শেষ মুহূর্তে কেন নিজেদের গৌরবময় ইতিহাসের চিহ্ন আঁকা জার্সি বদলাতে বাধ্য হলো দেশটি
· Prothom Alo

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে আর কয়েক ঘন্টা বাকি। এর মধ্যেই জানা যাচ্ছে, হাইতির ২০২৬ বিশ্বকাপের জার্সিতে থাকা কিছু নকশাকে ‘রাজনৈতিক’ হিসেবে বিবেচনা করে ফিফা তা বাতিল করায় দলটিকে শেষ মুহূর্তে নতুন জার্সি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এই দেশটির ২০২৬ বিশ্বকাপের জার্সিতে থাকা কিছু নকশাকে ‘রাজনৈতিক’ হিসেবে বিবেচনা করে ফিফা তা বাতিল করায় দলটিকে শেষ মুহূর্তে নতুন জার্সি ব্যবহার করতে হচ্ছে তাদের ফুটবল টিমকে। কনকাকাফ অঞ্চলের প্রতিনিধি হাইতির সঙ্গেই ঘটেছে এমন ঘটনা। আগামী শনিবার স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ খেলবে তারা।
Visit grenadier.co.za for more information.
ফিফার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় জার্সি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সায়েটা (Saeta) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ফিফার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে এবং বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার সময় ফিফার চাওয়া পরিবর্তনগুলোও সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে।
শেষ মুহূর্তে নতুন জার্সি ব্যবহার করতে হচ্ছে হাইতি ফুটবল টিমকেবিবৃতিতে সায়েটা বলেছে,
“হাইতিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি জার্সি তৈরি করা, যা হাইতির জনগণের গর্ব, দৃঢ়তা ও চেতনাকে তুলে ধরে।
নকশাটি হাইতির ভবিষ্যৎ গঠনে প্রতিদিন অবদান রাখা নারী-পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতেই তৈরি করা হয়েছিলকয়েক মাস ধরে বিভিন্ন নকশা তৈরি ও পরিমার্জন করে ফিফার স্বাভাবিক অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জমা দেওয়া হয়েছিল। আমাদের চূড়ান্ত নকশাটি হাইতির ভবিষ্যৎ গঠনে প্রতিদিন অবদান রাখা নারী-পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতেই তৈরি করা হয়েছিল, রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।”
তবে পর্যালোচনার সময় ফিফা মনে করে যে জার্সির কিছু দৃশ্যমান উপাদান তাদের সরঞ্জামবিষয়ক বিধিমালার আলোকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। ফলে সংস্থাটি নকশায় পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। সায়েটা জানায়, তারা ফিফার ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত না হলেও নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু কী ছিল?
হাইতির নতুন জার্সিগুলো নীল (হোম), সাদা (অ্যাওয়ে) এবং লাল (তৃতীয়) রঙে তৈরি করা হয়েছিল। জার্সির মাঝখানে ছিল জাতীয় দলের প্রতীক, আর কলার ও হাতায় ছিল লাল রঙের ছোঁয়া।
বিতর্কের সূত্রপাত জার্সির ডান দিকের নিচের অংশে থাকা একটি চিত্র নিয়ে। সেখানে ভেরতিয়ের যুদ্ধ (Battle of Vertières) এবং হাইতিয়ান বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত কিছু ছায়াচিত্র বা সিলুয়েট ব্যবহার করা হয়েছিল।
১৮০৩ সালে হাইতির বিপ্লবী নেতা জ্যাঁ-জাক দেসালিন (Jean-Jacques Dessalines) ফরাসি পতাকার সাদা অংশ ছিঁড়ে নতুন পতাকা তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বের প্রথম স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্র হাইতির জাতীয় পতাকার ভিত্তি হয়ে ওঠে। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে হাইতিতে প্রতি বছর ১৮ মে “হাইতিয়ান ফ্ল্যাগ ডে” পালন করা হয়।
ফিফা মনে করেছে, এই বিপ্লব-সংশ্লিষ্ট প্রতীকগুলো রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বার্তা বহন করতে পারে, যা তাদের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বকাপের আগে প্রকাশিত তিনটি জার্সিতেই এই নকশা ছিল এবং সেগুলো সায়েটার ওয়েবসাইটে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো সংশোধিত জার্সির নতুন সংস্করণ বাজারে আনার কোনো ঘোষণা দেয়নি।
ফিফা মনে করেছে, এই বিপ্লব-সংশ্লিষ্ট প্রতীকগুলো রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারেহাইতি গত সপ্তাহে নিউজিল্যান্ড ও পেরুর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে নিষিদ্ধ ঘোষিত জার্সিগুলো পরেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ফিফার অফিসিয়াল বিশ্বকাপ ফটোসেশনে দেখা যায়, খেলোয়াড়রা এমন জার্সি পরেছেন যেখানে বিতর্কিত প্রতীকগুলো আর নেই।
উল্লেখ্য, হাইতিই ছিল মার্কিন মুলুকে আফ্রিকান ক্রীতদাসদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম দেশ, যা স্থায়ীভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে। ১৭৯১ থেকে ১৮০৪ সাল পর্যন্ত চলমান সফল হাইতিয়ান বিপ্লবের ফল তা। এই বিপ্লব ইতিহাসের একমাত্র সফল দাস বিদ্রোহ হিসেবে পরিচিত। এর পর দেশটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই হাইতি আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে, মানবমুক্তির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
জার্সি বদল করতে বাধ্য করাকে খুব ভালোভাবে নিচ্ছেন না ফুটবলপ্রেমীরাআর সেই ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ও হাইতির গণমানুষের গৌরবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীকের ব্যপারে শেষ মুহূর্তে আপত্তি জানিয়ে হাইতিকে জার্সি বদল করতে বাধ্য করাকে খুব ভালোভাবে নিচ্ছেন না ফুটবলপ্রেমীরা। সব মিলিয়ে, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহনকারী প্রতীককে কেন্দ্র করে ফিফার এই সিদ্ধান্ত নতুন করে খেলাধুলায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির সীমা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, মিড ডে, বিবিসি
ছবি: ইন্সটাগ্রাম