ডাক্তাররা হার মানলেও মায়ের লড়াইয়ে দ্বিতীয় জীবন
· Prothom Alo

আমার মায়ের চোখের অশ্রু কখনো লড়াইয়ের হাতিয়ার, কখনো আশীর্বাদ, আবার কখনো মৃত্যুকে জয় করার অব্যর্থ প্রার্থনা হিসেবে দেখেছি বারবার। মায়ের জীবনটা এক অসম লড়াইয়ের গল্প। দিনভর অফিসের ব্যস্ততা আর ফাইলপত্রের স্তূপ সামলে যখন তিনি বাড়ি ফিরতেন, তাঁর ক্লান্ত চোখে ঘুমের বদলে সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন খেলা করত।
আমার জীবনের প্রতিটি প্রথমের পেছনে ছিল তাঁর অবিনশ্বর শক্তি। অ, আ, ক, খ শেখা থেকে শুরু করে প্রথমবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাওয়া—সবকিছুর নেপথ্য কারিগর তিনি। মনে পড়ে, প্রথমবার যখন স্টেজে গান শেষ করলাম, করতালির শব্দে যখন চারপাশ মুখরিত; ভিড়ের মধ্যে আমার চোখ খুঁজে নিয়েছিল মাকে। দেখেছিলাম মায়ের চোখের কোণে চিকচিক করছিল এক স্বচ্ছ লোনাজল। সে জল কষ্টের নয়; ছিল এক গর্বিত নারীর সার্থকতার অশ্রু।
Visit casino-promo.biz for more information.
কিন্তু জীবন সব সময় সুরের তালে চলে না। হঠাৎ এক কালবৈশাখী ঝড়ে সুর-তাল সব ফিকে হয়ে গেল। হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর উৎকট ওষুধের গন্ধের মধ্যে আমি যখন নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছি, ডাক্তাররা যখন অসহায় মুখে আমাকে মৃতপ্রায় বলে ঘোষণা করে দিলেন, তখনই শুরু হলো মায়ের আসল সংগ্রাম। মেডিক্যাল সায়েন্স যেখানে হার মেনেছিল, সেখানে যেন জেগে উঠেছিল মায়ের সেই অস্তিত্বের অশ্রু। তিনি কাঁদছিলেন না, যেন স্রষ্টার দরবারে আমার প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন। প্রতিটি অশ্রুবিন্দু দিয়ে তিনি যেন যমরাজের হাত থেকে আমার প্রাণ কেড়ে আনার চেষ্টা করছিলেন। ডাক্তারদের মতে যা ছিল অলৌকিক, আমার কাছে তা ছিল মায়ের চোখের জলের শক্তি। সেই কান্নায় কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক অদম্য জেদ আর ছিল সন্তানের দ্বিতীয় জীবন ছিনিয়ে আনার আকুতি। মায়ের সেই প্রার্থনা কবুল হয়েছিল।
ছবি: লেখকের সৌজন্যেআমি ফিরে এসেছি। আজ যখন নিজের পায়ের তলায় শক্ত মাটি খুঁজে পাই, পেছনে তাকালেই দেখতে পাই সেই সংগ্রামের প্রতিটি পথ মায়ের চোখের জলে ভেজা। আমার প্রতিটি নিশ্বাস যেন তাঁর সেই অশ্রুর ঋণ। মায়ের চোখের জল কেবল কষ্টের প্রতীক নয়; এটি সেই সঞ্জীবনী সুধা, যা আমায় নতুন জীবন দিয়েছে। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা তাঁর সেই লোনাজলে ধোয়া পবিত্র স্মৃতির কাছে আজীবন ঋণী হয়ে থাকবে।
আমি এখন অনায়াসে অসংখ্য ইভেন্ট সফল করতে পারছি, উপস্থাপনা করছি, গান করছি, নাটক করছি, লেখাপড়া করছি, কাজ করছি, যা আমার বেঁচে থাকার প্রমাণ। তবে সেই মৃত্যুপথযাত্রী ছেলেটারই কি এটা দ্বিতীয় জন্ম? যা তার জন্য ‘অস্তিত্বের অশ্রু বারে বারে’ মনে করিয়ে দেয়।
সাংস্কৃতিক সম্পাদক, বগুড়া বন্ধুসভা