মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে

· Prothom Alo

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মহিলা মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসায় নিপীড়ন হলে কী হয়? বেশির ভাগ গড়ায় সালিস পর্যন্ত। সালিসের মাধ্যমে সমঝোতা হওয়ার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা বিচার পান না। মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিয়ে লিখেছেন মনযূরুল হক

একজন মাদ্রাসাশিক্ষকের ফোন পেলাম। গলায় গভীর উদ্বেগ। তিনি জানালেন, মহিলা মাদ্রাসার সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় তিনি এতটা বিচলিত যে প্রতিকারের
জন্য নিজেই একটি উদ্যোগ নিতে চান। সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন তিনি। মহিলা মাদ্রাসার এক নারী শিক্ষকের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে সহযোগিতার
এই ডাক অভাবনীয়। তবে কি সময় বদলাতে শুরু করেছে?

Visit newsbetting.bond for more information.

নরসিংদীর রায়পুরায় একটি আবাসিক মহিলা মাদ্রাসার ১০ বছরের শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নের খবরে বলা যায় ধর্মপ্রাণ মানুষ স্তম্ভিত। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষক পলাতক। এর আগে গত ১৫ মার্চ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা মহিলা মাদ্রাসা কিংবা তারও আগে সাভারে ‘এরশাদুল্লাহ’র ঘটনা আমরা দেখেছি।

সাভারের ঘটনায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরাই সাহসের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরিয়ে দিয়েছে। বিস্ময়ের কথা হলো, সেই শিক্ষকের স্ত্রীও নিরুপায় হয়ে স্বামীকে সহায়তা করতেন বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নেত্রকোনার ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসা ছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সংবাদ। ছাত্রীর মা ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছেন তাকে। ডাক্তার জানিয়েছেন, শিশুটি কেবল এইটুকু বলতে পেরেছে—পেট ভারী লাগছে, ভেতরে কী যেন নড়ে!’ 

  • একটা কথা মনে রাখতে হবে, নামে ‘মহিলা মাদ্রাসা’ হলেও মাদ্রাসাগুলো নারীদের দ্বারা পরিচালিত হয় না। কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের হাতেই।

  • মাদ্রাসায় পরিচালকই সর্বময়। তিনি নীতিনির্ধারক, তিনি অভিভাবক। যেকোনো ছাত্রী বা নারী শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের নিরঙ্কুশ অধিকার তাঁর থাকে।

  • যখন কোনো বদ্ধ পরিবেশে অপরাধীকে অতিমানবীয় বা পবিত্র কোনো সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন ভুক্তভোগী নিজেই নিজের ওপর হওয়া অন্যায়কে নিয়তি বলে মেনে নিতে শুরু করে।

২.

ব্যক্তিগতভাবে তিনটি মহিলা মাদ্রাসা দেখার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সেখানে ‘পর্দা’ মেনে চলার যে কড়াকড়ি, তাতে বাইরের কোনো পুরুষের অনৈতিক কাণ্ড ঘটানো প্রায় অসম্ভব।

শ্রেণিকক্ষে দরজার লাগোয়া একটুখানি পর্দাঘেরা জায়গায় বসে পুরুষ শিক্ষক পাঠদান করেন, ক্লাস শেষ হলে সেই দরজা গলিয়ে বেরিয়ে আসেন। পুরুষ সেখানে কার্যত একা।

কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই যে ‘দুর্ভেদ্য গোপনীয়তা’, এটিই আবার অপরাধের শ্রেষ্ঠ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, নামে ‘মহিলা মাদ্রাসা’ হলেও মাদ্রাসাগুলো নারীদের দ্বারা পরিচালিত হয় না। কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের হাতেই। কোথাও অন্দরমহলে যোগাযোগের সুবিধার্থে একজন ‘বড় আপা’ থাকেন বটে, তবে তিনি হন পরিচালকের স্ত্রী। পরিচালক হলেন ‘বড় হুজুর’। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে খোদ এই পরিচালক জড়িত।

মাদ্রাসায় পরিচালকই সর্বময়। তিনি নীতিনির্ধারক, তিনি অভিভাবক। যেকোনো ছাত্রী বা নারী শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের নিরঙ্কুশ অধিকার তাঁর থাকে। এই একক কর্তৃত্ব একজন মানুষকে দুর্বিনীত করে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট, যদি সেখানে নিয়মতান্ত্রিক নজরদারি করার মতো তৃতীয় কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকে।

দর্শনের একটি প্রাথমিক পাঠ হলো: ‘অত্যধিক গোপনীয়তা বা অস্বচ্ছতা অনেক সময় অপরাধের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।’ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো একেকটি টোটাল ইনস্টিটিউশন’ হিসেবে কাজ করে। সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যানের মতে, এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একটিমাত্র কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেখানে ক্ষমতার একপক্ষীয় ব্যবহার (পাওয়ার অ্যাবিউজ) হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ, তিনি জানেন, তার কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই।

উপরন্তু সুরক্ষার অজুহাতে ছাত্রীদের যেভাবে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়, তাতে তারা একধরনের পদ্ধতিগত দুর্বলতার (সিস্টেমিক ভালনারেবিলিটি) শিকার হয়। এই বিচ্ছিন্নতা তাদের আত্মরক্ষার ক্ষমতা এবং সচেতনতাকে কমিয়ে দেয়।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, এই সমস্যাটি কেবল যৌন নিপীড়ন নয়; বরং এটি একটি ‘স্ট্রাকচারাল সায়লেন্স’ বা কাঠামোগত নীরবতার ফসল। মাদ্রাসাগুলোয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে বিশাল ক্ষমতার দূরত্ব (পাওয়ার ডিসট্যান্স) বজায় রাখা হয়, সেখানে প্রশ্ন করা বা দ্বিমত পোষণ করাকে প্রায়ই ‘বেয়াদবি’ বা ধর্মীয় অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো বদ্ধ পরিবেশে অপরাধীকে অতিমানবীয় বা পবিত্র কোনো সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন ভুক্তভোগী নিজেই নিজের ওপর হওয়া অন্যায়কে নিয়তি বলে মেনে নিতে শুরু করে। ফলে নিপীড়ক নিরাপদ বোধ করেন এবং দিনের পর দিন এই শোষণের চক্র চলতেই থাকে। এই মনস্তাত্ত্বিক শিকল না ভাঙলে কেবল আইন দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়।

৩.

এখানে আরও একটি গভীর সংকট আছে। নারীদের ‘উচ্চশিক্ষা’ গ্রহণ নিয়ে বিশ্বজুড়েই ওলামা শ্রেণির অভ্যন্তরে বিতর্ক রয়েছে। সামাজিক পরিসরে একজন মুসলিম নারীর দায়িত্ব কতটা—এটাই বিতর্কের উৎস। এর ফলাফল হিসেবে আমরা দেখি, উপমহাদেশে ওলামা শ্রেণির ‘অভিভাবক’ ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কখনো নারীদের ক্যাম্পাস স্থাপন করেনি। দেওবন্দ প্রভাবিত আফগানিস্তানের ইসলামি ইমারত সরকারও নারীদের শিক্ষা সংকুচিত করে রেখেছে। এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের প্রভাবশালী আলেম তাকি উসমানি নারীশিক্ষা বিষয়ে আফগান সরকারের নীতি বদলানোর অনুরোধ জানিয়ে হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদাকে চিঠি পাঠিয়েছেন।

একইভাবে কওমি ধারায় মহিলা মাদ্রাসা বৈধ কি না, তা নিয়ে এ দেশের আলেমদের মধ্যে বিতর্ক চলমা। একশ্রেণির আলেম নারীদের জন্য পৃথক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা অবৈধ বলে ‘ফতোয়া’ দেন। তুলনামূলক সহনশীল একটি পক্ষ মনে করে, নারীদের পড়ানো যেতে পারে শুধু নারী শিক্ষকের মাধ্যমে, তবে তা কেবল ‘ফরজ’ এবং গার্হস্থ্যজ্ঞান, যাতে তারা নিজ নিজ ইবাদত ও সংসার সামলাতে পারে।

এই দুই চিন্তাকে ছাপিয়ে যে প্রগতিশীল আলেমরা নারীদের উচ্চশিক্ষার পক্ষে বলেন, এই সব নিপীড়নের ঘটনা তাঁদের কণ্ঠস্বর দুর্বল করে দেবে নিশ্চিত এবং শক্তিশালী করবে নারীশিক্ষার বিরোধী শিবিরকে। তারা বলার সুযোগ পাবে, ‘মেয়েদের পড়তে পাঠানোই ফিতনা।’

যদিও ইসলামের ইতিহাস হাজারো নারীর কীর্তিকাহিনিতে মুখর, যাঁরা হাদিসের শিক্ষক ছিলেন, আদালতে দাঁড়িয়ে আইনি অভিমত দিয়েছেন, আবার শিল্প, সাহিত্য, চিকিৎসা, দাতব্য সংস্থা পরিচালনা, এমনকি যুদ্ধে লড়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ শুধু আধুনিক সময়ের তিনটা ঘটনা বলি।

এক. কেমব্রিজ ইসলামিক কলেজের ডিন ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভি ইসলামের ইতিহাসে নারী হাদিসবিশারদদের নিয়ে ৪৩ খণ্ডের এক বিশাল চরিতাভিধান ‘আল-মুহাদ্দিসাত’ রচনা করেছেন। ১০ হাজার স্কলার নারীর জীবন ও কর্ম স্থান পাওয়া এই গ্রন্থ প্রমাণ করে যে নারীশিক্ষা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ড. নদভি জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁর কাছে যে নতুন উপাত্ত আছে, তা দিয়ে সমপরিমাণ আরও ৪৩ খণ্ড রচনা করা সম্ভব।

দুই. সিরিয়ার শাইখা মুনিরা কুবাইসির কথা বলা যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘কুবাইসি মুভমেন্ট’ দামেস্কেই ৮০টি মহিলা মাদ্রাসা পরিচালনা করছে, যেখানে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় ঘটাচ্ছে। ২০১৮ সালে তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম নারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জর্ডানের রয়েল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক সেন্টার।

কুবাইসি নারীরা সায়েন্স অব দ্য কোরআন (উলুমুল কোরআন), সিরাত, ফিকহ, হাদিস ও সায়েন্স অব দ্য হাদিস (উলুমুল হাদিস) প্রভৃতি বিষয়ে ব্যাপক পরিমাণে গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনার কাজ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর শিক্ষার ধারা সফল হওয়ার অন্যতম কারণ জানা যায়, তিনি নারীকে বর্তমান জীবনধারা ছেড়ে নির্জনে পৃথক জীবনধারা গ্রহণ করতে বলেন না; বরং সমাজের সঙ্গে সেবামূলক কাজে মিলেমিশে থাকতে বলেন।

তিন. ফিলিস্তিনের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি খুলুদ আল-ফাকিহ। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম নারী শরিয়াহ বিচারপতি হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েছেন। খুলুদ ফাকিহ মনে করেন, বিয়ে, তালাক বা যৌন হেনস্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে একজন পুরুষ বিচারকের সামনে বিবরণ দিতে নারীরা যে জড়তা বোধ করেন, একজন নারী বিচারপতির উপস্থিতিতে সেই বাধা দূর হয় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। তিনি প্রায় ২০ হাজার নারী-সংক্রান্ত মামলায় শরিয়াহ বেঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং নারী ভিকটিমদের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

৪.

কিন্তু এত কথা কে শুনবে? বরং অপরাধীর লালসার মাশুল দিতে হচ্ছে ধর্মভীরু নারীদের শিক্ষার ভবিষ্যৎকে। এটি একটি বিপজ্জনক চক্র।

প্রশ্ন হলো, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যেখানে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষা কার্যক্রম চলে, সেখানে কি নিপীড়ন হয় না? হয় এবং তা নিয়ে আওয়াজও তোলা হয়। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন, ভিসির বাসভবন অবরুদ্ধ হয়, কখনো কখনো পরিস্থিতি সংঘর্ষের দিকে যায়, রক্তক্ষয় হয়। তারপরও সব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী যে তাঁর বিচার পান এমন নয়।

কিন্তু মাদ্রাসায় নিপীড়ন হলে কী হয়? বেশির ভাগ গড়ায় সালিস পর্যন্ত। কয়েক দিন আগে গণমাধ্যমে এসেছে, কুমিল্লার এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে বলা হলেও ময়নাতদন্তে পাওয়া গেছে যৌন নিপীড়নের আলামত। সালিসের মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছে বলে আপসনামা দেখিয়েছেন মাদ্রাসার সুপার।

এটাই হয়। ইজ্জত যাবে, হুজুরদের গায়ে কালিমা লাগবে, ইসলামের অপমান হবে—এমন নানা কিছু ভেবে যতটা সম্ভব ধামাচাপা দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী পরিবার উল্টো ভয়ে থাকে, যদি কোনোমতে জানাজানি হয়, মেয়ের বিয়ে তো হবেই না, ধর্মভীরু পরিবারটি প্রতিবেশীদের সামনে কখনো মুখই দেখাতে পারবে না। মামলা করার কথা ভাবা মহাপাপ কেননা, তাতে মাদ্রাসার সম্মানহানি হবে, ইসলামের বদনাম হবে।

৫.

তাহলে এই সব অপরাধের বিচার কীভাবে হবে? মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে?

আলেম নেতারা দাঁড়াবেন না, তাঁদের গায়ে কাদা লাগবে। সরকার দাঁড়াবে না, তাতে মাদ্রাসাবিরোধী তকমা আসবে। এনজিও এগিয়ে আসতে পারবে না, যেহেতু তাদের প্রতি ধর্মীয় সমাজের আস্থা নেই। মিডিয়া কি ঝুঁকি নেবে? আজকাল মিডিয়াও শত্রু পক্ষ-মিত্র পক্ষে ভাগ হয়ে আছে। তা ছাড়া মিডিয়ার সামনে কি মাদ্রাসার পর্দানশিন ছাত্রী বা শিক্ষিকারা কথা বলতে আসবেন, আসতে পারেন?

এ যেন নবী ইউনুস (আ.)–এর সেই অন্ধকারের ওপর অন্ধকার। অন্ধকার রাতে সমুদ্রের অন্ধকার তলে মাছের পেটের অন্ধকারে আটকা পড়েছিলেন তিনি। বের হওয়ার কোনো উপায় ছিল না, আল্লাহ ছাড়া তাঁর বলারও কেউ ছিল না। মহিলা মাদ্রাসার নিগৃহীত ছাত্রীরাও যেন চারদিকে ঘিরে থাকা অনিঃশেষ অন্ধকারে গেঁথে আছে, আর আল্লাহর নাম জপছে।

মহান আল্লাহ নিশ্চয় তাদের ডাক শুনবেন। তবে পৃথবীতে আল্লাহর ‘খলিফা’ যাঁরা, তাঁদের দায়মুক্ত হওয়ার উপায় নেই। যতই ‘স্বকীয়তা’র কথা বলা হোক, নাগরিক অধিকার রক্ষায় সরকার চোখ বন্ধ রাখতে পারে না। মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে বোর্ডের তদারকি বাড়াতে হবে। 

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) সহকারী মহাপরিচালক মাওলানা ইসমাইল হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তাঁদের ৩০ জন পরিদর্শক আছেন, যাঁরা নিয়মিত মাদ্রাসা পরিদর্শন করে থাকেন। অথচ বেফাকের অধীন মাদ্রাসা প্রায় ৩০ হাজার। বছরে একবার একজন পরিদর্শক কোনো একটি মাদ্রাসায় পাঠানোর মতো লোকবল তাঁদের নেই। তাঁরা পারেন প্রতিটি মহিলা মাদ্রাসায় কমিটির সদস্য ও নারী শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘গভর্নিং বডি’ করে দিতে, যারা সরাসরি কেন্দ্রীয় মাদ্রাসা বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করবে।

শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এ ধরনের ঘটনায় নীরবতা ভাঙার সংস্কৃতি তাদেরই গড়ে তুলতে হবে। এরশাদুল্লাহর ঘটনায় আমরা দেখেছি, ছাত্রীরাই সাহসের সঙ্গে তাঁকে ধরিয়ে দিয়েছে। তবে সর্বোপরি এগিয়ে আসতে হবে আলেম সমাজকে, না হলে একদল ‘ধর্মীয় লেবাসধারী নিপীড়কে’র উত্থান ঘটবে, তাতে আখেরে তাঁদের মুখের লাজ ধোপে টিকবে না। মনে রাখতে হবে, সুরক্ষার নামে যে গোপনীয়তা অপরাধকে আড়াল করে, সেই গোপনীয়তা ধর্মের নয়; বরং পাপের সহায়ক।

মনযূরুল হক জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, ধর্ম বিভাগ, প্রথম আলো

ই–মেইল: [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source