ইরান যুদ্ধে আদৌ কি কেউ বিজয়ী হবে!
· Prothom Alo

এক মাস হলো ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বহুমুখী সংঘাত চলছে। বর্তমান সময়ের এই উত্তাল পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ইরান এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই লড়াইয়ে আসলে কে জিতবে?
বর্তমান সময়ে কোনো যুদ্ধে কি সত্যিকার অর্থে পূর্ণাঙ্গ জয় বা সম্পূর্ণ পরাজয় সম্ভব? নাকি জয় ও পরাজয় এখন কেবলই একটি আপেক্ষিক ধারণা যা যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনের মাত্রার ওপর নির্ভর করে?
Visit moryak.biz for more information.
পৃথিবীর ইতিহাসে অতীতে বহু বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু বর্তমান সময়ের সংঘাত আগের চেয়ে অনেক ভিন্ন। একসময় যেকোনো যুদ্ধের ফলাফল খুব সহজেই নির্ধারণ করা যেত। সামরিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই জয় বা পরাজয় নির্ধারিত হতো।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো অত্যন্ত জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ওই সরল বিভাজন আর কার্যকর নয়। এখন সামরিক সাফল্য সব সময় রাজনৈতিক জয়ে রূপান্তরিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সামরিকভাবে এগিয়ে থেকেও একটি রাষ্ট্র কৌশলগত দিক দিয়ে মারাত্মক ব্যর্থ হতে পারে। একটি রাষ্ট্রের কাছে সামরিক পরাজয়ের চেয়ে এই কৌশলগত পরাজয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে ভাষণে আসলে কী বলতে চাইলেনবর্তমান সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ঠিক এই সমীকরণই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেকোনো সামরিক জয়ের চেয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল কারণ হলো, বিশ্বের জ্বালানির ২০ থেকে ২৫ ভাগ এ সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর সহজ সত্য হলো, জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ ছাড়া আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি কার্যত অচল।
এ কারণে এই সংঘাতে কে বিজয়ী হবে, এমন সরল প্রশ্ন আর যথেষ্ট নয়। এ প্রশ্নের ব্যাপ্তি আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এই ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য আসলে কী? যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি কেবল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, নৌক্ষমতা বা সম্ভাব্য পারমাণবিক অবকাঠামোর মতো সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতেই আগ্রহী? নাকি তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য আরও বিস্তৃত?
তারা কি কেবল ইরানের প্রতিরোধের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে চায়, নাকি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিজেদের নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করাটাই তাদের মূল লক্ষ্য? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে।
ইরান যুদ্ধে ক্লজউইটজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুলআন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতাবাদ তত্ত্বের আলোকে এই চলমান যুদ্ধকে খুব নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলাফল কখনোই কেবল সাময়িক সামরিক জয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। বরং তা নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার ভারসাম্য, কৌশলগত প্রভাব বিস্তার এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে দর-কষাকষির সক্ষমতার ওপর। সংঘাতের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ছিল। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা এবং দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এসব সামরিক আঘাত সত্যি সত্যিই ইরানের সরকারপতনের দিকে নিয়ে যাবে কি না, তা এখনো ঘোর অনিশ্চয়তায় মোড়ানো। উল্টো এসব বাহ্যিক আক্রমণের ফলে ইরানের সাধারণ জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা আরও দৃঢ় হয়েছে এবং তারা আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি একতাবদ্ধ। সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে না যে অচিরেই ইরান সরকারের কোনো পতন ঘটবে।
‘উলঙ্গ রাজা’: যে যুদ্ধে সবাই হেরে যাচ্ছেতাহলে এই চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এর উত্তর খুঁজতে নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও কৌশলবিদ থমাস শেলিংয়ের বল প্রয়োগ তত্ত্ব বিশেষভাবে সহায়ক। গেম থিওরি ব্যবহার করে সংঘাত বিশ্লেষণে যুগান্তকারী অবদান রাখা শেলিং দেখিয়েছেন, যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের জোরে পেশি প্রদর্শনের বিষয় নয়। যুদ্ধ হলো একটি চলমান দর-কষাকষির প্রক্রিয়া, যেখানে মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষকে একটি নির্দিষ্ট কাজ করতে বাধ্য করা বা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখা। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরিয়ে আনতে একই সঙ্গে সামরিক চাপ ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ কাজে লাগাচ্ছে।
অন্যদিকে ইরান এই চাপের মুখে হাত গুটিয়ে বসে নেই। কৌশলগত পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এমনকি প্রণালির প্রবাহ আংশিক ব্যাহত করে বিশ্বের বুকে একটি প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে দেশটি। ফলে বর্তমান সংঘাত আর মুখোমুখি সামরিক পর্যায়ে আটকে নেই। এটি পুরোপুরি সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক দর-কষাকষির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে সবাই নিজ নিজ অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।
ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প কি চার্চিলের মতো ‘মারাত্মক ভুল’ করতে যাচ্ছেন?যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থানটি তাত্ত্বিক জন মিয়ারশাইমারের আক্রমণাত্মক বাস্তবতাবাদ দিয়ে খুব সহজেই বিশ্লেষণ করা যায়। তাঁর তত্ত্ব আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক জানালা খুলে দেয়। জন মিয়ারশাইমারের মতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো কেবল প্রতিপক্ষকে দুর্বল করেই বসে থাকে না। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে রাখতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে।
এ পরিস্থিতিতে জয় বা পরাজয় একাধিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ইরানের সামরিক সক্ষমতা হয়তো আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের কৌশলগত প্রভাব এখনো বিলুপ্ত হয়নি। আধুনিক যুদ্ধে সামরিক ও রাজনৈতিক সাফল্য যে সরলরেখায় চলে না, বরং একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে, তা এ পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কোনো রাষ্ট্র সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার কৌশলগত অবস্থান যদি অক্ষুণ্ন থাকে, তবে তাকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত আখ্যা দেওয়া অবাস্তব।
এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ ইতিহাসে কি কারও একক বিজয় হিসেবে স্থান পাবে, নাকি অমীমাংসিত শক্তির একটি দীর্ঘস্থায়ী লড়াই হয়ে থেকে যাবে, তার উত্তর তোলা রইল সময়ের হাতে। আর এর ওপরই নির্ভর করছে আগামীর মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতার পথে পা বাড়াবে, নাকি সেখানে অশান্তির আগুন অনির্দিষ্টকালের জন্য জ্বলতেই থাকবে।
এখান থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি ধ্রুপদি রূপ ফুটে ওঠে, যেখানে কেবল ভৌগোলিক অবস্থান সরাসরি প্রবল অর্থনৈতিক ও দর-কষাকষির শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সামরিকভাবে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার পরও ইরান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতার আবহ তৈরি করে এই দর-কষাকষির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কিছুটা হলেও রাখতে সক্ষম হয়েছে। জ্বালানিবাজারে ইতিমধ্যে শুরু হওয়া অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি প্রমাণ করে, ইরানের এ কৌশল বেশ ভালোভাবেই কাজ করছে।
রবার্ট কিওহান ও জোসেফ নাইয়ের ‘জটিল আন্তনির্ভরশীলতা’ তত্ত্বটির বাস্তব রূপায়ণ দেখা যাচ্ছে এই সংকটে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা যে কেবল বারুদ আর অস্ত্রের ভান্ডারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সামর্থ্যের ওপরও দারুণভাবে নির্ভরশীল, তা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। বাধ্যকরণ ও প্রতিরোধের এ খেলায় থমাস শেলিংয়ের আরেকটি অসাধারণ দর্শন প্রাসঙ্গিক। তা হলো, ক্ষতি করার ক্ষমতাই মূলত দর-কষাকষির মূল চাবিকাঠি। সরাসরি জয়ের সম্ভাবনা না থাকলেও শুধু ভয়াবহ ক্ষতি করার সক্ষমতা দেখিয়ে ইরান আলোচনার টেবিলে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আগাম আঘাত হানার কৌশল ডেল কোপল্যান্ডের তত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী বা পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে তার উত্থানের আগেই পঙ্গু করে দেওয়া এই কৌশলের প্রধান দর্শন।
তবে এই সামরিক ও প্রতিরোধকাঠামোর একটি বড় সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয় কার্ল ফন ক্লজউইজের বিখ্যাত তত্ত্ব। আধুনিক সামরিক কৌশলের অন্যতম এই প্রবর্তক যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করেছেন রাজনীতির অন্য এক রূপ বা ধারাবাহিকতা হিসেবে।
তাঁর মতে, কোনো সামরিক অভিযান তখনই শতভাগ সফল, যখন তার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফলভাবে অর্জিত হয়। ইরান যদি সফলভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক অর্জনই রাজনৈতিকভাবে অসম্পূর্ণ ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। উল্টো দিকে যুক্তরাষ্ট্র যদি পুরোপুরি হরমুজ প্রণালিকে সুরক্ষিত রাখতে পারে এবং ইরানকে আর্থসামাজিকভাবে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়, কেবল তখনই তা তাদের জন্য চূড়ান্ত কৌশলগত বিজয় বলে গণ্য হবে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বারবার প্রমাণ করে যে জয় ও পরাজয় কোনো নির্দিষ্ট বা স্থির গন্তব্য নয়। সামরিক প্রতাপ, অর্থনৈতিক মোড়লিপনা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার জটিল সংমিশ্রণেই চূড়ান্ত ফলাফল অর্জিত হয়। হরমুজ প্রণালি ঘিরে গড়ে ওঠা এই তীব্র রেষারেষি এখনো উপসংহারে পৌঁছায়নি। আগামী দিনগুলোয় এই কৌশলগত জলপথের ওপর যার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেদিকটাই জয়ের পাল্লা ভারী করবে।
এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ ইতিহাসে কি কারও একক বিজয় হিসেবে স্থান পাবে, নাকি অমীমাংসিত শক্তির একটি দীর্ঘস্থায়ী লড়াই হয়ে থেকে যাবে, তার উত্তর তোলা রইল সময়ের হাতে। আর এর ওপরই নির্ভর করছে আগামীর মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতার পথে পা বাড়াবে, নাকি সেখানে অশান্তির আগুন অনির্দিষ্টকালের জন্য জ্বলতেই থাকবে।
সানজিদা বারী ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরাল ফেলো হিসেবে অধ্যয়নরত। ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব