যে পদ্ধতিতে পবিত্র কোরআন সংকলন ও সংরক্ষণ করা হয়

· Prothom Alo

ইসলামের ইতিহাসে কোরআন সংকলন এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা এই পবিত্র গ্রন্থের বিশুদ্ধতা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে এই মহান কাজ সম্পন্ন হয়।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

এই সংকলনের পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট এবং এটি সম্পাদনে অবলম্বন করা হয়েছিল সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

যেভাবে সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়

ইয়মামার যুদ্ধে শহীদদের মধ্যে কোরআনের অনেক হাফেজও ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হজরত ওমরে সঙ্গে পরামর্শ করে আবু বকর (রা.) কোরআন সংকলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলে চামড়ার টুকরা, হাড়, খেজুরের ডাল এবং মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোরআনের অংশগুলো একত্র করার উদ্যোগ নেওয়া হয় (আহমাদ সায়িদ, হুরুবুর রিদ্দাহ ওয়া বিনাউদ দাওলাতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৪৫, মাকতাবাতুল ফুরকান, কায়রো, ২০০৩)

জায়েদ (রা.) বলেন, ‘ইয়মামার যুদ্ধের পর আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর কাছে গেলে দেখতে পাই, সেখানে ওমরও উপস্থিত।

আবু বকর (রা.) এই মহান দায়িত্ব জায়েদ ইবনে সাবিতিরে ওপর অর্পণ করেন। জায়েদ (রা.) বলেন, ‘ইয়মামার যুদ্ধের পর আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর কাছে গেলে দেখতে পাই, সেখানে ওমরও উপস্থিত।

আবু বকর (রা.) আমাকে লক্ষ্য করে বলেন, “ওমর আমার কাছে এসে বলছেন, ইয়মামার যুদ্ধে কোরআনের অনেক হাফেজ শহীদ হয়েছেন। অন্যান্য জায়গায়ও কোরআনের হাফেজগণ শহীদ হতে পারেন। তাঁদের শাহাদাতের ফলে একসময় কোরআন বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আমার মত হলো, আপনি কোরআন সংকলনের নির্দেশ জারি করুন।”

আমি ওমরকে বলি, “নবীজি যা করেননি, তা আমি কীভাবে করি?” ওমর (রা.) বলেন, “আল্লাহর কসম, অবশ্যই এটি একটি কল্যাণকর কাজ।” তিনি এ নিয়ে অব্যাহত পীড়াপীড়ি করতে থাকেন।

একপর্যায়ে আল্লাহ–তাআলা এ ব্যাপারে আমার বক্ষ উন্মোচিত করে দেন। এখন ওমরের মতোই আমার মত হচ্ছে কোরআন সংকলন করা দরকার।”’ (মাজদি ফাতহি আস-সায়্যিদ, সিরাত ও হায়াতে সিদ্দিক (রা.), পৃষ্ঠা: ১২০, দারুস সাহাবা লিত-তুরাস, তানতা, ২০১৫)

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি

সাহাবি জায়েদ কেন নির্বাচন

আবু বকর (রা.) এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য আনসারি সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতকে মনোনীত করেন। জায়েদ ছিলেন নবীজির অন্যতম ওহি লেখক।

দায়িত্ব অর্পণের সময় আবু বকর তাঁকে বলেন, ‘তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার ওপর আমরা কোনো প্রকার অপবাদ পাইনি। তুমি তো আল্লাহর রাসুলের ওহি লেখকদের একজন। অতএব, তুমি কোরআনের বিভিন্ন অংশ খুঁজে খুঁজে তা সংকলন করতে থাকো।’

জায়েদ (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমাকে যদি পাহাড় সরানোর নির্দেশ দেওয়া হতো, তাহলে সেটা আমার কাছে কোরআন সংকলন অপেক্ষা সহজ হতো।’

তরুণ সাহাবি জায়েদের বয়স তখন ছিল মাত্র ২১ বছর। এই বয়সেই তাঁর ছিল বিপুল যোগ্যতা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, যা এই কাজের জন্য অপরিহার্য ছিল। তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত ও সবার নিকট গ্রহণযোগ্য।

এ ছাড়া তিনি ছিলেন নবীজির অন্যতম ওহি লেখক, ফলে এ বিষয়ে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। পাশাপাশি তিনি ছিলেন সেই চার আনসারি সাহাবির অন্যতম, যাঁরা রাসুল (সা.)-এর যুগে পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছিলেন।

এভাবে কাজ করতে করতে সুরা তাওবার শেষ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছে যাই। কিন্তু সুরা তাওবার শেষ আয়াতটির কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না। অবশেষে আবু খুজায়মা আনসারির কাছে আয়াতটির সন্ধান পাই।

জায়েদ যেভাবে কাজটি করেন

জায়েদ (রা.) বলেন, আমি কোরআনকে খেজুরের ডাল, পাথরের টুকরা, মানুষের বক্ষ, চামড়া এবং হাড় থেকে সংগ্রহ করে সংকলন করতে থাকি। এভাবে কাজ করতে করতে সুরা তাওবার শেষ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছে যাই।

কিন্তু সুরা তাওবার শেষ আয়াতটির কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না। অবশেষে আবু খুজায়মা আনসারির কাছে আয়াতটির সন্ধান পাই।

সেটি হচ্ছে, “অবশ্যই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতেই একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের যে দুঃখ-কষ্ট হয়ে থাকে তা তাঁর জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি করুণাশীল ও অতি দয়ালু। এরপরও তারা যদি বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।”’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৮-১২৯)

সাম্য ও মানবিক মর্যাদায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

কোরআন সংকলনের জন্য যে পন্থা তিনি অবলম্বন করেছিলেন তা হলো, কোনো লেখাকে ততক্ষণ পর্যন্ত কোরআন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতেন না, যতক্ষণ না তা রাসুল (সা.) কর্তৃক লিখিয়ে নেওয়া হিসেবে প্রমাণিত হতো এবং কোনো সাহাবি তা মুখস্থ করে নিয়েছেন বলে সাক্ষ্য দিতেন।

শুধু মুখস্থের ওপর ভরসা করা হতো না। একইভাবে কোনো লেখা তখন পর্যন্ত গ্রহণ করতেন না, যতক্ষণ না এর পেছনে এই মর্মে সাক্ষ্য বিদ্যমান থাকত যে এটি রাসুলের সামনে লিপিবদ্ধ করানো হয়েছে এবং তা ওই কিরাতের অনুরূপ, যে কিরাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে (হামদুল আজমি, আত-তাফাওউকু ওয়ান নাজাবাতু আলা নাহজিস সাহাবা, পৃষ্ঠা: ৭৪, মাকতাবাতুল ইবিকান, রিয়াদ, ২০০২)

সংকলিত মাসহাফ সংরক্ষণ

জায়েদ (রা.) কর্তৃক সংকলিত এই মাসহাফটি (পাণ্ডুলিপি) প্রথমে আবু বকরের কাছে সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর এটি ওমরের হাতে আসে এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তা তাঁর মেয়ে নবীজির স্ত্রী হজরত হাফসারর নিকট গচ্ছিত রাখা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৮৬)

এই সংকলনের মাধ্যমে কোরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা দূরীভূত হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এটি একটি সংরক্ষিত আসমানি গ্রন্থ হিসেবে বিদ্যমান থাকে।

খলিফা আবু বকরের নির্দেশে এই সংকলন ছিল উম্মতের জন্য এক বিশাল কল্যাণকর কাজ। এটি নিশ্চিত করে যে কোরআন তার ধারাবাহিকতা ও বিন্যাস অনুযায়ী সংরক্ষিত থাকবে।

কোরআনের এই বিন্যাস ছিল স্বয়ং জিবরিল (আ.) কর্তৃক বলে দেওয়া—যখনই কোনো আয়াত অবতীর্ণ হতো, জিবরিল নবীজি (সা.)-কে বলে দিতেন যে, ‘এই আয়াত অমুক সুরার অমুক আয়াতের পর লিখিয়ে নেবেন।’ (ইমাম বাগাবি, শরহুস সুন্নাহ, ৪/৫২২, আল-মাকতাবুল ইসলামি, দামেস্ক, ১৯৮৩)

আলী (রা.) এই মহান কাজের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ–তাআলা আবু বকরের ওপর রহম করুন, তিনিই সর্বপ্রথম কোরআনকে দুই মলাটের মধ্যে লিপিবদ্ধ করান’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, ৭/১৯৬, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ২০০৪)

এই সংকলনের মাধ্যমে কোরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা দূরীভূত হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এটি একটি সংরক্ষিত আসমানি গ্রন্থ হিসেবে বিদ্যমান থাকে।

  • ইলিয়াস মশহুদ : লেখক ও গবেষক

সভ্যতা রক্ষা ও বিপর্যয় রোধে কোরআনের অনন্য দর্শন

Read full story at source