মানবদেহের মূল্য কত

· Prothom Alo

জীবনে কত কিছুরই তো দাম মেটানো হয়। কিন্তু কখনো কি ভেবেছ, তোমার নিজের শরীরের দাম ঠিক কত? আবেগ বা দর্শনের দিক থেকে বিচার করলে হয়তো মানুষের জীবনের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; জীবন অমূল্য। কিন্তু বিজ্ঞানের চোখে আমরা তো শুধু কিছু রাসায়নিক পদার্থ ও মৌলের চমৎকার এক মিশ্রণ! তুমি যদি একজন সাধারণ মানুষকে শুধু রসায়নের পরীক্ষাগারে নিয়ে যান এবং তাকে ভেঙে টুকরা টুকরা করে তার ভেতরের মৌলগুলোকে আলাদা করো, তাহলে বাজারে সেই জিনিসগুলোর দাম কত হবে?

ধরো, তোমার ওজন ৭০ কেজি। এই ৭০ কেজি শরীরের ভেতরে ঠিক কী কী আছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন ৭০ কেজি ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রায় ৪৬ কেজিই হলো অক্সিজেন! এর পাশাপাশি আছে ১৩ কেজি কার্বন, ৭ কেজি হাইড্রোজেন, ২ কেজি নাইট্রোজেন ও ১ কেজি ক্যালসিয়াম। এ ছাড়া বাকি ১ কেজির মধ্যে ফসফরাস, সালফার, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্লোরিন, ম্যাগনেশিয়াম এবং সামান্য পরিমাণে আরও কিছু খনিজ পদার্থ মিলেমিশে আছে।

Visit raccoongame.org for more information.

বিখ্যাত লেখক বিল ব্রাইসন তাঁর দ্য বডি: আ গাইড ফর অকুপ্যান্টস বইয়ে এই মৌলগুলোর একটি আর্থিক হিসাব কষার চেষ্টা করেছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, তুমি যদি ল্যাবরেটরি থেকে এই প্রতিটি মৌল একেবারে ১০০ ভাগ রাসায়নিকভাবে খাঁটি অবস্থায় কিনতে চাও, তবে তোমার খরচ হবে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড, যা টাকায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখের কাছাকাছি!

মানুষ কি গাছপালার ছত্রাক থেকে সংক্রমিত হতে পারে

তবে এত টাকা শুনে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। আপনি যদি একটু বুদ্ধি খাটাও এবং বাজার থেকে খাঁটি রাসায়নিক না কিনে সস্তা বিকল্প খোঁজো, তবে শরীরের দাম একদম হাতের মুঠোয় চলে আসবে। যেমন ধরো, তোমার শরীরের সেই ৪৬ কেজি অক্সিজেন ও ৭ কেজি হাইড্রোজেনের জন্য তুমি খুব সহজেই প্রায় ৫২ লিটার পানি ব্যবহার করতে পারো। আর পানি তো প্রায় বিনা মূল্যেই পাওয়া যায়! একটি সাধারণ ইলেকট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পানিকে ভেঙে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন গ্যাস অনায়াসেই আলাদা করা সম্ভব।

এরপর আসা যাক কার্বনের কথায়। শরীরের ১৩ কেজি কার্বনের জন্য তুমি বাজার থেকে ভালো মানের কাঠকয়লা কিনতে পারো, যার প্রায় ৭০ শতাংশই হলো কার্বন। এর জন্য আপনার খরচ হবে বড়জোর ৭৫ ডলার। আর নাইট্রোজেন ও সালফারের জন্য আপনাকে সুপারশপ থেকে প্রায় ১০ কেজি অ্যামোনিয়াম সালফেট সার কিনতে হবে, যার দাম পড়বে মাত্র ৩১ ডলার! বাকি অন্যান্য খনিজ পদার্থগুলোর পরিমাণ শরীরে এতই কম যে সেগুলো কিনতে হয়তো আরও দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হবে। সব মিলিয়ে একটু সস্তায় খুঁজলে একটি আস্ত মানবদেহের কাঁচামাল জোগাড় করতে আপনার খরচ হবে মাত্র ১৬ হাজার টাকার মতো!

কিন্তু এখানে একটা বড় সমস্যা আছে। মানুষ তো আসলে শুধু কিছু আলাদা আলাদা রাসায়নিক মৌলের স্তূপ নয়! আমাদের শরীর তৈরি হয়েছে অত্যন্ত জটিল সব জৈব অণুতে, যেমন প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটে। আপনি যদি বাজার থেকে সস্তায় কাঁচামাল কিনে ল্যাবরেটরিতে বসে সেগুলোকে জুড়ে দিয়ে প্রোটিন বানাতে চাও, তবে সেই প্রক্রিয়ার খরচ কাঁচামালের দামের চেয়ে লাখ গুণ বেশি হবে!

পাখি কেন ঘুমের মধ্যে ডাল থেকে পড়ে যায় না

এবার রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের পাতা থেকে বেরিয়ে একটু পদার্থবিজ্ঞানের দিকে তাকানো যাক। আমরা জানি, ভর ও শক্তি একে অপরের পরিপূরক। অর্থাৎ আপনি চাইলে শক্তিকে পদার্থে রূপান্তর করতে পারেন। তাত্ত্বিকভাবে, লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের মতো কোনো বিশাল কণা ত্বরক যন্ত্র ব্যবহার করে বিশুদ্ধ শক্তি থেকে পরমাণু তৈরি করা সম্ভব।

কিন্তু মুশকিল হলো, শুধু শক্তি ব্যবহার করে শূন্য থেকে ৭০ কেজি ওজনের একটি শরীর তৈরি করতে আপনার প্রায় ১০১৭ জুল শক্তির প্রয়োজন হবে! এর পরিমাণ কত জানেন? এটি হলো প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের সমান। পুরো পৃথিবীর সব মানুষ মিলে এক বছরে যত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, এটি তার চেয়েও প্রায় ৭০ গুণ বেশি!

তাহলে দেখা যাচ্ছে, কাঁচামালের দিক থেকে মানবদেহের দাম হয়তো মাত্র ১৬ হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু সেই কাঁচামালকে শক্তি দিয়ে জোড়া লাগিয়ে একটি শরীর তৈরি করতে গেলে, আক্ষরিক অর্থেই তা অমূল্য হয়ে দাঁড়ায়!

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাসখাবার হজম হতে কতক্ষণ সময় লাগে

Read full story at source