রামমন্দিরের কেলেঙ্কারি: বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কি সংকটের মুখে
· Prothom Alo
চার দশক ধরে রাম জন্মভূমি মুভমেন্ট অথবা অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের কর্মসূচি ছিল বিজেপি, আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) জোটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাস।
একটি উগ্র রাজনৈতিক প্রচারণার পাশাপাশি চতুরতার সঙ্গে এটিকে একটি ‘সভ্যতা বিনির্মাণ মিশন’ হিসেবে জাহির করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এটি হিন্দুত্ববাদী পরিচয় পুনরুদ্ধার এবং মধ্যযুগীয় মুসলিম আক্রমণের ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধনের একটি ‘গণ-আন্দোলন’।
Visit turconews.click for more information.
বাস্তবে এটি পরিণত হয়েছিল স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় ধর্মীয়-রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ারে। কয়েক দশক ধরে সুপরিকল্পিতভাবে ‘হিন্দুদের ক্ষোভ’ উসকে দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়কে অস্ত্র বানিয়ে রূপ দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ে।
ধর্মনিরপেক্ষতাকে দেখানো হয়েছে প্রধান শত্রু হিসেবে। মুসলিমদের বারবার খলনায়ক বা ‘অপর’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আর এই সবকিছুর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—হিন্দু ভোট ব্যাংক এক করা এবং বিজেপিকে দিল্লির ক্ষমতায় বসানো।
একজন তরুণ সাংবাদিক হিসেবে আশির দশকের শেষভাগ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের সেই হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের রিপোর্টিং করার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে।
উত্তর ভারতজুড়ে তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল একের পর এক বজ্রকণ্ঠের স্লোগান: ‘রাম কি সৌগন্ধ খাতে হ্যায়, হাম মন্দির ওহি বানায়েনগে’ (রামের কসম খেয়ে বলছি, মন্দির আমরা ওখানেই বানাব), ‘জো হিন্দু হিত কি বাত কারেগা, ওহি দেশ মে রাজ কারেগা’ (যে হিন্দুর স্বার্থের কথা বলবে, সেই দেশ শাসন করবে)।
‘নীরবতা বিজেপি সরকারকে আরও সাহসী করে তুলছে’ভগবান রাম তখন আর কেবল আরাধনার দেবতা রইলেন না; তিনি হয়ে উঠলেন ‘ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং পশ্চিমি ভাবধারার এলিটদের বিরুদ্ধে এক আগ্রাসী হিন্দু জাগরণের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রতীক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির জীবনী লেখার সময় আমি এই রূপান্তরের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেছিলাম। ১৯৮০ সালে যখন বিজেপি গঠিত হয়, তখন বাজপেয়ি ঘোষণা করেছিলেন যে পার্টির মূল আদর্শ হবে ‘গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্র’। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র দুটি আসনে নেমে আসার পর বাজপেয়ি সরে দাঁড়ান এবং দলের হাল ধরেন লালকৃষ্ণ আদভানি।
দিল্লির রাস্তা যখন অযোধ্যা হয়ে যায়
দলের ভাগ্য বদলাতে মরিয়া আদভানি তখন অযোধ্যা ইস্যুটিকে বেছে নেন, যা এত দিন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) স্থানীয় পর্যায়ে উসকে দিচ্ছিল। এরপর যা ঘটল, তা ভারতের রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিল। ভারতীয় জনজীবনে আবির্ভাব ঘটল এক নতুন জিনিসের—‘রাম রথ’। ধর্মীয় প্রতীকে সাজানো হলেও যার ভেতরে ছিল পুরোদস্তুর রাজনৈতিক বার্তা।
মেলা, যাত্রা, ধর্মীয় সমাবেশ আর শোভাযাত্রার মাধ্যমে রাম জন্মভূমি মুভমেন্ট একটি দেশব্যাপী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। আর এই আন্দোলনের মূল প্রতীক হয়ে ওঠে ‘রথযাত্রা’। ১৯৮৯ সালে বিজেপির পালমপুর প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে রামমন্দির নির্মাণকে দলের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সেই মুহূর্ত থেকেই অযোধ্যার রাস্তা হয়ে ওঠে দিল্লির ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা।
রাম মন্দির উদ্বোধন। ২২ জানুয়ারি ২০২৪, অযোধ্যাবাজপেয়ির সংযত ‘গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্র’ থেকে সরে এসে আদভানির নেতৃত্বে উগ্র রাম জন্মভূমি আন্দোলনের দিকে বিজেপির এই বাঁক বদল দলটিকে প্রান্তিক পর্যায় থেকে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।
এই ইতিহাসটুকু জানা থাকলেই বোঝা যাবে, সম্প্রতি রামমন্দির ট্রাস্টকে ঘিরে ওঠা চুরি, আত্মসাৎ ও তহবিলের অপব্যবহারের অভিযোগগুলো কেন এত বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এই অভিযোগগুলো আসলে একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প। এগুলো বিজেপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সেই আদর্শিক ভিত্তির ওপরই আঘাত হেনেছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে তারা আজ ক্ষমতায়। কারণ, রামমন্দির ছিল আরএসএস-বিজেপির নৈতিক কম্পাস এবং নির্বাচনী চালিকাশক্তি।
তাই এই দুর্নীতির অভিযোগ রামমন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরো রাজনৈতিক প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি ধাক্কা নয়, বরং পুরো ইমারতটিকে ধসিয়ে দেওয়ার মতো এক আঘাত।
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি কোনোভাবেই এই বিতর্ক থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারে না। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে দলটি সচেতনভাবে রামমন্দিরকে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছে। ১৯৯০ সালের রথযাত্রায় আদভানির পাশে হেঁটেছিলেন বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। গুজরাট বিজেপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মোদি নিজে ছিলেন এই রথযাত্রার অন্যতম প্রধান সংগঠক, যার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই হয়েছেন।
কংগ্রেসের নতুন কৌশল, বিজেপি কি উত্তর প্রদেশ ধরে রাখতে পারবেপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ২০২০ সালে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। চার বছর পর ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক কয়েক মাস আগে তিনিই প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মন্দিরের ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ বা উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। যেকোনো সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সরকারের একজন নির্বাচিত প্রধানের কোনো উপাসনালয়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া এক নজিরবিহীন ঘটনা।
সেই অনুষ্ঠানটি কেবল ধর্মীয় আচার ছিল না, তা ছিল একটি রাজনৈতিক প্রদর্শনী। মোদির বিজেপি ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যকার দূরত্বের সব মুখোশ সেদিন ছুড়ে ফেলেছিল। রামমন্দির আর নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার—দুটি যেন মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল।
এই যোগসূত্র কেবল প্রতীকী ছিল না। রামমন্দির ট্রাস্টের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আরএসএস ও ভিএইচপির দীর্ঘদিনের কর্মকর্তা, হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের নেতারা এবং উত্তর প্রদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ আমলারা। এমনকি মোদির সাবেক প্রধান সচিব নৃপেন্দ্র মিশ্র নিজেই এই মন্দির নির্মাণকাজ তদারকি করেছেন।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক কয়েক মাস আগে নরেন্দ্র মোদি প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মন্দিরের ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ বা উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন।মন্দির নির্মাণকে মোদি যদি ‘সভ্যতার ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন, তবে বর্তমান দুর্নীতির অভিযোগগুলো বিজেপির জন্য একটি বড় নৈতিক ও অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। এত বছর ধরে বিজেপি দাবি করে আসছিল যে রামমন্দির আন্দোলন তাদের রাজনীতিকে সাধারণ নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। তারা নিজেদের ‘হিন্দু ধর্মের’ রক্ষক হিসেবে জাহির করত। কিন্তু সেই দাবি এখন এক বিরাট কালিমার নিচে ঢাকা পড়েছে।
২০১৯ সালের অযোধ্যা রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে ‘আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই ধ্বংসযজ্ঞই বিজেপিকে জাতীয় ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করেছিল।
আর এই ‘আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘনের’ জন্য মোদি সরকার সাধ্বী ঋদ্ধম্ভরাকে (হিন্দুত্ববাদী আধ্যাত্মিক নেত্রী এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নারী সংগঠন ‘দুর্গা বাহিনী’র প্রতিষ্ঠাতা) ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ পদক দিয়েছে, যিনি ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার দিন স্লোগান দিয়েছিলেন—‘এক ধাক্কা অউর দো, বাবরি মসজিদ তোড় দো’(আরও একটি ধাক্কা দাও, বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দাও)।
এক রহস্যময় নীরবতা
আজকে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। ২০২১ সালের জমি কেনা নিয়ে রামমন্দির ট্রাস্ট প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নির্মোহী আখড়া (বৈষ্ণব বৈরাগী সম্প্রদায়ের একটি প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় সন্ন্যাসী সংগঠন) বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তথা ভিএইচপির বিরুদ্ধে আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এনেছে। ডিজিটাল জালিয়াতির পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, মন্দিরের স্টাফ ও ট্রাস্টের কর্মকর্তারা সাধারণ ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
মূলধারার গণমাধ্যম হয়তো এই মন্দিরের দুর্নীতিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস বলে—বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারি সরকারের পতন ডেকে আনতে পারে। বোফর্স কেলেঙ্কারি রাজীব গান্ধীর সরকারকে ধ্বংস করেছিল, আর কমনওয়েলথ গেমস ও টু-জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি ইউপিএ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের কফিন তৈরি করেছিল। দুর্নীতি খুব দ্রুতই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
বিজেপি যখন রামমন্দিরকে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দাবি করেছিল, তখন তারা পুরো দেশকে সেই বিজয়ের অংশীদার বানিয়েছিল। তাই এখন তারা বলতে পারে না যে মন্দিরের অব্যবস্থাপনার দায় অন্য কারও। মোদি ও শাহের এই নীরবতাই আসলে অনেক বড় রাজনৈতিক বক্তব্য।
এই ঘটনায় বিজেপির প্রতিক্রিয়া বেশ অদ্ভুত। প্রধানমন্ত্রী মোদি এখনো এই রামমন্দির কেলেঙ্কারি নিয়ে পুরোপুরি নীরব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, যিনি সাধারণত বিরোধীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে লেলিয়ে দিতে এক মুহূর্ত সময় নেন না, তিনিও মুখে কুলুপ এঁটেছেন। আর উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ পুরোনো কায়দায় বিষয়টিকে ঘুরিয়ে দিতে ওয়াক্ফ বোর্ডের অনিয়ম নিয়ে বিরোধীদের মুখে ‘ফেভিকল’ লেগে থাকার খোঁটা দিচ্ছেন।
রামমন্দির ট্রাস্টের দুর্নীতির সঙ্গে ওয়াক্ফ বোর্ডের কী সম্পর্ক? দৃষ্টি ঘোরানোর এই চেষ্টা কাজে আসবে না। দেশের মানুষের সামনে প্রশ্নটা খুব সহজ: ভক্তদের দেওয়া টাকা চুরি হয়েছে কি না, আর হয়ে থাকলে এর জন্য দায়ী কে? বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা ও ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের ‘নৈতিকতার অজুহাতে’ পদত্যাগ কোনো সহজ পার পাওয়ার রাস্তা হতে পারে না। জবাবদিহি একদম শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে, যাঁদের রাজনীতি এই রামমন্দিরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।
তেলাপোকাকে কতটা পাত্তা দিচ্ছেন সাফল্য উদ্যাপনে বুঁদ মোদিএই তদন্ত প্রক্রিয়াও অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। উত্তর প্রদেশ সরকারের বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) কোনো স্বাধীন সংস্থা নয়, বরং সরকারের ঘরের লোকের মতোই কাজ করছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এসআইটি-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এবং ট্রাস্টের একজন সদস্যের অভিযোগের ভিত্তিতে। সাধারণ নিয়মে অপরাধের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আগে এফআইআর হয়, তারপর তদন্ত হয়। এখানে উল্টো কেন হলো?
এই ধরনের কোনো অভিযোগ যদি বিরোধী দল শাসিত কোনো রাজ্যে উঠত, তবে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এত দিনে মানি লন্ডারিং আইনে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু এখানে তদন্তের পুরো বিষয়টি রাজ্য সরকারের মেশিনারির মধ্যে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
মিশন নাকি কমিশন?
বিজেপি যখন রামমন্দিরকে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দাবি করেছিল, তখন তারা পুরো দেশকে সেই বিজয়ের অংশীদার বানিয়েছিল। তাই এখন তারা বলতে পারে না যে মন্দিরের অব্যবস্থাপনার দায় অন্য কারও। মোদি ও শাহের এই নীরবতাই আসলে অনেক বড় রাজনৈতিক বক্তব্য।
যদি আর্থিক দুর্নীতির এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে বুঝতে হবে শুধু টাকা চুরি যায়নি; বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আস্থার ওপর ডাকাতি করা হয়েছে।
চার দশক ধরে বিজেপি দাবি করেছে যে হিন্দুত্ব তাদের ‘আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য’। অথচ আজ প্রমাণিত হলো যে তাদের এই হিন্দুত্ব ভেতর থেকে ফাঁপা; এটি কেবলই উগ্রতা, ঘৃণা আর বিভাজনের এক রাজনৈতিক হাতিয়ার। এটি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতারণা বা ম্যাজিক ট্রিক।
রাম জন্মভূমি আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতি ও ধর্মকে উল্টে দেওয়া হয়েছে। ভাষা ছিল ধর্মের, কিন্তু পদ্ধতি ছিল কঠোরভাবে রাজনৈতিক। বিশ্বাসকে বানানো হয়েছে নির্বাচনী কৌশল আর মন্দিরকে বানানো হয়েছে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার।
সে জন্যই রামমন্দিরের এই দুর্নীতি এত বড় একটি ঘটনা। এটি বিজেপির আদর্শিক মূলে আঘাত করেছে। যে আন্দোলন ‘হিন্দু ধর্মের’ প্রতীক হওয়ার দাবি করত, আজ তারা নিজেদের প্রচারিত ভাবমূর্তির আড়ালে এক চরম নৈতিক সংকটের মুখোমুখি।
বিজেপির ক্ষমতার লোভে ধর্ম জুগিয়েছে প্রতীক আর রাজনীতি ঘরে তুলেছে ফায়দা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান জাঁকজমকভাবে পালন করা হলেও ধর্মের মূল বাণী কোথায় গেল? ভগবান রামের চরিত্র যে সত্য, সততা ও মমত্ববোধের প্রতীক—বিজেপি তাঁর নামে যে রাজনীতি করেছে, সেখানে সেই মূল্যবোধগুলো পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল।
বিজেপির কাছে এখন দেশের মানুষের একটাই অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার আছে: রামমন্দির আন্দোলন কি আসলেই কোনো পবিত্র ‘মিশন’ ছিল, নাকি এটি ছিল কেবলই ‘কমিশন’ খাওয়ার ধান্দা?
সাগরিকা ঘোষ অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত