গ্রীষ্মকালে কি চুল সত্যিই দ্রুত বাড়ে
· Prothom Alo

গ্রীষ্মের তীব্র গরম আর কড়া রোদ শরীরে নানাভাবে প্রভাব ফেলে। এর কারণে গরমে ঘাম হওয়ার মতো ছোটখাটো অস্বস্তি হয়। আবার হিটস্ট্রোক বা ত্বকে মারাত্মক সানবার্নের মতো বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
Visit biznow.biz for more information.
তবে এই গরমের মধ্যেও অনেকে বিশ্বাস করেন, গ্রীষ্মকালে চুল নাকি অন্য সময়ের চেয়ে দ্রুত লম্বা হয়। অবশ্য এই ধারণার পেছনে খুব জোরালো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিজ্ঞান বলে, গরমে চুল ঘন বা লম্বা হওয়ার চেয়ে বরং রোদ আর ঘামের কারণে চুল বেশি অগোছালো আর উসকোখুসকো হয়ে যায়। তবুও গ্রীষ্মকাল ও সূর্যের আলো চুল বাড়াতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে, এমনটা ভাবার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
দুশ্চিন্তায় কি মাথার চুল পড়ে যায়এলিজাবেথ বাহার হাউশমান্ড জানান, জিনগত কারণ, সঠিক পুষ্টির অভাব, মানসিক চাপ, কোনো ওষুধ খাওয়া বা শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার কারণে চুল বাড়ার এই চক্রটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চুল কীভাবে বাড়ে
আমাদের চুল সবসময় একই গতিতে বাড়ে না। সাধারণত মাথায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি চুল লম্বা হয়। চুলের গোড়া মূলত চারটি ধাপে কাজ করে। বৃদ্ধি বা বাড়ার ধাপ (অ্যানাজেন), পরিবর্তনের ধাপ (ক্যাটাজেন), বিশ্রামের ধাপ (টেলোজেন) এবং ঝরে পড়ার ধাপ (এক্সোজেন)। মাথার প্রতিটি চুল তার নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী দুই থেকে আট বছর পর্যন্ত বাড়ার ধাপে থাকে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল বাড়ার এই সময়টা কমে আসে। যার ফলে চুল পাতলা ও দুর্বল হয়ে পরে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ বাহার হাউশমান্ড। তিনি জানান, জিনগত কারণ, সঠিক পুষ্টির অভাব, মানসিক চাপ, কোনো ওষুধ খাওয়া বা শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার কারণে চুল বাড়ার এই চক্রটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা, শরীরে আয়রনের অভাব, বড় কোনো অসুস্থতা, অপারেশন, দ্রুত ওজন কমানো, সন্তান জন্মদানের পর হরমোনের পরিবর্তন কিংবা কিছু ওষুধের কারণে চুল দ্রুত ঝরে পড়ার ধাপে চলে যায়। আর এর ফলে কয়েক মাস পর হঠাৎ করেই খুব বেশি চুল পড়তে শুরু করে।
প্রাচীন মিশর থেকে আধুনিক বিজ্ঞানে চুল গজানোর রহস্যমাথার প্রতিটি চুল তার নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী দুই থেকে আট বছর পর্যন্ত বাড়ার ধাপে থাকে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল বাড়ার এই সময়টা কমে আসে। যার ফলে চুল পাতলা ও দুর্বল হয়ে পরে।
গ্রীষ্মকালে কি চুল বেশি বাড়ে
গরমের দিনে চুল দ্রুত বাড়ে, এই ধারণাটি অনেকের মধ্যেই প্রচলিত। এর পেছনে কিছু শারীরিক কারণও থাকতে পারে। কারণ সূর্যের আলো, তাপমাত্রা, রক্ত চলাচল ও হরমোনের পরিবর্তন আমাদের শরীরের নানা কাজকে প্রভাবিত করে।
এমনকি চারপাশের পরিবেশও আমাদের মাথার ত্বক ও চুলের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে গ্রীষ্মের রোদ বা ঋতু পরিবর্তনের মতো বাইরের কারণগুলো চুল বাড়ার পেছনে খুব বড় ভূমিকা রাখে না। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, চুলের বৃদ্ধি মূলত শরীরের ভেতরের হরমোন, চুলের গোড়া বা ফলিকলের গঠন এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে।
অনেকে মনে করেন, গরমে বেশি রোদ পাওয়ার কারণে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। আর এ কারণেই নাকি চুল দ্রুত বাড়ে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাটি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন।
কারও শরীরে যদি সত্যিই ভিটামিন ডি এর ঘাটতি থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে সেই ঘাটতি পূরণ করলে চুল পড়া কমতে পারে। কিন্তু যাদের শরীরে ভিটামিন ডি একদম স্বাভাবিক আছে, তারা রোদে গিয়ে বা বাড়তি ভিটামিন ডি নিয়ে চুল দ্রুত লম্বা করতে পারবেন না। অর্থাৎ, অতিরিক্ত ভিটামিন ডি চুলের ঘনত্ব বা সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় না।
সূর্য বা গ্রীষ্মকাল চুল গজানোর পেছনে ভূমিকা রাখে, এই কথাটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে খুব অল্প কিছু গবেষণা হলেও সেগুলো এই ধারণার পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে পারেনি।
চুল ও নখে কোষ নেই, কিন্তু বৃদ্ধি পায় কীভাবেযাদের শরীরে ভিটামিন ডি একদম স্বাভাবিক আছে, তারা রোদে গিয়ে বা বাড়তি ভিটামিন ডি নিয়ে চুল দ্রুত লম্বা করতে পারবেন না। অর্থাৎ, অতিরিক্ত ভিটামিন ডি চুলের ঘনত্ব বা সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় না।
গবেষণা কী বলে
১৯৯০ সালে পুরুষদের চুল ও দাড়ির বৃদ্ধি নিয়ে দুটি গবেষণা করা হয়। ১৯৯১ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, মার্চ মাসে পুরুষদের মাথার প্রায় ৯০ শতাংশ চুল বাড়ার ধাপে (অ্যানাজেন) থাকে। এরপরের ছয় মাস ধরে এই হার কমতে থাকে ও সেপ্টেম্বর মাসে এসে তা সবচেয়ে নিচে নেমে যায়। তবে দাড়ির ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল উল্টো। শীতকালের তুলনায় জুলাই মাসে দাড়ি প্রায় ৬০ শতাংশ দ্রুত বাড়ত।
পাঁচ বছর পর করা দ্বিতীয় গবেষণাতেও একই রকম ফলাফল পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, গ্রীষ্মের শেষের দিকেই মাথার সবচেয়ে বেশি চুল বিশ্রামের ধাপে চলে যায়। অর্থাৎ, এই গবেষণাগুলো উল্টো ইঙ্গিত করে। মানে গরমে চুল বেশি বাড়ার বদলে কম বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে এই দুটি গবেষণাই খুব ছোট ছিল। মাত্র ১৪ ও ১০ জনের ওপর করা হয়েছিল। তাই এই ফলাফল সবার জন্য সত্যি নাও হতে পারে।
পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ৮২৩ জন নারীর ওপর একটি বড় গবেষণা করা হয়। এই দলে সুস্থ নারী যেমন ছিলেন, তেমনি চুল পরা রোগে আক্রান্ত নারীরাও ছিলেন। এই গবেষণাতেও দেখা যায়, গ্রীষ্মকালেই মাথার সবচেয়ে বেশি চুল বিশ্রামের ধাপে থাকে।
চুল কত দ্রুত বাড়ে১৯৯১ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, মার্চ মাসে পুরুষদের মাথার প্রায় ৯০ শতাংশ চুল বাড়ার ধাপে থাকে।
এখন ধরা যাক, গরমে যদি দাড়ি ৬০ শতাংশ দ্রুত বাড়েও, তবে তা এক মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ০.৩ ইঞ্চি বেশি লম্বা হবে। এই সামান্য বৃদ্ধি খালি চোখে বোঝাই যায় না।
তাই বলা যায়, নিয়ম মেনে রোদ পোহালে শরীরে ‘সেরোটোনিন’ নামের হরমোন বাড়ে, যা আমাদের মন ভালো রাখে। কিন্তু রোদে গেলেই চুল দ্রুত লম্বা হবে বা চুল পরা কমে যাবে, এই ধারণার সপক্ষে কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তাসূত্র: পপুলার সায়েন্সকিছু মানুষের চুল ও নখ দ্রুত বড় হয় কেন