মেসির বদলে রদ্রি কেন গোল্ডেন বল জিতলেন?
· Prothom Alo

১৯ জুলাই। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির স্টেডিয়াম। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে স্পেন তখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু ট্রফির চেয়েও বড় আলোচনা শুরু হলো পুরস্কার মঞ্চে। যখন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি মানে গোল্ডেন বল উঠল স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির হাতে। রদ্রি যখন পুরস্কার নিতে উঠলেন, গোটা স্টেডিয়াম তখন প্রতিবাদে চিৎকার করছে ‘মেসি! মেসি!’ বলে। শুধু আর্জেন্টাইন সমর্থকরাই নয়, নিরপেক্ষ দর্শকেরাও যোগ দিয়েছিল সেই চিৎকারে।
Visit tr-sport.bond for more information.
প্রশ্নটা তাই যে কারও মনে আসাই স্বাভাবিক, ৩৯ বছর বয়সে লিওনেল মেসির ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট করা পারফরম্যান্সকে টপকে একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার যে কিনা পুরো টুর্নামেন্টে একটিও গোল বা অ্যাসিস্ট করেননি, কীভাবে সেরা হন?
সত্যি বলতে, মেসির দিকে পাল্লাটা খুবই ভারী ছিল। আর্জেন্টিনার ১৯ গোলের মধ্যে ১২টিতেই সরাসরি অবদান মেসির। ৩৯ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে প্রায় একা হাতে দলকে টেনে নিয়ে গেছেন টানা দ্বিতীয় ফাইনালে। জিতলে হতেন ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড়, যাঁর হাতে তিনটি গোল্ডেন বল রয়েছে। যদিও এমনিতেই তিনি একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি পেয়েছেন দুটি গোল্ডেন বল। তবু মেসির রূপকথার মতো সমাপ্তির সব উপাদানই তৈরি ছিল।
আর্জেন্টিনা কেন গোলে কোনো শট নিতে পারল নাআসলে গোল্ডেন বল পুরস্কার কে পাবেন, তা নির্বাচন করেন ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ। মূলত সাবেক খেলোয়াড়, কোচ আর বিশ্লেষকদের একটা প্যানেল এটা। তাদের পক্ষে কী কী যুক্তি সাজানো যায়, এবার সেটা বলি।
প্রথমত, রদ্রি ছিলেন চ্যাম্পিয়ন স্পেন দলের হৃৎপিণ্ড। পুরো টুর্নামেন্ট স্পেন যে অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হলো, তার প্রতিটি ম্যাচেই অধিনায়কের বাহুবন্ধনী হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। অঙ্কের বিচারে তাঁর নামের পাশে গোল-অ্যাসিস্ট শূন্য, কিন্তু স্পেনের যে দমবন্ধ করা পজেশন আর নিয়ন্ত্রণের ফুটবল সেখানে মেট্রোনোম তিনি। মানে তিনিই সুতা ধরে রাখা আর্কিটেক্ট। বিশ্লেষকদের ভাষায়, রদ্রি ছাড়া স্পেনের ভারসাম্যই থাকে না।
দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছে ফাইনাল। স্পেনের মাঝমাঠ সেদিন মেসির রসদ সরবরাহের সব পথ বন্ধ করে দেয়। ম্যাচের ১১৭ মিনিট পর্যন্ত গোলে একটা শটও রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা! এটা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে রেকর্ড। ইএসপিএনের রেটিংয়ে ফাইনালে ১০-এ মাত্র ৩ পেয়েছেন মেসি। যে মানুষটা মেসিকে শিকলবন্দী করলেন, ম্যাচসেরার পুরস্কারটাও উঠল সেই রদ্রির হাতেই। অথচ গ্যালারি তখনো গাইছে মেসির নাম।
মেসি ও ইয়ামালের সেই ছবির পেছনের গল্পফাইনালে হারের পর কান্না দমিয়ে রাখতে পারেননি লিওনেল মেসিতৃতীয়ত, গোল্ডেন বলের ভোটে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যকেও ওজন দেওয়া হয়। শিরোপাজয়ী দলের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে রদ্রি আধুনিক ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে গোল্ডেন বল জিতলেন। মানে এই পুরস্কারটা যে শুধু উইঙ্গার বা ফরোয়ার্ডের কৃতিত্বের জন্য প্রাপ্য হবে সেটা না, বরং যাঁরা নীরবে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁদেরও যোগ্য স্বীকৃতি দেয়।
তবে রদ্রির এই গোল্ডেন বল জেতার পেছনে দারুণ এক লড়াইয়ের গল্প আছে। ২০২৪-এ ইউরোর সেরা খেলোয়াড় আর ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেই এসিএল (হাঁটুর লিগামেন্ট) ছিঁড়ে রদ্রির ক্যারিয়ারই পড়ে গিয়েছিল অনিশ্চয়তায়, চোটে জর্জরিত ছিল পরের দুটো মৌসুমও। তাই পুরস্কার হাতে তিনি নিজেও বললেন, ‘আমি সত্যিই এটা আশা করিনি।’
তবু তো বিতর্ক থামছে না। কারণ, মেসি পেলেন সিলভার বল, ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতা এমবাপ্পে পেলেন ব্রোঞ্জ। বিশ্লেষকদের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। স্কাই স্পোর্টসে সাবেক স্ট্রাইকার জে বথরয়েড যুক্তি দিয়েছেন, মেসির ‘এক্স-ফ্যাক্টর’-এর কাছে সব পরিসংখ্যান ম্লান, গোল্ডেন বল তাঁরই জেতা উচিত ছিল। বিপক্ষ দল বলছে, মেসি অতিমানবীয় ছিলেন ফাইনালের আগপর্যন্ত, কিন্তু রদ্রি সেই পারফর্ম করেছেন টুর্নামেন্টের প্রথম মিনিট থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত, একেবারে প্রতিটি ম্যাচে।
বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল আসলে একটা পুরোনো প্রশ্নেরই নতুন উত্তর দেয় প্রতিবার। সেরা কে? যে জাদু দেখায়, নাকি যে জেতায়? ২০২৬ সালে ফিফা বেছে নিয়েছে দ্বিতীয় উত্তরটা। তারপরও মেসির ভক্তদের সান্ত্বনা একটাই—গোল্ডেন বল হারালেও ‘সর্বকালের সেরা’র মুকুটটা কেড়ে নেওয়ার সাধ্য কারও নেই। সেটা আবার স্বয়ং রদ্রিও স্বীকার করেছেন।
কোন ফরমেশনের কী অর্থ