাকে প্রতিহত করে। উভয় চিন্তাবিদই সতর্ক করেন যে একটি অনুমোদিত, বিশুদ্ধ আর পবিত্র হিসেবে বিবেচিত পরিচয়ের (তা জাতিগত, ধর্মীয়, জাতীয় বা সভ্যতাগত যা–ই হোক না কেন) প্রতি শর্তহীন আনুগত্য দাবি করার দাবি বা বয়ান মৌলিকভাবে রাজনীতিবিরোধী (anti-Political)।
জাতীয় চেতনার গর্ত: ফানোঁর সতর্কতা
এই পুরো প্রবণতার অভিমুখটি সম্পর্কে ফ্রান্তজ ফানোঁ তাঁর দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ বইয়ে অনেক আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। আগেই ফানোঁ সতর্ক করেছিলেন, ‘জাতীয় চেতনা’ ঔপনিবেশিকবিরোধী সংগ্রামের জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই চেতনা যদি বৃহত্তর সামাজিক চেতনায় বিকশিত না হয়, তবে তা একটি শূন্য খোলসে পরিণত হয়। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতীয় বুর্জোয়ারা বা দেশীয় শাসকেরা শোষণের কাঠামোগুলোকে অক্ষত রেখেই ঔপনিবেশিক প্রভুদের প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করবে। এ জন্য তারা ব্যবহার করবে ‘আফ্রিকানাইজেশন’ বা ‘স্বদেশীকরণের’ (indigenization) ভাষা। স্বদেশীকরণের বা ভূখণ্ডগত পরিচয় উৎপাদন আর আত্মীকরণের প্রক্রিয়ায় মানুষজনের বিভ্রম তৈরি হয় যে তারা দেশের জন্যই কাজ করছে (ফানোঁ ১৯৬৩)।
সমকালীন ‘বনেদিদের দ্বারা দখল’ বিষয়টি বোঝার জন্য ফানোঁর এই অন্তর্দৃষ্টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বনেদি বা এলিটরা প্রায়ই নিজেদের শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধা বা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাগুলো আড়াল করতে উপনিবেশবিরোধী বুলির কারসাজি ব্যবহার করে। শাসনকে ‘পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে ‘দেশজ সংস্কৃতির’ প্রতিরক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করে তারা নিজেদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখে। ফানোঁর বিশ্লেষণকে প্রসারিত করে এমবেম্বি উল্লেখ করেছেন, (আত্ম)পরিচয় স্বয়ং এখানে ক্ষমতার একটি প্রযুক্তিতে পরিণত হয়। সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতার নামে জনগণকে শাসনের মাধ্যমে অনুমোদিত নিয়ম মেনে চলার জন্য রাষ্ট্র পরিচয়ের রাজনীতি ব্যবহার করে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়: আহৃত বয়ান হিসেবে জাতীয়তাবাদ
জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা সম্পর্কে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সমালোচনা এই রোগনির্ণয়কে আরও শাণিত করে। চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদ প্রায়ই একটি ‘আহৃত বয়ান’ (derivative discourse) হিসেবে থেকে যায়। এর মানে হলো, জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রের মডিউলার বা প্রমিত রূপগুলো এবং সার্বভৌমত্বের যুক্তি সেই ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকেই গ্রহণ করে, যাদের সে বিরোধিতা করছে (পার্থ ১৯৮৬)। যখন বি–ঔপনিবেশিক প্রকল্পগুলো একটি ‘বি–উপনিবেশিত’ সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চায়, তখন তারা প্রায়ই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিকীকরণ এবং দমনমূলক কার্যাবলির পুনরাবৃত্তি করে। প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধের একটি বাহন হিসেবে গঠিত হওয়া জাতীয় পরিচয় শেষ পর্যন্ত ছদ্ম সার্বভৌমত্বের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়। নির্ধারণ করা হয় কে রাষ্ট্রের নিজস্ব আর কে ‘জনগণের শত্রু’। তবে তিনি আরও প্রস্তাব করেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নানাবিধ সংঘাত ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে আর ‘আধ্যাত্মিকতার’ পরিসরে একধরনের সার্বভৌমত্ব জারি রাখতে পেরেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পার্থিব ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক আর বিজড়ন কীভাবে ঘটেছিল, সেই প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ থেকেই যায়।
মীরা নন্দা: উত্তর-উপনিবেশবাদী বামপন্থা ও হিন্দু দক্ষিণপন্থার এক অদ্ভুত মিতালি
মীরা নন্দা উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের কঠোর সমালোচনা হাজির করেছেন। তাঁর মূল দাবি হলো—এই তত্ত্বের সঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদের এক আশ্চর্য এবং বেশ সমস্যাজনক বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মীয়তা রয়েছে। তাঁর মতে, এ দুই পক্ষের মধ্যেই ইউরোপীয় ‘আলোকায়নবিরোধী’ (anti-enlightenment) এক অবস্থান কাজ করে, যা আদতে ভারতের ফ্যাসিবাদী হিন্দুত্ববাদবিরোধী রাজনীতির জন্য চরম সমস্যা ডেকে এনেছে।
নন্দা দাবি করেন, মূলধারাসমেত ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আদতে পুরোপুরি সেক্যুলার ছিল না। বরং এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল ‘হিন্দু ঐতিহ্যবাদ, হিন্দু উগ্রতা আর শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ’। এই ‘বিশ্বদর্শন’ রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
যখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে একটি রক্ষণশীল বিপ্লব হিসেবে দেখা হয়, তখন উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের তিনটি বড় স্ববিরোধিতা বা ‘ফ্যালাসি’ ধরা পড়ে বলে নন্দা মনে করেন:
অনুকরণজাত বয়ানের ফ্যালাসি: পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত যুক্তি ছিল—ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আসলে উপনিবেশবাদেরই এক ‘অনুকরণজাত বয়ান’। কারণ, এটি আলোকায়নের যুক্তিবাদকে গ্রহণ করেছে। নন্দা এই যুক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ যদি কিছু অনুকরণ করে থাকে, তবে তা হলো ইউরোপীয় ‘প্রতি–আলোকায়ন’ (counter-enlightenment) ধারা। ভারতের তথাকথিত ‘আধ্যাত্মিকতাকে’ দাঁড় করানো হয়েছে পশ্চিমের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বস্তুবাদের বিপরীতে।
রোমান্টিকতাবাদ নিয়ে অন্ধত্ব: নন্দার মতে, উত্তর-উপনিবেশবাদীরা ঔপনিবেশিক সমাজে ইউরোপীয় ‘রোমান্টিক’ ভাবধারার প্রভাব দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার মানেই কেবল আলোকায়নের যুক্তিবাদ। অথচ উপনিবেশের অভিজ্ঞতায় ইউরোপীয় রোমান্টিক চিন্তার যে বিশাল ভূমিকা ছিল, তা তাঁরা এড়িয়ে যান। নিম্নবর্গের প্রাক-আধুনিক মূল্যবোধ আর ধর্মীয় ভাবাবেগকে ‘পশ্চিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’ হিসেবে উদ্যাপন করার মধ্য দিয়ে উত্তর-উপনিবেশবাদীরা মূলত সেই রোমান্টিকদের পথেই হাঁটছেন।
নিম্নবর্গের স্বায়ত্তশাসনের বিভ্রান্তি: বামপন্থীরা প্রান্তিক মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তির কথা বললেও নন্দা মনে করিয়ে দেন—এই তথাকথিত ‘নিম্নবর্গের ঐতিহ্য’ আসলে ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী’ মূল ঐতিহ্যের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বিকল্প হিসেবে যে ‘পৌরাণিক জীবনধারা’র প্রস্তাব দেওয়া হয়, তা আসলে ব্রাহ্মণ্যবাদী বিশ্বদর্শনে ঠাসা।
পরিশেষে নন্দা বামপন্থী এবং হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের এই ‘অপ্রত্যাশিত সখ্যের’ বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি লক্ষ করেছেন, বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একধরনের চরম দম্ভ আর নাক-উঁচু ভাব কাজ করে। তাঁরা ডানপন্থী লেখকদের কেবল নিচু মানের ‘তাত্ত্বিক’ বা ‘মতাদর্শী’ মনে করে উড়িয়ে দেন। এ অবজ্ঞার কারণেই তাঁরা ডানপন্থীদের সেই প্রভাবশালী চিন্তাধারাগুলো অবহেলা করেন, যা শেষ পর্যন্ত সমাজ ও রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে দিচ্ছে।
এতিয়েন বলিবার: নব্য-বর্ণবাদ এবং সাংস্কৃতিক নিরঙ্কুশবাদ
এতিয়েন বলিবার ‘নরবর্ণহীন বর্ণবাদ’ (racism without races) ধারণাটি উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিচিতির রাজনীতি এবং সমসাময়িক বর্জনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করে। বলিবার বলেন, আধুনিক বর্ণবাদ এখন আর কেবলই জৈবিক শ্রেণিবিন্যাস বা গায়ের রং নিয়ে কথা বলে না, বরং বর্ণবাদের অনুপস্থিতিতে বিকশিত হয়েছে ‘সাংস্কৃতিক বিভেদবাদ’ (cultural differentialism)। এই ধারণা অনুসারে, সংস্কৃতিগুলো এতটাই আলাদা যে তারা পরস্পর মিশতে পারে না এবং তাদের মেশা উচিতও নয় (বলিবার ১৯৯১)।
মানবিক দিগন্ত থেকে বিচ্ছিন্ন বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্ব অনিচ্ছাকৃতভাবে এসব যুক্তিকেই পুষ্ট ও প্রবল করতে পারে। পশ্চিমা ও অ-পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের পরম অতুলনীয়তার ওপর জোর দিয়ে কিছু বি–ঔপনিবেশিক ধারা অতি-ডানপন্থীদের সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতার বাতিককেই প্রতিফলিত করে। এই ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক অ্যাপার্টহাইড বা পৃথক্করণ’ প্রমাণ করতে থাকে যে আমরা পৃথক বাস্তবতার বদ্ধ গলিতে বসবাস করি। আমাদের একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারার মতো একটি অংশীদারত্বমূলক রাজনৈতিক পরিক্ষেত্রের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয় এই তত্ত্ববিশ্ব ও চটকদার বুলিবাজি।
বিশ্বজনীনতার সংকট: বিবেক চিবারের পর্যালোচনা
উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব প্রসঙ্গে বিবেক চিবারের সমালোচনা বিশ্বজনীনতা পরিত্যাগের বিপদগুলো তুলে ধরে। চিবারের মতে, যখন উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকরা ‘অধিকার’, ‘গণতন্ত্র’ কিংবা ‘শ্রমের’ মতো মানদণ্ডমূলক ধারণাগুলোকে সহজাতভাবে ইউরোপকেন্দ্রিক হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন তাঁরা নিজেদেরই নিরস্ত্র করেন (চিবার ২০১৩)। তাঁরা স্থানীয় স্বৈরাচারদের চ্যালেঞ্জ করার জন্য নিপীড়িতের হাতে কোনো বিশ্বজনীন ভাষা অবশিষ্ট রাখেন না।
যদি ‘মানবাধিকার’ একটি পশ্চিমা কল্পকাহিনি হিসেবে খারিজ হয়ে যায়, তবে একজন উত্তর-ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসককে ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন করা থেকে কে আটকাবে? বিশ্বজনীনতার প্রত্যাখ্যান একটি ‘আদর্শিক শূন্যতা’ (normative void) তৈরি করে আর সেই শূন্যতা দ্রুত আপেক্ষিকতাবাদ বা কর্তৃত্ববাদ দখল করে নেয়। বিভিন্ন সূত্র অনুসারে, পশ্চিমা বিশ্বজনীনতার জোরালো সমালোচনা প্রায়শই সাংস্কৃতিকভাবে আবদ্ধ থেকে বিভিন্ন দাবিকে সত্য হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে আর এই দশা ন্যায়বিচারের প্রতি আন্তবর্গীয় (ইন্টারসেকশনাল) প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে (হাল ২০২২)।
এলিট ক্যাপচার এবং নৈতিক অনাক্রম্যতা: ওলুফেমি তাইও
ওলুফেমি ও. তাইওর ‘এলিট ক্যাপচার’ বা ‘বনেদিদের দ্বারা দখলের’ বিশ্লেষণ এমন এক পরিস্থিতি ও ঘটনাবলির সমাজতত্ত্ব ব্যাখ্যা করে। তাইও দেখান, কীভাবে পরিচয়ের রাজনীতি নিয়মিতভাবে সামাজিক বনেদিদের দ্বারা দখল হয়ে যায়। এই বনেদিরা ক্ষমতাবানদের শ্রেণিস্বার্থ ভাগ করে নেয়, কিন্তু তারা নিপীড়িতের শব্দভান্ডার ব্যবহার করে (তাইও ২০২২)।
দাতা সংস্থা, আন্তরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক বিভিন্ন প্রকারের দাতব্য কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী সংগঠন এবং বেসরকারি সংস্থার আন্তঃসম্পর্কিত দুনিয়াদারিতে, ‘বি–উপনিবেশায়ন’ প্রায়শই একটি আমলাতান্ত্রিক পারফরম্যান্সে পরিণত হয়। প্রান্তিক মানুষের বস্তুগত অবস্থার পরিবর্তন না করেই বনেদিদের যোগ্যতর প্রমাণ করার এবং সম্পদ অর্জনের একটি উপায়ে পরিণত হয় এই পারফরম্যান্স। আরও বিপজ্জনকভাবে, আত্মপরিচয় ‘নৈতিক দায়মুক্তির’ একটি রূপ হয়ে ওঠে। যেহেতু বক্তা একটি ভুক্তভোগী গোষ্ঠীর অন্তর্গত (বা তাদের হয়ে কথা বলার দাবি করেন), তাই তাঁদের রাজনীতি সমালোচনার ঊর্ধ্বে বলে গণ্য হওয়ার দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অধিকৃত বলে মনে করতে থাকেন। অধিকার চাইতে থাকেন। তাইও এবং এমবেম্বি উভয়েই বলেন, সমালোচনাকে মর্যাদায় বা স্ট্যাটাসে রূপান্তর করা হলো মুক্তিকামী রাজনীতির মৃত্যুঘণ্টা।
অতলস্পর্শিতা পেরিয়ে: বোয়াবেন্তুরা দ্য সুসা সান্তোস ও জ্ঞানের ন্যায্যতার সন্ধানে
উত্তর-ঔপনিবেশিক এবং বি–উপনিবেশায়িত চিন্তার জগতে বোয়াবেন্তুরা দ্য সুসা সান্তোস এক অনন্য নাম। তিনি পশ্চিমা আধুনিকতার আধিপত্যকে এক আমূল চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর সমগ্র কাজের ভিত্তি একটি শক্তিশালী ধ্রুব সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত: বৈশ্বিক জ্ঞানের ন্যায্যতা (global cognitive justice) ছাড়া বৈশ্বিক সামাজিক ন্যায্যতা অর্জন অসম্ভব। সান্তোসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ‘অতলস্পর্শী চিন্তা’ (abyssal thinking)। তাঁর মতে, আধুনিক পশ্চিমা চিন্তা জগৎকে এক অদৃশ্য রেখা দিয়ে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়: একটি হলো রেখার ‘এপার’ (মহানাগরিক উত্তর বা মেট্রোপলিটান নর্থ) এবং অন্যটি ‘ওপার’ (ঔপনিবেশিক দক্ষিণ বা কলোনিয়াল সাউথ)। রেখার ‘এপারে’ অবস্থিত জ্ঞানকে সর্বজনীন, বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘ওপারে’ থাকা শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্য ও জ্ঞানকে দেখা হয় অদৃশ্য বা অস্তিত্বহীন হিসেবে। সেগুলোকে স্থানীয়, ব্যক্তিনিষ্ঠ বা অযোগ্য বলে খারিজ করা হয়। এই বর্জন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নয়; বরং বর্জনমূলক শর্ত ও প্রক্রিয়াগুলো একেক ধরনের ‘জ্ঞানের নিধন’ (epistemicide) হয়ে বিনাশ করে বিচিত্র সব জ্ঞানপদ্ধতিকে।
ইউরোপকেন্দ্রিকতা আসলে নিজের ‘স্থানীয়’ জ্ঞানকে ‘বিশ্বজনীন’ বলে দাবি করে এক প্রকার ‘বিশ্বায়িত স্থানীয়তা’ (globalized localism) কায়েম করে এবং নিজস্ব যুক্তিকাঠামো চাপিয়ে দিয়ে অন্যান্য সংস্কৃতির ওপর নিজের আধিপত্যকে স্বাভাবিক হিসেবে জাহির করে। এই আধিপত্য ঠেকাতে সান্তোস প্রস্তাব করেন ‘দক্ষিণের জ্ঞানতত্ত্বের’ (epistemologies of the south) ধারণা। এখানে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা দক্ষিণ গোলার্ধ কোনো ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং এটি পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদ ও পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া মানুষের পদ্ধতিগত দুঃখকষ্ট ও নীরব অভিজ্ঞতার একটি রূপক। এই জ্ঞানতত্ত্বগুলো আসলে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর দ্বারা গড়ে তোলা প্রতিরোধেরই বিচিত্র রূপ। সান্তোস বিশ্বজনীনতাবাদ (universalism) এবং সাংস্কৃতিক সাপেক্ষিকতাবাদের (cultural relativism) মধ্যকার চিরস্থায়ী বিতর্কের একটি ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, উভয়ই মুক্তির পথে অন্তরায়: ইউরোপকেন্দ্রিক সর্বজনীনতাবাদ বৈচিত্র্যকে দমন করে আর ‘নিষ্ক্রিয় সাপেক্ষিকতাবাদ’ (inert relativism) ন্যায্যতার কোনো সাধারণ মানদণ্ডকে স্বীকার করে না। ফলে প্রায়শই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাছে অসহায় করে তোলে।
সমাধান হিসেবে তিনি প্রস্তাব করেছেন ‘ডায়াটোপিক্যাল হারমেনিউটিকসের’ ধারণা। এই প্রস্তাব এমন এক আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের প্রয়োজনের কথা বলে, যে সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রতিটি সংস্কৃতির ‘টপোই’ (topoi) বা মৌল ভিত্তিগুলো নিজেদের অসম্পূর্ণতা ঠাহর করবে। ‘এক পা নিজের সংস্কৃতিতে এবং অন্য পা অন্য সংস্কৃতিতে রেখে’ সংলাপ চালিয়ে আমরা আমাদের এই পারস্পরিক অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারি। কোনো চাপিয়ে দেওয়া মানদণ্ড নয়, বরং পারস্পরিক নাজুকতা এবং ‘গ্রহীয় আন্তঃসম্পর্ক’ (planetary relationality)-এর ওপর ভিত্তি করে একটি ‘সংলাপমূলক ও বহুত্ববাদী বিশ্বজনীনতা’র সন্ধান করে এই প্রস্তাব। সান্তোসের প্রকল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এক ‘বিদ্রোহী বিশ্বজনীনতা’ (insurgent cosmopolitanism) গড়ে তোলা। প্রক্রিয়াটি আসলে ‘নিচ থেকে বিশ্বায়ন’, যেখানে প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো সীমান্তের বেড়া ভেঙে একজোট হয় কেবল কোনো একটি সত্য চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং এক বহু দুনিয়াময় বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি (pluriversal approach) গড়ার লক্ষ্যে। ভিন্নতাকে সমমর্যাদায় স্বীকৃতি দিয়ে সান্তোস এমন এক পৃথিবীর দিকে এগোচ্ছেন, যেখানে ‘বহু পৃথিবীর সহাবস্থান’ সম্ভব আর এই পৃথিবীর ভিত্তি হবে জ্ঞানের ন্যায্যতা। সান্তোসের এই তত্ত্বায়ন প্রথাগত সংস্কৃতিবাদী আর রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যকার দ্বৈরথের পরিবর্তে সম্মিলনের জন্য জরুরি বলে মনে করেন চিন্তকেরা।
গ্রহায়িত সংকটের মধ্যে ‘এক বিশ্বের মধ্যে বহুবিশ্বের’ সহাবস্থানের রূপরেখার প্রস্তাব ‘বৈপ্লবিক বৈচিত্র্য’ আর ‘অতলস্পর্শী বিভক্তির দেয়াল ভাঙতে’ সাহায্য করতে পারে। কট্টর পরিচয়ের বেড়াজালে বন্দিত্ব আর পুঁজির অসীম নিষ্কর্ষণ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে বিশ্বজনীনীকৃত ঐতিহাসিক আখ্যান আর স্থানিক পর্যায়ের মানুষ ও না-মানুষি অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্ততা তৈরি করতে পারে। বস্তুবাদী ও অর্থনীতিবাদী দৃষ্টিকোণ আর আখ্যানগত সাংস্কৃতিক দশাকে বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া আরও ধ্বংসাত্মক হতে পারে। শোষণের বস্তুগত দশাগুলো যেমন টিকে থাকে নির্দিষ্ট ভাষিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপরেখার মধ্যে, তেমনি বৈশ্বিক-স্থানিক পরিসরে সংযুক্ত ও ভিন্ন বস্তুগত শাসনের ও নিয়ন্ত্রণের দশাগুলো পরিচয়, ভাষা ও জ্ঞানের গঠন করতে থাকে। আর উপনিবেশিতরা একটা সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের জ্ঞান, চিহ্ন, ভাষা ও অভিব্যক্তিকে খেয়ে ফেলে নতুন এক প্রতিরোধের পরিসর ও তরিকা সৃষ্টি করতে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে দ্রোহী-সাংস্কৃতিক ভক্ষণ (কালচারাল ক্যানিবালিজম) হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি।
ক্যানিবাল শব্দটির একটি উপনিবেশবাদী ব্যঞ্জনা রয়েছে। ক্যানিবালিজম পদটি সৃষ্টিই হয়েছে প্রাচ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক জ্ঞানের মধ্য দিয়ে। অপরাপর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে নরমাংস ভক্ষণকারী হিসেবে সাব্যস্ত ও পরিবেশন করে সেসব জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা আর জৈবিকভাবে স্বজাতির মাংসভোগী পাশবিক সত্তার নির্মাণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্যানিবালিজমের ধারণা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তিনি এই অর্থকে পাল্টে দিয়েছেন কালচারাল ক্যানিবালিজম পদটি ব্যবহারের মাধ্যমে। আফ্রিকার উবুন্টু বা মেক্সিকোর জাপাতিস্তা চিন্তাধারা এমন বিকল্প বিশ্বভাবনার উদাহরণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে হালোর ডিজিটাল পুঁজিবাদ ও অ্যালগরিদমিক সাম্রাজ্যবাদের নতুন বাস্তবতা (ইয়রগেনসেন প্রমুখ ২০১৩; কানাজা-চোকে ২০১৯; কাস্ত্রো-সোতোমায়র ও মিনোইয়া ২০২৩; নিকোলস ২০১০; ম্যাকইউয়ান ২০০৩; সান্তোস ২০১১; সান্তোস ও ফিলহো ২০১৫; নেইলর প্রমুখ ২০১৮; বালানসো ও মেইজা ২০২৩)।
ওপরে উল্লিখিত চিন্তকগণের পাশাপাশি আমি আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাববিস্তারকারী চিন্তকের প্রধান ধারণা ও চিন্তাগুলোকে ছকচিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আদিত্য নিগম, ওয়ালন্টার মিনিওলে, আনিবাল কিহানো প্রমুখ।
অ্যালগরিদমিক আধিপত্যের গাণিতিক ছক: ডেটা উপনিবেশবাদ ও সার্বভৌম আত্মসত্তার বিভ্রম
সমকালীন ডিজিটাল পুঁজিবাদের বিস্তার কেবল কোনো প্রযুক্তিগত বিবর্তন নয়; বরং আগ্রাসী ডিজিটাল পরিসর আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মিথস্ক্রিয়াকে ঔপনিবেশিক প্রকল্পের এক নয়া সংস্করণ হিসেবে ঠাহর করা সম্ভব। লাতিন আমেরিকান বি–উপনিবেশায়নবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণমূলক সমাজের ইউরোপীয় সমালোচনার মেলবন্ধন ঘটালে দেখা যায়, কীভাবে অ্যালগরিদমিক উপনিবেশবাদ আমাদের মগজ, মাটি, এমনকি মানুষের সংজ্ঞাকেও নতুন করে গঠন করছে (কিহানো ২০১৯; কিহানো ২০২২; কোলড্রি ও মেহিয়াস ২০১৮; মালডুন ও উ ২০২৩; মোলেমা ২০২৪; মোহামেদ প্রমুখ ২০২০; হেলগেসন ২০২৩)।
ভূখণ্ড দখল থেকে ডেটা উপনিবেশবাদ
উপনিবেশবাদ প্রাথমিকভাবে জমি, খনিজসম্পদ, কাঁচামাল দখলের আর বিভিন্ন সম্পদ লুটপাটের মাধ্যমে চিহ্নায়িত হয়। বর্তমানের ডেটা উপনিবেশবাদ সেই লুণ্ঠনমূলক যুক্তিকে মানুষের মনোজগৎ ও সামাজিক সম্পর্কের স্তরে নিয়ে এসেছে। এখানে সামাজিক জীবনকেই উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে দখল করা হচ্ছে। মানুষের জীবনকে উপাত্তে রূপান্তর বা ‘ডেটাফিকেশন’ আসলে ঐতিহাসিক অপরায়নেরই এক অ্যালগরিদমিক রূপ। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল কিছু বাণিজ্যিক উপাত্ত বা ডেটার সমষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয়। ডিজিটাল উপাত্তে পরিণত করার মাধ্যমেও কট্টর পরিচয়বাদী আত্মসত্তার গঠন ভয়াবহ তৎপরতায় ও বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। প্রক্রিয়াটি একটি প্রযুক্তিগত একমুখিতা তৈরি করে। ঔপনিবেশিক বাগানগুলো যেভাবে স্থানীয় বৈচিত্র্য ধ্বংস করে কেবল অর্থকরী ফসল চাষ করত, অ্যালগরিদমিক পূর্বাভাস ও বিশ্লেষণ একইভাবে মানুষের যাপনের বৈচিত্র্য মুছে দিয়ে একধরনের নব্য-উদারবাদী বৈশ্বিক মানদণ্ড চাপিয়ে দিচ্ছে। এই দশাকে বলা যায় অ্যালগরিদমিক জ্ঞানহনন (algorithmic epistemicide): যেখানে কোডিংয়ের অদৃশ্য হিংস্রতায় মানুষের ভিন্নভাবে বাঁচার এবং জানার অধিকারকে হত্যা করা হচ্ছে (কোল্ড্রি ও মেজিয়াস ২০১৯ক, কোল্ড্রি ও মেজিয়াস ২০১৯খ)।
বিভাজিত সত্তা এবং সাইকোপলিটিকস
ঐতিহাসিক ঔপনিবেশিক শাসন থেকে অ্যালগরিদমিক শাসনে উত্তরণের মূলে রয়েছে এক গভীর অস্তিত্বতাত্ত্বিক বদল। আজকের নিয়ন্ত্রণমূলক সমাজে মানুষ আর অবিভাজ্য ‘ইনডিভিজুয়াল’ নয়, সে পরিণত হয়েছে ‘ডিভিজুয়াল’ (dividual) বা বিভাজিত উপাত্তে। মানুষের আঙুলের ছাপ, কেনাকাটার অভ্যাস বা অবস্থানের সংকেত—এসব তথ্যবিন্দুকে আলাদা করে আবার একত্র করা হয় কেবল নজরদারি পুঁজিবাদের স্বার্থে।
এমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা টিকে থাকে ‘মনোরাজনীতির’ মাধ্যমে। অতীতের শাসন ছিল নিষেধাজ্ঞামূলক বা ‘না’-বাচক; কিন্তু মনোরাজনীতি পরিচালিত হয় ‘হ্যাঁ’-বাচক প্রলোভনে। ব্যক্তিকে উৎসাহ দেওয়া হয় নিজেকে একজন ‘স্বশাসিত-উদ্যোক্তা’ হিসেবে গড়ে তুলতে। এখানে সে প্রতিনিয়ত নিজের অপরবাস্তব সত্তাকে উন্নত, খাঁটি আর পরিশুদ্ধ করতে ব্যস্ত থাকে। এই পুঁজিবাদের সঙ্গে প্রচ্ছন্নভাবে সম্মিলন ঘটেছে ‘ডিজিটাল সামন্তবাদের’। আমাদের পরস্পর সংযুক্ত থাকার স্বাধীনতার উদ্যাপন হিসেবে নৈমিত্তিক যাপনের ডিজিটাল পরিসরের তৎপরতা আসলে পরিশেষে শ্রম। এই শ্রম টেক-জায়ান্টদের জন্য কাঁচামাল হিসেবে ডেটা তৈরি করে। এই টেক-জায়ান্টদের ক্ষমতা এখন অনেক সার্বভৌম রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। মেটা, গুগল, এক্স, মাইক্রোসফট, টিকটকসমেত বিভিন্ন ডিজিটাল পরিসরের মালিকদের পুঁজি বিনিয়োগ আর কার্যক্রম এই মুহূর্তে দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি দাসমনোবৃত্তির গ্রাহক তৈরি করে চলেছে। এই দাসেরা প্রতিনিয়ত মনে করতে থাকে, তারা স্বাধীন ও স্বয়ংশাসিত আর তাদের যেকোনো কিছু করার সক্ষমতা ও সামর্থ্য আছে। তাদের মনে করানো হতে থাকে যে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
বস্তুগত লুণ্ঠন এবং নয়া পুঁজিবাদের যুক্তি
উপাত্তকে প্রায়শই ‘বায়বীয়’ বা ‘ক্লাউড’ভিত্তিক বলে প্রচার করা হলেও, ডেটা উপনিবেশবাদ আসলে এক রূঢ় বস্তুগত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। এই নতুন ব্যবস্থার লুণ্ঠনমূলক যুক্তি পৃথিবীর শরীরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে রয়েছে কম্পিউটিং যন্ত্রপাতির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উত্তোলন করতে গিয়ে প্রকৃতি ও প্রান্তিক জনপদ ধ্বংস করা। দুষ্প্রাপ্য খনিজ থেকে শুরু করে নিত্যকারের জল ব্যবহার করা এই ডিজিটাল পরিসরের অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি। অন্যদিকে অ্যালগরিদমকে সচল রাখতে এবং তথ্য বিন্যস্ত করতে যে অদৃশ্য শ্রম (ghost work) প্রয়োজন, তা মূলত পদ্ধতিগত বৈষম্যকেই আরও ঘনীভূত করে। ডিজিটাল পরিসর একটি দুনিয়াজোড়া ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। এখানে বিগ ডেটা বিশ্লেষণ, মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজ আর প্রেডিকটিভ মডেলিং থেকে শুরু করে পৌনঃপুনিক স্বনিয়ন্ত্রণের বিভ্রমে আক্রান্ত ভোক্তা মানুষের জীবনকে স্রেফ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করাটাকেই স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে।
প্রতিরোধ: বিদ্রোহী বিশ্বজনীনতা ও স্বাবলম্বী প্রযুক্তি
এমন বেষ্টনী থেকে মুক্তির জন্য কেবল ‘প্রাইভেসি সেটিং’ যথেষ্ট নয়, দরকার জ্ঞানতাত্ত্বিক বি–উপনিবেশায়নের মাধ্যমে প্রতিরোধ। বি–উপনিবেশায়নের নতুন শর্তবলির পরিপ্রেক্ষিতে এমন চিন্তাভাবনা অনেক চিন্তকেরই। এ ধরনের প্রতিরোধের মূলে রয়েছে সামষ্টিক সক্রিয়তাকে ও কর্তাসত্তাকে পুনরুদ্ধার করা এবং স্থানীয় প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে স্বায়ত্তশাসিত প্রযুক্তিগত বিন্যাস গড়ে তোলা।
আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি ‘জ্ঞানের বাস্তুবিদ্যা’ গড়ে তোলা, যেখানে প্রযুক্তি মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলার হাতিয়ার না হয়ে বরং বহুত্বের মাধ্যম হয়ে উঠবে। যখন সাধারণ মানুষ বা বিভিন্ন আন্দোলন বড় বড় টেক-করপোরেশনের লুণ্ঠনমূলক যুক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং ডেটা সার্বভৌমত্ব দাবি করে, তখনই জন্ম নেয় বিদ্রোহী কসমোপলিটিয়ানিজম। এমন সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো: ১. বিভাজিত সত্তাকে অস্বীকার: স্রেফ উপাত্তের সমষ্টি নয়, বরং একজন ‘স্বীকৃত মানুষ’ হিসেবে নিজের অধিকার ফিরে পাওয়া। ২. অ্যালগরিদমিক শাসনের গণতান্ত্রিকীকরণ: প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে করপোরেট প্রকোষ্ঠ থেকে বের করে এনে জনপরিসরে স্বচ্ছতার অধীন আনা। ৩. প্রযুক্তিগত পুনরুদ্ধার: প্রযুক্তিকে তার স্থানীয় ইতিহাস, বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে পুনঃস্থাপন করা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে ডেটা উপনিবেশবাদের জটিল নিয়ন্ত্রণমূলক, বিভ্রম সৃষ্টিকারী, দাসত্ব ও আসক্তিকে মাথায় রেখে বি–উপনিবেশায়নবাদী লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য হলো সামাজিক জীবনকে স্রেফ অর্থনৈতিক উৎপাদনের কাঁচামাল হতে না দেওয়া। মানুষকে অ্যালগরিদমের হাতে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার এক রাজনৈতিক ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এ দীর্ঘমেয়াদি লড়াই।
‘ম্যাট্রিক্স’ (পরিচালক: লানা ওচাওস্কি ও লিলি ওচাওক্সি, ১৯৯৯) চলচ্চিত্রটি এ ক্ষেত্রে অবশ্যপাঠ্য হতে পারে। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে মানুষ বেঁচে আছে একটি সর্বগ্রাসী ও নিয়ন্ত্রক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার পরিসরে। তাদের বাস্তব শরীর সংরক্ষিত কতগুলো বড় বড় বাক্সে আর এক নেটওয়ার্ক দিয়ে তাদের মগজকে সক্রিয় করে এক বিভ্রম উৎপাদিত হয়ে চলেছে। এই বিভ্রমের মধ্যে তারা সবাই স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করছে বলে মনে করছে। এই চলচ্চিত্রকে যদি আমরা চিহ্ন, প্রতীক আর উপমার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করি তাহলে আমাদের পক্ষে নয়া ডিজিটাল উপনিবেশের বাস্তবতা অনুধাবন করা সহজ হতে পারে। মুক্তি, স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামর্থ্য, স্বপ্ন দেখা, বাসনাতাড়িত হওয়া থেকে নৈমিত্তিক যাপনে যে মুক্তির অনুভব, তা প্রকৃতপক্ষে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সৃষ্টি। সেখানে আমাদের শরীর সংবেদন-তৎপরতার অধীন আর প্রায় মৃত। ম্যাট্রিক্স প্রতিনিয়ত আমাদের মুক্ত, স্বাধীন আর সার্বভৌম সত্তাধারী হিসেবে পরিচিতিবোধ তৈরি করতে থাকে। অথচ আমরা জীবন্মৃত দশায় ওই ম্যাট্রিক্সের অধীন হয়ে আছি।
প্রভাবের কলকবজা: যেভাবে মুক্তি আধিপত্যে পরিণত হয়
এখন প্রশ্ন হলো উচ্চমার্গীয় তাত্ত্বিক আলোচনা ঠিক কীভাবে বাস্তবে কর্তৃত্ববাদী চর্চায় রূপান্তরিত হয়? প্রাসঙ্গিক গবেষণা ও লেখালেখি বেশ কয়েকটি কার্যকারণ সম্পর্কজাত পথ ও ‘প্রভাবের কলকবজাকে’ চিহ্নিত করে। এসব কলকবজার মাধ্যমে বি–ঔপনিবেশিক বয়ান আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
কৌশলগত সারসত্তাবাদ থেকে অনড় সারসত্তাবাদ
গায়ত্রী স্পিভাক একসময় ‘কৌশলগত সারসত্তাবাদের’ (strategic essentialism) প্রস্তাব করেছিলেন। এই ধারণার মূল কথা ছিল রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিম্নবর্গীয় গোষ্ঠীগুলো সাময়িকভাবে হতে পারে একটি সরলীকৃত পরিচয়ের অধীনে একত্রিত। তবে এই কৌশলগত অবস্থান বিপজ্জনকভাবে ‘অনড় সারসত্তাবাদের’ (rigid essentialism) দিকে পরিবর্তিত হয়। অবদমিত জ্ঞান পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা প্রায়ই স্থির ও অনৈতিহাসিক পরিচয়বাদী সত্তা ও বর্গে পুনর্গঠন করে। পরে এই দশা ওই গোষ্ঠীর ভেতরের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যকে বাদ দেয় (ইয়েটস ২০২০)। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম বা রাষ্ট্রীয় নীতিতে যখন এই সারসত্তাবাদকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়, তখন একটি ‘হিমায়িত’ বা জমে যাওয়া সংস্কৃতি তৈরি হয়। অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতকে দেখা হয় ‘বিশুদ্ধতার অভাব’ বা ‘ভেজাল’ হিসেবে। সহি ও গলদের মধ্যে সংঘাতের প্রক্রিয়ায় এই চিরন্তন ও স্থির সারসত্তাগত আত্মসত্তার গঠন সব ভিন্নতাকে আর ঐতিহাসিক পুনর্গঠন ও রূপান্তরকে খারিজ করে দেয়। ভেজাল বা গলদ হিসেবে সাব্যস্ত করে ভিন্নতাকে ও রূপান্তরের ঐতিহাসিকতা অস্বীকার করে বিভিন্ন পরিচয়কে শাস্তি দিতে পারে, স্বীকৃতি কেড়ে নিতে পারে (যেমন রাষ্ট্র বা জাতিবিরোধী হিসেবে সাব্যস্ত করে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, মানবাধিকার হরণ করা, স্বাভাবিক বেঁচে থাকার মানবীয় অধিকার কেড়ে নিয়ে হত্যাযোগ্য করে তোলা, বিচারিক ও সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া ইত্যাদি)।
জ্ঞানতাত্ত্বিক জাতিত্বকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ
জর্জ বি হাল আরেকটি বিশেষ দশাকে ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক জাতিত্বকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ’ (epistemic ethnonationalism) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই মতবাদ অনুসারে জ্ঞানের দাবিগুলো কেবল তখনই বৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়, যখন সেগুলো কেবল ‘বিশুদ্ধ’ ও ‘সহি’ পরিচয় বহনকারী গোষ্ঠী বা সমষ্টি বা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভূত হয় (হাল ২০২২)। সোজা কথায়, কেউ যদি ওই নির্দিষ্ট দলের না হন, তবে ওই বিষয়ে কথা বলার অধিকার তার নেই বলে ঘোষণা করা হয়। কখনো কখনো এই ঘোষণা আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে ন্যায্যতা পায়। এই দশা জ্ঞানতত্ত্বকে (আমরা কীভাবে জানি?) জাতিসত্তার ও আত্মপরিচয়ের (আমরা কে?) সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। এমন বিচ্যুতি সত্য সম্পর্কে একটি মালিকানাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে; যেন ‘পাশ্চাত্য বিজ্ঞান’ পশ্চিমের সম্পত্তি এবং ‘আদিবাসী জ্ঞান’ আদিবাসীদের সম্পত্তি আর তাই উভয় জ্ঞানের মধ্যে কোনো সংলাপই সম্ভব নয়। এমন দশাগুলো কট্টরপন্থীদের ‘জাতিগতভাবে সীমায়িত বহুত্ববাদের’ যুক্তির খুব কাছাকাছি চলে যায়। এমন বহুত্ববাদ দাবি করে যে সংস্কৃতিগুলোকে তাদের সারসত্তাগত পবিত্র ও সহি বৈশিষ্ট্যাবলি রক্ষার জন্য পৃথক থাকাই শ্রেয়।
বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসেবে সংযোগ-বিচ্ছেদের পুনর্ব্যাখ্যা
ওয়াল্টার মিনিওলোর সংযোগ-বিচ্ছেদের ধারণাটি মূলত পশ্চিমা ক্যাটাগরির বাক্সের বাইরে চিন্তা করার উপায় হিসেবে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক পদক্ষেপ হিসেবে উদ্দিষ্ট ছিল। তবে রাজনৈতিক কুশীলবদের হাতে পড়ে এই তরিকাটি প্রায়ই বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। মুক্তিদায়ী ধারণা হিসেবে সংযোগ-বিচ্ছেদের বয়ান তখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড ও বিধিমালা, বৈশ্বিক বিদ্যায়তনিক মানদণ্ড অথবা ‘পশ্চিমা’ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বুলিসর্বস্ব কারসাজির মাধ্যমে ন্যায্য হয়ে ওঠে (মিনিওলো ২০০৭; গ্রসফোগুয়েল ২০০৯)।
কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদীরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ডের উদারনৈতিকতাবাদী সমালোচনাগুলো কেবল ‘উপনিবেশের চাপিয়ে দেওয়া মানদণ্ড বা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার নির্মাণ’ বলে দাবি করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী নিপীড়ন ও সহিংসতাকে অভ্যন্তরীণ বিষয়, নিজস্ব জাতিগত বা ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার স্বাধীনতার অধিকার অথবা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। উল্লেখ্য, আধুনিক মানবাধিকারের বয়ানের উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে আর বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে মানবাধিকারের বিধিবিধানের ধারণাগত ও ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রসঙ্গে সিরিয়াস সমালোচনা রয়েছে।
ক্ষমতা, কর্তৃত্ব আর ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে মানবাধিকারের বয়ান ও আইনকে বিভিন্ন জাতি, পরিসর ও দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ডমাফিক প্রয়োগের বিরুদ্ধে সমালোচনা যৌক্তিক। একই সঙ্গে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে মানবাধিকারের ধারণাগুলো ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে বলে একটি বিশ্বজনীন মানদণ্ড অথবা কনভেনশনের এমন বৈচিত্র্য ও ভিন্নতাকে আমলে না নেওয়ার প্রসঙ্গও বিদ্যায়তনিক ও আইনশাস্ত্রীয় পরিসরে জারি আছে। কিন্তু এসব পর্যালোচনামূলক আর কর্তৃত্ববাদবিরোধী এবং সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবিগুলোর মুক্তিকামী আর আধিপত্যবিরোধী স্বরগুলো বিলীন হয়ে যায় আধিপত্যবাদী সহিংসতা ও নিপীড়নকে জায়েজ করার উচ্চকিত বুলির মধ্যে। এ ক্ষেত্রে বি–উপনিবেশায়নের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে সংযোগ-বিচ্ছেদের ধারণা কেবল বুলির কারসাজিতে রূপান্তরিত হয়।
ভুক্তভোগিতার হাতিয়ারকরণ
ঔপনিবেশিক শাসনে ভুক্তভোগী হওয়ার আখ্যানগুলোর বিশাল নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যখন এই আখ্যানগুলো সংখ্যাগুরু ও ভদ্রবিত্ত বনেদিরা একচেটিয়াভাবে দখল করতে থাকে, তখন তারা একটি ‘জিরো-সাম’ রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয় (কাপুর ২০২৫)। সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীকে কেবল ঔপনিবেশিক আমলেরই নয়; বরং ইতিহাসের চিরন্তন ভুক্তভোগী হিসেবে নির্মাণ ও পরিবেশন করে (যেমন ভারতে হিন্দু, ইউরেশিয়ায় রাশিয়ান, শ্রীলঙ্কা বা মিয়ানমারে বৌদ্ধ)। রাষ্ট্রীয় ও সংখ্যাগুরুবাদী আখ্যান সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক নীতিগুলোকে ‘সংশোধনমূলক বিচার’ আর ‘ঐতিহাসিক ভুক্তভোগিতার ন্যায্য প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে আইনি ও নৈতিক বৈধতা দিতে পারে। ভুক্তভোগিতা (victimhood) পৌনঃপুনিকভাবে হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয় আর বেদনা, যন্ত্রণার ও নিপীড়নের স্মৃতিকে আধিপত্যের লাইসেন্সে রূপান্তরিত করে। ধারাবাহিকভাবে জারি থাকা এক পরম দশা তৈরি করা হয়, আর এমন এক নৈতিকতা গঠিত হয়ে ওঠে, যা যেকোনো বহুমাত্রিক সমালোচনাকে অবৈধ ঘোষণা করতে থাকে।
দ্বিমেরু কাঠামো এবং মেরুকরণ
বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বের বনিয়াদি দ্বিমেরুকরণগুলো (অর্থাৎ ঔপনিবেশিক/উপনিবেশিত, পাশ্চাত্য/বাদবাকি বিশ্ব, জালিম/মজলুম, ঔপনিবেশিক লুটপাট ও সংঘাত/প্রাক্-ঔপনিবেশিক) সবচেয়ে বড় রোগনির্ণায়ক শক্তি হলেও একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়ও বটে। সমসাময়িক জটিল সমাজে এই দ্বিমেরু খুব কম টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকে। কারণ, অধিকাংশ মানবসত্তাই এখন পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত। তবু জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনগুলো এই দ্বিমেরু কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই বিকাশ লাভ করে (লুইস এবং লল ২০২৩)। তবে হালের দুনিয়ায় উগ্র ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এই দ্বিমেরুকরণ প্রচণ্ড প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। জটিল সামাজিক বাস্তবতাকে ‘জনগণ’ (খাঁটি, বি–ঔপনিবেশিক) এবং ‘বনেদি’/‘ভদ্রবিত্ত’/‘এলিট’ (পশ্চিমাঘেঁষা, ঔপনিবেশিক), অথবা ‘হিন্দু’ (সংখ্যাগুরু হিসেবে নির্ণায়ক ও বিশুদ্ধ) ও ‘মুসলমান’ (সংখ্যালঘু হিসেবে অধস্তন ও দূষিত) ধরনের বিভিন্ন দ্বিমেরুকরণের মধ্যে ফেলতে থাকে। জটিল ও বহুমাত্রিক শর্ত ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হতে থাকা সম্পর্কগুলোকে কেবল পারস্পরিক সংঘাতের আখ্যানের মাধ্যমে সমরূপ আর সমান করে ফেলা হয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার কুশীলবগণ সূক্ষ্ম নীতিগত বিতর্ক এড়িয়ে পরিচয়ের এই সমতলীয় ও সমস্বত্ব আখ্যানের মাধ্যমে জনসমর্থন আদায় করতে পারে। হালের দুনিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে ও রাষ্ট্রে এমন ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন লক্ষণগুলো স্পষ্ট।
আঞ্চলিক কেস স্টাডি: বৈশ্বিক প্রকাশ
ওপরে বর্ণিত তাত্ত্বিক ঝুঁকিগুলো কেবল কাল্পনিক বা হাইপোথেটিক্যাল নয়; এগুলো বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সক্রিয়ভাবে উন্মোচিত হচ্ছে। নিম্নলিখিত কেস স্টাডিগুলো দেখায় কীভাবে বি–ঔপনিবেশিক ভাষা স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে মিশে অনুদার, আধিপত্যবাদী ও সর্বগ্রাসবাদী পরিণতির দিকে যাচ্ছে।
ভারত: ‘হিন্দু মননের বি–উপনিবেশায়ন’
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কেস স্টাডি হিসেবে সমসাময়িক ভারতকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই আমি ভারতের সমসাময়িক কট্টর দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ের উত্থানের সঙ্গে উপরে উল্লিখিত প্রবণতা ও প্রক্রিয়াগুলোর নিবিড় যুক্ততার বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছি। পাঠ্যক্রম সংশোধনে, বিদ্যায়তনিক শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায়, বিভিন্ন সাংবিধানিক ও আইনি সেক্যুলার ও লিবারেল প্রতিষ্ঠানগুলোর বনিয়াদি নীতি ও চর্চাকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রধান যুক্তি হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ‘পশ্চিমা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও জ্ঞানের’ সম্পর্ক। সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক বিধিবিধানের বৈধতাকে ‘পশ্চিমা’ ও ‘ঔপনিবেশিক আমলের আরোপিত হিসেবে’ চিহ্নিত করে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলোকে অনুপযোগী ও অকার্যকর হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। ব্রিটিশ ও মধ্যযুগীয় শাসনামল (অর্থাৎ, যে কালপর্বকে মুসলমান শাসকদের শাসনামল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়) ঔপনিবেশিক হিসেবে চিহ্নিত হয়। পাশাপাশি এক শুদ্ধকরণের প্রকল্প হাজির করা হয় ঔপনিবেশিক কুশীলবদের পুনরুত্থানের কাল্পনিক আতঙ্ক উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে মুসলমান ও খ্রিষ্টান এবং ধর্মান্তরিত আদিবাসী বিভিন্ন গোষ্ঠী হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও জৈবিকভাবে বহির্ভারতীয়। প্রাক্-মধ্যযুগীয় ‘হিন্দু’ আমল হিসেবে চিহ্নিত করা কালপর্বকে গৌরবময় সমৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখানো হয়। একদিকে পুরোনো হিন্দু গৌরবকে পুনরুজ্জীবিত করা ও অন্যদিকে নতুন করে ঔপনিবেশিক, বিশেষ করে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের পুনরুত্থানের আতঙ্ক তৈরি করার প্রণালিবদ্ধ তৎপরতার মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী ও নয়া-হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের বিকাশ ঘটেছে।
সালোনি কাপুরের মতো গবেষকেরা উল্লেখ করেন, ‘হিন্দু মননের বি–উপনিবেশায়ন’ প্রকল্পটি দেশজ সভ্যতাগত শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের ‘বিদেশি’ হিসেবে তকমা দিয়ে প্রান্তিকীকরণ, বিমানবিকীকরণ আর বেনাগরিকীকরণকে ন্যায্যতা দেওয়া হয় (কাপুর ২০২৫)। চটকদার বুলির কারিকুরির কারসাজিতে সমালোচনামূলক আলাপচারিতা ও গবেষণাকে ‘পশ্চিমা’ বা ‘জাতিবিরোধী’ হিসেবে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এই দশা সেন্সরশিপ এবং একাডেমিক ভিন্নমত দমনের দিকে নিয়ে যায় (লুইস এবং লল ২০২৩)। হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পে সেক্যুলার (হিন্দুত্ববাদীদের বুলিতে অসুস্থ ও বিকারগ্রস্ত চিন্তা হিসেবে সিক-উলার (sick-ular) সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে বা উদারনৈতিক বিভিন্ন ধারণা (যেমন বাক্স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার পাওয়ার নাগরিক স্বাধীনতা, ধর্ম-জাতি–বর্ণ-লিঙ্গ-আঞ্চলিক পরিচয়নির্বিশেষে সমানাধিকার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ইত্যাদি) পশ্চিমা, ঔপনিবেশিক আর ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে অনুপযুক্ত হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী অংশগুলোকে ভারতীয় ও হিন্দুত্ববাদী, কর্তৃত্ববাদী ও আধিপত্যবাদী প্রকল্পে উত্তর-ঔপনিবেশিক ও বি–উপনিবেশায়নের ভাষা, তত্ত্ব ও চিন্তাকে আত্তীকরণ করার আরও বিশদ উদাহরণ দেওয়া হয়েছে (কুনুম্মাল ২০২৩)। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের উদাহরণের সাপেক্ষে আরও বিস্তারিত আলাপও এই প্রবন্ধের পরের অংশে রয়েছে।
রাশিয়া: রাষ্ট্রীয় সভ্যতা এবং পাশ্চাত্যবিরোধিতা
যদিও প্রথাগত উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়ন থেকে প্রায়ই বাদ দেওয়া হয়, তবু রাশিয়া রাষ্ট্রীয় আত্মসাৎকরণের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উদাহরণ। রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় বয়ান ক্রমবর্ধমানভাবে রাশিয়াকে ‘ঔপনিবেশিকবিরোধী’ বিশ্বের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছে আর নিজেকে ‘সমষ্টিগত পশ্চিমের’ আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইকারী হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াকু পরিচয় তৈরিতে ব্যবহৃত বুলির কারিকুরি পুরোনো সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উত্তরাধিকার থেকে প্রচুর উপাদান গ্রহণ করে। কিন্তু সেগুলোকে একটি রক্ষণশীল ও সভ্যতাবাদী লেন্সের মাধ্যমে নতুন করে সাজায়। গবেষক লুইস ও লাল যুক্তি দেন, রাশিয়ার ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী অভিজাতেরা নারীবাদ, রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের জাতিসত্তার অধিকার, সার্বভৌমত্বের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষার মতো উদার মূল্যবোধগুলোকে অবৈধ করতে ‘বি–ঔপনিবেশিক’ যুক্তি ব্যবহার করে। তারা এগুলোকে রাশিয়ান ‘আত্মাকে’ দুর্বল করার জন্য ছক কষা বিদেশি ‘ঔপনিবেশিক’ আমদানি হিসেবে ফ্রেম করে (লুইস ও লল ২০২৩)।
সংযোগ-বিচ্ছেদের ধারণার মতো ধারণা ও চটকদার বুলি এমন ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং সিভিল সোসাইটিকে দমনের ন্যায্যতা দিতে ব্যবহৃত হতে থাকে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নজরদারি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে সার্বভৌমত্ব এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যের ভাষা ব্যবহার করে। এমনিতে ভূরাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বোঝাপড়া আর একচ্ছত্র অর্থনৈতিক ও ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়ার অংশীদারত্ব থাকলেও অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত দমন করা, স্বৈরাচারী শাসনের বিরোধিতাকারীদের শায়েস্তা করা অথবা বৃহত্তর রাশিয়ান জাতীয়তাবাদের বিস্তারের নামে আগেকার সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর ওপরে আগ্রাসন পরিচালনা করার কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাও বি–ঔপনিবেশিক বয়ানকে প্রতিবিম্বিত করে। একই বয়ান বর্তমানে রাশিয়ার অন্তর্গত বিভিন্ন জাতিগত আন্দোলন দমানোর জন্য প্রয়োগ করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই রাশিয়ান সম্প্রসারণবাদবিরোধীদের অভিযুক্ত করা হয় পশ্চিমাদের দোসর অথবা পশ্চিমা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ভোক্তা হিসেবে।
লাতিন আমেরিকা: দেশজতার টানাপোড়েন
অনেক বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বের জন্মস্থান লাতিন আমেরিকা। সেখানে পরিস্থিতির জটিলতা বহুমাত্রিক ও গতিশীলতা বহুমুখী। এখানে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইরত আদিবাসী এবং আফ্রো-বংশোদ্ভূত আন্দোলনের জন্য বি–ঔপনিবেশিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার’ মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। যেমন কলম্বিয়ার শান্তিপ্রক্রিয়ার অধ্যয়নের বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে কীভাবে ‘ক্ষমতার ঔপনিবেশিকতা’ টিকে থাকে। তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী আইনি নিষ্পত্তিতে ‘আত্মপরিচয়কে সারসত্তাকৃত করে তোলার’ ঝুঁকিগুলোও তুলে ধরে। যখন বিভিন্ন অধিকারকে কঠোরভাবে ‘ঐতিহ্যগত’ সত্তার বা আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন এই যুক্ত সম্প্রদায়গুলোকে সময়ের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে ফেলতে পারে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ অথবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ওপরে অধিকার অর্জনের জন্য তাদের নিজেদের ‘আদিবাসিত্বের’ একটি নির্দিষ্ট পরিচিতিমূলক ও প্রতিষ্ঠান–নির্ধারিত পারফরম্যান্স করতে বাধ্য করা হয়। এভাবেই তাদের নিজেদের অধিকার আদায় করতে তাদের আশ্রয় নিতে হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক জ্ঞান ও আইনি রূপরেখার প্রভাবে বিকশিত মানদণ্ডের ওপরে। এই মানদণ্ড অনুসারে আদিবাসিত্বের স্বীকৃতি পেতে তারা নির্দিষ্ট স্থির সময় ও পারফরম্যান্সকে পুনরুৎপাদন করতে থাকে আর অচিরেই তারা জাদুঘরায়িত বস্তুতে রূপান্তরিত হন (লোসাদা ২০২৮; ব্লাঙ্কো ২০১৬; লাভেল ২০০৭)।
বি–ঔপনিবেশিক তৎপরতার কিছু ধারা ‘মেস্তিজাজে’ (মিশ্রণ বা সংকরত্ব) ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা জাতিগত বা জনগোষ্ঠীগত সংমিশ্রণের বৈশিষ্ট্যগুলোকে আর সেগুলোর জনপরিসরগত সত্তাগুলোকে মুছে ফেলার মাধ্যম হিসেবে বি–উপনিবেশায়নের ভাষা ও বয়ান প্রয়োগ করে। ঐতিহাসিকভাবে এ কথা সত্য যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও জাতিসত্তার মধ্যকার মিশ্রণ অনেক সময় আদিবাসী সত্তাকে মুছে ফেলতে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে একটি কঠোর মেস্তিজাজে-বিরোধী বি–উপনিবেশায়নের সক্রিয়তা ‘বিশুদ্ধতার রাজনীতির’ দিকে ঝুঁকতে পারে। এসব তৎপরতা ঔপনিবেশিক জাতিগত শ্রেণিবিন্যাসকে যেন আয়নায় প্রতিফলিত করে আর লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সাংস্কৃতিক ও জৈবিক সত্তাগুলোর মিশ্র ও তরল বাস্তবতাকে ধারণ করতে হিমশিম খায়।
আফ্রিকা: সংবিধানবাদ বনাম দেশজবাদ
বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতিও খুবই জটিল। ঔপনিবেশিক মানচিত্রায়ণ ও ভূখণ্ডের ভাগাভাগি উপনিবেশপূর্ব জাতিসত্তাগত স্থানিক পরিসরের তারল্য আর রূপান্তরশীলতাকে আধুনিক রাষ্ট্রের মানচিত্রে খণ্ডবিখণ্ড করেছে। অন্যদিকে বি–উপনিবেশায়নের বিভিন্ন বুলি ও বয়ান খণ্ডিত জাতিগুলোর মধ্যকার সংঘাত ও সহিংসতাকে পরিপুষ্ট করছে। সাংবিধানিক অধিকারের ‘পশ্চিমা’ কাঠামো এবং প্রথাগত আইনের ‘বি–ঔপনিবেশিক’ পুনরুদ্ধারের মধ্যে টানাপোড়েন ও সংঘাতময়তা এক বিশুদ্ধতাবাদী দেশজবাদের বিকাশ ঘটায়। যেমন গবেষকেরা উল্লেখ করেন, আইনি কাঠামোগুলোকে প্রথাগত দাবিগুলোর (যেমন, জমি বা সরদারিব্যবস্থা–সংক্রান্ত) সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। এই দাবিগুলো কখনো কখনো সাংবিধানিক অধিকারের (যেমন লিঙ্গীয় সমতা অথবা মানবাধিকার বা জাতিগত ও ধমীয় সম্প্রদায়ের সমতা) সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। যখন রাজনৈতিক কুশীলবেরা সংবিধানকেই একটি ‘ঔপনিবেশিক চাপিয়ে দেওয়া বিষয়’ হিসেবে ফ্রেম করে, তখন তারা আসলে পিতৃতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী ঐতিহ্যবাদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে (সিম্বি ২০১২)।
আরেকটি লক্ষণও আফ্রিকায় বেশ প্রকটভাবেই দৃশ্যমান। সেটি হলো অপর জাতি অথবা বর্ণ কিংবা সংস্কৃতি বা রাষ্ট্রের মানুষজনের প্রতি ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ, যাকে সামগ্রিকভাবে জেনোফোবিয়া হিসেবে শনাক্ত করা যায়। বি–ঔপনিবেশিকীকরণের ‘দেশজবাদী’ রূপগুলো জেনোফোবিয়াকে উসকে দিতে পারে। যদি আফ্রিকার নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্র আর জাতিবাদ লেপ্টালেপ্টি করে দাবি করে যে ওই রাষ্ট্র কেবল সেই রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির জন্যই বৈধ, তাহলে সেই দাবি হয়ে ওঠে বর্জনবাদী। এমনকি এই বর্জন বহুত্ববাদের ধারণার অধীন থেকেও করা যায়। কোনো একটি বা একাধিক জাতিসত্তা বা রাষ্ট্রসত্তা বা লিঙ্গীয় সত্তাকে একদমই বহিরাগত, বিদেশি বা অপর সত্তা হিসেবে তকমা দেওয়াকে স্বাভাবিক করে তোলা যায়, তখন বহুত্ব ও অন্তর্ভুক্তি কেবল সেসব পরিচয়কেই ‘বহুর’ মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করবে, যেগুলো ওই বহুত্বের নির্ধারিত মানদণ্ড ও দেশজপনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দেশজবাদ অন্যান্য আফ্রিকান দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দিতে পারে। কারণ, তাদের তখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে ‘যথেষ্ট দেশজ নয়’ বলে গণ্য করা হয়।
একই সঙ্গে সেটলার কলোনিগুলোতে আর যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ আর দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতেও বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদ, পরিচয়বাদ আর ধর্মবাদী বিভিন্ন আধিপত্যবাদী প্রকল্পে বি–উপনিবেশায়ন ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বায়ন ও সমালোচনা থেকে বিভিন্ন ভাষা, অভিব্যক্তি আর জনতুষ্টিবাদী বয়ানবাজি বাছাই করে আত্মসাৎ করার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যে দেশগুলো ঔপনিবেশিক শাসনের কুশীলব ছিল অথবা চিন্তাগত পরিসর ছিল (যেমন জার্মানি বা ইতালি) সেই দেশগুলোতেও হালের উগ্র ডানপন্থার উত্থানের মুখে বিভিন্ন পক্ষেই উত্তর-ঔপনিবেশিক ও বি–উপনিবেশায়নের চিন্তা থেকে লোকরঞ্জক চটকদার বুলি ও ভাষার কারিকুরির কারসাজি হরহামেশা ব্যবহৃত হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, একসময়ের ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশিত—উভয় অঞ্চলেই বা দেশেই পর্যালোচনামূলক এসব তত্ত্বের বয়ানবাজি বাস্তব রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে (ট্রাম্পের আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ, ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ স্বৈরতান্ত্রিক সংখ্যাগুরুবাদী একচেটিয়া শাসন বা দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় জাতিবাদী ও দেশজবাদী বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী শক্তিশালী ও প্রভাববিস্তারী রাজনীতির উত্থানে এমন আলামতের অভাব নেই) (আমিরেলে ২০২৩; কামিসুনা ২০২৪; কোয়াক ২০২০; টাক ও ইয়াং ২০১২; টাউট প্রমুখ ২০২৪; নেইলর প্রমুখ ২০১৮; বোগার্টস ও রাবেন ২০১২; ম্যাককার্ডি প্রমুখ ২০২৫; লি ২০২৩; লোভেল ২০০৭; স্যান্ডার্স ২০১৮)।
নৈর্ব্যক্তিকতা ও নির্মোহ বস্তুনিষ্ঠতার বি–ঔপনিবেশিক প্যারাডক্স: হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসতত্ত্ব এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক দাবির হাতিয়ারকরণ
হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসতত্ত্ব কতগুলো মৌলিক স্ববিরোধিতার মধ্য দিয়ে প্রামাণ্যতা ও সত্যতার দাবি পেশ করে। একদিন এই ইতিহাসতত্ত্বের কুশীলবেরা বৈজ্ঞানিক নৈর্ব্যক্তিকতা আর নির্মোহ ও নিরপেক্ষতার দাবি করেন। প্রাসঙ্গিকভাবে মনে রাখতে হবে, নৈর্ব্যক্তিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা আর নির্মোহ অবস্থানে থেকে ইতিহাস লিখনের ধারণা আলোকায়ন আর ঔপনিবেশিক আধুনিকতা জারিত ইতিহাসতত্ত্বের অন্যতম বনিয়াদি সারসত্তা। অন্যদিকে প্রাচ্যবাদী ও আধুনিকতার অন্যতম আরেকটি বনিয়াদ হলো সাপেক্ষিকতাবাদ ও নির্দিষ্টতাবাদী ধারণা। এ দুই বিপরীত অবস্থানের টানাপোড়েনে পশ্চিমা ইতিহাসতত্ত্ব দীর্ঘদিন বিকশিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই ইউরোপীয় পরিসরের ইতিহাসচর্চায় এ টানাপোড়েন চলমান ছিল।
তবে উপনিবেশের ইতিহাস আবিষ্কার ও লিখনের প্রকল্পে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের, ভারতবিদ্যাগত ও ঔপনিবেশিক ইতিহাস রচনার প্রকল্পের দিকে মনোযোগ দিলে দেখা যাবে পৌরাণিক ও অতিকথনভিত্তিক অথবা ধর্মকেন্দ্রিক ইতিহাসের তকমা দিয়ে উপনিবেশপূর্ব কালের বিভিন্ন লিখিত সূত্র ও বৃত্তান্তকে ইতিহাস হিসেবে মান্য করা হয়নি। পুরাণ, ধর্মশাস্ত্র ও লিখিত বিভিন্ন সূত্রকে ইতিহাসের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বৈজ্ঞানিকীকরণ, নৈর্ব্যক্তিকীকরণ এবং নিরপেক্ষতার ছাঁকনিতে পর্যালোচনার দাবি করে।
উপনিবেশ-উত্তর জাতীয়তাবাদী ইতিহাসতত্ত্বে নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠতার তকমা প্রবলভাবে পুনরুৎপাদিত হলেও নানাস্তরের জনপরিসরে বিভিন্ন স্থানীয় ধারার ও আদিকল্পীয় ইতিহাসবোধ সমন্বয় ও সংঘাতসমেত অস্তিত্বশীল থেকেছে। পরিশেষে আধুনিকতা ও সভ্যতাগত গৌরব, সমৃদ্ধি আর শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান নির্মাণে নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈর্ব্যক্তিকতার বাতাবরণ দৃঢ় হয়েছে। কোনো ইতিহাস লিখন এই মানদণ্ডে ইতিহাস হয়ে উঠল কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বাহাসের উদাহরণ বহু পাওয়া যাবে। প্রকৃতপক্ষে সেই ইতিহাসে পুরাণ, অতিকথন অথবা পদ্ধতিগতভাবে ভ্রান্তি কীভাবে অন্তর্লীন ছিল বা ছিল না, সেই তর্ক এখানে গৌণ; বরং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠতা আর নিরপেক্ষভাবে ইতিহাসের সত্য জানার চেষ্টাকে সর্বজনীনভাবেই স্বীকৃত ধরে নেওয়া হয়।
ইতিহাসতত্ত্বের তত্ত্বীয় ও পদ্ধতিগত প্রসঙ্গগুলো বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করলে হিন্দুত্ববাদীদের দাবি ও বিশ্লেষণপদ্ধতির পরস্পরবিরোধিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে তারা অনবরত দাবি করতে থাকে, কোনো জাতির অতীত ও ইতিহাস হলো সেই জাতি গঠনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় আর বনিয়াদি। কিন্তু ‘ভারতীয় অথবা হিন্দু জাতির’ কাছ থেকে তাদের প্রাকৃতিক ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দখল করে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বয়ানের মাধ্যমে এবং চটকদার বুলির কারিকুরিতে বা রেটোরিকে নিজেদের ভিকটিম ও মজলুম পরিচয় জাহির ও পুনরুদ্ধারের সংকল্প ঘোষণা করা হয়। এ প্রকল্পকে নিছক জনতুষ্টিবাদী ও নির্বাচনী কৌশল হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে; বরং বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন প্রণালিবদ্ধ পদ্ধতিতে, পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করার মাধ্যমে এবং বিপুল বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসের পুনরুদ্ধার, নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠকরণ আর চিন্তার ওপরে হেজিমোনিক কর্তৃত্ব অর্জনের প্রক্রিয়াগুলো চালু রয়েছে। বিস্ময়করভাবে ইতিহাসতত্ত্ব ও ইতিহাসের পুনর্লিখনের এই পবিত্রকৃত প্রকল্প তথাকথিত ‘ইতিহাসের বিকৃতি’ সংশোধনের নামে বিভিন্ন ধরনের ও মাত্রার পদ্ধতিগত বিচ্যুতির জন্ম দিয়ে তো চলছেই, পাশাপাশি বৈধতা দান করেছে আদি ও মধ্যযুগের ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পাঠকে আর সেই ইতিহাসের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ঝোঁক ও প্রবণতাগুলোকে (অভিকুন্তক ২০২১; উলফ ২০০৯; গোপাল প্রমুখ ১৯৯৩; ঝা ২০০৯; নন্দী ১৯৯৫; ভার্মা এবং মেনন ২০১০; ভিসানা ২০২২; মহাজন ২০১৮; সরকার ২০১৯; সিং ২০২১; সুন্দর ২০০৫; হিউমস ২০১২)।
‘নির্বাচিত বিজ্ঞানবাদের’ কৌশল: কর্তৃত্বের সিঁড়ি হিসেবে ল্যাবরেটরি
হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসতত্ত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানবিকবিদ্যার ব্যাখ্যামূলক সীমাবদ্ধতাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ‘বিজ্ঞানবাদী’ যুক্তিতর্কের আশ্রয় নেওয়া। মুশকিল হলো এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের পদ্ধতি আর অব্যহত প্রশ্ন জারি রেখে পরিবর্তনশীল ও সম্ভাব্য সত্য জানার তরিকা হিসেবে নয়, বরং একটি অভ্রান্ত দৈববাণীর মতো ব্যবহার করা হয়। প্রধানত প্রত্নতাত্ত্বিক সময় নির্ণয়ের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (যেমন রেডিওকার্বন ডেটিং), বহুবিধ বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে পাওয়া উপাত্ত, ডিএনএ সিকোয়েন্সিং, স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিং আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবকে এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী অতীতে বয়ান নির্মাণের এক ‘ফরেনসিক’ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন এ ক্ষেত্রে উত্থাপন করা জরুরি: যদি ল্যাবরেটরিই সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়, তবে সেই একই বিজ্ঞানের ফলাফল যখন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী গোষ্ঠীগুলোর (আর্য নামক নরবর্ণগত বা জাতিগত পরিচয়বাহী জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় ভ্রান্তভাবে) হরপ্পা সভ্যতার পরবর্তী সময়ে (খ্রিষ্টপূর্ব১৭০০ থেকে ১২০০ অব্দ পর্যন্ত) অভিবাসনের সপক্ষে যায়, তখন কেন সেই উপাত্ত ও বিশ্লেষণকে ‘ঔপনিবেশিক বা পশ্চিমা কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়?সরস্বতী নদীর অতীত প্রবাহপথ শনাক্তকরণে উপগ্রহচিত্র ও দূর অনুধাবনের বিভিন্ন বিশ্লেষণকে ধ্রুব সত্য হিসেবে জাহির করা আর অন্যদিকে ভাষাতত্ত্বীয় প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের বিশ্লেষণনির্ভর তথ্যকে অস্বীকার করা হতে থাকে। কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই সত্য ও মিথ্যা নির্ধারণে এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রমাণ করে যে এসব তর্কবিতর্কে বিজ্ঞান কোনো নির্মোহ অনুসন্ধানের পথ নয়। বরং আগে থেকে নির্ধারিত সত্তাশ্রয়ী সিদ্ধান্তকে একটি নৈর্ব্যক্তিক, বিজ্ঞানসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠতার সিলমোহর দেওয়ার হাতিয়ার মাত্র।
অনুকৃতিবাদী কপট অভ্যুত্থান: মেকি নৈর্ব্যক্তিকতা ও ঔপনিবেশিক ব্লুপ্রিন্ট
হিন্দুত্ববাদীদের যুক্তিতর্ক পেশ করার বনিয়াদি পদ্ধতি আর বয়ানগুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আপাতদৃষ্টিতে উপনিবেশ বা পশ্চিমা জ্ঞানের বিরুদ্ধে একধরনের অভ্যুত্থান বা বিদ্রোহ করার দাবি করলেও অথবা বিদ্যায়তনিক আধুনিক ও পর্যালোচনামূলক ইতিহাসকে ভ্রান্ত, ঔপনিবেশিক, মুসলমানদের তোষণমূলক হিসেবে দাগিয়ে দেয়। অথচ সেই ইতিহাস লিখনের ও বয়ানের ভাষা, পদ্ধতি আর অভিব্যক্তিই বাছাই করে আত্মসাৎ, পরিমার্জন ও প্রয়োগ করা হতে থাকে। এ কারণেই এ ধরনের অদৃশ্য ও জটিল গ্রহণ–বর্জনমূলক আর আধিপত্য তৈরি করার জন্য বয়ান নির্মাণ করেই প্রবল ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে জাহির করাকে অনুকৃতিবাদী কপট অভ্যুত্থান বা মিমেটিক ইনসারজেন্সি হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামোকে ঘৃণা করেও কি তাদেরই তৈরি নথিপত্র আঁকড়ে ধরা সম্ভব? ব্রিটিশ আমলের নথিপত্র বা মহাফেজখানা থেকে তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে এই পরিচয়বাদী ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঘরানা একধরনের কৌশলী ব্যবচ্ছেদ ও আহরণ বা সার্জিক্যাল এক্সট্র্যাকশন পদ্ধতি অনুসরণ করে। বিপুল ও জটিল উৎস ও উপাত্ত থেকে দরকারমতো বাছাই করে উৎসের পর্যালোচনা না করেই ব্যবহার করার এই কৌশল একদিকে জনতুষ্টিবাদী হয়, অন্যদিকে সুনির্দিষ্ট পরিচয়বাদী বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার কার্যকর ভূমিকা রাখে। যেমন একদিকে তারা ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বকে ইতিহাসের বিকৃতির উৎস হিসেবে অভিযুক্ত করে, আবার অন্যদিকে এলিয়ট ও ডাউসনের অনুবাদ করা ফারসি ইতিহাসগ্রন্থগুলোকে মধ্যযুগীয় নিপীড়নের অকাট্য ও নৈর্ব্যক্তিক প্রমাণ হিসেবে বরণ করে নেয়।
এমন মেকি নৈর্ব্যক্তিকতাও নির্মোহ অবস্থানের দাবি আসলে প্রমাণ করে যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রকল্পটি কোনো মৌলিক বি–উপনিবেশায়ন নয়; বরং এই তৎপরতা ও বয়ান ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামোরই এক পুনর্দখল।
অতীতের হাতিয়ারকরণ: সংখ্যাতাত্ত্বিক মহাবিপর্যয়, নৈর্ব্যক্তিকতা এবং পবিত্রতার ভূখণ্ডায়ন
হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চা প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসকে সমসাময়িক সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যায়তনিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কগুলোকে উগ্র পরিচয়বাদী আর সাম্প্রদায়িক উসকানিতে রূপান্তর করা।
‘আর্যদের আদিবাসসংক্রান্ত বিতর্ক’ এই হাতিয়ারকরণের একটি মোক্ষম উদাহরণ। পেশাদার ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ভাষাতাত্ত্বিক পুনর্গঠন, প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং জেনেটিক প্রমাণের ভিত্তিতে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী গোষ্ঠীগুলোর (যাদের ইন্দো-আর্য বলা হয়) পরিযান নিয়ে বিতর্ক করেন। এই বিতর্ক আন্তশাস্ত্রীয়, জটিল এবং বহুমুখী গবেষণার বিষয়। ইন্দো-ইউরোপীয়দের অভিবাসনের বিভিন্ন পর্ব সম্পর্কে (যা আর্য আক্রমণতত্ত্ব অথবা ভারতকেন্দ্রিক আর্যদের উদ্ভবতত্ত্ব থেকে পুরাপুরি ভিন্ন) বিগত দুই দশকের বিভিন্ন গবেষণায় নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদেরা এই জটিলতাকে একটি দ্বিমুখী বা বাইনারি বাছাইয়ে সংকুচিত করেন: আপনি ‘ভূমিপুত্র’ (যা হিন্দুদের শ্রেষ্ঠত্বকে বৈধতা দেয়), নয়তো আপনি ‘আক্রমণকারী’ (যা এই উপমহাদেশে হিন্দুদের চিরন্তন ভূমিজ হওয়ার দাবিকে অবৈধ প্রমাণ করে)। ‘আর্যদের’ আদিবাস এই ভূখণ্ডেই ছিল দাবি করে তারা সিন্ধু সভ্যতা থেকে বর্তমান পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন হিন্দু সভ্যতার আখ্যান তৈরি করে। ফলে সমসাময়িক হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদকে প্রাচীন আদিবাসীদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সহজ হয়।
সভ্যতার আদি মালিকানা দাবি করার লক্ষ্যে কীভাবে পাণ্ডিত্যপূর্ণ সংশয়কে রাজনৈতিক নিশ্চিতিতে রূপান্তর করা হয়? আর্যদের আদি নিবাস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে যে বহুস্তরীয় ও অমীমাংসিত বিতর্ক বিদ্যমান, হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসতত্ত্ব তাকে একটি সরল দ্বিমুখী সমীকরণে নামিয়ে আনে: ‘দেশজ’ (যা তাদের শ্রেষ্ঠত্বকে সত্তাশ্রয়ী বৈধতা দেয়) বনাম ‘আক্রমণকারী’ (যা অন্যদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে)। হাজার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া আর অভিবাসনের জটিলতাকে অস্বীকার করে তারা আর্যদের এই মাটির সন্তান হিসেবে উপস্থাপনের দাবিকে ‘নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক সত্য’ হিসেবে প্রচার করে। এখানে ইতিহাস কোনো অনুসন্ধানের ক্ষেত্র নয়, বরং বর্তমানের রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাচীনকাল থেকে বৈধ করার এক প্রয়াস। এর ফলে ইতিহাসের জ্ঞানতাত্ত্বিক বহুমাত্রিকতা বিসর্জিত হয় জাতীয়তাবাদী একরোখা জেদের কাছে।
‘মধ্যযুগে মন্দির ধ্বংসের বয়ান’ ইতিহাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আরেকটি ভয়ংকর উদাহরণ। হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদেরা মুসলিম শাসকদের দ্বারা ধ্বংস হওয়া কথিত মন্দিরের তালিকা তৈরি করেন এবং সেগুলোকে পাঁচ শতাব্দী ধরে চলা একটি পরিকল্পিত ও ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত মূর্তিবিনাশের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। পেশাদার ইতিহাসবিদেরা বেশ কিছু যুক্তিতে এই দাবিগুলো নস্যাৎ করেন: প্রাক্-আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আধুনিক সাম্প্রদায়িক চশমা দিয়ে দেখা, মুসলিম শাসকদের মন্দির অনুদান ও হিন্দু রাজাদের মন্দির ধ্বংসের ইতিহাস চেপে গিয়ে কেবল সুবিধামতো তথ্য চয়ন করা এবং দুর্বল উৎসের ওপর ভিত্তি করে ভুল পদ্ধতিতে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচার করা। তবে সাধারণ মানুষের আবেগতাড়িত ‘ভুক্তভোগী আখ্যান’-এর কাছে এই তাত্ত্বিক সমালোচনা বিশেষ পাত্তা পায় না। এই কৌশলকে বলা যেতে পারে ‘সংখ্যাতাত্ত্বিক মহাবিপর্যয়’। এই কৌশলে জটিল ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে কিছু সংখ্যার তালিকায় পরিণত করা হয়।
এসব তালিকা প্রমাণ আকারে পেশ করার মাধ্যমে শোষণের একটি পদ্ধতিগত প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। এই তালিকাকরণ আর সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবেশন হিন্দুদের ঐতিহাসিক ক্ষোভ এবং হারানো অধিকার ‘পুনরুদ্ধারের’ দাবিকে বৈধতা দেয়। ইতিহাস যখন কেবল ‘মন্দির ধ্বংসের শুমারিতে’ পর্যবসিত হয়, তখন সেই সময়ের জটিল, স্থানিকভাবে স্থিতিস্থাপক আর পরিচয়গতভাবে অনেক ভিন্ন বয়ানের কী পরিণতি ঘটে? ‘সংখ্যাতাত্ত্বিক বিপর্যয়’ সৃষ্টির মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসতত্ত্ব মধ্যযুগের জটিল ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংসের একটি রৈখিক তালিকায় রূপান্তর করে। একটি স্থাপত্যিক অবশেষ বা ভাঙা পাথরের গায়ের ক্ষতকে তারা নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে, কিন্তু একই সময়ে সেই সুলতান বা বাদশাহর দেওয়া মন্দিরের ভূমিদান (সনদ) বা হিন্দু শাসকদের দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দু মন্দিরের লুণ্ঠনপ্রক্রিয়াকে সযত্নে আড়াল করে। পাশাপাশি সেই সময়ের পরিচয়ের স্থানিক বহুত্বকে এবং বিভিন্ন পরিচয়ের জটিল মিথস্ক্রিয়াকে বর্তমানের প্রবল পরিচয়বাদী বয়ান দিয়ে ভ্রান্তভাবে চিহ্নিত করার চেষ্ঠা করে।
এখানে একটি পদ্ধতিগত প্রশ্ন জাগে: কেবল সংখ্যার খতিয়ান কি মধ্যযুগের রাষ্ট্রনীতি বা সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বোঝাতে সক্ষম? আর্থসামাজিক সমন্বয়কে অস্বীকার করে কেবল ট্রমার একপক্ষীয় বয়ান তৈরি করার মাধ্যমে তারা ইতিহাসকে একটি ‘অবরুদ্ধ ব্যবস্থায়’ পরিণত করেছে, যেখানে তথ্যের আধিক্যকে ব্যবহার করা হয় ইতিহাসের গভীর সত্যকে ধামাচাপা দিতে।
অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ হিন্দুত্ববাদীদের হাতে ধ্বংস হওয়ার আগে ও পরে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন তৎপরতা ও বয়ানবাজি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আখ্যানে নির্মোহ বস্তুনিষ্ঠতার পাটাতন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে। এমনকি পৌরাণিক ও লিখিত উৎসের সঙ্গে নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ আলামতের জগাখিচুড়ি পাকানো ব্যাখ্যা বি–উপনিবেশায়নের চটকদার বুলিতে পেশ করার উদাহরণও হিন্দুত্ববাদীদের জবানিতে পাওয়া যাবে। লিখিত ও পৌরাণিক আর মিথকে নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণের নামে বিজ্ঞান করে তোলার চেষ্টা একদিকে; আর অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক আলামতের সত্তাশ্রয়ী ও সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যাকে আধুনিক দৃষ্টবাদী ও প্রত্যক্ষণগত আলামত হিসেবে হাজির করা অন্যদিকে। এমন নয় যে মহাকাব্য ও পুরাণগুলো নিয়ে অথবা পৌরাণিক ইতিহাসের ধারণা নিয়ে প্রখর ও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে। কিন্তু সেসব আলাপকে উপনিবেশবাদী অথবা পশ্চিমা চিন্তা প্রভাবিত হিসেবে দেগে দেওয়ার প্রবণতাও এই তৎপরতাগুলোয় দৃশ্যমান ছিল। পরস্পরবিরোধী সংশ্লেষের একটি ভয়ংকর উদাহরণ হিসেবে এই ধ্বংসের পরে আদালতের নির্দেশনায় পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন আর খননের আলামতের ব্যাখ্যাকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করেন যে অযোধ্য রামজন্মভূমি আর বাবরি মসজিদ রামের জন্মস্থানে নির্মিতে একটি মন্দির ভেঙে তার ধ্বংসাবশেষের ওপর মোগল সম্রাট বাবরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছিল। এই প্রত্নতত্ত্বচর্চা ও তার বনিয়াদি সংকট নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। সেসব বিশ্লেষণ অন্তর্জাল দুনিয়ার কল্যাণে জনপরিসরে খুঁজলেই পাওয়া যাবে। এখানে বিশদভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক আলামতের বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যাবিষয়ক পর্যালোচনায় যাওয়ার সুযোগ কম। তবে একটা কথা স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক আলামতের ভিত্তিতে বাবরি মসজিদ কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপরে নির্মিত বলে প্রত্যক্ষণগত ও বস্তুনিষ্ঠ কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাবরি মসজিদের প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে পর্যালোচনাগুলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়বাদী বিভিন্ন বয়ানবাজিতে ও সহিংসতাকে ন্যায্যতা প্রদানকারী বয়ানের সপক্ষে তাঁরা কিছু বাছাই করা প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং ধর্মীয় গ্রন্থের আক্ষরিক পাঠকে ‘প্রমাণ’ হিসেবে হাজির করেন। পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যখন এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁদের ‘মতাদর্শগতভাবে আপসকামী’ বলে খারিজ করে দেওয়া হয়। ১৯৯২ সালে মসজিদ ধ্বংস এবং পরবর্তী আইনি লড়াই প্রমাণ করে, কীভাবে ভ্রান্ত ঐতিহাসিক আখ্যানকে সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করা যায়।
‘পবিত্র ভূগোলের’ ধারণার লেন্স দিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠতার নামে ঐতিহাসিক যুক্তির মাধ্যমে কোনো ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর চিরন্তন, অনড় আর বিজ্ঞানসম্মত দাবি করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে উপাসনার অথবা ধর্মীয়ভাবে বহু অর্থ বহনকারী স্থানগুলো জাতীয়তাবাদী ও পরিচয়বাদী যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়ে ওঠে। পৌরাণিক কাহিনি বা জনশ্রুতিকে কোনো সমালোচনা ছাড়াই ‘লিখিত উপাদান’ বা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ব্যবহার করে তারা অতীতকে একটি অপরাধের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে আর সেই অপরাধের বিচার করাকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আবশ্যকীয় হিসেবে ঘোষণা করে। এ ক্ষেত্রে ধর্মাচার ও বিশেষ সম্প্রদায়ের পরিচয়নির্ভর বিশ্ববীক্ষাকে স্থানিক পরিসরের সঙ্গে সমাপতন ঘটানো হয়। এ প্রক্রিয়াকে আমরা সাম্প্রদায়িকতার ভূখণ্ডায়ন হিসেবে আখ্যায়তি করতে পারি।
বয়ানবাজির কারিকুরি ব্যবহারের এমন কৌশলের একটি সাধারণ কৌশলগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কৌশলটি হলো ‘বিদ্যায়তনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনিশ্চয়তাকে রাজনৈতিক নিশ্চিতিতে রূপান্তর করা’। পেশাদার ইতিহাসচর্চায় অস্পষ্টতা, তথ্যের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাখ্যার বহুত্বকে স্বীকার করে নেওয়া হয়। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চা এই অনিশ্চয়তাকে মুছে ফেলে বিতর্কিত দাবিগুলোকে ধ্রুব সত্য হিসেবে পাঠ্যপুস্তক এবং আইনি বিচারে উপস্থাপন করে। এ রূপান্তর সম্ভব হয় বিকল্প প্রকাশনা সংস্থা, প্রণালিবদ্ধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার সংগঠন গড়ে তোলার, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক সক্রিয় করাসহ নানা প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলের মাধ্যমে। এমনকি হালের বিদ্যায়তনিক ও প্রকাশনা কারখানায় ‘পিয়ার রিভিউ’ বা বিশেষজ্ঞ যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার দাবি করে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধ ও বইপত্রও একটি সম্পূরক সমান্তরাল জ্ঞানব্যবস্থা তৈরি করে। পরিশেষে মুনাফা অর্জনের নয়া উদারনৈতিক পুঁজিবাদীব্যবস্থায় খ্যাতিমান ও বনেদি প্রকাশনা সংস্থাগুলো এমন বহু ভ্রান্ত ও প্রতারণামূলক চিন্তাকে বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্মোহ আখ্যান হিসেবে বাজারজাত করে। সম্মিলিত ও সুপরিকল্পিত এই অনুকৃত কপট অভ্যুত্থানের চটকদার কারসাজিতে এমন উগ্র জাতীয়তাবাদী আখ্যানগুলোই কাণ্ডজ্ঞান হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
বিকৃতি এবং বিজয়: পরস্পরবিরোধী যুক্তির যুগপৎ প্রয়োগ
হিন্দুত্ববাদীদের ‘ইতিহাসের বিকৃতি সংশোধনের’ প্রকল্প নিজেই একটি পদ্ধতিগত বিকৃতি। একই সঙ্গে দৃষ্টবাদী (positivist), সত্তাশ্রয়ী (subjectivist) ও নৈর্ব্যক্তিকতাবাদী (objectivist) যুক্তি প্রয়োগ করার দাবি করে এ প্রকল্প(গুলো) কাজ করে। আর এমন কৌশলগত অসংলগ্নতা আসলে তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য খুবই কার্যকর।
‘নির্মোহ বৈজ্ঞানিকতা আর দৃষ্টবাদিতার’ যুক্তি তখন সামনে আসে, যখন হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদেরা সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি করেন; যেমন ‘১৫২৮ সালে বাবর রামমন্দির ধ্বংস করেছিলেন’, ‘বেদের সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ’, ‘মুসলিম শাসকেরা ৬০,০০০ মন্দির ধ্বংস করেছেন’, ‘বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করা গেছে যে বৈদিক সরস্বতী নদী হরপ্পা সভ্যতার সমসাময়িক ছিল ও হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম প্রভাবক ছিল; তাই সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার পরিবর্তে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা বলতে হবে। আর সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সময়ে বা তার আগে বেদ লিখিত হয়েছিল’ ইত্যাদি। এই বক্তব্যগুলোকে প্রত্যক্ষণলব্ধ বা এমপিরিক্যাল ও অকাট্য বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে পেশ করা হয়। অথচ তারা প্রত্যক্ষণ ও বস্তুনিষ্ঠতার ন্যূনতম শৃঙ্খলাও মানেন না। সূত্রগুলো আংশিকভাবে চয়ন করা হয়, বিরোধী প্রমাণ অগ্রাহ্য করা হয় এবং দুর্বল উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে বিশাল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখানে নির্মোহতা, বস্তুনিষ্ঠতা আর প্রত্যক্ষণলব্ধ বৈজ্ঞানিকতার বাগাড়ম্বর কেবল পাণ্ডিত্যপূর্ণ কর্তৃত্ব জাহিরের জন্যই ব্যবহৃত হয়।
‘সত্তাশ্রয়িতার যুক্তি’ আবির্ভূত হয় তখন, যখন পেশাদার ইতিহাসবিদেরা তাঁদের এই দাবিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেন। এ ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদেরা পালটা যুক্তি দেন যে ইতিহাস আসলে একধরনের ‘ব্যাখ্যা’; ‘দেশজ’ বা নিজস্ব সত্তার দৃষ্টিভঙ্গিও ‘পাশ্চাত্য’ পাণ্ডিত্যের মতোই সমান বৈধ এবং প্রত্যক্ষণলব্ধ প্রমাণের পাশাপাশি ভারতীয় ঐতিহ্যগত জ্ঞানব্যবস্থাকে আর আবেগীয় ও ভক্তিজাত জ্ঞানকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। এই সত্তাশ্রয়ী অবস্থান পুরাণকে ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে এবং আচার-প্রবৃত্তি-অপার্থিবতা ও অতিকথনকে হরেদরে কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই আর সূত্রগুলোর তীক্ষ্ণ নিরিখ ছাড়াই বৈধ ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের পথ খুলে দেয়। পরিণতিতে পেশাদার ও পর্যালোচনামূলক ইতিহাসচর্চাকে স্রেফ আরেকটি ‘ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে খারিজ করা সহজ হয়। এই সত্তাশ্রয়ী চালাকির চালটি একদিকে পাণ্ডিত্যপূর্ণ সমালোচনাকে গুরুত্বহীন করে দেয়, অন্যদিকে পরিচয়বাদী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সুবিধাজনক ব্যাখ্যাকে বৈধতা দেয়।
আবার ‘নৈর্ব্যক্তিকতাবাদী যুক্তি’ ফিরে আসে, যখন তারা যেকোনো পর্যালোচনামূলক ইতিহাস লিখনীকে বা হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসের সমালোচনাকারীদের ‘মার্ক্সবাদী’ বা ‘সেক্যুলার’ বা ‘অভিজাত লিবেরাল’ হিসেবে তকমা দেয় আর পক্ষপাতদুষ্ট, পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত এবং মতাদর্শগতভাবে প্রভাবিত ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিরোধী হিসেবে সেই ইতিহাস লিখনী আর ইতিহাসবিদদের দাগিয়ে দেয়। বিপরীতে বস্তুনিষ্ঠ, নির্মোহ আর ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থার অধীন পরিচালিত সত্য ও নিরপেক্ষ ইতিহাস হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে। এখানে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদেরা দাবি করেন যে তাঁদের কাজ সম্পূর্ণ মতাদর্শগত প্রভাবমুক্ত। কারণ, এই কাজ ‘খাঁটি ভারতীয়’ দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁদের রচিত ইতিহাস কোনোভাবেই ঔপনিবেশিক বা বামপন্থী ফ্রেমওয়ার্ক দ্বারা কলুষিত নয়। তাঁরা হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ইতিহাসকেই একমাত্র নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস হিসেবে পেশ করেন এমনভাবে যেন তাঁদের দ্বারা স্বীকৃত ও প্রত্যয়নকৃত জাতি-দেশ-জাতিবর্ণের প্রতি আনুগত্যই বস্তুনিষ্ঠতার গ্যারান্টি দেয়। নৈর্ব্যক্তিকতাবাদী নির্মোহ হিসেবে পরিবেশিত এই ধারাগুলো হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে একমাত্র প্রকৃত নিরপেক্ষ বিদ্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং পক্ষপাতিত্ব ও নিরপেক্ষতার চিরাচরিত সংজ্ঞাকেই আমূল বদলে দেয়।
বিকৃতির কৌশলগুলো মূলত কয়েকটি প্রক্রিয়ায় কাজ করে:
মিথ বা পুরাণকে প্রমাণে উন্নীত করা: সূত্র-বিচারের তোয়াক্কা না করেই ধর্মীয় ও লিখিত সূত্রগুলোর একরৈখিক পাঠ ও স্থানীয় লোককথাকে আক্ষরিক ইতিহাস হিসেবে ব্যবহার করা।
বাছাইকৃত সামগ্রিকতা (selective comprehensiveness): প্রচুর উদ্ধৃতি ব্যবহার করে গবেষণার গভীরতা ও ব্যাপ্তি বোঝানোর চেষ্টা করা, অথচ পদ্ধতিগতভাবে বিরোধী প্রমাণগুলোকে বাতিলের খাতায় রাখা।
কালবিভ্রান্তিমূলক বিচ্যুতি (anachronistic projection): প্রাক্-আধুনিক সমাজের বোঝাপড়ায় আধুনিক সাম্প্রদায়িক পরিচয় বা জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন পরিচয় ও বর্গ চাপিয়ে প্রক্ষেপ করে ব্যবহার করা।
ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বয়ান: পেশাদার ইতিহাসচর্চাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্র হিসেবে দেগে দেওয়া এবং নিজেদের আখ্যানকে রাজনৈতিকভাবে ‘নিষ্পাপ’ হিসেবে সাজানো।
ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক শব্দভান্ডার: প্রত্নতত্ত্ব বা বংশগতিবিদ্যার কারিগরি ভাষা ধার করা, কিন্তু সেগুলোর একাডেমিক শৃঙ্খলা না মেনে বিজ্ঞানের বিভ্রম সৃষ্টিকারী বাস্তব কাঠামো (simulacrum) তৈরি করা।
‘অতীতের বিজয়’ সম্পন্ন হয় প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসকে দখলের মাধ্যমে। হিন্দুত্ববাদী নেটওয়ার্কগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে পাঠ্যক্রম কমিটি এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ডগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে সমালোচক ইতিহাসবিদেরা চাপের মুখে থাকেন। এই প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত কৌশলের মাধ্যমেই বিতর্কিত ব্যাখ্যাগুলো নাগরিক ধ্রুবসত্যে পরিণত হয় এবং হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চা পরিণত হয় সমাজের কাণ্ডজ্ঞানে।
পদ্ধতিগত সুবিধাবাদ: ত্রিস্তরীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক ডিগবাজি
এই পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতা লুকিয়ে আছে এর ‘পদ্ধতিগত সুবিধাবাদ’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক অসংগতির মধ্যে। তারা পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনটি ভিন্ন অবস্থানে বিচরণ করে:
১. দৃষ্টবাদী ও নৈর্ব্যক্তিকতাবাদী নিশ্চয়তা: যখন কোনো তথ্য (যেমন ডিএনএ বা স্যাটেলাইট ছবি) আর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে প্রাপ্ত উপাত্ত তাদের সপক্ষে যায়, তখন তারা বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে সেগুলোকে ধ্রুবসত্য হিসেবে জাহির করতে থাকে।
২. সত্তাশ্রয়ী মৌলিকত্ব: যখন বিজ্ঞান তাদের প্রতিকূলে যায়, তখন তারা বলে ‘দেশজ’ অনুভূতি বা পরম্পরাই আসল, আর বিজ্ঞান পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক হিসেবে অপ্রাসঙ্গিক।
৩. সাপেক্ষিকতাবাদ: যখন পেশাদার ইতিহাসবিদেরা তাদের ভুল ধরিয়ে দেন, তখন তারা যুক্তি দেয়, সব ইতিহাসই মতাদর্শগতভাবে নির্মিত, তাই তাদের কথিত ও রচয়িত ইতিহাসও সমানভাবে বৈধ।
এই অসংগতিগুলো কোনো বিচ্যুতি নয়। একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাম্প্রদায়িক কৌশল হিসেবে এমন অসংগতিগুলোকে চিহ্নিত করা দরকার। জনতুষ্টির মাধ্যমে আর পরিচয়বাদী আধিপত্যবাদী প্রচারের দাপটের মধ্যে একাডেমিক জবাবদিহি এড়াতে এবং একই সঙ্গে বিজ্ঞানের মর্যাদা ভোগ করতে এমন অসংগতিপূর্ণ ও সুবিধাবাদী ইতিহাসের চেতনা ও বয়ানবাজি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কঠোর পদ্ধতিগত অনুসন্ধিৎসু সতর্কতা বনাম কর্তৃত্ববাদী নিশ্চয়তা
নৈর্ব্যক্তিকতা কখনোই নির্মোহ নয়; বরং নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠতার দাবিকে সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা যেমন জরুরি, তেমনই ক্ষমতা সম্পর্কের বিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত করে—এমন দাবির পাটাতনে উৎপাদিত, বৈধতা দেওয়া আর জনগ্রাহ্য হওয়া ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসতত্ত্ব নৈর্ব্যক্তিকতার মোড়কে আসলে একধরনের কর্তৃত্ববাদী নিশ্চয়তা চাপিয়ে দিতে চায়। এমন ভয়াবহ দশার প্রতিকার কেবল ‘নির্মোহ’ ও ‘নিরপেক্ষ’ হওয়ার দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের প্রয়োজন ‘অনুসন্ধিৎসুমূলক কঠোর ধারণা ও পদ্ধতিগত সতর্কতা’ (reflexive rigor)। এ ক্ষেত্রে ইতিহাসের ব্যাখ্যামূলক প্রকৃতিকে স্বীকার করেও বিভিন্ন বিশাল, নতুন, কপট অভ্যুত্থানের দাবিদার ইতিহাসের বয়ানকে প্রামাণিক তথ্য, যুক্তি এবং খণ্ডনযোগ্যতার (falsifiability) কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। ইতিহাসের দায়িত্ব কোনো জাতীয়তাবাদী পুরাণ রচনা নয়, বরং অতীতকে তার সমস্ত জটিলতা ও বহুমাত্রিকতা নিয়ে এক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সংলাপের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা।
তত্ত্ব ও বয়ানের কাঠামাগত দুর্বলতা: চারটা প্যাটার্ন
বি–উপনিবেশায়ন, উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং সংশ্লিষ্ট ক্রিটিক্যাল চিন্তাভাবনার আত্মসাৎকরণ ও হজম করে প্রতিরোধ ও লড়াইকে মোকাবিলা করার জন্য ব্যবহার করা, বিরুদ্ধতাকে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে প্রধান বনিয়াদি আধিপত্যবাদী ব্যবস্থাকে অদৃশ্য করে ফেলার আর ফ্যাসিস্ট ও পরিচয়বাদী নানা ধরনের অ্যাখ্যান উৎপাদন করে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরন ও প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ব্যাখ্যামূলকভাবে সার্বিকভাবে এই ধরনগুলোকে আমরা মোটাদাগে চারটি প্যাটার্নে বিভক্ত করতে পারি।
প্যাটার্ন ১
বিমূর্তায়নের মাধ্যমে লড়াইয়ের মুখ্য প্রসঙ্গগুলোকে আড়াল করে হাওয়াই বুলিতে রূপান্তর করে আত্মসাৎ করা
এ ধরনে বা প্যাটার্নে আসল, জটিল ও বহুস্তরায়িত বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বি–উপনিবেশায়নের তত্ত্বায়নগুলোকে কেবলই কতগুলো লব্জে পরিণত করা হয়। বিমূর্তায়নের এ প্রকরণের বিচ্ছিন্ন ও সংকুচিত এই সূক্ষ্ম আর চতুর প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও বস্তুগত প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ধারণাগুলোকে তাদের মূল ভিত্তিগত শর্তাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আধিপত্যবাদী, সাম্প্রদায়িক ও জাতিবাদী আখ্যানে এই বিমূর্তায়িত ধারণা ও লব্জগুলোকে ব্যবহার করা হয় হরেদরে। এ প্রক্রিয়ায় কঠোর চিন্তা ও পদ্ধতিনির্ভর তত্ত্বগুলোকে দুর্বল করে ফেলা হতে থাকে। জনপরিসরে, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে, বিদ্যায়তনে, প্রচারমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ছুতায় এই বিমূর্তায়িত বুলি ও লব্জ এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যেন সেগুলো যথার্থই ন্যায্য ও সঠিক। অথচ বিমূর্তায়নের সংকট ও বিপদ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করলে হয় প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের কঠিন, জটিল বা জারগন-সর্বস্ব হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়, নয়তো শত্রু হিসেবে, প্রতিপক্ষ হিসেবে, আলোচ্য ‘মুক্তিদায়ী’ প্রকল্পবিরোধী হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। তত্ত্বীয় ধারণাগুলো নিছক আলংকারিক শব্দ বা চটকদার বুলিতে সংকুচিত হয়ে পড়ার প্রক্রিয়ায় এই বুলিগুলো যেকোনো ভাষ্যে বা বয়ানে ব্যবহারযোগ্য একটি শব্দভান্ডারে (portable vocabularies) রূপান্তরিত হয়। ফলস্বরূপ এই শব্দগুলোকে এমন সব প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, যা তাদের আদি মুক্তিদায়ক লক্ষ্যগুলোর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বি–উপনিবেশায়ন তখন স্রেফ একটি রূপক হয়ে দাঁড়ায়, যার সঙ্গে জমি ফেরত দেওয়ার কোনো সম্পর্ক থাকে না; ইন্টারসেকশনালিটি রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন শুধু কিছু জনমিতিক শ্রেণিবিন্যাসে পরিণত হয়। জলবায়ু ন্যায়বিচার হয়ে পড়ে কেবল সম্পদ বণ্টনের কিছু কাঠামো, যেখানে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিই উধাও হয়ে যায়।
‘বি–উপনিবেশায়ন’, ‘সার্বভৌমত্ব’, ‘আত্মসত্তা’/‘পরিচয়’, ‘সত্তা/সত্তাশ্রয়িতা’, ‘ন্যায়বিচার/ইনসাফ’, ‘অভিজাত’/‘ভদ্রবিত্ত’/‘জালিম’, ‘নিম্নবর্গ’/‘ভুক্তভোগী’/‘মজলুম’ এবং ‘অধিকার’/‘সমানাধিকার’, ‘বাক্ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা’, ‘আইনের শাসন’, ‘ভিন্ন চিন্তা’ ও ‘প্রতিবাদী’, ‘সংখ্যাগুরু’/‘সংখ্যালঘুর’ মতো গূঢ় ও ব্যঞ্জনাময় ধারণাগুলোকে তাদের মূল মুক্তিদায়ক ও প্রতিরুদ্ধ প্রেক্ষাপট থেকে চিহ্নবুলিগতভাবে (semantically) বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। পরে সেগুলোকে নতুন আধিপত্য, জুলুমবাজি অথবা পুনর্নবায়িত নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে পুনরায় মোতায়েন করা হয়। প্যাটার্নটি মূলত ‘ডিজকার্সিভ স্ট্র্যাটেজি’ বা বয়ানবাজির কৌশলের ওপর আলোকপাত করে: কীভাবে অতি ডানপন্থী শক্তিগুলো বি–উপনিবেশায়নের ভাষাকে নিজেদের মতো করে সাজায়, উত্তর-ঔপনিবেশিক সার্বভৌমত্বের বয়ানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, পরিচয়ের রাজনীতিকে উল্টে দেয়, পরিবেশবাদী ভাষাকে কবজা করে এবং ন্যায়বিচারের শব্দভান্ডারগুলোকে বেছে বেছে আত্মসাৎ করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মুহূর্ত, সম্পর্ক, পরিপ্রেক্ষিত, দশা আর তৎপরতার ক্ষেত্রে এই ব্যঞ্জনাকে একশিলা বুলিতে স্লোগানের মতন বারবার উচ্চারণ করা হয় লোকপ্রিয়তা উৎপাদন ও অর্জন উভয় লক্ষ্যে। প্রতিটি পদ বা ধারণার ক্রমাগত অর্থান্তর আর স্থানিক-কালিক দশার ফারাককে বেমালুম অস্বীকার করার মাধ্যমে বিমূর্তায়নের ফলে তৈরি হওয়া ‘অর্থগত বিচ্যুতির’ ফলে ধারণাগুলো বহুস্তরীয় বাছবিচারের পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাধারণ অথবা ভাসা–ভাসা হয়ে পড়ে। সেগুলোর ভাষিক কারিকুরি ও চটকদার বাক্চাতুর্যপূর্ণ দৃশ্যমান বৈধতা বজায় রেখেই নতুন কোনো বিষয়বস্তু প্রকাশ করা সম্ভব হয়। ভারতের অতি ডানপন্থী, হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও রাজনীতির দিকে মনোযোগ দিলে এমন অগণিত উদাহরণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
প্যাটার্ন ২
প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে পর্যালোচনা ও প্রশ্নকে নিষ্ক্রিয়করণ
বিশ্ববিদ্যালয়, বড় করপোরেশন ও রাষ্ট্র যখন আন্দোলনের ভাষাগুলোকে নিজেদের দাপ্তরিক রুটিন বা ‘কমপ্লায়েন্স ফ্রেমওয়াকের’ ভেতর ঢুকিয়ে নেয়, তখন এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিগুলো স্রেফ কিছু ‘প্রশাসনিক দায়ভার’ হয়ে ফাইলবন্দী হয়ে থাকে। অথচ ক্ষমতার প্রকৃত কাঠামোগত ও কৃৎকৌশলগত কোনো পরিবর্তন আসে না। অতি ডানপন্থী, নয়া উদারনৈতিক আর পরিচয়বাদী প্রকল্পগুলো মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রভাববিস্তারী গণতান্ত্রিক, শিক্ষামূলক, নীতিনির্ধারক এবং প্রতিরোধের পরিসর ও শর্তগুলো গঠনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কবজা করে এবং নিজেদের কাজে ব্যবহার করে।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও তৎপরতায় এই প্যাটার্নগুলো স্পষ্টভাবেই শনাক্ত করা যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠ্যক্রমের গেরুয়াকরণ, সমন্বিত প্রচারণা ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে গণমাধ্যম দখল, বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, এনজিও ও নাগরিক সমাজকে দমন এবং নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নষ্ট করা। এসব প্রক্রিয়ায় বনিয়াদি ভূমিকা পালন করে ‘আমলাতান্ত্রিক গ্রাস’। অতি ডানপন্থী আর কর্তৃত্ববাদী কুশীলবেরা প্রাতিষ্ঠানিক পদ ও পদ্ধতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হাসিল করে। তারপর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা খোলসটি বজায় রেখেই আইনি কিংবা বিধিবিধানের বাছাই করা কোড ও সুবিধা ব্যবহার সেই প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বকে ব্যবহার করে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যায়। হতবুদ্ধিকর বিষয় হলো, পুরো প্রক্রিয়াটি আপাতদৃষ্টিতে বহুবিধ স্ববিরোধিতা আর ফ্যালাসি দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত থাকে। যেমন বাক্স্বাধীনতা বা চিন্তার স্বাধীনতার হক অথবা সাংবিধানিক আধুনিক ও সেক্যুলার নীতিমালাগুলোকে নিজের তৎপরতায় কখনো প্রতিপক্ষকে হত্যাযোগ্য করা, বিমানবিকীকরণ করা অথবা সংখ্যালঘু হিসেবে বাদ দিয়ে দেওয়ার কাজে প্রয়োগ করা হয়। আবার একই নীতিমালা ও বিধিবিধানকে নিজেদের পক্ষের লোকজনের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ভারতে সাম্প্রতিককালে উমর খালিদ বা শারজিল ইমামের বিচারবিহীন দীর্ঘ কারাবন্দিত্ব অথবা বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রবিরোধিতা অথবা দাঙ্গা-হাঙ্গামায় মদদ দিয়ে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতন বিভিন্ন বানোয়াট অভিযোগ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিক মানবাধিকার এবং সংবিধান প্রদত্ত অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। আবার ধর্ষণ, দাঙ্গা অথবা সংখ্যালঘু নিপীড়ন আর মব লিঞ্চিং করে হত্যাকারীদের বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের অজুহাতে জামিন প্রদান করা বা সাজা মওকুফ করার ঘটনাও ঘটেছে। এখন অধিকার ও আইনি যুক্তিগুলোকে যদি ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হওয়ার নামে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন-পীড়নে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই ব্যবহার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আইনের ও অধিকারের প্রসঙ্গগুলোকে দরকারমতো ঔপনিবেশিক আবার দরকারমতো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অথবা ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার নামে বেছে বেছে প্রয়োগ করার ফলে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের বনিয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও পরস্পরবিচ্ছিন্নতার ধারণাগুলো (নির্বাহী, আইন প্রণয়নকারী আর বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও বিচ্ছিন্নতার ধারণা যেমন) অর্থহীনতায় নিপতিত হয়েছে।
একই ধরনের বয়ানবাজি ও তৎপরতা উত্তর-ঔপনিবেশিক নারীবাদী আন্দোলনগুলোর বাজারচলতি চটকদার পদাবলি ও যুক্তিতক্কো অন্তর্ভুক্ত করেও মুক্তিদায়ী ও বহুমাত্রিক নিপীড়ন ও দমনের রাস্তাগুলো খুঁজে নেওয়া হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী নারীবাদীদের বয়ানে যেভাবে বিশুদ্ধ হিন্দু বা ভারতীয় নারীর রূপ পেশ করা হয়, সেখানে একই সঙ্গে সংসার সামলানো আর বাইরে লড়াই করা নারীর একটি নির্দিষ্ট ব্রাহ্মণ্য চেহারাকে আদর্শ হিসেবে খাড়া করানো হয়। সেই চেহারার বিশুদ্ধতাকে সমর্থন করা হয়। অন্যদিকে সংখ্যালঘু, ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর, দলিত অথবা নিপীড়নের শিকার নারীদের পশ্চিমা ভাবধারার, পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক আচার ও পোশাক ব্যবহারকারী কিংবা হিন্দু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হিসেবে শনাক্ত করে নজরদারি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাইকারি হারে বেশ্যাকরণ করে আর যৌনজ আক্রমণ করে নিপীড়নের পক্ষে ন্যায্যতা তৈরি করা হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রণালিবদ্ধভাবে নারীমুক্তি, উন্নয়নবাদী বনেদি নারীবাদী বয়ান আর উচ্চ জাতি–বর্ণের মানদণ্ডে পুনর্গঠিত সমতা, সমানাধিকার আর প্রতিরোধের বয়ান হাজির করে। একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বা দলিত বা মুসলমান বা শ্রমিক বা ভিন্নমতাবলম্বী নারীর জন্য বয়ানের ব্যবহার একরকম হয়, আর ক্ষমতার কাছাকাছি বা ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ নারীর ক্ষেত্রে বয়ানের প্রয়োগ ভিন্নভাবে হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক আত্তীকরণের মাধ্যমে বি–উপনিবেশায়নসহ বিভিন্ন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ও ভাষাকে আত্তীকরণ করার এমন বহু ধরনের উদাহরণ রয়েছে। বৈচিত্র্যের প্রতিফলন ঘটানো, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই টোকেন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ভিন্নতা বা ডাইভার্সিটি দেখানোর তরিকায় তখন জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্তৃত্বের পুনর্বণ্টন ছাড়াই শুধুই লোকদেখানো প্রতিনিধিত্ব তদারক করা হয়; এনভায়রনমেন্ট-সোসাইটি-গভর্ন্যান্স (ইএসজি) অথবা করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটির নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তাদের লুণ্ঠনমূলক ব্যবসায়িক মডেলকে চ্যালেঞ্জ না করেই কেবল টেকসই উন্নয়নের পরিসংখ্যান দাখিল করে; এথিকস কমিটিগুলো নজরদারি পুঁজিবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ না করেই কেবল অ্যালগরিদমের চুলচেরা বিচার করে। এসব ক্ষেত্রেই নতুন নতুন ফ্যাশনেবল বুলি লিখিত প্রতিবেদন বা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে উপস্থাপিত হতে থাকে।
প্যাটার্ন ৩
কৃৎকৌশলগত রূপান্তরের মাধ্যমে কাঠামোগত বিশ্লেষণের বিরাজনৈতিকীকরণ
এই প্যাটার্নে যখন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমালোচনাগুলোকে স্রেফ কিছু কারিগরি সমস্যা হিসেবে নতুন করে সাজানো হয়, তখন এগুলো বিশেষজ্ঞের সমাধান, অ্যালগরিদমিক অপ্টিমাইজেশন কিংবা বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য হিসেবে পরিবেশিত হতে থাকে। ফলে অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত সমাজের কোনো কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে কেবল একটি পরিমাপযোগ্য পরিসংখ্যানগত ত্রুটি হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন নির্দিষ্ট উপাত্ত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অ্যাপ আর বিগ ডেটা অ্যানালিসিসের মডেল ব্যবহার করে নির্বাচন, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি, বিদ্বেষ-বচনের প্রচার বাড়ানো, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য প্রণালিবদ্ধভাবে ‘বট’, ‘স্প্যামার’ এবং রিচ বাড়ানো বা কমানো, অথবা টার্গেট করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। পশ্চিমাদের কবল থেকে অথবা ঔপনিবেশিক আধুনিক জ্ঞানের হেজিমোনি থেকে পরিচয়কে মুক্ত করার ছলনাময়ী বাসনা উজ্জ্বীবিত করার বুদ্ধিজীবিতা বহু অপরাধ ও নৃশংসতাকে আড়াল করতে থাকে। সিস্টেমিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনপরিসরে আর প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গভীর ও বহুমাত্রিক সমস্যাকে হয় সরলভাবে সমাধানযোগ্য হিসেবে পেশ করা হয় অথবা নিরবচ্ছিন্নভাবে সামাজিক যোগাযোগ ও মিডিয়ার মাধ্যমে নিত্যনতুন আকর্ষণীয় বিষয়বস্তু উৎপাদন করে জনমনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করা হয়। যেমন ভারতে হোয়াটসঅ্যাপ বা টুইটারনির্ভর অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থাপনা ও উপাত্তের বিশ্লেষণ হিন্দুত্ববাদী পরিচয়বাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। ক্রমাগত ঔপনিবেশিক মনস্তাত্ত্বিক দশা, পশ্চিমা ধারণা, ইতিহাসের বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে মুসলমানসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীকে উপনিবেশবাদী, পশ্চিমের দাস, নাগরিক এলিট, ইত্যাদি ট্যাগ দেওয়া হয়। সিএএ–বিরোধী আন্দোলনের সময়ও প্রতিবাদী ও বিক্ষোভকারীদের পশ্চিমা ইতিহাসের ও নাগরিকত্বের উদারনৈতিক ধারণার অনুসারী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জলবায়ু সংকট মালিকানা আর পরিকল্পনার প্রশ্ন হওয়ার বদলে হয়ে ওঠে কেবলই একটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ; আর শহুরে অসমতা গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই বেগবান হওয়ার বদলে স্রেফ একটি ‘স্মার্ট সিটি অপ্টিমাইজেশনের’ সমস্যা হিসেবে হাজির করা হয়।
পুরো প্রক্রিয়াতেই লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরিয়ে সমস্যাটিকে ‘বিশেষজ্ঞদের’ আর প্রাতিষ্ঠানিক নীতিনির্ধারকদের টেবিলে নিয়ে আসা হয়। রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে স্রেফ কিছু কারিগরি সমস্যা হিসেবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হয় আর সেগুলো সামলাতে প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত সমাধান প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়। সমাজের গভীর বৈষম্যের প্রতিফলন না হয়ে একটা গাণিতিক বা পরিসংখ্যানগত ত্রুটি হিসেবে হাজির হয়। এ প্যাটার্নে এমন রূপান্তরকরণ অহরহ ঘটতে থাকে। এ প্রক্রিয়ার আওতায় পড়ে ডিজিটাল নজরদারি এবং বায়োমেট্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য ও ভুল তথ্যের অ্যালগরিদমিক বিস্তার, ‘স্মার্ট সিটি’ নজরদারি অবকাঠামো, সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে রাজনীতির বদলে সরলভাবে এক ‘আইনশৃঙ্খলা’ পরিস্থিতি, বৈষয়িক রেষারেষি, ব্যক্তিগত শত্রুতা অথবা কোনো গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে অস্বীকার করা হয় আর সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার জন্য সহজ আর পুঁজির জন্য উপযুক্ত হিসেবে রূপান্তর করা হতে থাকে। পরিবেশগত কারণে উচ্ছেদকে স্রেফ সংরক্ষণ বা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মূল কৌশলটি হলো ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’—রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে যখন কারিগরি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়, তখন তা ক্ষমতার আসল সমীকরণগুলোকে আড়াল করে দেয় এবং গণতান্ত্রিকভাবে প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করে দেয়। বহু ক্ষেত্রেই সমস্যা, সহিংসতা, বিদ্বেষকে ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা অথবা পশ্চিমা ভাবধারার প্রভাব বা পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে চিহ্নিত করার নজির রয়েছে।
প্যাটার্ন ৪
বয়ানবাজির কারিকুরিতে মুক্তির ভাষাকেই হাতিয়ার বানানো
এ প্যাটার্ন সবচেয়ে ভয়ংকর। এখানে ক্ষমতাশালী পক্ষগুলো এবং জনপরিসরে প্রভাব বিস্তারকামী বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন শব্দ, বিভিন্ন পদ, হাওয়াই বুলি বা আলংকারিক বুলি পৌনঃপুনিকভাবে ব্যবহার করে। মুক্তিদায়ী ও প্রতিরোধমূলক বিভিন্ন বয়ান ও তৎপরতা থেকে পরিপ্রেক্ষিত ও ইতিহাসবিচ্ছিন্ন এসব ভাষিক কারসাজি বা রেটোরিক শাসন, পরিচয়বাদী সহিংসতা, দঙ্গলবাজিকে বৈধতা দেয়।
প্রভাবশালী অথবা প্রভাব বিস্তারকামী পক্ষগুলো আধিপত্যবিরোধী প্রতিরোধ ও লড়াইয়ের ভাষা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিবাসীদের জ্ঞান ও ঐতিহ্যগুলোকে আত্মসাৎ করে আর দেশজ প্রাক্-ঔপনিবেশিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-আচার-অভিব্যক্তিকে মনস্তাত্ত্বিক পুঁজি হিসেবে বিভিন্নভাবে প্রয়োগ করতে থাকে। লড়াইয়ের ভাষা আর কৌশলের শব্দ ও চিহ্নগুলোই ব্যবহার করা শুরু হয় আধিপত্যবাদী প্রতিষ্ঠান, বয়ান আর নিপীড়নকে বৈধতা দিতে; অথচ এসব আধিপত্যকে ভেঙে ফেলার জন্যই ভাষা-আবেগ-উপলব্ধির ধারালো প্রয়োগ হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তরাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ-ঋণ-অসম চুক্তি অথবা দাতা সংস্থাগুলোর অনুদানের বিপুল অংশ নানাভাবে ওই দাতাসংস্থার পরামর্শকের বেতন দিতে চলে যায় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ নানা স্তরে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হতে থাকে কোনো জবাবদিহি ছাড়াই। জনপ্রিয় বয়ানবাজিতে আর স্লোগানে অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আধিপত্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ হয়, সেই আধিপত্যের ও নিপীড়নের প্রধান কুশীলবদের সঙ্গেই আবার প্রতিবাদকারীদের একটা অংশের অদৃশ্য লেনদেন জারি থাকে।
কৌশলগতভাবে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ ম্যানেজ করা এবং সমসাময়িক অন্য বড় বড় অপরাধ ও বেআইনি তৎপরতা থেকে নাগরিকদের নজর অন্যত্র সরানোর জন্য বি–উপনিবেশায়নের পরিচয়বাদী উন্মাদনা অসম্ভব কার্যকর ভূমিকা পালন করে। যে সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সংঘাতের-নিপীড়নের-নজরদারির বিরুদ্ধে দৃশ্যমানভাবে সরব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে বলে মানুষকে বোঝানো হয়, সেই সংস্থাই আবার সংঘাত-নিপীড়ন-নজরদারি জারি রাখার কুশীলবদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় এমন অগণিত উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বিবদমান সব পক্ষকে কোনো নির্দিষ্ট বহুজাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্র অর্থায়ন করছে। বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি বিক্রি করছে। অত্যাধুনিক হাতিয়ার বিক্রি করছে। এমন জটিল, অদৃশ্য, অশ্রুত জটিল নয়া উদারনৈতিক জমানার নেটওয়ার্ককে আড়াল করার জন্য এবং ওই নেটওয়ার্কের ইতিবাচক চেহারা সামনে নিয়ে আসার জন্য বি–উপনিবেশায়নের ভাষা ও বুলি যথেষ্ট সফল হতে পারে।
অ্যালগরিদমিক আধিপত্য বিস্তারে আর হালের কৌশলী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় জনপরিসরকে বিভ্রান্ত করতে অথবা বিভ্রম তৈরি করতেও বি–উপনিবেশায়নের বয়ানগুলোকে বাছাই করে গ্রহণ ও বর্জনের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা শনাক্তযোগ্য। করপোরেশনগুলো তাদের লুণ্ঠনকে আড়াল করতে জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভাষা ব্যবহার করে। নজরদারি প্ল্যাটফর্মগুলো তথ্য হাতিয়ে নেওয়াকে বৈধতা দিতে ‘অংশগ্রহণমূলক’ আলোচনার আশ্রয় নেয়। অলিগার্কদের অনুগত প্রচারমাধ্যমগুলো পশ্চিম, আধিপত্য, জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা এবং দেশজ জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার করে মুনাফা যেমন করে, তেমনি তাদের বিপুল লুণ্ঠনকে আড়ালে রাখে। প্রাক্-ঔপনিবেশিক একটি সমরূপীকৃত স্থান-কালের গৌরবময় ও সমৃদ্ধির গাথা রচনা করা হয় আর লুণ্ঠনকারী শিল্পগোষ্ঠীগুলোর উচ্ছেদকে জায়েজ করতে আদিবাসীদের সঙ্গে ‘অংশীদারত্বের’ ভাষা ব্যবহার করে আর তাদের নাগরিক উন্নত সুযোগ-সুবিধার গ্রাহক হতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আর বহুজাতিক ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আঁতাতে স্থানীয় জ্ঞান, দেশজ ভাষা এবং দেশজ সংস্কৃতির সমরূপ পরিচয়ের দাপটে সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার ধামাচাপা দেওয়া হয়। মজলুম জনগোষ্ঠী থেকে টোকেন প্রতিনিধিত্ব বরাদ্দ করে সমতা ও মুক্তির দাবি করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সঙ্গে দর–কষাকষি করা হয়। বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্রোকারদের সংস্থাগুলো জবাবদিহি ও বি–উপনিবেশায়ন নিশ্চিত করার বয়ান দিয়ে ডিজিটাল উপাত্ত ব্যবস্থাপনা, বাজার ব্যবস্থাপনা আর প্রতিরোধের নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাপনার কৌশল প্রয়োগ করে।
এই প্যাটার্নের মনোযোগ থাকে, অতি ডানপন্থী শক্তিগুলো সমালোচনামূলক ধারণাগুলোর শব্দগত কাঠামো ঠিক রেখে সেগুলোর মর্মার্থকে সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়ার দিকে। এখানে উপনিবেশবাদবিরোধী ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় সংখ্যালঘু ও দুর্বলদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে জায়েজ করতে, যাদের ‘ঔপনিবেশিক দালাল’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ‘ভিকটিমহুড’ বা নিগৃহীত হওয়ার কাঠামোটিকে উল্টে দিয়ে প্রভাবশালী সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজকেই বিপন্ন হিসেবে দেখানো হয়। ভারতের হিন্দুত্ববাদী বয়ানে মুসলিম পুরুষদের কলঙ্কিত করতে এবং ভিন্নধর্মী সম্পর্কগুলোতে নজরদারি চালাতে সুকৌশলে নারীবাদী বয়ান ব্যবহার করা হয়। এই প্যাটার্নের মূল প্রক্রিয়াটি হলো আমূল উল্টে দেওয়া পরিবর্তন। সমালোচনার অভিমুখটি সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়া হয় অথবা যৌক্তিক হেত্বাভ্যাস (fallacy) তৈরি করে ব্যবহার করা হয়। অথচ ব্যবহৃত সমালোচনামূলক শব্দভান্ডারটি চেনা চেনা মনে হয় এবং প্রকৃত মুক্তিদায়ক দাবিগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে।
এ চারটি প্যাটার্ন বিশ্লেষণের প্রয়োজনে আলাদা করা হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বাকচাতুর্যের কারসাজির মাধ্যমে অর্থের বিপর্যয় (প্যাটার্ন ৪) মূলত প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির (প্যাটার্ন ২) জন্য একধরনের বৈধতার বয়ান তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ আবার এমন কারিগরি রূপান্তরের (প্যাটার্ন ৩) সুযোগ করে দেয়, যা সহিংসতা ও বর্জনকে বিরাজনীতিকরণ করে ফেলে। একইভাবে সমালোচনামূলক ধারণাগুলোর বিমূর্তায়ন (প্যাটার্ন ১) এমন সব ফাঁকফোকর তৈরি করে, যা বাকি তিনটি প্যাটার্নই ব্যবহার করতে পারে। ডিজিটাল অবকাঠামো এই চার প্যাটার্নের ক্ষেত্রেই ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ বা বহুগুণে শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে আর আত্মসাৎকৃত বয়ানগুলোর দ্রুত বিস্তার ঘটায়। অপতথ্য, উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বহুমাত্রিকভাবে ব্যবহারযোগ্য পরিসরে রূপান্তরিত হয়। ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদী আর উপাত্ত বিশ্লেষণনির্ভর ব্যবস্থাপনা অনলাইন হয়রানি, গুজব, মিথ্যা প্রচারণা এবং অফলাইন সহিংসতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
চারটি প্যাটার্নে বিশ্লেষণ করা এই রূপরেখা অতি ডানপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী আত্মসাতের পদ্ধতিগত চরিত্র এবং সুনির্দিষ্ট কৌশলে কাজ করার পদ্ধতিকে উন্মোচিত করতে ও বোঝাপড়া করতে সাহায্য করতে পারে। চারটি প্যাটার্নকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যকার যোগসূত্রগুলো দেখানোর মাধ্যমে এই পর্যালোচনা বি–উপনিবেশায়ন ও উত্তর-ঔপনিবেশিকতার মতো পর্যালোচনামূলক তত্ত্বকে শেষ পর্যন্ত নানা স্তরে ও বিভিন্ন মাত্রায় ব্যবহার করার বিস্তৃত, গভীরতা আর জটিল কৃৎকৌশল বোঝার রাস্তা খুলে দিতে পারে। প্রতিরোধের কৌশল তৈরির জন্য এবং সমালোচনামূলক তত্ত্বকে এমনভাবে নতুন করে ভাবার জন্য এই উপলব্ধিটুকু অপরিহার্য।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন তৎপরতা ও বয়ান নিয়ে গবেষণা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে বেশি হওয়ায় এসব বয়ানে এমন উদাহরণ চিহ্নিত করা সহজ হয় (চ্যাটার্জি ২০২৯; ফারুক ২০২২; জর্জ ২০২৪; কবির ২০০২; মুখার্জি ২০২০; উইলিয়ামস ২০২১)। ওপরে সেই উদাহরণগুলো ব্যবহার করা সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য থেকেও উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বুঝতে পারার সুবিধার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের নয়া জাতীয়তবাদী ও হিন্দুত্ববাদী বয়ানগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আরও কিছু উদাহরণ পেশ করা হলো। এই উদাহরণগুলোর মাধ্যমে আশা করি আপাতজটিল ও অদৃশ্যমান প্যাটার্নগুলো বোঝাপড়ায় সাহায্য হতে পারে।
অন্য বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের মতো ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী বয়ানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বহুত্ববাদকে একটি ‘ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার’ হিসেবে চিত্রিত করে আর এই পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক জ্ঞানকে উপড়ে ফেলার দাবি করতে থাকে। এটি এমন একটি বয়ানবাজির চাল (discursive move), যা শাসনব্যবস্থা এবং জনজীবনে উচ্চবর্ণীয় হিন্দু সাংস্কৃতিক নীতিগুলোকে বিশেষাধিকার দেওয়ার বিষয়টি জায়েজ করতে সাহায্য করে। ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, সংখ্যালঘুদের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং বহুত্ববাদী কাঠামোগুলোকে পশ্চিমা আধিপত্য বা ঔপনিবেশিক রেশ (colonial hangovers) হিসেবে তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে বলা হয় যে এগুলোর বদলে ‘খাঁটি ভারতীয়’ (হিন্দু) বিকল্প আনা দরকার। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে হিন্দুর সংজ্ঞা ও মানদণ্ড হিন্দুত্ববাদী মানদণ্ড অনুসারে হতে হয়। যেকোনো প্রতিরোধ, সমালোচনা আর প্রশ্নকে হিন্দুবিরোধী, ভারতবিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী আর পশ্চিমা হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়।
এই কাঠামো মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদবিরোধী সমালোচনাকে চালাকির সঙ্গে উল্টে দিয়ে সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র এবং সংখ্যালঘু অধিকারের দিকে তাক করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদকে স্বাধীনতাসংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং সেক্যুলার বহুত্ববাদকে ঔপনিবেশিক চাপিয়ে দেওয়া বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে এই বয়ান প্রকৃত ইতিহাসকে উল্টে দেয়। অথচ ইতিহাস বলে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন গান্ধী এবং নেহরুর মতো ব্যক্তিত্বদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল, যাঁরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং সেক্যুলার বহুত্ববাদের পক্ষে কথা বলতেন। অন্যদিকে বর্তমান হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পূর্বসুরি হিন্দু মহাসভা অথবা হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিপ্রদানকারীরা (যেমন, চন্দ্রনাথ বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সাভারকর, গোওয়ালকর প্রমুখ) ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত তো ছিলেনই না; বরং বহু ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এই প্যাটার্নে বিভিন্ন কারিকুরিময় বুলির কারসাজিতে অর্থ বিপর্যয় ঘটানো হয়। এখানে কৌশল হিসেবে থাকে ঐতিহাসিক সরলীকরণ করে জটিল ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে স্রেফ ‘হিন্দু নিপীড়ন’ এবং ‘মুসলিম ও পশ্চিমা শোষণের’ কাহিনিতে পরিণত করা। বিভিন্ন বয়ান বাছাইকৃত ও কালবিভ্রান্তিমূলকভাবে মিলিয়ে মিশিয়ে (temporal conflation) তৈরি করা হয় ঐতিহাসিক মুসলিম শাসন, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এবং সমসাময়িক ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, যাকে একটি একক ‘বিদেশি আধিপত্যের’ বয়ান হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে ভারতীয় সভ্যতা বলতে হিন্দুত্ববাদী তত্ত্বায়নে ও আখ্যানে যা বোঝানো হয়, সেটাতে সারসত্তাকরণ করে (civilizational essentialism) ভারতের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যকে একমাত্র হিন্দু সভ্যতায় সংকুচিত করা হয় এবং তাকেই ‘খাঁটি দেশজ সত্তা’ হিসেবে দাবি করা হয়।
নৈতিক আত্মসাৎকরণের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের নৈতিক তেজকে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আধিপত্য বৈধ করতে ব্যবহার করা হয়। যারা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে, তাদের ‘ঔপনিবেশিক দাস’ বা ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে উল্টো উপনিবেশবাদবিরোধী সমালোচনাকে তাদের দিকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সহিংসতার ন্যায্যতা প্রদান করার মাধ্যমে উপনিবেশবাদবিরোধী এই ভাষা সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে ‘মুক্তির লড়াই’ এবং অপরাধীদের ‘মুক্তিকামী’ হিসেবে রূপান্তরিত করে।
২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার ওপর করা গবেষণাগুলো দেখায় যে কীভাবে যৌথ সহিংসতাকে ঐতিহাসিক ভুল এবং তাৎক্ষণিক উসকানির বিরুদ্ধে একটি ‘বৈধ প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে অপরাধীদের বিচারহীনতা এবং পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের নৈতিক ন্যায্যতা পেতে সাহায্য করে। এই সহিংসতায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন (যাঁদের বেশির ভাগই মুসলিম)। এর ঠিক আগেই গোধরা ট্রেন পোড়ানোর ঘটনায় ৫৯ জন হিন্দু পুণ্যার্থী মারা গিয়েছিলেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো পরবর্তী হত্যাকাণ্ডকে হিন্দুদের ‘স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ’ এবং মুসলিম আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বৈধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরে।
এই উপনিবেশবাদবিরোধী কাঠামো একাধিক স্তরে কাজ করেছে। মুসলিমদের চিত্রিত করা হয়েছে ‘বিদেশি আক্রমণকারীদের’ বংশধর হিসেবে, যাদের শাসনকাল ছিল শত শত বছরের নিপীড়ন। সহিংসতাকে ‘ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে—যেন শত শত বছরের পরাধীনতার পর হিন্দুরা অবশেষে নিজেদের অধিকার জাহির করছে। গোধরা ঘটনাকে হিন্দুদের ওপর মুসলিম আক্রমণের দীর্ঘ ইতিহাসের সর্বশেষ অংশ হিসেবে সাজানো হয়, যার জন্য একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক জবাব’ প্রয়োজন ছিল। এই কাঠামো মূলত অপরাধী এবং ভিকটিমের অবস্থান বদলে দেয়—যারা সংগঠিত সহিংসতা চালিয়েছে, তারা হয়ে ওঠে ‘সভ্যতার রক্ষক’, আর যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের চিত্রিত করা হয় আগ্রাসী হিসেবে, যারা কেবল প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে।
উপনিবেশবাদবিরোধী এই বাকচাতুর্য নৈতিক ন্যায্যতা এবং রাজনৈতিক ঢাল প্রদান করেছে। অপরাধীরা নিজেদের অপরাধী মনে না করে ‘দেশপ্রেমিক’ মনে করতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা, যাঁরা এই সহিংসতায় মদদ দিয়েছেন বা অংশ নিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’ বা ‘বৈধ জনরোষের বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই বয়ানবাজি বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে মামলা হয়েছে খুব সামান্য, সাজা হয়েছে হাতেগোনা কয়েকজনের এবং অভিযুক্তদের (মোদিসহ) রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বদলে আরও উন্নত হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক অথবা আকর্ষণীয় মনে হলেও ওপরে উল্লিখিত প্যাটার্নগুলোর বুনিয়াদি অন্তঃসারশূন্যতা, চালাকি, বুদ্ধিবৃত্তিক স্ববিরোধিতা এবং বয়ানবাজিগত সহিংসতা আরও স্পষ্ট করার জন্য খুব সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের উদাহরণ দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল ও রাষ্ট্রে বি–উপনিবেশায়ন এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক অবস্থান নেওয়ার নামে শাসন, একচ্ছত্র আধিপত্য, সর্বগ্রাসবাদী আগ্রাসন আর উগ্র পরিচয়বাদের বোঝাপড়া করতে সাহায্য করতে পারবে। ভারতের আধিপত্যবাদী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টির নানা প্রচার, তৎপরতা আর আখ্যান নির্মাণে বি–ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক অভিব্যক্তি, ভাষা, ধারণা আর যুক্তিতক্কর ব্যবহার করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শাস্ত্রীয়করণ আর বিদ্যায়তনিক জ্ঞান উৎপাদনেও এই তত্ত্ববিশ্ব থেকে যুক্তি, পদাবলি ও ভাষার পৌনঃপুনিক ব্যবহার প্রকটভাবেই লক্ষণীয়। এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নরেন্দ্র মোদির দেওয়া কয়েকটি ভাষণে (ডিডি নিউজ ২০২৫; পাঠক ২০২৫; ইন্ডিয়া টুডে ২০২৫; কুমার ও যাদব ২০২৫)।
‘ভারতীয় মানসের বি–উপনিবেশায়নে’ মোদির এই পৌনঃপুনিক আহ্বান বি–উপনিবেশায়ন আর পশ্চিমের প্রভাবমুক্তির নামে কট্টর পরিচয়বাদী আখ্যানকে সংহত করার প্রকল্পের অংশ হিসেবেই পাঠ করেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক (আইয়ার ২০২৫; কেনেডি ২০২৫; নাকভি ২০২৫; পুনিয়ানি ২০২৫; শেফার্ড ২০২২)। থমাস বেবিংটন ম্যাকাউলির ২০০ বছর আগের তৎকালীন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রদত্ত বক্তৃতার উদাহরণ আর ঔপনিবেশিক ভারত উপমহাদেশে ম্যাকাউলি প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে মোদি আলাপ করেন। ম্যাকাউলির শিক্ষাব্যবস্থার ঔপনিবেশিক রূপান্তর প্রসঙ্গে বহু চিন্তক বিস্তর নিবিড় পর্যালোচনা করেছেন। কিন্তু ওই বক্তৃতাগুলোতে সেসব আলাপে না গিয়ে সরল কতগুলো বাজারচলতি বয়ান হাজির করা হয়েছে। উপনিবেশ-পূর্ব ‘ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার’ [বুঝতে হবে প্রধানত উচ্চ জাতি–বর্ণচালিত ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাব্যবস্থা] অথবা ‘ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থার’ অতীত গৌরবের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয় যে ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে দাসোচিত মনোবৃত্তির সম্পর্ক রয়েছে। সেই জ্ঞান ফিরিয়ে আনার জন্য তৎপর হতে হবে। ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তি তৈরি করে ভারতীয়দের মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করা হয়েছে আর একদল অভিজাতবর্গের সৃষ্টি হয়েছে, যারা ভারতের নিজস্বতায় গৌরব বোধ করে না বলে মোদির বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়। ঔপনিবেশিক দাস মনোবৃত্তি ও অভিজাতদের দাপট থেকে মুক্তির আহ্বান জানানো হয় ‘অতীত হিন্দু ভারতের জ্ঞান ও চিন্তার’ ভিত্তিতে। এই শিক্ষা থেকে ‘ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা’ আর ‘ভারতীয় ভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা’ ভবিষ্যতে গড়ে তোলার কথা বলা হয়।
মোদির বক্তৃতাগুলো নির্দিষ্ট হিন্দুত্বের পরিচয়ের নির্মাণে ও জনপ্রিয়করণে বি–ঔপনিবেশিক ভাষা, ভঙ্গি ও রেটোরিক ব্যবহার করার কার্যকর উদাহরণ হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। মোদির এই বক্তৃতার সমালোচনা করে যাঁরা আলাপ করেছেন, তাঁরা বিভিন্ন প্রসঙ্গ উল্লেখ করছেন। তবে আমি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই কাঞ্চা ইলাইয়া শেফার্ড আর কেনেডি উল্লিখিত দুটি পয়েন্টের দিকে। কাঞ্চা ইলাইয়া স্পষ্টতই দেখান যে ইংরেজি ভাষা ও শিক্ষাব্যবস্থা ভারত উপমহাদেশে জাতি–বর্ণ বিভাজিত ও চরম বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থায় মুক্তিদায়ী ভূমিকা পালন করেছিল। জাতি–বর্ণের ভেদাভেদে নিচের দিকে থাকা জাতি ও বর্ণের মানুষজনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা তৈরি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এবং মনুবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদী আদর্শ সমাজের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাশিক্ষা আর শিক্ষাব্যবস্থা বড় ভূমিকা পালন করেছে।
অন্যদিকে কেনেডি বলেন যে মোদির এই বি–উপনিবেশায়নের ডাক আসলে প্রহসনমূলক। এর মধ্য দিয়ে মনুবাদী ও হিন্দুত্ববাদী বিশ্ববীক্ষাকে স্থানীয়, গৌরবময় আর পরিচয়ের জন্য অহংকার হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার প্রকল্পকে জায়েজ করা হয়। আমি এখানে উদাহরণ হিসেবে কেবল এই বক্তৃতার উল্লেখ করলেও, বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের এমন জনতুষ্টিবাদী আপাত বি–উপনিবেশায়নের বয়ান নতুন কিছু নয়। কেবল সাদা বা কালো, পশ্চিম বনাম ভারতীয়/অপশ্চিম, উপনিবেশ/উপনিবেশিতার মতো সরল বিভিন্ন যুগ্ম বৈপরীত্য/বাইনারি দিয়ে বি–উপনিবেশায়নকে বুঝতে গেলে কেমন বিপদ ঘটতে পারে, তার ইশারাও সমালোচক, চিন্তকদের লেখালেখিগুলোতে পাওয়া যায়। ‘পশ্চিমা’ হিসেবে দেগে দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা আর তৎপরতাকে খারিজ করে দেওয়ার এমন উদাহরণ কেবল হিন্দুত্ববাদী বয়ানগুলোতেই নয়, অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলের পরিচয়বাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের ক্ষেত্রেও শনাক্ত করা যেতে পারে। জনপরিসরের প্রবল বাদবিবাদের ভাষা ও ভঙ্গিতেও খুঁজে পাওয়া যাবে।
প্রাক্-ঔপনিবেশিককালের গৌরব, সমৃদ্ধি আর শান্তির বিপরীতে ঔপনিবেশিক লুটপাট, গণহত্যা আর নিপীড়নকে হাজির করার এই আখ্যান নির্মাণ করার মাধ্যমে অতীতমুখী যে বাসনা গঠিত হতে থাকে, সেই অতীত ফিরিয়ে আনার যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন হতে থাকে, সেইগুলোর সঙ্গে উপনিবেশবিরোধী লড়াই আর ঔপনিবেশিক জ্ঞানকে নিরন্তর প্রতিরোধ করার তৎপরতার সম্পর্ক নেই বললেই চলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বাসনার অভিঘাত বর্তমানের সংকট, সহিংসতা ও বৈষম্যকে জায়েজও করে, আবার মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় ভূমিকাও রাখে। একই সঙ্গে উপনিবেশের জটিল শাসন, অনুশাসন ও জ্ঞানের নিষ্ঠ ও নিরন্তর বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তা আর তৎপরতার পরিবর্তে কিছু সরল, জনতুষ্টিবাদী আর পরিচয়বাদী স্লোগানে বি–উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়াকে সংকুচিত করে ফেলা হয়।
এমন প্রবণতা, ঝোঁক ও অভিঘাত গত কিছু বছরে এতটাই বেড়ে গেছে যে এমন দশায় পতিত হওয়ার বিপদ হালের চিন্তকেরা সামনে এনেছেন। এমন আলাপ আপাতদৃষ্টিতে বি–উপনিবেশায়নের বিভিন্ন ভাষা ও আহ্বান বলে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে ভারতের মতো একটি বহু জাতির, বহু ধর্মের, বহু ভাষার আর বহু জাতি–বর্ণের রাষ্ট্রে ঔপনিবেশিক মনন আর মানসিক দাসত্বের সঙ্গে বনেদি শ্রেণির উত্থান আর ইংরেজি ভাষার সম্পর্ক নিয়ে উল্লেখ খুবই উপরতলীয়; অনেক জটিলতা ও ভিন্নতাকে আড়াল করে এসব বয়ান সরলভাবে পরিচয়ের রাজনীতির অভিব্যক্তিমাত্র। বি–উপনিবেশায়ন আর উত্তর-ঔপনিবেশিক বিভিন্ন ধারণা ও পরিভাষা এই হিন্দুত্ববাদী বর্গগুলো দুই দশক ধরে আত্মসাৎ করে চলেছে। উত্তর-উপনিবেশবাদ ও বি–উপনিবেশায়নের আলাপচারিতা ও তত্ত্ব কীভাবে ভারতে সাম্প্রদায়িক, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ও আধিপত্যবাদী, এবং সমসত্ত্ব হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানে ভূমিকা রেখেছে?
তবে এখানে একটা কথা খুব স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার। এ ধরনের বিপজ্জনক ও আধিপত্যবাদী বয়ানের জনপ্রিয় পরিসরে দাপট তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে উত্তর-ঔপনিবেশিক বা বি–ঔপনিবেশিক সমালোচনা বা ক্রিটিক নিজে দায়ী নয় বলেই অনেকে মনে করেন। এই তত্ত্বগুলোর ভেতরেই যে গলদ আছে, ব্যাপারটা তা নয়। আসল সমস্যা হলো একে ব্যবহারের কায়দা বা ‘উপকরণে পরিণতকরণ’ (instrumentalization) নিয়ে। যখন আপনি ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা একটি গভীর সমালোচনাকে দরকার মতো সংকুচিত করে কেটে–ছেঁটে একটি অনড় ‘পরিচয় মতবাদ’ বা আইডেন্টিটি ডকট্রিনে পরিণত করেন, তখনই সর্বনাশটা ঘটে। যখন এটাকে কেবল কিছু নৈতিক গোঁড়ামি বা সভ্যতাগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে পর্যবসিত করা হয়, তখনই তা বিষাক্ত হয়ে ওঠে। বি–ঔপনিবেশিক তত্ত্বে ‘সংযোগ-বিচ্ছেদ’ (de-linking) এবং ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক অবাধ্যতার’ (epistemic disobedience) মতো দারুণ কার্যকর সব ধারণা আছে। কিন্তু এই ধারণাগুলোকে যখন বহুত্ববাদ এবং গণতান্ত্রিক উদারতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় ও নিরন্তর পর্যালোচনা ছাড়া স্থির ও অনড় চিন্তা হিসেবে নিরাময়ের সূত্র হিসেবে পেশ করা হয়, তখন একের পরে এক গারদখানা নির্মিত হতে থাকে। একই সঙ্গে, জটিল ও বহুস্তরীয় পর্যালোচনা বাদ দিলে কেবল চটকদার ও ফ্যাশনেবল বুলি হিসেবে বাছাই করা কিছু পরিভাষা যদি বারবার আওড়ানো হয়, তখন এই মুক্তির ভাষাই অন্যকে বাদ দেওয়ার বা খারিজ করার নতুন এক হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
শেষ থেকে শুরু: একটি সার্বভৌমত্বহীন বি–উপনিবেশায়নের দিকে
এই প্রবন্ধে যে গতিপথটি চিহ্নিত করা হয়েছে তা হলো বি–ঔপনিবেশিক সমালোচনার মুক্তিদায়ী প্রতিশ্রুতি থেকে এর কর্তৃত্ববাদী রুদ্ধতা অবধি যাত্রা। এই যাত্রা অনিবার্য না হলেও একটি স্পষ্ট এবং চলতি বিপদ। ভারত, রাশিয়া এবং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক সংঘাতের প্রমাণগুলো ‘সংযোগ বিচ্ছেদ’, ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক অবাধ্যতা’, ‘দেশজতা’, এবং ‘স্থানিক নির্দিষ্টতার’ মতো শব্দভান্ডার কট্টরপন্থীদের দ্বারা আত্তীকৃত ও তাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
এসব ঘটনা, প্রক্রিয়া ও দশার সমাধান কিন্তু বি–ঔপনিবেশিক সমালোচনা পরিত্যাগ করা নয়; বরং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে বি–উপনিবেশায়নের জনতুষ্টিবাদী বনেদি দখল প্রতিরোধ করে আরও গভীর ও নিবিড় পর্যালোচনার রাস্তায় হাঁটা দরকার। নৈমিত্তিক বাস্তব যাপনের জটিলতা আর বহুমাত্রিকতাকে নাগরিক অভিজাত পরিসর আর বিদ্যায়তনিক হাওয়াই বুলির কারিকুরির কারসাজি পরিত্যাগ করে ভিন্ন ভিন্নভাবে নিবিড় আলাপচারিতায় আনাও প্রয়োজন। এমবেম্বি, কুইজানো, এসকোবার, আরেন্ট, সোসা, ফাঁনো পার্থের মতো এই প্রবন্ধে উল্লিখিত বহু চিন্তকের কাজের নিবিড় বিশ্লেষণ ভিন্ন ভিন্ন পথ দেখায় আমাদের। এই পথে যাত্রার জন্য প্রয়োজন এমন একটি ‘সার্বভৌমত্ববিহীন’ (Non-sovereign) বি–উপনিবেশায়ন। এই বি–উপনিবেশায়ন এক প্রক্রিয়া, যা একটি নতুন, বিশুদ্ধ এবং নিরঙ্কুশ কোনো কর্তৃপক্ষ বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় না; বরং এই চিন্তাগত অবস্থান দুনিয়াদারির হালের বা অতীতেরও বিজড়িত ও লেপ্টালেপ্টি করে থাকা জটপাকানোর দশাগুলোকে মেনে নেয়।
একটি স্বতন্ত্রভাবে মুক্তিদায়ী বি–ঔপনিবেশিক রাজনীতি হয়ে ওঠার জন্য অনেক প্রস্তাবই আছে। নিচে আমি কেবল কয়েকটি উল্লেখ করে এই দীর্ঘ প্রবন্ধের ইতি টানতে চাই:
ক. বহুত্ববাদী ও একই পৃথিবীতে বহু দুনিয়ার সহাবস্থান নিশ্চিতকারী তত্ত্ব ও তৎপরতা পশ্চিম ও বাদবাকি বিশ্বের সহজ দ্বিমেরুকরণ প্রত্যাখ্যান করে ক্ষমতার একটি জটিল মানচিত্র গ্রহণ করে। এই অবস্থান গ্লোবাল সাউথের অভ্যন্তরীণ জটিল স্তরায়ন ও শ্রেণিবিন্যাসগুলোকে স্বীকৃতি দেয়।
খ. কর্তৃত্ববাদবিরোধী অবস্থান অব্যাহতভাবে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে জারি রাখা। রাষ্ট্রীয় দমন বা এলিট ক্যাপচারের জন্য ‘সংস্কৃতি’ অথবা ‘ইতিহাসের’ নির্দিষ্ট বাছাইকৃত বর্তমানবাদী বয়ানকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে অস্বীকার করা।
গ. একটি নয়া সর্বজনীনতাবাদী চিন্তার সন্ধান করা, যা ঔপনিবেশিক প্রভুর উদ্ধত সর্বজনীনতা হয়ে উঠবে না; বরং এই চিন্তা হবে ‘সমান্তরাল বিশ্বজনীনতা’। এই চিন্তা বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতার মধ্যেও সংযোগ খোঁজে। এই অবস্থান কেবল স্থানিক মাত্রাতে রুদ্ধ যেমন নয়, তেমনি বৈশ্বিক মাত্রায় পর্যবসিত করে একটি অনড় সাধারণীকরণেও অনুগত হয় না। আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে একটি অংশীদারত্বমূলক গ্রহীয় বা তৎপরতা হিসেবে স্বীকার করা জরুরি।
এমবেম্বি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে বি–উপনিবেশায়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রাক্-ঔপনিবেশিক খোলসে গুটিয়ে যাওয়া নয়; বরং বিশ্বকে এমনভাবে ‘মেরামত’ করা, যাতে এটি সব প্রাণের ও প্রকৃতির জন্য বসবাস উপযোগী হয়ে ওঠে। টেকসই উপায়ে বসবাসের তুলনায় এ ধরনের বসবাসের উপযোগী একটি বহুমাত্রার স্বীকৃতিসমেত দুনিয়া গঠনের লক্ষ্যই এখানে প্রধান। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তত্ত্বকে উন্মুক্তকরণের, সতর্ক কঠোর পদ্ধতিগত পর্যালোচনার আর অনেকান্তবাদী তৎপরতার সঙ্গে সক্রিয় ও নিরবচ্ছিন্ন সংলাপের সঙ্গে লিপ্ত হয়ে থাকতে হবে। কোনো রুদ্ধ, এককেন্দ্রিক আর জনতুষ্টিবাদী দেয়াল খাড়া করে চিন্তা ও সক্রিয়তা প্রতিরোধ ও মুক্তি আনতে পারে না।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
পুরো পাণ্ডুলিপিটি পড়ে মতামত জানানোর জন্য ও প্রুফ সংশোধনের জন্য আমি জাহিন জামালকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বিভিন্ন পর্যায়ের গবেষণার জন্য আমি সাইস্পেস ও জিনির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণার টুল ব্যবহার করেছি। এই প্রবন্ধে ব্যবহৃত ইনফোগ্রাফগুলো তৈরি করার জন্য আমি জেমিনি ব্যবহার করেছি আমার নিজের প্রম্পট ব্যবহার করে।
রচনাপঞ্জি
অভিকুন্তক ২০২১।। Ashish Avikunthak, Bureaucratic archaeology: State, science and pasts in Postcolonial India, Cambridge: Cambridge University Press।
আইয়ার ২০২৫।। Mani Shankar Aiyar, ‘An inverted Macaulay’, ২ ডিসেম্বর ২০২৫, Frontline, https://frontline.thehindu.com/columns/modi-macaulay-debate-and-politics-of-english-education/article70345175.ece, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
আহমদ ১৯৯২।। Aijaz Ahmad, In theory: Classes, nations, literatures, London: Verso।
আলহুইয়ারভি ২০২১।। Tuomo Alhojärvi, ‘For postcapitalist studies: Inheriting futures of space and economy’, Nordia Geographical Publications, খণ্ড ৫০, সংখ্যা ২, পৃ. ১-২৩০, https://doi.org/10.30671/nordia.103117।
আমিরেল ২০২১।। Stefan Eklöf Amirell, ‘Nationalism, colonialism and decolonisation in Southeast Asia: The rise of emancipatory nationalism’, পৃ. ৩৬১–৩৭৪, Lu Zhouxiang (সম্পাদিত), The Routledge Handbook of Nationalism in East and Southeast Asia, London: Routledge।
আরেন্ট ১৯৫১।। Hannah Arendt, The origins of totalitarianism, New York: Harcourt Brace।
ইঞ্জিনিয়ার ২০০২।। ‘Gujarat Riots in the Light of the History of Communal Violence’, Economic and Political Weekly, খণ্ড ৩৭, সংখ্যা ৫০, পৃ. ৫০৪৭–৫০৫৪।
ইন্ডিয়া টুডে ২০২৫।। India Today, ‘PM Modi's National Call: Break Free From 'Macaulay Mindset', Restore Bhartiya Knowledge | IndiaFirst’, ১৮ নভেম্বর ২০২৫ (ইউটিউব), https://www.youtube.com/watch?v=oVIBgjBtJV4, (প্রবেশ: ১ মার্চ ২০২৬)।
ইয়রগেনসেন ২০১২।। Kenneth Mølbjerg Jørgensen, Anete M. C. Strand, এবং David M. Boje, ‘Towards a Postcolonial-storytelling Theory of Management and Organization’, Philosophy of Management, খণ্ড ১২, সংখ্যা ১, পৃ. ৪৩–৬৬।
ইয়েটস ২০২০।। Julian S. Yates, ‘On decoloniality…and the ‘decolonial problem’’, Postcolonial Studies, খণ্ড ২৩, সংখ্যা ৪, ২০২০, পৃ. ৫৮৯–৫৯৫, https://doi.org/10.1080/13688790.2020.1751433।
এমবেম্বি ২০০১।। Achille Mbembe, On the postcolony, Berkeley: University of California Press।
এমবেম্বি ২০১৫।। Achille Mbembe, ‘Decolonizing knowledge and the question of the archive’, Johannesburg: Wits Institute for Social and Economic Research।
কবির ২০০২।। Ananya Jahanara Kabir, Violence, History and the State: Gujarat 2002, Report of a Meeting organised by the Common Security Forum, King’s College, Cambridge. অনলাইন রিপোর্ট, ৬ আগস্ট ২০০২, https://www.histecon.magd.cam.ac.uk/events/gujarat_discussion.pdf, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
কুমার ২০২৫।। Praveen Kumar এবং Ashish Kumar Yadav, ‘Macaulay vs Modi: Decolonising the Indian mind’, Organiser, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, https://organiser.org/2025/12/23/331618/bharat/macaulay-vs-modi-decolonising-the-indian-mind/, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
কুনুম্মাল ২০২৩।। Ashraf Kunnummal, ‘Islamic Liberation Theology and Decolonial Studies: The Case of Hindutva Extractivism’, Religions, খণ্ড ১৪, সংখ্যা ৯, প্রবন্ধ ১০৮০ (অনলাইন প্রকাশনা ২০২৫, MDPI), https://doi.org/10.3390/rel14091080, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
কানসা-চোক ২০১৯।। Franklin Americo Canaza-Choque, ‘Pluri-versalismo transmoderno decolonial en la crisis civilizatoria: Una lectura clave a Grosfoguel’, Cátedra Villarreal, খণ্ড ৭, সংখ্যা ১, ২০১৯, পৃ. ২১–৩৬।
কামিসুনা ২০২৪।। Tatsuya Kamisuna, ‘National Origins of International Solidarity Movements: Nationalism and International Solidarity for East Timor in Post-Cold War Southeast Asia’, TRaNS: Trans-Regional and -National Studies of Southeast Asia, খণ্ড ১৩, সংখ্যা ১, পৃ. ৪০–৫৮, https://doi.org/10.1017/trn.2024.8।
কাপুর ২০০২।। Ilan Kapoor, ‘Capitalism, culture, agency: dependency versus postcolonial theory’, Third World Quarterly, খণ্ড ২৩, সংখ্যা ৪, ২০০২, পৃ. ৬৪৭–৬৬৪, https://doi.org/10.1080/01436590220000053।
কাপুর ২০২৪।। Saloni Kapur, ‘Challenging Decoloniality Human Rights and Hindutva in Contemporary India’, Asad ur Rehman এবং Muhammad Shoaib Pervez (সম্পাদিত), South Asia from the Margins: Transformations in the Political Space (প্রথম সংস্করণ), পৃ. ১১৪-১৪১, London: Routledge।
কাসেম-ফাশান্দি ২০১২।। Parvis Ghassem-Fachandi, Pogrom in Gujarat: Hindu nationalism and anti-Muslim violence in India, Princeton, New Jersy: Princeton University Press।
কাস্ত্রো-সোতোমাইওর ২০২৩।। Javier Castro-Sotomayor এবং Paola Minoia, ‘Cultivating Post-development: Pluriversal Transitions and Radical Spaces of Engagement’, Henning Melber, Uma Kothari, Laura Camfield এবং Nathan Andrews (সম্পাদিত), Challenging Global Development: Towards Decoloniality and Justice, পৃ. ৯৫-১১৬, Cham, Switzerland: Palgrave Macmillan।
কিহানো ২০০৭।। Aníbal Quijano, ‘Coloniality and modernity/rationality’, Cultural Studies, খণ্ড ২১, সংখ্যা ২–৩, পৃ. ১৬৮–১৭৮। কেনেডি ২০২৩।। James J Kennedy, ‘PM Modi's ‘Macaulay Mindset’ Is a Myth. The Real Fight Is Over India’s Ideas’, The Quint, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫, https://www.thequint.com/opinion/modi-macaulay-mindset-colonialism-claim-hindutva-narrative, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
কোয়াক ২০২০।। Laura J Kwak, ‘Problematizing Canadian exceptionalism: A study of right-populism, white nationalism and Conservative political parties’, Oñati Socio-Legal Series, খণ্ড ১০, সংখ্যা ৬, পৃ. ১১৬৬–১১৯২।
কোয়াশি ২০২২।। Hélène Quashie, ‘Introduction générale’, Ethnicités en miroir, Paris: PSL-EHESS, https://hal.archives-ouvertes.fr/hal-03808879।
কোল্ড্রি ২০১৯।। Nick Couldry এবং Ulises A Mejias, The Costs of Connection: How Data Is Colonizing Human Life and Appropriating It for Capitalism, Stanford, CA: Stanford University Press।
কোল্ড্রি ও মেজিয়াস ২০১৯।। Nick Couldry এবং Ulises A Mejias, ‘Data Colonialism: Rethinking Big Data’s Relation to the Contemporary Subject’, Television & New Media, খণ্ড ২০, সংখ্যা ৪, পৃ. ৩৩৬–৩৪৯, https://doi.org/10.1177/1527476418796632।
কোলপানি ২০২২।। Gianmaria Colpani, ‘Crossfire: postcolonial theory between Marxist and decolonial critiques’, Postcolonial Studies, খণ্ড ২৫, সংখ্যা ১, পৃ. ৫৪-…
গর্গ ২০২৪।। Gaurav C Garg, ‘Between Global History and Microhistory: Rethinking Histories of 'Small Spaces' and Cities’, Comparative Studies in Society and History, খণ্ড ৬৬, সংখ্যা ১, পৃ. ৩২–৫৬, https://doi.org/10.1017/S001041752300039।
গোপাল ১৯৯৩।। Sarvepalli Gopal, Romila Thapar, Bipan Chandra, প্রমুখ, ‘The political abuse of history: Babri Masjid-Rama Janmabhumi dispute’, South Asia Research, খণ্ড ১৩, সংখ্যা ২, পৃ. ১০৭-১২২, https://doi.org/10.2307/3517330।
গ্রোসফোগুয়েল ২০০৮।। Ramón Grosfoguel, ‘A Decolonial Approach to Political-Economy: Transmodernity, Border Thinking and Global Coloniality’, Kult, খণ্ড ৬ (বিশেষ সংখ্যা: Epistemologies of Transformation: The Latin American Decolonial Option and its Ramifications), পৃ. ১০–৩৮।
গ্রোসফোগুয়েল ২০১১।। Ramón Grosfoguel, ‘Decolonizing Post-Colonial Studies and Paradigms of Political-Economy: Transmodernity, Decolonial Thinking, and Global Coloniality’, TRANSMODERNITY: Journal of Peripheral Cultural Production of the Luso-Hispanic World, খণ্ড ১, সংখ্যা ১, পৃ. ১-৩৭, https://doi.org/10.5070/t411000004।
চ্যাটার্জি ১৯৮৬।। Partha Chatterjee, Nationalist thought and the colonial world: A derivative discourse?, London: Zed Books।
চ্যাটার্জি ২০১৯।। Angana P. Chatterji, Christophe Jaffrelot এবং Thomas Blom Hansen, Majoritarian state: How Hindu nationalism is changing India, New Delhi: Oxford University Press।
চিবার ২০১৩।। Vivek Chibber, Postcolonial theory and the specter of capital, London: Verso। জর্জ ২০২৪।। A. Shaji George, ‘Weaponizing WhatsApp: Organized propaganda and the erosion of democratic discourse in India’, Partners Universal Multidisciplinary Research Journal (PUMRJ), খণ্ড ১, সংখ্যা ১, পৃ. ২২-৩৬, https://doi.org/10.5281/zenodo.11178130।
জিগফ্রিড ২০০৯।। Siegfried O Wolf, Die Konstruktion einer kollektiven Identität in Indien: Vinayak Damodar Savarkar und sein Hindutva-Konzept [The construction of a collective identity in India: Vinayak Damodar Savarkar and his Hindutva concept], Heidelberg: South Asia Institute, Heidelberg University, https://doi.org/10.11588/HEIDOK.00009517।
ঝা ২০০৯।। Dwijendra Narayan Jha, Rethinking Hindu identity, Sheffield: Equinox Publishing। টাউট ২০২৪।। Dan Tout, Kelly Alley এবং Elizabeth Strakosch, ‘Australia as competing projects of settler nationalism’, Settler Colonial Studies, খণ্ড ১৫, সংখ্যা ৩, পৃ. ৫৬৩–৫৮২, https://doi.org/10.1080/2201473X.2024.2408142।
টাক ও ইয়াং ২০১২।। Eve Tuck এবং K. Wayne Yang, ‘Decolonization is not a metaphor’, Decolonization: Indigeneity, Education & Society, খণ্ড ১, সংখ্যা ১, পৃ. ১-৪০। ডারলিক ১৯৯৭।। Arif Dirlik, The postcolonial aura: Third world criticism in the age of global capitalism, New York: Routledge।
ডেভিস ও ব্যমার ২০১৮।। Dominic Davies এবং Elleke Boehmer, ‘Postcolonialism and South–South relations’, Elena Fiddian-Qasmiyeh এবং Patricia Daley (সম্পাদিত), Routledge Handbook of South-South Relations, পৃ. ৪৫–৫৫, Abindon, Uk: Routledge।
ডিডি নিউজ ২০২৫।। DD News, ‘PM Modi calls for ending Macaulay’s legacy of mental slavery on Veer Bal Diwas’, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫, https://ddnews.gov.in/en/pm-modi-calls-for-ending-macaulays-legacy-of-mental-slavery-on-veer-bal-diwas/, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
তাইও ২০২২।। Olúfẹ́mi O Táíwò, Elite capture: How the powerful took over identity politics (and everything else), Chicago: Haymarket Books।
দুসেল ১৯৮৫।। Enrique Dussel, Philosophy of liberation, Maryknoll, NY: Orbis।
নকভি ২০২৫।। Hardik Naqvi, ‘An idiot’s guide to Macaulay’s legacy’, National Herald, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫, https://www.nationalheraldindia.com/opinion/an-idiots-guide-to-macaulays-legacy, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
নন্দী ১৯৯৫।। Ashis Nandy, ‘History's forgotten doubles’, History and Theory, খণ্ড ৩৪, সংখ্যা ২, পৃ. ৪৪-৬৬, https://doi.org/10.2307/2505434।
নেইলর প্রমুখ ২০১৮।। Lindsay Naylor, Michelle Daigle, Sofia Zaragocín, Margaret Marietta Ramírez এবং Mary Gilmartin, ‘Interventions: Bringing the decolonial to political geography’, Political Geography, খণ্ড ৬৬, পৃ. ১৯৯–২০৯, https://doi.org/10.1016/j.polgeo.2017.11.002।
নিকোলস ২০১০।। Robert Nichols, ‘Postcolonial Studies and the Discourse of Foucault: Survey of a Field of Problematization’, Foucault Studies, সংখ্যা ৯, পৃ. ১১১–১৪৪, https://doi.org/10.22439/fs.v0i9.3062।
পুনিয়ানি ২০২৫।। Ram Puniyani, ‘Macaulay and Modi: The colonial mindset – Is traditional knowledge at risk?’, ১ ডিসেম্বর ২০২৫, The Aidem, https://theaidem.com/en-macaulay-and-modi-the-colonial-mindset-is-traditional-knowledge-at-risk/, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
পাঠক ২০২৫।। Vikas Pathak, ‘PM Modi urges 10-year national pledge to shed colonial mindset rooted in Macaulay’s legacy’, ১৮ নভেম্বর ২০২৫, The Indian Express, https://indianexpress.com/article/india/india-not-just-an-emerging-market-but-also-an-emerging-model-pm-modi-at-ramnath-goenka-lecture-10371417/, (প্রবেশ: ১ মার্চ ২০২৬)।
ফারুক ২০২২।। Gowhar Farooq, ‘Old Conflicts in New Media Assemblages: India’s Cow Vigilantism and YouTube’, Asiascape: Digital Asia, খণ্ড ৯, সংখ্যা ১-২, পৃ. ৪৭-৭০, https://doi.org/10.1163/22142312-bja10027।
ফানোঁ ১৯৬৩।। Frantz Fanon, The wretched of the earth, New York: Grove Press।
বলিবার ১৯৯১।। Étienne Balibar, ‘Is there a 'neo-racism'?’, Race, nation, class: Ambiguous identities, London: Verso।
বালানসো ও মেইজা ২০২৩।। Andrés Balanzó এবং Marcela Rámos-Mejía, ‘Towards epistemic diversity in sustainability transitions: An exploration of hybrid socio-technical systems’, Sustainability Science, খণ্ড ১৮, সংখ্যা ৬, পৃ. ২৫১১-২৫৩১, https://doi.org/10.1007/s13347-023-01370-9।
বার্ন ২০০১।। Eleanor Byrne, ‘Postcolonial aporias’, Hungarian Journal of English and American Studies, খণ্ড ৭, সংখ্যা ২, পৃ. ৫৫-৬৮।
ব্লাঙ্কো ২০১৬।। Juan Polo Blanco, ‘Colonialidad del poder y violencia epistémica en América Latina’, RELASO, খণ্ড ৬, সংখ্যা ১, পৃ. ২৭-৪৪, https://doi.org/10.17979/RELASO.2016.6.1.1967।
বোগার্টস ও রাবেন ২০১২।। Els Bogaerts এবং Remco Raben, Beyond empire and nation: The decolonization of African and Asian societies, 1930s-1960s, Leiden: KITLV Press।
ভার্মা ২০১০।। Supriya Varma এবং Jaya Menon, ‘Archaeology and the construction of identity: The excavations at Ayodhya’, Social Scientist, খণ্ড ৩৮, সংখ্যা ৭/৮, পৃ. ৬৯-৯৩।
ভিসানা ২০২২।। Vikram Visana, ‘Glory and humiliation in the making of V. D. Savarkar's Hindu nationalism’, The Historical Journal, খণ্ড ৬৫, সংখ্যা ৫, পৃ. ১২৫৫-১২৭৮, https://doi.org/10.1017/s0018246x22000255।
মহাজন ২০১৮।। Sucheta Mahajan, ‘Hindutva agenda and history writing: Imaginings of nation’, Revista Española de Antropología Americana, খণ্ড ৭৬, পৃ. ২৫৭-২৭৪, https://doi.org/10.25145/J.RECAESIN.2018.76.015।
মালদোনাদো-তোরেস ২০০৭।। Nelson Maldonado-Torres, Sobre la colonialidad del ser: contribuciones al desarrollo de un concept, Bogotá: Siglo del Hombre Editores।
মালডুন ও উ ২০২৩।। James Muldoon এবং Bobby Wú, ‘Artificial intelligence in the colonial matrix of power’, Philosophy & Technology, খণ্ড ৩৬, পৃ. ৮০, https://doi.org/10.1007/s13347-023-00687-8।
মিনিওলো ২০০০।। Walter D Mignolo, ‘Post-Occidental reason: The crisis of occidentalism and the emergenc(y)e of border thinking’, Local histories/global designs: coloniality, subaltern knowledges, and border thinking, পৃ. ৯১–১২৬, Princeton, NJ: Princeton University Press।
মিনিওলো ২০০৯।। Walter D Mignolo, ‘Epistemic disobedience': The de-colonial option and the meaning of identity in politics’, Gragoatá, খণ্ড ১২, সংখ্যা ২২, পৃ. ১১-৪১, https://doi.org/10.22409/GRAGOATA.V12I22.33191।
মিনিওলো ২০১৭।। Walter D Mignolo, ‘Coloniality is far from over, and so must be decoloniality’, Afterall, খণ্ড ৪৩, পৃ. ৩৮-৪৫, https://doi.org/10.1086/692552।
মুখার্জি ২০২০।। Rahul Mukherjee, ‘Mobile witnessing on WhatsApp: Vigilante virality and the anatomy of mob lynching’, South Asian Popular Culture, খণ্ড ১৮, সংখ্যা ১, পৃ. ৭৯–১০১, https://doi.org/10.1080/14746689.2020.1736810।
মোহামেদ প্রমুখ ২০২০।। Shakir Mohamed, Marie-Therese Png এবং William Isaac, ‘Decolonial AI: Decolonial theory as sociotechnical foresight in artificial intelligence’, Philosophy & Technology, খণ্ড ৩৩, সংখ্যা ৪, পৃ. ৬৫৯–৬৮৪, https://doi.org/10.1007/s13347-020-00405-8।
মোলেমা ২০২৪।। W. J. T. Mollema, ‘Decolonial AI as disenclosure’, Open Journal of Social Sciences, খণ্ড ১২, সংখ্যা ২, পৃ. ৫৭৪-৬০৩, https://doi.org/10.4236/jss.2024.122032।
ম্যাককার্ডি প্রমুখ ২০২৪।। Patrick McCurdy, Kevin Clarke এবং Bart Cammaerts, ‘From social awareness to authoritarian other’, Journal of Language and Politics, খণ্ড ২৪, সংখ্যা ৬, পৃ. ৯১০ – ৯৩৩, https://doi.org/10.1075/jlp.24126.mcc।
ম্যাকিউয়ান ২০০৩।। Cheryl McEwan, ‘Material geographies and postcolonialism’, Singapore Journal of Tropical Geography, খণ্ড ২৪, সংখ্যা ৩, পৃ. ৩৪০-৩৫৫, https://doi.org/10.1111/1467-9493.00163।
রিকাউর্তে ২০১৯।। Paola Ricaurte, ‘Data epistemologies, the coloniality of power, and resistance’, Television & New Media, খণ্ড ২০, সংখ্যা ৪, পৃ. ৩৫০-৩৬৫, https://doi.org/10.1177/1527476419831640। রিকাউর্তে ২০২২।। Paola Ricaurte, ‘Ethics for the majority world: AI and the question of violence at scale’, Media Culture & Society, খণ্ড ৪৪, সংখ্যা ৪, পৃ. ৭২৬-৭৪৫, https://doi.org/10.1177/01634437221099612।
লাতুর ২০০৪।। Bruno Latour, ‘Why has critique run out of steam? From matters of fact to matters of concern’, Critical Inquiry, খণ্ড ৩০, সংখ্যা ২, পৃ. ২২৫–২৪৮, https://doi.org/10.1086/421123।
লাভেল ২০০৭।। Mary Lovell, ‘Settler colonialism, multiculturalism and the politics of postcolonial identity’, কনফারেন্স পেপার, Australasian Political Studies Association Conference, ২৩-২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭, Melbourne: Monash University, http://hdl.handle.net/1885/9387, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
লি ২০২৩।। Justin Lee, ‘Romanticizing decolonization and Asian epistemology: Reflections on identity and space’, Asia Pacific Education Review, খণ্ড ২৪, সংখ্যা ২, পৃ. ১৮৭–১৯৭, https://doi.org/10.1007/s12564-023-09835-3।
লুইস ও লাল ২০২৩।। Alexandra Lewis এবং Marie Lall, ‘From decolonisation to authoritarianism: The co-option of the decolonial agenda in higher education by right-wing nationalist elites in Russia and India’, The International Journal of Higher Education, পৃ. ১৪৭১–১৪৮৮, https://doi.org/10.1007/s10734-023-01074-0।
লোসাদা ২০১৮।। Jhon Jairo Losada, ‘Identité, reconnaissance et colonialité : Annotations sur le cas colombien dans le cadre de l'Accord de Paix’, AUC Interpretationes, খণ্ড ৮, সংখ্যা ১, পৃ. ১২১–১৩৮।
শেফার্ড ২০২৩।। Kancha Ilaiah Shepherd, ‘When RSS, Modi attack Macaulay and English, they attack upward mobility of Dalits, Shudras, Adivasis’, The Wire, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, https://thewire.in/caste/when-rss-modi-attack-macaulay-and-english-they-attack-upward-mobility-of-dalits-shudras-adivasis, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
সান্তোস ২০১১।। Boaventura de Sousa Santos, ‘Epistemologies of the South’, Études Rurales, খণ্ড ১৮৭, পৃ. ২১-৫০, https://doi.org/10.4000/etudesrurales.9351।
সান্তোস ও ফিলহো ২০১৫।। Catarina Maria dos Santos এবং José Edmilson Pereira Filho, ‘Universalismo e o relativismo: La mutilação genital feminina e o diálogo intercultural dos direitos humanos’, Pensar, খণ্ড ২০, সংখ্যা ১, পৃ. ৩১-৬০, https://doi.org/10.5020/2317-2150.2015.v20n1p29।
সরকার ২০০২।। S. Sarkar, Beyond Nationalist Frames: Postmodernism, Hindu Fundamentalism, History, Bloomington: Indiana University Press।
সরকার ২০১৯।। Tanika Sarkar, ‘How the Sangh Parivar writes and teaches history’, Christophe Jaffrelot (সম্পাদিত), The Sangh Parivar: A Reader, পৃ. ২৫০–২৭৫, New Delhi: Oxford University Press।
স্যান্ডার্স ২০১৮।। Ian Saunders, ‘Post-colonial Australia: Fact or fabrication?’, NEW: Emerging Scholars in Australian Indigenous Studies, খণ্ড ২, সংখ্যা ১, পৃ. ৫৬-৬১, https://doi.org/10.5130/nesais.v2i1.1474।
সিং ২০২১।। Kundan Singh, ‘Colonial roots of the Aryan invasion/migration theory and the contemporary archaeological evidence in Western sources’, Indian Historical Review, খণ্ড ৪৮, সংখ্যা ২, পৃ. ১৫৯-১৮০, https://doi.org/10.1177/03769836211052101।
সিনহা ২০১৭।। Rakesh Sinha, ‘Decolonisation of Indian Mind’, ন্যাশনাল সেমিনার অন ‘Decolonisation of Indian Mind’, ১৫-১৬ এপ্রিল ২০১৭, আহমেদাবাদ, গুজরাট, অর্গানাইজড বাই ভারতীয় বিচার মঞ্চ, ১৯ জুন ২০১৭ (ইউটিউব), https://www.youtube.com/watch?v=W9xJl-RmvEY&t=1858s, (প্রবেশ: ২ মার্চ ২০২৬)।
সিম্বি ২০২১।। Félicien Rutayisire Simbi, Genocide, citizenship and political identity crisis in postcolonial Africa: Rwanda as case study, Durban: University of KwaZulu-Natal।
সুন্দর ২০০৫।। Nandini Sundar, ‘Teaching to hate: The pedagogy of communalism in India’, Economic and Political Weekly, খণ্ড ৪০, সংখ্যা ১৭, পৃ. ১৭৫১-১৭৫৮।
হাং ২০১৪।। Ho-fung Hung, ‘Introduction’, Journal of World-Systems Research, খণ্ড ২০, পৃ. ৩৩৪–৩৩৭, https://doi.org/10.5195/jwsr.2014.560।
হাল ২০২২।। George B Hull, ‘Epistemic ethnonationalism: Identity policing in neo-traditionalism and decoloniality theory’, Acta Academica: Critical Views on Society, Culture and Politics, খণ্ড ৫৪, সংখ্যা ৩, পৃ. ১৩১–১৫৫, https://doi.org/10.18820/24150479/aa54i3/।
হিউমস ২০১২।। Cynthia Ann Humes, ‘Hindutva, mythistory, and pseudoarchaeology’, Numen, খণ্ড ৫৯, সংখ্যা ২-৩, পৃ. ১৭৮-২০১, https://doi.org/10.1163/156852712X630770।
হেলগেসন ২০২৩।। Stefan Helgesson, ‘Marxism, postcolonialism, and the decolonization of literary studies’, Atto Quayson এবং Ankhi Mukherjee (সম্পাদিত), Decolonizing the English Literary Curriculum, পৃ. ১৮৫-১৯৯, Cambridge: Cambridge University Press।
হোমার ও কেলনার ২০০৪।। Sean Homer এবং Douglas Kellner, Fredric Jameson: A Critical Reader, Basingstoke: Palgrave Macmillan।
হল ১৯৯৬।। Stuart Hall, ‘When was ‘the post-colonial’? Thinking at the limit’, Ian Chambers এবং Lidia Curti (সম্পাদিত), The Post-Colonial Question: Common Skies, Divided Horizons, পৃ. ২৪২–২৬০, London: Routledge।
লেখক পরিচিতি
স্বাধীন সেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপনা করেন। তাঁর কাছে প্রত্নতত্ত্ব কেবল পেশাগত কোনো দায়িত্ব নয়; তিনি প্রত্নতত্ত্বকে ‘শারীরিক ও মানসিক অভিজ্ঞতা’ হিসেবে বিবেচনা করেন আর মানুষি আর না-মানুষি জগতের (যেমন প্রকৃতি বা পরিবেশ) মধ্যকার এক পার্থিব ও অপার্থিব সম্পর্কের অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করেন। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহের মূলে রয়েছে ‘মানুষ-প্রকৃতি-পানির’ জটিল সম্পর্ক। বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলে নদী, বৃষ্টি আর পলিকে ইতিহাসের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখেন। তিনি ‘বহুপ্রজাতিক সম্পর্কের’ ধারণাটি সামনে আনেন, যেখানে পুকুর, গাছপালা কিংবা নদীবাহিত পলি মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। প্রত্নতত্ত্ব, উপনিবেশ আর বিভিন্ন পরিচয়বাদী চিন্তার সম্পর্ক বোঝা ও পর্যালোচনা করা তাঁর গবেষণার আগ্রহের প্রসঙ্গ। মাঠপর্যায়ে তিনি কেবল বড় স্থাপনা উদ্ধারে বিশ্বাসী নন। তিনি পুরো ল্যান্ডস্কেপ বা অঞ্চলের ওপর মনোযোগ দিয়ে অতীতের বহুমাত্রিক আখ্যানকে একটি আন্তশাস্ত্রীয় পরিসরে বোঝার পদ্ধতি খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পাশ্চাত্য প্রত্নতত্ত্বের তত্ত্বগুলোকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে তিনি এই বদ্বীপের নিজস্ব বাস্তবতা ও জীবনদর্শন দিয়ে ইতিহাসকে দেখার কথা বলেন। ইংরেজি ও বাংলায় গবেষণার পাশাপাশি বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন চিন্তাকে বাংলাদেশের পাঠকদের সামনে আনার বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাঁর তাত্ত্বিক এবং মাঠপর্যায়ের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর সহসম্পাদিত The Archaeology of Early Medieval and Medieval South Asia: Contesting Narratives from the Eastern Ganga-Brahmaputra Basin (Routledge, 2023) বইটিতে। এ বইয়ে তিনি প্রথাগত ইতিহাসের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলার জনবসতির ধরন ও সামাজিক পরিবর্তনের এক বহুত্ববাদী চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। শিক্ষকতা ও লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত আমাদের ইতিহাসের পুরোনো চিন্তার জড়তাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ইতিহাসের উপাদানের সঙ্গে বর্তমানের বেঁচে থাকা ঐতিহ্যের একটি সেতুবন্ধ তৈরির পথ খোঁজার প্রতি তাঁর মনোযোগ রয়েছে। বঙ্গীয় বদ্বীপের নদী ও নদীর ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর সংবেদী যুক্ততা ও স্মৃতিকাতরতা রয়েছে।