বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির শরীর কি দামি ম্যাগনেটে পরিণত হয়

· Prothom Alo

সলিম আলির হয়েছে ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’। একমাত্র ছেলে রাজীব আলি মারা গেছে বজ্রপাতে। বাপের কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী জিনিস আর কী আছে! সেই ভারের দুঃখ ভুলতেও কয়েক বছর সময় দরকার। কান্নাকাটি করেছেন তিনি, রাজীবের মায়ের কান্না আরও মর্মস্পর্শী। একমাত্র সন্তানের অকালমৃত্যু কোন মা-ই বা মানতে পারেন? বাপের অবস্থাও তার চেয়ে ভালো নয়। ছেলের ঝলসানো লাশ দাফন করেছেন বটে, কিন্তু রাত কাটাতে হচ্ছে কবরস্থানে। হচ্ছে, তার কারণও আছে। সলিম আলি লোকমুখে শুনেছেন, আজকাল নাকি লাশ চুরি হচ্ছে কবর থেকে। তবে সব লাশ নয়, বজ্রপাতে নিহত লোকদের লাশ কে বা কারা চুরি করছে। শোকাতুর সলিম আলিকে তাই রাত জেগে ছেলের লাশ পাহারা দিতে হচ্ছে।

Visit moryak.biz for more information.

এক-দুরাত করে সলিম আলি প্রায় ১৫ রাত ছেলের কবর পাহারা দেন। তারপর আর শরীরে কুলোয় না। পাহারা বন্ধ করে দেন। তাঁর ধারণা ছিল, এত দিন পর নিশ্চয়ই চোরেরা ভুলে গেছে তাঁর ছেলের কথা।

১৭তম দিনে আক্কাস ব্যাপারী সলিমকে দুঃসংবাদটা দেন। রাজীব আলির লাশ নাকি নেই! হন্তদন্ত হয়ে সলিম আলি ছুটে যান কবরস্থানে। আক্কাস ব্যাপারীর কথাই ঠিক। মস্ত চারকোনা কবরটা খাঁ খাঁ করছে। লাশের চিহ্নটুকুও নেই। এক ছেলেকে দুবার হারানোর শোক বড্ড ভয়ানক!

বজ্রপাত নিয়ে ১০ অদ্ভুত তথ্য, যা জানা জরুরি
এক-দুরাত করে সলিম আলি প্রায় ১৫ রাত ছেলের কবর পাহারা দেন। তারপর আর শরীরে কুলোয় না। পাহারা বন্ধ করে দেন। তাঁর ধারণা ছিল, এত দিন পর নিশ্চয়ই চোরেরা ভুলে গেছে তাঁর ছেলের কথা।

কাশেম মিস্ত্রির কপাল এত দিনে খুলেছে। পেশায় টিনের মিস্ত্রি। টিন দিয়ে ঘর ছাওয়া হলেই কেবল তাঁর ডাক পড়ে। আজকাল টিনের বাড়ি নেই বললেই চলে। তাই কাজ কমে গেছে কাশেম মিস্ত্রির।

কাশেমের সীমান্তে বাড়ি, তাই চোরাচালানের শ্রমিক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু বর্ডারে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পর বাড়তি উপায়ের পথটা বন্ধ হয়ে যায়। চোরাচালান বন্ধ হয়নি, তবে আগের মতো সাধারণ জিনিসপত্র আর আসে না ওপার থেকে। এখন আসে কেবল মাদক ও গরু। কিন্তু বড্ড রিস্ক! বিএসএফ এখন গুলি করে মানুষ মারে! আর এর শিকার হন শ্রমিকেরাই। আসল চোরাচালানিরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই তিনি ওই পেশা ছেড়ে দেন।

কাশেমের হাতে সম্প্রতি একটি সুযোগ এসেছে। তাঁর বন্ধু আমির মিয়া পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি নাকি দেশি মালামাল রপ্তানি করে মস্ত ধনী হয়েছেন। কী রপ্তানি করেন তিনি?

আমির মিয়া ফিসফিস করে বলে, ‘কথাটা পাঁচকান কোরো না। তোমার ভালোর জন্যই বলছি। যত বেশি লোক শুনবে, তত বাড়বে প্রতিদ্বন্দ্বী। তার চেয়ে তুমি একলাই করো ব্যবসাটা। আমার দু-একজন লোক তোমার সঙ্গে দেব। বাইরের লোক জানাজানি হওয়ার ভয় নেই। সারা জীবনে যদি একটাও জোগাড় করতে পারো, বাকি জীবন আর কিছু করা লাগবে না।’

‘কিন্তু কাজটা কী?’ চিন্তিত কণ্ঠে বলেন কাশেম মিস্ত্রি। ষড়যন্ত্রীর মতো ফিসফিস করে বলে আমির মিয়া, ‘ম্যাগনেট, দামি ম্যাগনেট! একেকটার কোটি কোটি টাকা দাম। একটা জোগাড় করে দিলেই পঞ্চাশ লাখ পাবে তুমি।’

৭ বার বজ্রাহত হয়েও বেঁচে গেছেন তিনি!
আমির মিয়া ফিসফিস করে বলে, ‘কথাটা পাঁচকান কোরো না। তোমার ভালোর জন্যই বলছি। যত বেশি লোক শুনবে, তত বাড়বে প্রতিদ্বন্দ্বী। তার চেয়ে তুমি একলাই করো ব্যবসাটা।'

‘পঞ্চাশ লাখ!’ অবাক হন কাশেম মিস্ত্রি। ‘এ তো অনেক টাকা! কিন্তু ম্যাগনেট কোথায় পাব?’ ‘সীমানা পিলারের নিচে থাকে। আর থাকে বাজ পড়ে মারা যাওয়া মানুষের দেহে!’ কাশেম মিয়া শুনেছেন বটে, সীমানা পিলারে ম্যাগনেট থাকে। তাঁদের গ্রামেও কয়েকটা সীমানা পিলার ছিল, সেগুলো রাতারাতি চুরি হয়ে গেছে। তাই সীমানা পিলারের আশা বাদ। আপাতত বজ্রপাতে নিহত লাশের সন্ধান করতে হবে। ইদানীং বজ্রপাতে মানুষ মরছে খুব বেশি। মনে মনে হিসাব কষেন। তারপর তাঁর ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা হাসি চলে আসে। আমির মিয়ার চোখ এড়ায় না। কপট তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, ‘কী মিয়া, রাজি? অবশ্য তুমি যদি না করতে চাও, অন্য লোক রেডি আছে। নেহাত তুমি আমার বন্ধু। আর বন্ধুর জন্য এটুকু উপকার আমি করতেই পারি। শোনো, এতে কিন্তু আমারও লাভ আছে। তুমি ভেবো না, বিনা স্বার্থে আমি কাজটা করছি। তুমি পঞ্চাশ লাখ পেলে আমি পাব ১৫ লাখ। আর তোমাকে যারা সাহায্য করবে, ওরা প্রত্যেকে ২ লাখ করে।’

কাশেম মিয়া দেখেন, আমির বিনা স্বার্থে করছে না। সেও মোটা টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। তা নিক, বরং এতে ভালোই হলো। বিনা স্বার্থে এত বড় উপকার করতে আসে কেবল বাটপাড়েরাই। তাঁর এই বন্ধুটি অবশ্য তেমন নয়। সে নিজের লাভের জন্যই বন্ধুকে জড়াচ্ছে।

বৃহস্পতি গ্রহের বজ্রপাত পৃথিবীর চেয়ে ১০০ গুণ শক্তিশালী
আপাতত বজ্রপাতে নিহত লাশের সন্ধান করতে হবে। ইদানীং বজ্রপাতে মানুষ মরছে খুব বেশি। মনে মনে হিসাব কষেন। তারপর কাশেম মিয়ার ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা হাসি চলে আসে।

২৫ মে কাশেম মিস্ত্রি আর আমির মিয়া খবর পান, অনন্তপুর গ্রামের সলিম আলির ছেলে বজ্রপাতে মারা গেছে। চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কাশেম মিস্ত্রির। আমির মিয়া ও তাঁর দুজন চ্যালাকে নিয়ে কাশেম মিস্ত্রি অনন্তপুর গ্রামে যান। পাশাপাশি গ্রাম। সবাই সবাইকে চেনে। তাই তাঁদের জানাজায় দেখে মোটেও অবাক হয়নি অনন্তপুরবাসী। লাশ মাটি দেওয়ার ছল করে কাশেম আর আমিরের দল আসলে কবরস্থানটাই রেকি করে আসে। কিন্তু রাতে লাশ চুরি করতে গিয়ে দেখে, সলিম আলি আলো হাতে কবর পাহারা দিচ্ছেন।

এত বড় একটি সুযোগ হাতের মুঠোয় এসে ফসকে যাচ্ছে, এ কথা ভেবে মুষড়ে পড়েন কাশেম মিস্ত্রি। কিন্তু সাহস দেয় বন্ধু আমির মিয়া। বলে, ‘হতাশ হওয়ার কিছু নেই বন্ধু। ম্যাগনেট থাকে লাশের হাড়ে। হাড় পচে না। বুড়ো কত দিন ছেলের লাশ পাহারা দেবে! আমরা ওর ওপর নজর রাখব, যেদিন পাহারা বন্ধ হবে, সেই রাতেই লাশ গায়েব করে দেব।’

হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন কাশেম মিস্ত্রি। সলিম আলি পাহারা তুলে নেওয়ার পরদিনই লাশ গায়েব হয়ে যায়।

বিনা মেঘে বজ্রপাত
লাশ মাটি দেওয়ার ছল করে কাশেম আর আমিরের দল আসলে কবরস্থানটাই রেকি করে আসে। কিন্তু রাতে লাশ চুরি করতে গিয়ে দেখে, সলিম আলি আলো হাতে কবর পাহারা দিচ্ছেন।

সলিম আলির ছেলের মতো এমন ঘটনা বাংলাদেশে প্রায়ই ঘটে। মিডিয়াতেও হইচই পড়ে যায়। আসলেই কি বাজ পড়লে এমন ঘটনা ঘটে? সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা কাহিনির বিখ্যাত গল্প হলো রয়েল বেঙ্গল রহস্য। এই গল্পে একজন চরিত্র আছেন, যাঁর নাম তড়িৎবাবু। সেই তড়িৎবাবু তলোয়ার নিয়ে গুপ্তধন খুঁজতে গিয়ে নিহত হন। এটাই ছিল গল্পের অন্যতম রহস্য। কেউ মনে করেন, তড়িৎবাবুকে খুন করা হয়েছে। কেউ মনে করেন বাঘে খেয়েছে। ফেলুদাও প্রথমে বুঝতে পারেননি তড়িৎবাবুর মৃত্যু কেন হলো। পরে তিনি হিসাব মিলিয়ে ফেলেন। গল্পের সেই লাইনটা এমন—‘‘ফেলুদা বলল, ‘কোনও মানুষের হাতে লোহা বা ইস্পাতের কোনও জিনিস থাকা অবস্থায় যদি তার ওপর বাজ পড়ে, তা হলে সে জিনিস চুম্বকে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, সে জিনিস অনেক সময় বিদ্যুৎকে আকর্ষণ করে। তড়িৎবাবুর মৃত্যু হয়েছিল বজ্রাঘাতে এবং হয়তো এই তলোয়ারই তার মৃত্যুর জন্য দায়ী। মাটি খুঁড়ে কলসি বার করার পর বৃষ্টি নামে, তার সঙ্গে বাজ ও বিদ্যুৎ। তড়িৎবাবু অশ্বত্থগাছের নিচে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসেন। বাজ পড়ে। তড়িৎবাবু ছিটকে পড়ার সময় তার হাতের তলোয়ার বুকে বিঁধে যায়। সম্ভবত মৃত্যুর পরমুহূর্তেই তলোয়ার তার দেহে প্রবেশ করে।’’’

ফেলুদার এ কাহিনির এই বৈজ্ঞানিক অংশটুকু সত্য। তবে পুরোটা নয়। মানুষের হাতে থাকলেই যে লোহা বা ইস্পাতের কোনো তলোয়ার চুম্বকে পরিণত হবে, ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। বরং যেখানেই থাকুক, লোহা বা ইস্পাতের মতো বিদ্যুৎপরিবাহী ধাতব পদার্থ চুম্বকে পরিণত হতে পারে।

বজ্রপাত: বাঁচতে হলে জানতে হবে
বজ্রপাতের সময়ও বিদ্যুৎ মাটিতে চলে যায়। সরাসরি মেঘ থেকে মাটিতে বিদ্যুৎ নেমে আসে। কিন্তু আসার পথে যদি কোনো বিদ্যুৎপরিবাহী বস্তু থাকে, বিদ্যুৎ সেটার ভেতর দিয়েই মাটিতে নেমে আসে।

ফেলুদা আরেকটা কথাও বলেছেন, ইস্পাত বা চুম্বক বা লোহা অনেক সময় বিদ্যুৎকে আকর্ষণও করতে পারে। এই কথাটা কিছুটা ভুল। লোহা বা ইস্পাত বিদ্যুৎ সুপরিবাহী। মেঘের ভেতর জন্ম নেওয়া বিদ্যুৎ মাটিতে এসে প্রশমিত হয়। কারণ, মাটি বিদ্যুৎনিরপেক্ষ, তাই যেকোনো বৈদ্যুতিক চার্জকে প্রশমিত করে দিতে পারে। এ জন্য বাসাবাড়ি কিংবা কলকারখানার বিদ্যুতেও আর্থ কানেকশন থাকে। অর্থাৎ বিদ্যুতের যে দুটি লাইন আমরা ব্যবহার করি, তার একটা মাটির সঙ্গে যুক্ত থাকে। আরেকটা থাকে ফেজ তার, যেটা প্রবাহিত বিদ্যুৎ বহন করে। কিন্তু সেই বিদ্যুৎ কোন দিকে প্রবাহিত হবে?

সোজা উত্তর হলো, ফেজ তারে সরাসরি আর্থ কানেক্টেড তার যুক্ত করলে বৈদ্যুতিক চার্জ মাটিতে চলে যাবে। তবে সরাসরি এভাবে দুটো তার জুড়ে কোনো লাভ নেই। এটি আমাদের কোনো কাজে আসে না। শুধুই বিদ্যুৎ অপচয়। একেই বলে শর্টসার্কিট। এতে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

তাই দুই তারের মাঝখানে বৈদ্যুতিক ডিভাইস যুক্ত করা হয়। যেমন টিভি, ফ্রিজ, ফ্যান, লাইট, কলকারখানার যন্ত্রপাতি—সবকিছুতে দুটি তার সংযুক্ত করা হয়। ফেজ তার থেকে বিদ্যুৎ প্রথমে ডিভাইসের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তারপর সেটা ডিভাইসকে সচল করে চলে যায় আর্থ কানেক্টেড তারের ভেতর দিয়ে, মাটিতে। এই আর্থ কানেকশন ছাড়া সরাসরি বিদ্যুতে চলে, এমন কোনো ডিভাইস চালানো সম্ভব নয়।

বজ্রপাতের সময়ও বিদ্যুৎ এভাবে মাটিতে চলে যায়। কিন্তু ঠিক কোথা দিয়ে যাবে? সরাসরি মেঘ থেকে মাটিতে বিদ্যুৎ নেমে আসে। কিন্তু আসার পথে যদি কোনো বিদ্যুৎপরিবাহী বস্তু থাকে, বিদ্যুৎ সেটার ভেতর দিয়েই মাটিতে নেমে আসে। গাছপালা, লোহালক্কড়, এমনকি মানুষ ও পশুপাখিও বিদ্যুৎপরিবাহী। তাই আকাশের বজ্র এসবের ভেতর দিয়ে মাটিতে নেমে আসতে পারে।

বজ্রপাত কীভাবে হয়
ফেজ তারে সরাসরি আর্থ কানেক্টেড তার যুক্ত করলে বৈদ্যুতিক চার্জ মাটিতে চলে যাবে। তবে সরাসরি এভাবে দুটো তার জুড়ে কোনো লাভ নেই। শুধুই বিদ্যুৎ অপচয়। এটাকেই বলে শর্টসার্কিট।

বিদ্যুতের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, চলার পথে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নেয়। গাছপালা, মানুষ বিদ্যুৎপরিবাহী। তাই সরাসরি পড়ার চেয়ে বাজের বিদ্যুতের জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সবচেয়ে উঁচু কোনো পরিবাহীর মাধ্যমে মাটিতে নেমে আসা। কারণ, পরিবাহীর কারণে মাটিতে আসার পথ সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তাই যেখানে অনেক গাছপালা আছে, সেখানে বাজ পড়লে সবচেয়ে উঁচু গাছটাতেই পড়বে। সেই গাছের নিচে মানুষ থাকলে বিদ্যুতায়িত হয়ে মানুষও মারা যাবে।

আর যদি আশপাশে কোনো গাছ না থাকে, মানুষই যদি হয় কোনো স্থানের সবচেয়ে উঁচু বিদ্যুৎপরিবাহী বস্তু, তাহলে বাজ মানুষের মাথায় পড়বে। কোনো লোহা বা ইস্পাতের খুঁটি সেখানে থাকলে বাজ তার ওপর পড়বে। লোহা বা ইস্পাত দিয়ে তৈরি বস্তু চুম্বক অর্থাৎ ম্যাগনেটে পরিণত হবে। সুতরাং বাজ পড়লে বস্তু ম্যাগনেটে পরিণত হতে পারে—এ কথা আংশিক সত্যি। বস্তুটি কেবল ফেরোচুম্বক পদার্থ হলেই সেটি ম্যাগনেটে রূপান্তরিত হবে।

লোহা, নিকেল, কোবাল্ট হলো ফেরোচুম্বক পদার্থ। ইস্পাত মৌলিক পদার্থ নয়। এতে কিছুটা কার্বন ভেজাল থাকে। কিন্তু প্রচুর পরিমাণে লোহা থাকে বলে ইস্পাতও ফেরোচুম্বক। ফেরোচুম্বকের ভেতরে ছোট ছোট চৌম্বক এলাকা থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই ডোমেনগুলো ছড়ানো থাকে এলোমেলোভাবে। উচ্চপ্রবাহ মাত্রার বিদ্যুৎ লোহা বা ইস্পাতের ভেতরে থাকা এলোমেলো চুম্বক ডোমেনগুলোর মুখ একদিকে সাজিয়ে দেয়। ফলে ওই বস্তুতে দুটি চুম্বক মেরু তৈরি হয় এবং বস্তুটি চুম্বকে পরিণত হয়।

বজ্রপাত ও বজ্রঝড় কি বায়ুদূষণ কমায়?
লোহা, নিকেল, কোবাল্ট হলো ফেরোচুম্বক পদার্থ। ইস্পাত মৌলিক পদার্থ নয়। এতে কিছুটা কার্বন ভেজাল থাকে। কিন্তু প্রচুর পরিমাণে লোহা থাকে বলে ইস্পাতও ফেরোচুম্বক।

মানুষের দেহ ফেরোচুম্বক পদার্থ নয়। সুতরাং এগুলো চুম্বক বা কথিত ম্যাগনেটে পরিণত হওয়া অসম্ভব। মার্কিন ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট ডক্টর মেরি অ্যান কুপার বজ্রপাতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা এবং এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। এ জন্য গোটা বিশ্বেই তাঁর সুনাম রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বজ্রপাতের অতি শক্তিশালী বিদ্যুৎ মানুষের স্নায়ুতন্ত্র এবং হৃৎপিণ্ডকে বিকল করে দেয়। এমনকি শরীরের কোষগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু মানবদেহকে চুম্বকে পরিণত করা অসম্ভব।’

এটি সত্যি মানুষের শরীরে লোহা বা আয়রন থাকে। কিন্তু তার পরিমাণ অতিসামান্য। তা দিয়ে শক্তিশালী ম্যাগনেট তৈরি হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তাই যদি হয়, তাহলে এত চড়া দামে এগুলো বিক্রি হয় কেন? মোটেও এগুলোর দাম চড়া নয়। এমনকি লোহা বা ইস্পাতের তৈরি কোনো বস্তু বাজ পড়ে ম্যাগনেটে পরিণত হলেও তার দাম এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। আসলে এই গুজবটির পেছনে রয়েছে কিছু প্রতারক চক্র। তারা কৌশল করে ব্যাপারটা এমনভাবে সাজায়, যেন মানুষ ধোঁকায় পড়ে।

সেই কৌশলটা কেমন? সেটা জানতে হলে, রাজীব আলির লাশের শেষ গন্তব্য কোথায় হলো, সেটি জানতে হবে।

উড়োজাহাজের ওপর বজ্রপাত হলে কী ঘটে?
ভদ্রলোক বলেন, ‘কাশেম সাহেব, আপনার মাল আমি সময়মতো পেয়েছি। ধন্যবাদ। জব্বর একখান জিনিস দিয়েছেন, ভাই। শিগগির মালটা বিক্রি হবে। আপনি টাকা পেয়ে যাবেন।'

কাশেম মিস্ত্রি ঝুঁকি নিয়ে রাজীব আলির লাশ চুরি করেন। অবশ্য সঙ্গে আমির মিয়ার দুই স্যাঙাত ছিল। তারা লাশ নিয়ে চলে যায়। কাশেম মিয়া ফোন করে বলেন, ‘পরশু তোমার সঙ্গে কথা হবে। স্যার নিজে তোমাকে ফোন দেবেন।’ স্যার মানে নারায়ণগঞ্জের সেই ব্যবসায়ী।

দুদিন পরে তিনি ফোন করেন কাশেম মিস্ত্রিকে। কাশেম এতেই অর্ধেক গলে যান। নারায়ণগঞ্জের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তাঁকে ফোন করেছেন, এ তো সৌভাগ্যের ব্যাপার!

ভদ্রলোক বলেন, ‘কাশেম সাহেব, আপনার মাল আমি সময়মতো পেয়েছি। ধন্যবাদ। জব্বর একখান জিনিস দিয়েছেন, ভাই। শিগগির মালটা বিক্রি হবে। আপনি টাকা পেয়ে যাবেন। একবার যদি মালটা ঠিকঠাকমতো বিদেশে পাচার করতে পারি, বায়াররা খুশি হবেন। আশা করি পরেরবার দাম আরও বেশি পাব। আপনি মঙ্গলবার টাকা পেয়ে যাবেন।’

সোমবার আমির মিয়া এসে হাজির। তাঁকে দেখে খুশি হন কাশেম মিস্ত্রি। বলেন, ‘কাল টাকা পাব তো?’ ‘পাবে মানে! হান্ড্রেড পারসেন্ট শিওর। তবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করা লাগবে। তোমার কি অ্যাকাউন্ট আছে?’ নেই, কখনো যে অ্যাকাউন্ট দরকার হবে, এ ভাবনা তো কখনো আসেনি। আমির মিয়া তাঁকে আশ্বস্ত করে। বলেন, ‘কোনো টেনশন নেই, কালই শহরে গিয়ে অ্যাকাউন্ট করিয়ে দেব। একখান কথা কই কাশেম মিয়া, আমাকে তো বিশ্বাস করো?’

‘করি মানে, নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করি।’

‘আমাদের স্যার, পরশু দিন তিনি ফোন করেছিলেন। উনি এখন মালয়েশিয়ায়। দাঁড়াও তোমাকে স্যারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিই।’

সমুদ্রে বজ্রপাত বেশি তীব্র কেন
সোমবার আমির মিয়া এসে হাজির। তাঁকে দেখে খুশি হন কাশেম মিস্ত্রি। বলেন, ‘কাল টাকা পাব তো?’ ‘পাবে মানে! হান্ড্রেড পারসেন্ট শিওর। তবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করা লাগবে।'

হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল দেয় আমির মিয়া। ওপাশের লোকটা বলেন, ‘আরে কাশেম সাহেব, আপনাকে দেখে ভালোই লাগছে। আমি এখন মালয়েশিয়ায়।’ বলে তিনি সে দেশের সেই আইকনিক বিল্ডিং টুইন টাওয়ার দেখিয়ে বললেন, ‘দেখেছেন কী সুন্দর দেশ! ব্যবসাপাতি এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগির আপনাকেও এখানে বেড়াতে নিয়ে আসব।’

এ কথা শুনে কাশেম মিস্ত্রি মহাখুশি। তারপর কিছুক্ষণ কথা বলে ওপাশ থেকে বিদায় নেন সেই লোকটা। আমির মিয়া বলেন, ‘স্যার মাল বেচতে গিয়েছেন। তবে উনি একটু সমস্যায় পড়েছেন। মানে, ওই মাল মালয়েশিয়া থেকে এখন আমেরিকায় যাবে। স্যারের অ্যাকাউন্টে তো কোটি কোটি টাকা। কিন্তু সিস্টেমে কী একটা সমস্যা হয়েছে, তাই টাকা তুলতে পারছেন না। এক মাসের আগে অ্যাকাউন্ট ঠিক হবে না। কিন্তু স্যারের হাত এখন একদম খালি। মালয়েশিয়া পর্যন্ত গিয়েছেন, কিন্তু আমেরিকায় যেতে না পারলে ম্যাগনেট বিক্রি হবে না। অথচ আমেরিকান পার্টি বলছেন সাত দিনের মধ্যে মাল পৌঁছে দিতে হবে, নইলে তাঁরা আর নেবেন না।’ বলে আমির মিয়া থেমে যায়। কিছুক্ষণ পরে বলে, ‘এখন যে কী করি! আমার কাছেও অত টাকা নেই!’

মুখ কালো হয়ে যায় কাশেম মিস্ত্রির। তারপর কী একটা ভেবে নিয়ে বলেন, ‘কত টাকা আমির ভাই?’ ‘তা ধরো সাত লাখ টাকা! তুমি শুনে কী করবে? তোমার কি অত টাকা আছে? দেখি আমি কিছু করতে পারি কি না।’ বলে আবার থেমে যায় আমির মিয়া, ‘তাহলে এখন আমি যাই, কাল দেখা হবে। অ্যাকাউন্টের জন্য ছবি আর ভোটার আইডি রেডি করো।’

বজ্রপাত কেন হয়, বাঁচার উপায় কী
‘আমার ভিটেজমির দলিল বন্ধক রাখব।’ মিনমিনে কণ্ঠে বলেন কাশেম মিস্ত্রি। মিজান বলে, ‘ঠিক আছে, তবে পাকা দলিল করতে হবে। কিন্তু তুমি এত টাকা কী করবা?’ হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন কাশেম মিস্ত্রি।

পরদিন সব গুছিয়ে রেডি কাশেম মিস্ত্রি। কিন্তু আমির মিয়ার খবর নেই। বাধ্য হয়ে কাশেম তাকে ফোন দেন। ফোন ধরে আমির মিয়া বলে, ‘অ্যাকাউন্ট করে আর কী হবে, বলো! আমি তো টাকা জোগাড় করতে পারলাম না। দেখি চেষ্টা করে। হাতে মাত্র চার দিন সময়।’

কাশেম মিস্ত্রি কষ্ট পান। কিন্তু বন্ধুকে অবিশ্বাসের কথা মাথায়ও আসে না তাঁর। তারপর বাড়িময় পায়চারি করেন। দুটি গরু আছে ঘরে, বেচলে লাখ দেড়েক টাকা আসবে। আর এই ভিটেজমি, এটা হাতছাড়া করা যাবে না। সুদখোর মিজানুর বিশ্বাসের কাছে যান তিনি। তাঁর কাছে গিয়ে বলেন সব কথা। মিজান বলে, ‘তুমি নেবে সাত লাখ? এত টাকা চোখে দেখেছ? শোধ দেবে কী করে?’

‘আমার ভিটেজমির দলিল বন্ধক রাখব।’ মিনমিনে কণ্ঠে বলেন কাশেম মিস্ত্রি। মিজান বলে, ‘ঠিক আছে, তবে পাকা দলিল করতে হবে। কিন্তু তুমি এত টাকা কী করবা?’ হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন কাশেম মিস্ত্রি। বলেন, ‘বিদেশ যাব, কথাবার্তা পাকা।’ তারপর তিনি মিজান বিশ্বাসের হাত চেপে ধরে বলেন, ‘কিন্তু এ কথা কাউকে বলবেন না, মিজান ভাই।’

মিজান বিশ্বাস অবাক হয়। কিন্তু তার অত কথায় কাজ কী, সে টাকা দেবে, সুদ নেবে! কথা গোপন রাখলে তার ক্ষতি নেই। টাকা যদি দিতে না পারে, তখন ভিটেজমির দখল নেবে!

বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ আগে চমকায়, শব্দ পরে আসে কেন
ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন কাশেম মিস্ত্রি। তত দিনে তিনি বুঝতে পেরেছেন, লাশে ম্যাগনেট বলে হয়তো কিছুই নেই। আসলে একটা নাটক সাজিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আমির আর তার স্যার।

সাত লাখ টাকা নিয়ে জমির দলিল ও বন্ধকের পাকা দলিল করে ফেলেন কাশেম মিস্ত্রি। তারপর আমির মিয়াকে ফোন করে বলেন, ‘মিয়া, কী খবর, টাকা জোগাড় হয়েছে?’ ‘কত চেষ্টা করলাম, পারলাম কই!’ আমির মিয়া হতাশ কণ্ঠে বলে। কাশেম মিস্ত্রি বলেন, ‘চিন্তা কোরো না। রাতে আমার বাড়ি এসো, টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে।’ আমির মিয়া এই টোপটাই দিয়েছিল, কাশেম মিস্ত্রি ঠিকঠাকমতো সেটা গিলেছেন। রাতে এসে টাকা নিয়ে যায়। পরদিন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করার জন্য রেডি থাকতে বলে।

কিন্তু সকালে আর আমির মিয়ার সন্ধান পান না কাশেম মিস্ত্রি। আসলে আমির মিয়া গ্রামে থাকে না, ঢাকায় থাকে। মাঝে মাঝে গ্রামে আসে। গ্রামে সে বোনের বাড়িতে থাকে। মাঝে মাঝে আসে, কয়েক দিন থেকে আবার চলে যায়।

আকাশ ভেঙে পড়ে কাশেমের মাথায়। বুঝতে পারেন কত বড় প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন তিনি। কিন্তু সে কথা কাউকে বলতেও পারেন না। কারণ, তাতে রাজীবের লাশ চুরির ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবে। টাকা যা যাওয়ার তা তো গেছেই, লাশ চুরির অপরাধে কত বছর জেল খাটতে হবে, কে জানে!

ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন কাশেম মিস্ত্রি। তত দিনে তিনি বুঝতে পেরেছেন, লাশে ম্যাগনেট বলে হয়তো কিছুই নেই। আসলে একটা নাটক সাজিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আমির আর তার স্যার।

আসলেই তা-ই। গোটা বাংলাদেশে প্রচুর প্রতারক চক্র ঘুরে বেড়ায়। এরা একেক সময় একেক ধরনের নাটক করে। কখনো সীমানা পিলারের নিচে ম্যাগনেট খুঁজে পায়, কখনো বিদেশ নিয়ে যাওয়ার টোপ দিয়ে মানুষকে সর্বস্বান্ত করে। এরাই আবার দরিদ্র মানুষের দুর্বলতা ও কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে রাজীব আলিদের মতো বজ্রপাতে নিহত মানুষের লাশ নিয়ে নাটক করে।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানবর্ষণ কীভাবে হয়

Read full story at source