আফগানিস্তানে শান্তি এল, স্বস্তি এল কি?
· Prothom Alo

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলে ঢোকার পর গোটা বিশ্ব আশঙ্কা করেছিল, আফগানিস্তান ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে। তবে খুব কম মানুষ ভেবেছিল, প্রায় পাঁচ বছর পরেও বড় ধরনের গৃহযুদ্ধ না থাকলেও আফগানিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবিক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়ে থাকবে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
২০২২ সালে জাতিসংঘ হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পরেই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ কাজ হারায়। হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি দ্রুত ধসে পড়ে। এর পাশাপাশি, যে অল্পসংখ্যক দক্ষ পেশাজীবী দেশে ছিলেন, তাঁরাও দেশ ছাড়তে শুরু করেন। একই সময়ে নারীদের ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দারিদ্র্য হয়ে ওঠে সমাজের প্রধান বাস্তবতা। শুরুতে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা আরও ভয়াবহ হয়েছে।
আজকের আফগানিস্তান এক অদ্ভুত বাস্তবতা তুলে ধরে। তালেবান চার দশকের লড়াই শেষ করে এখন প্রায় পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণে। আগের সরকারের শেষ দিকের তুলনায় সশস্ত্র সংঘর্ষ অনেক কমেছে। কিন্তু এই সামরিক সাফল্য অর্থনৈতিক উন্নতি বা মানুষের সমৃদ্ধি আনতে পারেনি।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, আফগান অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সরকারের আয় কিছু বেড়েছে, মূল্যবৃদ্ধি কমেছে এবং বড় ধাক্কার পর সামান্য অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ফিরেছে। কিন্তু এই ছবির আড়ালে রয়েছে কঠিন সত্য।
জনসংখ্যা বাড়ছে দ্রুত, কিন্তু অর্থনীতি সেই গতিতে বাড়ছে না। বিদেশি সাহায্য কমছে। বেকারত্ব খুব বেশি এবং ক্রমেই বাড়ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে তৈরি হয়েছে এমন এক অবস্থা, যেখানে স্থিতিশীলতা আছে, কিন্তু উন্নতি নেই।
আজকের আফগানিস্তানে তালেবান শাসন মানেই দারিদ্র্যের সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছে। সামরিক জয়ের পরও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাধান না হওয়াই এর কারণ।
মানবিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ আফগান মানুষ (অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুজনে একজন) মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। লাখ লাখ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছে। শিশু অপুষ্টির হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম। এই পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায় আছে। উন্নয়নমূলক সাহায্য হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া, তালেবান প্রশাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা, আফগান সম্পদ জব্দ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং–ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি দ্রুত ধসে পড়ে। এই পদক্ষেপগুলো তালেবানকে চাপ দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়েই এই সংকট ব্যাখ্যা করা যায় না।
তালেবানের অন্দরে যেভাবে ক্ষমতার কোন্দল ছড়িয়ে পড়ছেতালেবান সরকারের নিজের সিদ্ধান্তও পরিস্থিতিকে খারাপ করেছে। মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ রাখা এবং নারীদের কাজের সুযোগ সীমিত করে দেওয়ায় দেশের অর্ধেক মানবসম্পদ কার্যত নষ্ট হচ্ছে। কোনো দেশই তার শিক্ষিত জনশক্তির অর্ধেককে বাদ দিয়ে উন্নতি করতে পারে না। এ কারণে শুধু অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি, পরিবারের আয় কমেছে, স্বাস্থ্য পরিষেবা দুর্বল হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়েছে।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন এখনো সক্রিয়। এর মধ্যে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, ইসলামিক স্টেট খোরাসান, পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামিক আন্দোলন, ইসলামিক মুভমেন্ট অব উজবেকিস্তান, বালুচ লিবারেশন আর্মি এবং আরও কিছু সংগঠন। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলো আশ্বস্ত নয় যে আফগান ভূমি অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। এ সমস্যার সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন।
আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে তালেবান যোদ্ধারাঅথচ আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কম নয়। দেশে তামা, লিথিয়াম, বিরল খনিজ, লৌহ আকরিক এবং জ্বালানিসম্পদের বড় ভান্ডার রয়েছে। এগুলো বিদেশি বিনিয়োগ টানতে পারে। কিন্তু শুধু সম্পদ থাকলেই উন্নয়ন হয় না। দরকার স্থিতিশীল আইন, কার্যকর ব্যাংকিং–ব্যবস্থা, পরিবহনব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চুক্তিকাঠামো। রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান এই সবকিছুকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত শর্তসাপেক্ষে তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। মানবিক সাহায্য চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে উন্নয়নমূলক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তবে তা নির্ভর করবে মেয়েদের শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে দৃশ্যমান অগ্রগতির ওপর। স্বীকৃতি দেওয়া বা না দেওয়া—দুটিই যেন বাস্তব পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে।
আঞ্চলিক দেশগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তান, চীন, ইরান, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এবং উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না আফগানিস্তান চিরস্থায়ীভাবে দরিদ্র ও অস্থির থাকুক। বাণিজ্য বাড়ানো, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, জ্বালানি ও পরিবহন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং খনিজ সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার—এসবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। বিশেষ করে পাকিস্তান বাণিজ্য ও মানবিক সাহায্যে সহায়তা করতে পারে, তবে একই সঙ্গে আফগান মাটিতে জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংসের দাবিও জোরালোভাবে তুলতে পারে।
আজকের আফগানিস্তানে তালেবান শাসন মানেই দারিদ্র্যের সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছে। সামরিক জয়ের পরও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাধান না হওয়াই এর কারণ। যদি তালেবান এবং আন্তর্জাতিক সমাজ শুধু সংকট সামলানোতেই ব্যস্ত থাকে, আর রাষ্ট্র গঠন ও মানুষের জীবিকা উন্নয়নের দিকে না যায়, তবে আফগানিস্তান এমন এক অবস্থায় আটকে থাকবে—যেখানে স্থিতিশীলতা আছে, কিন্তু উন্নতি নেই; শান্তি আছে, কিন্তু অগ্রগতি নেই।
আসিফ দুররানি পাকিস্তানের সাবেক আফগানিস্তানবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি
ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত