স্বল্প জীবনেই যিনি আলো ছড়িয়ে গেছেন
· Prothom Alo

সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন মার্ক্সবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী ও প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী এক তরুণ কবি। তাঁর জন্ম কলকাতায় হলেও পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুরে (বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার উনশিয়া গ্রাম)। সুকান্তের পিতা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য ও মা সুনীতি দেবী।
সুকান্তের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি ছিলেন তাঁর জেঠতুতো বোন রানীদি। তৎকালীন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মণীন্দ্রলাল বসুর ‘সুকান্ত’ গল্পটি পড়ে রানীদি তাঁর নাম রাখেন সুকান্ত। তিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ। ছোট্ট সুকান্তকে গল্প-কবিতা শুনিয়ে তিনি সাহিত্যচর্চার প্রথম অনুপ্রেরণা দেন। হঠাৎ করেই রানীদি মারা যান। কিছুদিন পর তাঁর মা-ও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মাত্র ১২ বছর বয়সে একের পর এক শোক সুকান্তকে নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়।
Visit mwafrika.life for more information.
সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন তাঁর হাতের লেখা পত্রিকা ‘সপ্তমিকা’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন স্বয়ং সুকান্ত এবং তাঁর বন্ধু অরুণাচল বসু।
সুকান্ত সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে যোগ দেন। একই বছরে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’-এর প্রকাশনায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৪৪ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেন, কিন্তু উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। চারপাশের মানুষকে নিয়ে সুকান্ত তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতেন কবিতার মাধ্যমে। তাঁর লেখার ভাষা ছিল তীক্ষ্ণ ও প্রতিবাদী। তাঁর ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থ সেটিরই বহিঃপ্রকাশ। এই কাব্যের ‘মহাজীবন’ কবিতায় তিনি পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটির সঙ্গে তুলনা করেছেন—যা জনতার ক্ষুধার প্রতীক।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা সুকান্ত ভট্টাচার্যসুকান্তের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী ছিল কবিতা। পরে তা হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল ক্ষেত্র। তাঁর রচনায় প্রকাশ পেয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, যন্ত্রণা ও বিক্ষোভ। তাঁর কবিতায় শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি লিখেছেন—
‘হে সূর্য, তুমি তো জানো আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব’
এবং
‘ডাকঘরে রানার দুঃখের পিঠে টাকার বোঝা, তবু এই টাকা যাবে না ছোঁয়া।’
একজন ভালো পাঠক হিসেবেও সুকান্ত পরিচিত ছিলেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে সমান আদরে এই বই সকলের ঘরে রাখা উচিত।’
কলকাতা শহর ছিল তাঁর আবেগমিশ্রিত ভালোবাসার শহর। তিনি কলকাতাকে কখনো রহস্যময়ী নারী, কখনো প্রেয়সী, আবার কখনো হারানো মায়ের মতো কল্পনা করতেন। তাঁর সাহিত্যজগৎ ছিল কলকাতার অলিগলিতে ভরা।
ছোটবেলা থেকেই সুকান্ত নিয়মকানুন পছন্দ করতেন না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি যেন অনিয়মকে নিয়ম করে নিয়েছিলেন। একদিকে পার্টির কাজ, অন্যদিকে সাহিত্যচর্চা ও দারিদ্র্য—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন হয়ে ওঠে সংগ্রামমুখর। এ সময়েই তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন।
সুকান্ত সব সময় মানবতার পক্ষে কথা বলেছেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু নিজের জন্য কখনো কারও কাছে সাহায্য চাননি। রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ব্যস্ততার কারণে ব্যক্তিগত জীবন গড়ে তোলার সুযোগ পাননি। মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে।
‘দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে লিখি কথা
আমি যে বেকার পেয়েছি লেখার স্বাধীনতা’—এই পঙ্ক্তিটি যেন তাঁর জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি।
স্বল্প জীবনেও যে আলো ছড়ানো যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য তারই অনবদ্য উদাহরণ।
পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক, গোবিপ্রবি বন্ধুসভা