ভ্রমণে নবগঙ্গা-চিত্রা
· Prothom Alo

আমার আজকের এ লেখা জীবন থেকে মুছে যাওয়া দিনগুলোর স্মৃতিচারণা। তুমি কি বুঝতে পারবে এই অনুভূতি? জানি না, তবে চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! তুমিও তো আমার মতো অন্যের মনের কথা বুঝতে চাও। তাই পারলে আমার লেখাটির সঙ্গে একত্র হয়ে এটিকে আরও সম্প্রসারিত করতে চেষ্টা করো—যেন তুমিও হারিয়ে ফেলো তোমাকে, যেমনটি আমি হারিয়ে ফেলেছি আমাকে বহুবার। জীবনের সেই গভীর আবেশময় আকাঙ্ক্ষায় ভেসে ওঠে একটি চিরচেনা পঙ্ক্তি—
‘পথ চলিতে যদি চকিতে কভু দেখা হয়, পরান-প্রিয়!
Visit casino-promo.biz for more information.
চাহিতে যেমন আগের দিনে তেমনি মদির চোখে চাহিও।’
আমার গ্রামের বাড়ি নহাটা। এটি বর্তমান মাগুরা জেলাধীন মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা ইউনিয়নের একটি গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নবগঙ্গা নদী, সময়ের স্রোতের মতোই অনন্ত, স্মৃতির মতোই মমতাময়। এই নদীর স্রোতধারা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার জলভূমিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। গঙ্গা নদী, যার উৎপত্তি হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহে, ভারত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মা নামে পরিচিত হয়ে বহু শাখা নদীর জন্ম দেয়। এই নদীব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা নবগঙ্গা, যা যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল অঞ্চলের জনজীবনকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লালন করেছে। প্রবহমান এই নদী শেষ পর্যন্ত মধুমতী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বৃহত্তর বদ্বীপ অঞ্চলের অংশ হয়ে সাগরের পথে যাত্রা সম্পূর্ণ করে।
ইতিহাসের এক পর্যায়ে এই নবগঙ্গা নদীর সঙ্গে চিত্রা নদীরও সংযোগ ছিল, এখনো আছে, যা দক্ষিণ বাংলার নদীপথের ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক গতিশীলতার এক জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে। আর এই নদীপথেই আমি চলাচল করেছি জীবনের সেই ছোট্ট বেলায়, শৈশবের নির্মল আনন্দ, নৌকার দোলায় ভেসে থাকা স্বপ্ন, আর আপনজনের টানে ভরা এক অমলিন যাত্রার সাক্ষী হয়ে।
নবগঙ্গা নদীর বুকে ছুটে চলছে বাইচের নৌকাজীবনে ভ্রমণ করেছি অনেক, দেখেছি পৃথিবীকে নানাভাবে, দেখেছি প্রকৃতির দৃশ্য, দেখেছি অনেক পর্বত, দেখেছি আকাশে নর্ডিক লাইট, দেখেছি ঝরনা, দেখেছি বন্যা, দেখেছি নিখিলের সোনালি রঙের শোভা। শুধু দেখা হয়নি সময় করে হৃদয়ের মধ্যে পড়ে থাকা ছোট্টবেলার সেই দিনগুলো। ভ্রমণে নানাবাড়ি, সে কী মহা উৎসব! আজও মনে পড়ে, সেই অপেক্ষার প্রহর শেষে দেখব কখন নানির মুখখানি।
নৌকা ভ্রমণের সেই দিনগুলো আজও স্মৃতির ভেতরে জীবন্ত হয়ে আছে। নবগঙ্গা নদীর বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলত ধীর, শান্ত ঢেউয়ের তাল মেনে। জলরেখা কাঁপত হালকা হাওয়ায়, আর দূরে সবুজে ভরা প্রকৃতি যেন ডেকে নিত আপন করে। মাঝির দাঁড়ের ছন্দে ভেসে আসত জলের মৃদু শব্দ, আকাশজুড়ে উড়ে বেড়াত সাদা বক, আর নদীর দুই তীরে দুলত শাপলা, শালুক আর কাশফুলের মায়াবী শোভা।
নবগঙ্গা পেরিয়ে যখন চিত্রা নদীর বাঁকে নৌকা প্রবেশ করত, তখন মনে হতো, যেন আরেক পৃথিবীতে এসে পড়েছি। পানির রং, বাতাসের গন্ধ, পাখির ডাক—সবকিছুই বদলে যেত। সেই চিত্রা নদীর তীরেই নানাবাড়ি। তবে ঘাটের পর ঘাট, কখন নানাদের ঘাট আসবে? এ যন্ত্রণা, এ জ্বালা আর সইত না। শেষে রেগেমেগে জিজ্ঞেস করতাম, ‘ও মাঝি, আর কতক্ষণ লাগবে রে?’ মাঝির নৌকা চলত তার নিজের গতিতে, আর আমি গুনে গুনে শেষ করতাম ঘাটের পর ঘাট। ছোটবেলার সেই আশ্রয়, সেই ভালোবাসার ঠিকানা, যেখানে সময় যেন একটু ধীরে হাঁটত। ঘাটে পৌঁছানোর আগেই দূর থেকে ভেসে আসত আপনজনের কণ্ঠ, আর নানির স্নেহমাখা হাসি মুছে দিত পথের সব ক্লান্তি।
বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি, কত শহর, কত দেশ দেখেছি। কিন্তু নবগঙ্গা আর চিত্রার সেই নৌকা ভ্রমণ, আর নানা বাড়ির ঘাট, আজও বুকের ভেতর অদ্ভুতভাবে দাগ কেটে আছে। কোনো দূরত্বই সেই স্মৃতিকে মুছে দিতে পারেনি। বরং যত দূরে গেছি, ততই সেই নদীর জল, সেই ঘাট, সেই শৈশব আমাকে আরও গভীরভাবে টেনে এনেছে। নানা-নানি বেঁচে নেই, বেঁচে আছে শুধু স্মৃতি। তাদের স্নেহ, তাদের আশীর্বাদ, তাদের ভালোবাসা আজও হৃদয়ের গহিনে অনির্বাণ প্রদীপের মতো জ্বলে।
বাংলাদেশে নদীপথ কি আগের মতো ছোট্ট নৌকায় করে কাউকে যেতে দেখা যায়? নদীর ঘাটে জল আনতে এসে নববিবাহিত এক রমণীর কণ্ঠে কি সেই গান আজও ভেসে ওঠে—
‘কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া
আমার ভাইধন রে কইও নাইওর নিতো বইলা
তোরা কে যাস, কে যাস, কে যাস রে…’
স্মৃতির এই নদীপথ বয়ে চলে আজও সময়ের সীমানা অতিক্রম করে। জীবনের সব ভ্রমণের শেষে তাই মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর যাত্রা ছিল সেই ছোট্ট নৌকায়, নবগঙ্গা আর চিত্রার বুক বেয়ে, প্রিয় নানাবাড়ির পথে।
আজ কেন বারবার মনে চায় ফিরে দেখতে নবগঙ্গার ঢেউ আর চিত্রাতীর, একবার দাঁড়িয়ে, নিবিড় দৃষ্টিতে। এই দুই নদীর জলধারা শুধু ভূগোলের অংশ নয়, তারা আমার শৈশব, আমার মমতা, আমার অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অনির্বচনীয় টান। তাদের না দেখলে হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটে না। তাই স্মৃতির অন্তরালে আজও তারা জেগে আছে, অনন্ত মমতায়।
নিভৃতে ভাবি, হৃদয়ের গভীরে সযতনে রেখে দিয়েছি সেই দিনগুলোকে, নৌকার দোলায় ভেসে চলা বিকেল, কাশফুলে ভরা তীর, আর দূরের সবুজে হারিয়ে যাওয়া আকাশ। তবু কখনো মনে প্রশ্ন জাগে, যদি সেই নদীপথ হারিয়ে যায়, তবে কি আর ফিরে পাওয়া যাবে সেই চেনা যাত্রা? নবগঙ্গার বুক চিরে চিত্রার দিকে এগিয়ে যাওয়া সেই স্নিগ্ধ পথ কি আবার আমাকে ডেকে নেবে?
বাংলার প্রকৃতি তখন ছিল অপার সৌন্দর্যের এক অনন্ত ভান্ডার। নবগঙ্গার জলে প্রতিফলিত হতো আকাশের নীল, আর চিত্রার বাতাসে ভেসে আসত মাটির গন্ধ। সেই রূপ, সেই স্নিগ্ধতা, সেই ভালোবাসা আজও হৃদয়ে গাঁথা এক অমলিন মালার মতো। ফিরে তাকালে মনে হয়, স্মৃতির দুয়ার খুললেই আবার দেখা মেলে সেই আপন পৃথিবীর।
যদি আর একবার জানা যেত, প্রিয় সেই নদীপথ আজও অপেক্ষায় আছে, তবে ছোট্ট নৌকায় ভেসে গিয়ে মিটিয়ে নিতাম মনের সব সাধ। নবগঙ্গা ও চিত্রার বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই অপরূপ দৃশ্য বুকে ধারণ করে ভাবি, এই দেশ, এই নদী, এই স্মৃতির আলো কে আগলে রাখবে, যদি আমরা ভুলে যাই আমাদের শিকড়?
এভাবেই নবগঙ্গা ও চিত্রার স্রোতে ভেসে থাকে আমার ভালোবাসা, আমার অতীত, আর ফিরে পাওয়ার এক অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।
আজ মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কীভাবে সংরক্ষণ করছি বাংলাদেশের সেই ঐতিহ্যবাহী প্রবাদ—ধান, নদী, খাল এই তিনে বরিশাল—যা সমগ্র বাংলাদেশের অমূল্য ঐতিহ্যের প্রতীক? নবগঙ্গা ও চিত্রার মতো অসংখ্য নদী আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেগুলো কতটা রক্ষিত, আর কতটাই–বা হারিয়ে যাচ্ছে, তার উত্তর জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে অন্তরে।
কবে নাগাদ বাস্তবে রূপ নেবে সেই সোনার বাংলার স্বপ্ন, যা জন্মের লগ্নে আমরা হৃদয়ে ধারণ করেছি? কৃষির সমৃদ্ধি, নদীর সজীবতা ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্র কী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, আর তার প্রকৃত অর্জনই–বা কতদূর, তা জানতে বড়ই ইচ্ছা করে। কারণ, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের শিকড় ও আমাদের ছয় ঋতুচক্রের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]