জ্যামিতির মজা, মজার জ্যামিতি
· Prothom Alo

১. ক্লাসে একদিন
একবার চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা কল্পনা করো তো! শীতের কনকনে সকাল। লেপ ছেড়ে আসতে মোটেও মন চাইছিল না, তাও সোয়েটার-মাফলার জড়িয়ে কোনোমতে ক্লাসরুমে এসে বসে আছো।
Visit biznow.biz for more information.
ওদিকে ব্ল্যাকবোর্ডে খসখস করে চক ঘষে জ্যামিতি শেখাচ্ছেন তোমাদের অঙ্ক স্যার। চকের সাদা গুঁড়ো এমনভাবে উড়ছে যেন ক্লাসরুমের ভেতরেই ছোটখাটো একটা তুষারপাত হচ্ছে! হঠাৎ তিনি বোঁ করে ঘুরে দাঁড়ালেন। সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, ‘সবাই চটপট খাতায় সুন্দর করে একটা অর্ধবৃত্ত এঁকে ফেলো তো! খেয়াল রাখবে, এর নিচের দিকের ব্যাস বা লম্বা দাগটার নাম হবে AB।’
জানোই তো, অর্ধবৃত্তকে ইংরেজিতে বলে সেমিসার্কেল। মানে একটা বৃত্তের অর্ধেক—আধখানা বৃত্ত। সেটা আঁকতে জ্যামিতি বক্স হাতড়ে কাঁটা-কম্পাস আর পেন্সিল বের করে ক্লাসের সবাই ঝটপট লেগে পড়লে কাজে।
আঁকা শেষ হতেই স্যার নতুন নির্দেশ দিলেন, ‘এবার ওই অর্ধবৃত্তের ছাদের ওপর, মানে পরিধির যেকোনো জায়গায় তোমার পছন্দমতো একটা বিন্দু নাও। চলো, আমরা বিন্দুটার নাম দিই P। এবার স্কেল দিয়ে P বিন্দুর সঙ্গে A ও B বিন্দু দুটোকে সোজা দাগ টেনে জুড়ে দাও।’
এক কদমও এগোতে না পারার গোলকধাঁধাঅর্ধবৃত্তকে ইংরেজিতে বলে সেমিসার্কেল। মানে একটা বৃত্তের অর্ধেক—আধখানা বৃত্ত। সেটা আঁকতে জ্যামিতি বক্স হাতড়ে কাঁটা-কম্পাস আর পেন্সিল বের করে ক্লাসের সবাই ঝটপট লেগে পড়লে কাজে।
সবার আঁকা শেষ হলে স্যার মুচকি হেসে বললেন, ‘এবার জ্যামিতি বক্স থেকে চাঁদাটা বের করো। মেপে দেখো তো, P বিন্দুতে যে নতুন কোণটা তৈরি হলো, সেটার মাপ ঠিক কত?’
তুমি হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবছো, একেকজন তো পরিধির একেক জায়গায় বিন্দু বসিয়েছে। পেছনের বেঞ্চের তোমার বন্ধু হয়তো বিন্দুটা নিয়েছে একদম বাঁ দিকে ঘেঁষে, আর সামনের বেঞ্চের আরেক বন্ধু হয়তো নিয়েছে ঠিক মাঝখানে। তাই তোমার কাছে মনে হবে, একেকজনের চাঁদায় একেক রকম মাপ আসার কথা। সবার কোণের মাপ তো আর এক হওয়ার কথা নয়, তাই না?
কিন্তু চাঁদাটা বসাতেই তোমার চোখ রীতিমতো কপালে উঠবে! কিছুক্ষণ পর ক্লাসের সবাই যে কোণের কথা বলবে, দেখা যাবে তোমার পাওয়া কোণটাও ঠিক তাই। আসলে তুমি বিন্দুটা ডানে, বাঁয়ে, মাঝখানে—যেখানেই বসাও না কেন—কোণটার মাপ সবসময় কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ৯০ ডিগ্রি বা এক সমকোণ! যেন চাঁদাটা কোনো জাদুমন্ত্রে আটকে গেছে! P বিন্দুটা যেখানেই নেওয়া হোক না কেন, কোণটা একগুঁয়ের মতো ৯০ ডিগ্রিতেই বসে থাকবে (ছবি ১)।
ছবি ১: থেলিসের উপপাদ্যগণিতের জগৎ যে এমন অদ্ভুত সুন্দর সব জাদুকরী চমকে ভরপুর, সেটা অনেকেই শুরুতে ধরতে পারে না। জানলে অবাক হবে, জ্যামিতির ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও দুর্দান্ত একটি উপপাদ্য এটি। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে, প্রাচীন গ্রিসের নামকরা দার্শনিক ও গণিতবিদ থেলিস এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেছিলেন। থেলিস ছিলেন ইতিহাস ও জ্যামিতির জগতের এক দারুণ চরিত্র! তাঁকে গণিতের প্রথম সত্যিকারের জ্যামিতিবিদ বলা হয়।
তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর কর্মকাণ্ডে। যেমন মিশরের বিশাল ফারাওদের পিরামিড দেখে যখন সবাই অবাক হয়ে ভাবত—‘এর উচ্চতা কত হতে পারে?’, থেলিস তখন কোনো গাছে না উঠে, কোনো লম্বা ফিতা ছাড়াই একটা সাধারণ কাঠের লাঠি দিয়ে পিরামিডের উচ্চতা মেপে ফেলেছিলেন!
৩৫০ বছরের পুরোনো যে গাণিতক রহস্য আজও মুগ্ধ করেআসলে তুমি বিন্দুটা ডানে, বাঁয়ে, মাঝখানে—যেখানেই বসাও না কেন—কোণটার মাপ সবসময় কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ৯০ ডিগ্রি বা এক সমকোণ! যেন চাঁদাটা কোনো জাদুমন্ত্রে আটকে গেছে!
ভাবছো, তাঁর কৌশলটি কী ছিল? তিনি রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। যখন লাঠির ছায়ার দৈর্ঘ্য ঠিক লাঠিটার দৈর্ঘ্যের সমান হতো, তিনি জানতেন ঠিক ওই মুহূর্তে পিরামিডের ছায়ার দৈর্ঘ্যও পিরামিডের আসল উচ্চতার সমান! জ্যামিতির অনুপাত ব্যবহার করে তিনি সহজেই মেপে ফেললেন পুরো পিরামিডের উচ্চতা। আবার থেলিস একবার স্রেফ জ্যামিতি ও গণিত কষে সূর্যগ্রহণের দিনক্ষণ নিখুঁতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
এই থেলিসের মতে, গণিতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কখনোই এটা নয় যে ‘আমরা কী জানি?’, বরং আসল প্রশ্ন হলো ‘আমরা সেটা কীভাবে জানি?’ অর্থাৎ, এর প্রমাণটা কী বাপু!
তাহলে থেলিসের মতো তোমার মনেও এখন প্রশ্ন জাগতে পারে—কেন? অর্ধবৃত্তের ভেতরের এই কোণটি সবসময় কেন ঠিক ৯০° বা এক সমকোণই হয়?
এর ছোট্ট এবং চমৎকার উত্তরটি হলো—আমরা এটি প্রমাণ করতে পারি। কোনো ভেলকিবাজি দিয়ে নয়, বরং একদম সাদামাটা আর জানা কিছু গাণিতিক নিয়ম দিয়েই সেটা প্রমাণ করা সম্ভব। স্রেফ ধাপে ধাপে কিছু নিখুঁত যুক্তির সিঁড়ি বেয়ে এই চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছানো যায়।
ছবি ২: প্রমাণের গুরুত্বআর ঠিক এই প্রমাণের কাজটি করেই, আমরা শুধু জ্যামিতির মূল ভিত্তিটাই মজবুত করব। সেই সঙ্গে আরও দারুণ এবং বড় কিছু করার চেষ্টা করব। কারণ, জ্যামিতির এই যুক্তিনির্ভর পথ ধরেই তুমি গণিতের আসল সৌন্দর্য ও তার ভেতরের প্রকৃত মজাটাকে খুব কাছ থেকে ধরতে পারবে। যেকোনো বয়সেই, জ্যামিতির এই জাদুকরী জগতে পা রাখার মাত্র আধঘণ্টার মধ্যেই তুমি বুঝতে পারবে—গণিত বা জ্যামিতি মোটেও বোরিং কিছু নয়!
আর আমার এই কথাগুলো যদি তোমার ঠিক বিশ্বাস না হয়, তাহলে...
অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়থেলিসের মতে, গণিতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কখনোই এটা নয় যে ‘আমরা কী জানি?’, বরং আসল প্রশ্ন হলো ‘আমরা সেটা কীভাবে জানি?’ অর্থাৎ, এর প্রমাণটা কী বাপু!
২. তাহলে শুরু করা যাক
জ্যামিতির রহস্য ভেদ করতে গিয়ে আমাদের প্রথম যে বড় ও দারুণ ধারণাটির মুখোমুখি হতে হবে, তার নাম সমান্তরাল রেখা। ইংরেজিতে বলা হয় প্যারালাল লাইন।
সহজ কথায়, একই সমতলে থাকা এমন দুটি সোজা দাগ বা রেখা, যাদের যত দূরই বাড়িয়ে দাও না কেন; কখনোই তারা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাবে না বা মিশবে না। রেললাইনের দুটি পাতের কথা ভেবে দেখতে পারো! জনপ্রিয় একটা গানও আছে—‘দুই ভুবনে দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল/রেললাইন বহে সমান্তরাল’। রেলের এই লাইন দুটি যতই এগিয়ে যাক, তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব সবসময় সমান থাকে।
এই সমান্তরাল রেখা নিয়ে আমরা শুরুতেই দুটো দরকারি কথা ধরে নেব। জ্যামিতির ভাষায় এই ধরে নেওয়া বা অনুমান করাকে বলা হয় স্বীকার্য বা অ্যাসাম্পশন। জ্যামিতির এই স্বীকার্য জিনিসটা শোনামাত্রই একটু খটোমটো আর ভারিক্কি মনে হতে পারে। কিন্তু আসল কথা হলো, ব্যাপারটা এতই সহজ একটা ধারণা যে আমরা দৈনন্দিন জীবনেও নিজেদের অজান্তেই হাজার হাজার স্বীকার্য মেনে চলি!
যেমন ধরো, তুমি শীতকালে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলে বাইরের রাস্তাঘাট পুরো ভিজে চপচপ করছে। তুমি কোনো প্রমাণ না দেখেই সঙ্গে সঙ্গে কী ধরে নেবে? —‘রাতে নিশ্চয়ই বৃষ্টি হয়েছিল!’
এই যে তুমি চোখ বন্ধ করে ধরে নিলে যে রাস্তা ভেজা থাকা মানেই বৃষ্টি হয়েছে—এটাই একটা স্বীকার্য। আসলে স্বীকার্য হলো জ্যামিতির ভিত্তিপ্রস্তর বা খেলার শুরুর সেই নিয়ম, যা প্রমাণ ছাড়াই সত্যি বলে ধরে নেওয়া হয়, যেন যুক্তির সিঁড়ি বেয়ে একসময় বড় বড় সত্যে পৌঁছানো যায়!
যে গণিতের নিয়মে টিকে আছে পুরো মহাবিশ্বসহজ কথায়, একই সমতলে থাকা এমন দুটি সোজা দাগ বা রেখা, যাদের যত দূরই বাড়িয়ে দাও না কেন; কখনোই তারা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাবে না বা মিশবে না।
সহজ কথায়, স্বীকার্য হলো এমন কিছু সহজ নিয়ম বা সত্য, যা কোনো প্রমাণ ছাড়াই আমরা শুরুতে ‘সত্যি’ বলে মেনে নিই, যাতে সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা পরের বড় বড় রহস্যগুলো সমাধান করতে পারি।
আজ থেকে প্রায় ২৩০০ বছর আগে গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড যখন তাঁর বিখ্যাত বই এলিমেন্টস লিখতে বসলেন, তখন তিনিও ঠিক এই পথটাই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, একটা বাড়ি বানাতে যেমন শক্ত ভিত্তি লাগে, তেমনি জ্যামিতির প্রাসাদ গড়তেও এমন কিছু স্পষ্ট নিয়ম লাগবে—যা সবাই প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নেবে।
ইউক্লিড শুরুতেই এমন কিছু আজব কিন্তু চমৎকার জিনিসকে স্বীকার্য হিসেবে ধরে নিলেন, যা খাতায় আঁকা অসম্ভব! যেমন: বিন্দু। ইউক্লিড ধরে নিলেন, বিন্দুর কোনো দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা নেই—কেবল একটা অবস্থান আছে! আবার সরলরেখার ক্ষেত্রে তিনি ধরে নিলেন, একটা সোজা দাগের কোনো মেদ বা পুরুত্ব থাকবে না!
এখন ভাবো তো, খাতায় পেন্সিল দিয়ে যতই সূক্ষ্ম ফোঁটা বা দাগ টানো না কেন, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে তার কিছুটা পুরুত্ব তো থেকেই যায়! কিন্তু ইউক্লিড বললেন, ‘জ্যামিতির খেলাটা শুরু করতে হলে আগে মনে মনে ধরে নাও যে এদের কোনো পুরুত্ব নেই।’
এই যে নিখুঁত জিনিসগুলোকে সত্যি বলে মেনে নেওয়া—এটাই ছিল ইউক্লিডের জ্যামিতির ভিত্তিপ্রস্তর। আর কোনো সেন্টিমিটার বা ইঞ্চি ছাড়াই, কেবল এই সাধারণ স্বীকার্যগুলোর ওপর ভর করেই তিনি জ্যামিতির শত শত জটিল উপপাদ্য প্রমাণ করে ফেলেছিলেন!
ইউক্লিডেরও শতবর্ষ আগে থেলিস সমান্তরাল রেখা আর স্বীকার্যকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বললেন, কিছু ব্যাপার এতই স্বাভাবিক যে খালি চোখে দেখলেই তো স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘তাই এর পেছনে অহেতুক প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। একে স্বীকার্য হিসেবে মেনে নেওয়া যাক!’
গণিতের হিসাবে আর কতদিন টিকবে মানবজাতিইউক্লিড ধরে নিলেন, বিন্দুর কোনো দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা নেই—কেবল একটা অবস্থান আছে! আবার সরলরেখার ক্ষেত্রে তিনি ধরে নিলেন, একটা সোজা দাগের কোনো মেদ বা পুরুত্ব থাকবে না!
সমান্তরাল রেখা
যাই হোক, এবার কল্পনা করো, দুটি সমান্তরাল দাগ বা সরল রেখা চলে গেছে। এবার হুট করে তৃতীয় আরেকটা সোজা দাগ এসে এই দুটো দাগকে আড়াআড়িভাবে কেটে ফেলল! ঠিক নিচের ৩ নং ছবির মতো। এর ফলে যে বিশেষ কোণগুলো তৈরি হয়, তাদের বলে অনুরূপ কোণ।
ছবি ৩: সমান্তরাল রেখাআমরা আপাতত এগুলো সত্য ধরে নেব। পরে এগুলোর প্রমাণও দেখা যাবে:
১. দুটি রেখা যদি সমান্তরাল হয়, তাহলে তৈরি হওয়া অনুরূপ কোণগুলো অবশ্যই সমান হবে (ব্যাপারটা খালি চোখেই বোঝা যায়)।
২. উল্টোভাবে, কোনো দুটো রেখাকে যদি একটি দাগ কাটার পর অনুরূপ কোণগুলো সমান হয়, তাহলে ওই রেখা দুটি অবশ্যই সমান্তরাল হবে।
সহজ কথায়, আমাদের সাধারণ বুদ্ধি বা কাণ্ডজ্ঞান বলে, সমান্তরাল রেখা মানেই তারা ‘একই দিকে’ মুখ করে চলছে। দেখতে যতই সহজ আর নিশ্চিত মনে হোক না কেন, গণিতের জগতে এগুলো কিন্তু আমাদের শুরুতেই মেনে নেওয়া বা ধরে-নেওয়া কথা! মানে স্বীকার্য। এই স্বীকার্য বা অনুমানগুলো পরের পৃষ্ঠাগুলোতেও আমাদের আরও কাজে লাগবে। তাই এ দুটো স্বীকার্য সম্ভব হলে মনে রেখো।
এখানে খেয়াল করে দেখো, দুটি কথা কিন্তু একই রকম শোনালেও কাজ করে দুভাবে। প্রথম নিয়মটি সমান্তরাল রেখা থাকলে আমাদের হিসাব-নিকাশ করতে সাহায্য করে। আর দ্বিতীয় নিয়মটি দুটি রেখা আদৌ সমান্তরাল কি না, তা প্রমাণ করতে সাহায্য করে!
সৌন্দর্যের মহাজাগতিক ব্যাকরণসমান্তরাল রেখা মানেই তারা একই দিকে মুখ করে চলছে। দেখতে যতই সহজ আর নিশ্চিত মনে হোক না কেন, গণিতের জগতে এগুলো কিন্তু আমাদের শুরুতেই মেনে নেওয়া বা ধরে-নেওয়া কথা!
কোণ নিয়ে কিছুক্ষণ
দুটি সোজা দাগ বা রেখা যখন এক জায়গায় এসে মিলে যায়, তখন যে কোণা বা ফাঁক তৈরি হয়, সেটাই হলো কোণ। দাগ দুটি একে অপরের থেকে কতটা দূরে সরে গেছে বা কতখানি খোলা—সেটার পরিমাপকেই কোণ বলা হয়। জ্যামিতির ভাষায় বলা যায়, দুটি রশ্মি বা রেখাংশ যখন একটি সাধারণ প্রান্তবিন্দুতে মিলিত হয়, তখন তাদের সংলগ্ন মধ্যবর্তী স্থান বা আকৃতিকে কোণ বলে। আমরা কোণ মাপি ডিগ্রি দিয়ে। একে ° চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
প্রশ্ন করতে পারো, ডিগ্রি জিনিসটা আসলে কী? ভাবো তো, তুমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের চারপাশে ঘুরে পুরো একটা চক্কর বা চক্কর মেরে গোল হয়ে আগের জায়গায় ফিরে এলে। গণিতের ভাষায়, তুমি কিন্তু চমৎকার একটা পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করে ফেললে! গণিতবিদেরা এই পুরো গোল চক্করটাকে সমান ৩৬০টি ছোট ছোট ভাগে বা টুকরোয় ভাগ করে নিয়েছেন। আর এই একেকটি ছোট্ট টুকরো বা ভাগকে বলা হয় ১ ডিগ্রি (১°)।
এবার খেয়াল করো, এই পুরো বৃত্তটাকে যদি তুমি মাঝখান থেকে সমান দুই ভাগে কেটে ফেলো? তবে পাবে অর্ধেক চক্কর, অর্থাৎ একটি সরলরেখা। আর ৩৬০-এর অর্ধেক কত বলতো? ঠিক ধরেছ—১৮০°!
তাই একটি সোজা দাগ বা সরলরেখার ওপর কোনো বিন্দু থাকলে (ধরা যাক বিন্দুটি হলো P), ওই বিন্দুর দুই পাশে থাকা সোজা দাগটি মিলে তৈরি করে ঠিক ১৮০ ডিগ্রি (১৮০°) কোণ। একে বলা হয় সরলকোণ (ছবি ৪)।
মন্টি হল প্যারাডক্স: যে গাণিতিক ধাঁধা বিজ্ঞানীদেরও বোকা বানিয়েছিলজ্যামিতির ভাষায় বলা যায়, দুটি রশ্মি বা রেখাংশ যখন একটি সাধারণ প্রান্তবিন্দুতে মিলিত হয়, তখন তাদের সংলগ্ন মধ্যবর্তী স্থান বা আকৃতিকে কোণ বলে। আমরা কোণ মাপি ডিগ্রি দিয়ে।
বাংলা ভাষায় ‘সরল’ শব্দের অর্থ সহজ, কিন্তু এর জ্যামিতিক অর্থ হলো ‘সোজা’ (যেমন: সরলরেখা)। যেহেতু ১৮০° কোণ তৈরি করতে কোনো বাঁক বা মোড় নিতে হয় না, দুটি বিপরীতমুখী রশ্মি মিলে একদম একটি সোজা বা সরল দাগ তৈরি করে—তাই বাংলা জ্যামিতিতে এর নাম দেওয়া হয়েছে সরলকোণ!
আমরা একটা কথা প্রায়ই ব্যবহার করি—‘এই ঘটনাটার পর ওর জীবন পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে!’ কিন্তু কথাটা কেন বলা হয় বলতো?
আসলে তুমি যদি উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ঠিক ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাও, তাহলে তোমার মুখ ঠিক তার পুরো উল্টো দিক, অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে চলে যাবে! তাই কোনো কিছু নিজের আগের অবস্থানের ঠিক ১০০ ভাগ উল্টো রূপ নিলে রূপক অর্থে বলা হয় তা ‘১৮০ ডিগ্রি বদলে গেছে’।
ছবি ৪: ১৮০° কোণ (সরলকোণ)এখন এই ১৮০° কে যদি একদম মাঝখান থেকে সমান দুই ভাগে কেটে ফেলা যায়? তবে পাওয়া যাবে তার অর্ধেক। অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি (বা ৯০°)। একেই আমরা বলি সমকোণ বা রাইট অ্যাঙ্গেল। সেটা দেখতে ঠিক ইংরেজি L অক্ষরের মতো! আর যে দুটি রেখা মিলে এই ৯০° কোণ তৈরি করে, তাদের বলা হয় লম্ব।
কিন্তু ইংরেজিতে একে Right বলা হয় কেন?
যে সহজ ধাঁধাগুলো আমাদের মগজ ধোলাই করে দেয়যেহেতু ১৮০° কোণ তৈরি করতে কোনো বাঁক বা মোড় নিতে হয় না, দুটি বিপরীতমুখী রশ্মি মিলে একদম একটি সোজা বা সরল দাগ তৈরি করে—তাই বাংলা জ্যামিতিতে এর নাম দেওয়া হয়েছে সরলকোণ!
এখন এই ১৮০° কে যদি একদম মাঝখান থেকে সমান দুই ভাগে কেটে ফেলা যায়? তবে পাওয়া যাবে তার অর্ধেক। অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি (বা ৯০°)। একেই আমরা বলি সমকোণ বা রাইট অ্যাঙ্গেল। সেটা দেখতে ঠিক ইংরেজি L অক্ষরের মতো! আর যে দুটি রেখা মিলে এই ৯০° কোণ তৈরি করে, তাদের বলা হয় লম্ব।
কিন্তু ইংরেজিতে একে Right বলা হয় কেন?
আসলে এই শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Angulus Rectus থেকে। প্রাচীনকালে সোজা খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাকে বলা হতো রাইট বা আপরাইট। যেহেতু একটি সমকোণে একটি রেখা অন্য রেখার ওপর একদম সোজা খাড়া হয়ে দাঁড়ায় (কোথাও হেলে পড়ে না), তাই এর নাম দেওয়া হয়েছিল রাইট অ্যাঙ্গেল বা সোজা কোণ!
ছবি ৫: সমকোণ বা ৯০ ডিগ্রিবাংলায় ‘সমকোণ’ শব্দটির উৎপত্তি ও নামকরণের কারণটা বেশ চমৎকার! শব্দটাকে দুটি ভাগে ভাঙলেই এর আসল রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায়: সম অর্থ সমান বা সমতা এবং কোণ মানে দুটি রেখার ছেদবিন্দুতে তৈরি হওয়া কোণ। আমরা জানি, একটি সোজা দাগ বা সরলরেখার ওপর মোট কোণ থাকে ১৮০ ডিগ্রি। এখন এই সোজা দাগটিকে যদি একদম মাঝখান থেকে লম্বভাবে কেটে আড়াআড়ি সমান দুই ভাগে ভাগ করা যায়, তাহলে প্রতিটি ভাগের কোণের মাপ হয় ৯০ ডিগ্রি। যেহেতু ১৮০ ডিগ্রির সরলকোণকে ভাগ করে সমান দুটি কোণ তৈরি করা হয়েছে, তাই এই কোণটির নাম দেওয়া হয়েছে সমকোণ।
সমকোণ বলার আরেকটি কারণও আছে। বাংলা ভাষায় ‘সম’ শব্দটির আরেকটি অর্থ হলো ভারসাম্য বা সোজা থাকা (যেমন: সমতল, সমতা)। কোনো কোণ যদি ৯০ ডিগ্রি এর চেয়ে ছোট হয় (সূক্ষ্মকোণ), তাহলে রেখাটি এক দিকে ঢলে পড়ে। আবার কোণটি যদি ৯০ ডিগ্রির চেয়ে বড় হয় (স্থূলকোণ), তাহলে রেখাটি হেলে যায় আরেক দিকে। কিন্তু কোণটি ঠিক ৯০ ডিগ্রি হলে রেখাটি ডান বা বাম—কোনো দিকেই বিন্দুমাত্র হেলে না থেকে একদম সোজা বা ‘সম’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এটি সবদিকের সাথে একদম সমান বা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকে বলে একে সমকোণ বলা হয়।
প্যারাডক্স লস্টএকটি সোজা দাগ বা সরলরেখাকে যদি একদম মাঝখান থেকে লম্বভাবে কেটে আড়াআড়ি সমান দুই ভাগে ভাগ করা যায়, তাহলে প্রতিটি ভাগের কোণের মাপ হয় ৯০ ডিগ্রি।
কখনো কি ভেবে দেখেছ, পৃথিবীর প্রায় সব ঘরবাড়ি, দালানকোঠা আর পিলার কেন মাটির সাথে ঠিক ৯০ ডিগ্রি কোণে (লম্বভাবে) তৈরি করা হয়?
এর পেছনের কারণ হলো মহাকর্ষ বল! পৃথিবী তার কেন্দ্রের দিকে সবকিছুকে খাড়া নিচের দিকে টানে। কোনো দেয়াল বা খুঁটি যদি ঠিক ৯০ ডিগ্রি কোণে সোজা দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার ওপর মাধ্যাকর্ষণ বলের চাপ সবচেয়ে সুষমভাবে পড়ে। কিন্তু দেয়ালটি যদি ৯০ ডিগ্রি থেকে সামান্য একটুও কাত হয়ে যায় (যেমন ৮৮ ডিগ্রি বা ৯২ ডিগ্রি), তাহলে হেলে থাকা পাশে চরম চাপ তৈরি হয় এবং পুরো দালানটি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ, আমাদের মাথার ওপরের ছাদটি নিরাপদে ধরে রাখার মূল নায়কই হলো সমকোণ!
আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে যখন আধুনিক স্কেল বা চাঁদা ছিল না, তখন প্রাচীন গ্রিক ও মিশরীয়রা কীভাবে পিরামিডের মতো নিখুঁত চারকোনা বিশাল বিশাল ইমারত বানাত?
আসলে সেজন্য তারা ব্যবহার করত একটি জাদুকরী ১২ গিঁটের দড়ি! তারা একটি লম্বা দড়িতে সমান দূরত্বে ১২টি গিঁট দিত। এরপর দড়িটিকে ৩ ভাগ, ৪ ভাগ এবং ৫ ভাগে বাঁকিয়ে একটি ত্রিভুজ তৈরি করত (যাকে বলা হয় ৩-৪-৫ ত্রিভূজ)। পিথাগোরাসের উপপাদ্যের কল্যাণে ৩ আর ৪ একক দৈর্ঘ্যের বাহু দুটির মাঝখানে কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ৯০ ডিগ্রি বা সমকোণ তৈরি হতো! এই সহজ ট্রিকটি ব্যবহার করেই প্রাচীন কালের সব নিখুঁত স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছিল।
যোগফল বের করার জাদুকরী শর্টকাটপৃথিবী তার কেন্দ্রের দিকে সবকিছুকে খাড়া নিচের দিকে টানে। কোনো দেয়াল বা খুঁটি যদি ঠিক ৯০ ডিগ্রি কোণে সোজা দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার ওপর মাধ্যাকর্ষণ বলের চাপ সবচেয়ে সুষমভাবে পড়ে।
বিপ্রতীপ কোণ
দুটি সোজা রেখা যখন একে অপরকে ক্রসের (×) মতো কেটে বের হয়ে যায়, তখন তাদের মুখোমুখি বা সামনাসামনি থাকা কোণগুলোকে বলে বিপ্রতীপ কোণ বা অপজিট অ্যাঙ্গেল (ছবি ৬)। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—এই মুখোমুখি কোণ দুটো সবসময় একজোড়া যমজ ভাইয়ের মতো হুবহু সমান হয়!
বাংলায় ‘বিপ্রতীপ’ শব্দটির অর্থ হলো ‘বিপরীত দিকে অবস্থিত’ বা ‘মুখোমুখি’। যেহেতু ছেদবিন্দুর বিপরীত বা উল্টো দিকে মুখ করে কোণগুলো অবস্থান করে, তাই প্রাচীন গণিতবিদেরা এর দারুণ ও সুন্দর নাম দিয়েছিলেন—বিপ্রতীপ কোণ!
ছবি ৬: বিপ্রতীপ কোণবিপ্রতীপ কোণকে বলা যায় জ্যামিতির আয়না প্রভাব। কারণ তুমি যদি × আকৃতির মাঝখানের ছেদবিন্দুটিতে একটি ছোট আয়না রাখো, তাহলে দেখবে ওপরের কোণের অবিকল প্রতিফলন বা ছায়া তৈরি হচ্ছে নিচের কোণটিতে। এরা এতই নিখুঁতভাবে সমান যে, জ্যামিতির যেকোনো জটিল আকৃতিকে উল্টে বা ঘুরিয়ে ধরে হিসাব করার সময় বিপ্রতীপ কোণ সবচেয়ে বড় সহজ রাস্তা বাতলে দেয়।
শিল্পকলার প্রতিটি স্তরে এক বিস্ময়কর ধ্রুবকদুটি সোজা রেখা যখন একে অপরকে ক্রসের মতো কেটে বের হয়ে যায়, তখন তাদের মুখোমুখি বা সামনাসামনি থাকা কোণগুলোকে বলে বিপ্রতীপ কোণ বা অপজিট অ্যাঙ্গেল।
একান্তর কোণ
এবার আবার ফেরত যাই সমান্তরাল রেখায়। দুটি সমান্তরাল রেখাকে যদি তৃতীয় একটি রেখা কাটাকাটি করে, তবে ‘Z’ আকৃতির ভেতরের কোণগুলোকে বলে একান্তর কোণ বা অল্টারনেট অ্যাঙ্গেল।
সাবমেরিন থেকে পানির ওপরে দেখার জন্য যে পেরিস্কোপ ব্যবহার করা হয়, সেটির ভেতরে দুটি আয়না ৪৫ ডিগ্রি কোণে এবং পরস্পরের সমান্তরাল করে রাখা থাকে। আলো যখন প্রথম আয়নায় ধাক্কা খেয়ে ভেতরে আসে, তখন একান্তর কোণের নীতি মেনেই আবার বাঁক নিয়ে ঠিক সমান্তরালভাবে দর্শকের চোখে পৌঁছায়।
ছবি ৭: একান্তর কোণএই একান্তর কোণগুলোও কিন্তু সবসময় সমান হয়! কিন্তু কেন? জাদু নাকি?
একেবারেই নয়! এর পেছনের লজিকটা খুব সহজ। ধরা যাক, একটি অনুরূপ কোণ a আর আরেকটি অনুরূপ কোণ b। সমান্তরাল রেখার নিয়ম অনুযায়ী a = b। আবার, b কোণটির ঠিক উল্টো পাশে থাকা বিপ্রতীপ কোণ হলো c। তাই b = c।
এখন, a যদি b-এর সমান হয়, আর b যদি c-এর সমান হয়—তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবেই a = c হবে!
এই একই যুক্তি কিন্তু উল্টোভাবেও খাটে! অর্থাৎ একান্তর কোণ সমান হলে রেখা দুটিকে অবশ্যই সমান্তরাল হতেই হবে।
আর এই ধারণাগুলোর ওপর ভিত্তি করে, আমরা এখন প্রথম উপপাদ্যটি প্রমাণ করতে পারবো। অবশ্য সেটা মোটেই একনজরেই বুঝে নেওয়ার মতো সহজ কিছু নয়...
ছবি ৮: একান্তর কোণগুলো সবসময় সমান হওয়ার প্রমাণমনে রাখতে হবে, একান্তর কোণ দুটি সমান হবে—এই শর্তটি কেবল সমতল পৃষ্ঠের (ইউক্লিডীয় জ্যামিতি) জন্যই সত্যি। পৃথিবীর মতো কোনো গোলক বা বাঁকানো তলে দুটি সমান্তরাল রেখাকে অন্য রেখা দিয়ে কাটলে একান্তর কোণ দুটো আর সমান থাকে না!
বিশৃঙ্খলাকে বশে এনে ৩০ কোটি টাকার ব্রেকথ্রু পুরস্কার!ধরা যাক, একটি অনুরূপ কোণ a আর আরেকটি অনুরূপ কোণ b। সমান্তরাল রেখার নিয়ম অনুযায়ী a = b। আবার, b কোণটির ঠিক উল্টো পাশে থাকা বিপ্রতীপ কোণ হলো c। তাই b = c।
ত্রিভুজের তিন কোণের রহস্য!
সব ছোটখাটো হাতিয়ার তো গোছানো হলো, এবার আমরা এমন একটা সত্য প্রমাণ করব, যা জ্যামিতিতে ঢোকার আগে মোটেও এত স্পষ্ট বা সহজ মনে হয় না! সেটি হলো: যেকোনো ত্রিভুজের ভেতরের তিনটি কোণ যোগ করলে যোগফল সবসময় ঠিক ১৮০ ডিগ্রি হবে!
ছবি ৯: ত্রিভূজের কোণগুলোত্রিভুজটা পিচ্চি হোক, বিশাল বড় হোক, চ্যাপ্টা হোক আর সূক্ষ্মই হোক—এই নিয়মের এক চুল এদিক-ওদিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই! কিন্তু কথাটা প্রমাণ করবে কীভাবে?
সেটাও খুব সহজ! যেকোনো একটা ত্রিভুজ নাও। ত্রিভুজের যেকোনো একটি মাথার কোণ (শীর্ষবিন্দু) দিয়ে নিচের ভূমির সমান্তরাল করে একটি সোজা দাগ টেনে দাও।
ছবি ১০: ত্রিভূজের কোণগুলো যোগফল যে সবসময় সমান, তার প্রমাণকিছুক্ষণ আগেই আমরা দেখেছি, একান্তর কোণ সবসময় সমান হয়। এবার দেখো, সমান্তরাল রেখার নিয়মে একান্তর কোণের কল্যাণে নিচের কোণ a এবং নতুন টানা সমান্তরাল রেখার উপরে তৈরি নতুন কোণটি a কোণের সমান। কারণ ওই কোণ দুটি একান্তর কোণ। আবার একই কারণে অন্য পাশের কোণ b-ও উপরের তার সমান একান্তর কোণে গিয়ে বসবে। অর্থাৎ খেয়াল করে দেখো, উপরে টানা নতুন সোজা দাগটির ওপর এখন তিনটি কোণ পাশাপাশি বসে আছে: a, b, আর ত্রিভুজের নিজস্ব কোণ c।
আমরা জানি, একটি সরল রেখার ওপর মোট কোণের যোগফল সবসময় ১৮০ ডিগ্রি হয়। তাই আমরা এখানে একদম পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি: a + b + c = ১৮০ ডিগ্রি।
ব্যস! কেল্লা ফতে! প্রমাণ হয়ে গেল যে ত্রিভুজের পেটের ভেতরের তিন কোণের যোগফল সবসময় কাঁটায় কাঁটায় ১৮০ ডিগ্রি!
চোখের পলকে অঙ্ক করার ম্যাজিকসমান্তরাল রেখার নিয়মে একান্তর কোণের কল্যাণে নিচের কোণ a এবং নতুন টানা সমান্তরাল রেখার উপরে তৈরি নতুন কোণটি a কোণের সমান। কারণ ওই কোণ দুটি একান্তর কোণ।
৩. ইউক্লিডের এলিমেন্টস
জ্যামিতিকে এত নিখুঁত, গোছানো আর যুক্তিনির্ভর করে সাজানোর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণটি লিখেছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড। তাঁর কথা আমরা একটু আগেই আলোচনা করেছি। তাঁকে জ্যামিতির জনক বলা হয়। আজ থেকে প্রায় ২৩০০ বছর আগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে) তিনি জ্যামিতির একটি বই লেখেন। সেই বইটির নাম এলিমেন্টস।
এলিমেন্টস বইয়ের অনেক জ্ঞানই কিন্তু তাঁর নিজের আবিষ্কৃত ছিল না। তাঁর আগের গ্রিক গণিতবিদদের (যেমন থেলিস, পিথাগোরাস) বিচ্ছিন্ন তত্ত্ব ও জ্যামিতিক সত্যগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে, লজিক দিয়ে ধাপে ধাপে সাজিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন তিনি।
বইটি লেখা হয়েছিল ১৩টি খণ্ডে। ইউক্লিড মাত্র ৫টি মৌলিক সত্য বা স্বতঃসিদ্ধ (যা প্রমাণ ছাড়াই সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়) থেকে শুরু করে পুরো জ্যামিতির ৪৬৫টি জটিল উপপাদ্য ধাপে ধাপে প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। প্রমাণ করার এই আধুনিক পদ্ধতিই আজকের সম্পূর্ণ বিজ্ঞান ও গণিতের ভিত্তি তৈরি করেছে। এই বইটি মানব সভ্যতার চিন্তাধারাই বদলে দিয়েছিল। মানব ইতিহাসে টানা ২০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যামিতির প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে ইউক্লিডের লেখা বই-ই ব্যবহৃত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত গোটা বিশ্বে জ্যামিতি মানেই ছিল ইউক্লিডের বই!
কথিত আছে, ইউক্লিডের কাছ থেকে জ্যামিতি শিখতে শুরু করেছিলেন মিশরের তৎকালীন শাসক রাজা প্রথম টলেমি। কিন্তু বইয়ের জটিল যুক্তিগুলো দেখে টলেমি অধৈর্য হয়ে পড়েন। তিনি ইউক্লিডকে জিজ্ঞেস করেন, জ্যামিতি সহজে বোঝার জন্য কোনো শর্টকাট বা সহজ উপায় আছে কি না। ইউক্লিড সরাসরি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মহাশয়, জ্যামিতি শেখার কোনো রাজকীয় রাস্তা নেই!’
শূন্যের গোলকধাঁধাকথিত আছে, ইউক্লিডের কাছ থেকে জ্যামিতি শিখতে শুরু করেছিলেন মিশরের তৎকালীন শাসক রাজা প্রথম টলেমি। কিন্তু বইয়ের জটিল যুক্তিগুলো দেখে টলেমি অধৈর্য হয়ে পড়েন।
আরেকবার এক নতুন শিক্ষার্থী ইউক্লিডের কাছে প্রথম উপপাদ্যটি শেখার পর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এসব নিরস বিষয় শিখে আমার বাস্তব জীবনে কী লাভ হবে?’
ইউক্লিড সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভৃত্যকে ডেকে বললেন, ‘ওকে একটা মুদ্রা দিয়ে দাও। কারণ সে যা-ই শেখে, তা থেকেই নগদ লাভ তুলতে চায়!’
ছবি ১১: গ্রিক পণ্ডিত ইউক্লিডতবে শুরুতেই একটা গোপন কথা বলে রাখা ভালো—ইউক্লিডের জ্যামিতিতে যে রেখা, বিন্দু আর উপপাদ্যগুলোর প্রমাণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কিন্তু আসলে বাস্তবের কোনো বস্তু নয়! বলতে পারো, এগুলো এক ধরনের কাল্পনিক সত্তা। ভাবছো, কথাটা কেন বলছি?
ভাবো তো, ইউক্লিডীয় জ্যামিতিতে একটা ‘সরলরেখা’ মানে তা নিখুঁত সোজা তো বটেই, কিন্তু তার কোনো পুরুত্ব বা মেদ নেই! অর্থাৎ এটি মোটেও মোটা নয়। তুমি খাতায় পেন্সিল দিয়ে যতই সুন্দর করে দাগ টানো না কেন, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে দেখবে তার কিছু না কিছু পুরুত্ব থেকেই যায়। কিন্তু ইউক্লিডের সোজা দাগের পুরুত্ব একদম শূন্য! তাই তুমি যদি খাতায় একটা সত্যিকারের ইউক্লিডীয় সরলরেখা এঁকেও ফেলো, খালি চোখে সেটা দেখতেই পাবে না!
ছক্কার সাহায্যে মিলল ১৫০ বছরের পুরোনো গাণিতিক রহস্যের সমাধানতবে শুরুতেই একটা গোপন কথা বলে রাখা ভালো—ইউক্লিডের জ্যামিতিতে যে রেখা, বিন্দু আর উপপাদ্যগুলোর প্রমাণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কিন্তু আসলে বাস্তবের কোনো বস্তু নয়!
আর বিন্দু পয়েন্ট? সেটা কোনো ছোটখাটো ফোটা বা ডট নয়। ইউক্লিডের ভাষায়: ‘বিন্দু হলো এমন এক সত্তা, যার কোনো অংশ বা পরিমাপ নেই।’ মানে এর দৈর্ঘ্য নেই, প্রস্থ নেই, উচ্চতাও নেই! কেবল অবস্থানটুকু আছে।
ছবি ১২: ইউক্লিডের 'এলিমেন্টস'-এর টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো অনুলিপি। ৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলে স্টিফেন দ্য ক্লার্ক নামের এক লিপিকার এই অনুলিপি তৈরি করেছিলেনমজার ব্যাপার হলো, এত জ্যামিতি কষে ফেললেও ইউক্লিড কিন্তু দৈর্ঘ্য মাপার জন্য আমাদের মতো সেন্টিমিটার, মিটার বা ইঞ্চির মতো কোনো একক বা ইউনিট ব্যবহার করেননি! এমনকি কোণ মাপার জন্য কোনো ডিগ্রির ধারণাও তাঁর বইয়ে ছিল না। কোণ বোঝাতে তিনি সবচেয়ে কাছাকাছি যা ব্যবহার করেছিলেন, তা হলো সমকোণ। পুরো বইয়ে সমকোণ নিয়ে তিনি প্রচুর মাতামাতি করেছেন!
এত খটোমটো আর কড়া নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও, পৃথিবীর ইতিহাসে ‘এলিমেন্টস’-এর চেয়ে বেশি ছাপা হওয়া আর প্রভাব ফেলা বই কিন্তু খুব কমই আছে।
চিত্র ১৩: ইউক্লিডের 'এলিমেন্টস'—এর ১৭৩২ সালের একটি সংস্করণ থেকে বিপ্রতীপ কোণগুলো যে সমান, তার প্রমাণপ্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই গ্রিক পণ্ডিত কেবল বুদ্ধি আর যুক্তির জোর দিয়ে এমন এক অটুট জ্ঞানের প্রাসাদ বানিয়ে গেলেন, যা যুগের পর যুগ ধরে পৃথিবীর বিজ্ঞানকে পথ দেখিয়ে আসছে! তবে দিনশেষে, জ্যামিতির রহস্য বোঝার তো আর একটাই নির্দিষ্ট পথ হতে পারে না। ইউক্লিড যেমন নিখুঁত প্রমাণের এক জাদুকরী রাজপ্রাসাদ গড়েছেন, তেমনি আমাদেরও নিজস্ব চোখ দিয়ে এই অসাধারণ জগৎকে দেখার স্বাধীনতা রয়েছে।
সে কারণেই এখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইউক্লিডের চেয়ে একটু বেশি সোজা নিয়ম ব্যবহার করা হয়েছে। ইউক্লিড কড়া প্রমাণের শক্ত ভিত গড়েছেন। আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে শক্ত পায়ে যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সেই যুক্তির ডানায় ভর দিয়ে জ্যামিতির জটিল নিয়মে আটকে না থেকে, এর আসল সৌন্দর্য, অদ্ভুত সব চমক আর রোমাঞ্চকর জগতে পা রাখা...
গণিত শিক্ষায় মস্তিষ্কের প্যাটার্ন কীভাবে সাহায্য করেমজার ব্যাপার হলো, এত জ্যামিতি কষে ফেললেও ইউক্লিড কিন্তু দৈর্ঘ্য মাপার জন্য আমাদের মতো সেন্টিমিটার, মিটার বা ইঞ্চির মতো কোনো একক বা ইউনিট ব্যবহার করেননি!
৪. থেলিসের উপপাদ্য
শুরুতে আমরা যে একটা অর্ধবৃত্তটার কথা বলেছিলাম, সে কথা মনে আছে? সেখানে অর্ধবৃত্তের পরিধির যেখান থেকেই দাগ টানো না কেন, কোণটা সবসময় ঠিক ৯০ ডিগ্রি হচ্ছিল। ওটা আসলে থেলিসের একটি উপপাদ্য বা থিওরেম। এই উপপাদ্য অনুসারে, অর্ধবৃত্তস্থ কোণ সবসময় এক সমকোণ বা ৯০°। এবার সময় এসেছে সেই রহস্যের পর্দা উন্মোচন করার!
থেলিসের এই বিখ্যাত প্রমাণটি হাতের মুঠোয় আনতে আমাদের আর মাত্র দুটো মূল ধারণা জানা থাকলেই চলবে। সে দুটি ধারণা হলো: সর্বসম ত্রিভূজ এবং সমদ্বিবাহু ত্রিভূজ। চলো, সেগুলো একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক!
সর্বসম ত্রিভুজ
সর্বসম মানে সবকিছু এক সমান। সহজ কথায়, দুটি ত্রিভুজের আকার আর আকৃতি যদি হুবহু এক হয়—যেন একটার ওপর আরেকটা বসালে একদম মিলে যায়—তবে তাদেরকে বলে সর্বসম ত্রিভুজ।
ছবি ১৪: SAS নীতি অনুযায়ী সর্বসমতাএখন এই দুটি ত্রিভূজ যে দেখতে হুবহু এক, তা বুঝবে কীভাবে?
একটি ত্রিভুজের মোট ৬টি প্রধান উপাদান থাকে—৩টি বাহু এবং ৩টি কোণ। কিন্তু দুটি ত্রিভুজ সর্বসম কি না তা জানার জন্য এই ৬টি উপাদান মিলিয়ে দেখার কোনো দরকার নেই! মাত্র ৩টি নির্দিষ্ট শর্ত মেলানো গেলেই ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়া যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো: দুটি ত্রিভুজের যদি যেকোনো দুটি বাহু এবং তাদের মাঝের কোণটি সমান হয়, তাহলে বাকি সবকিছুই চোখ বন্ধ করে সমান হবে! জ্যামিতির ভাষায় একে সংক্ষেপে বলে ‘বাহু-কোণ-বাহু’ (Side-Angle-Side বা SAS) নীতি।
ভিঞ্চির ৫০০ বছরের পুরোনো রহস্যের জট খুললেন এক ডেন্টিস্টসর্বসম মানে সবকিছু এক সমান। সহজ কথায়, দুটি ত্রিভুজের আকার আর আকৃতি যদি হুবহু এক হয়—যেন একটার ওপর আরেকটা বসালে একদম মিলে যায়—তবে তাদেরকে বলে সর্বসম ত্রিভুজ।
সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ
যে ত্রিভুজের যেকোনো দুটো বাহু সমান, তাকে বলে সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ।
জ্যামিতিতে এই ধরনের ত্রিভুজের ভূমিকা অনেক বড়, যার প্রধান কারণ হলো—সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ভূমি সংলগ্ন কোণ দুটি সবসময় সমান হয় (চিত্র ১৫)।
ছবি ১৫: একটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজএকটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজকে যদি আমরা ঘুরে পেছন দিক থেকে দেখি, তবুও সেটি দেখতে ঠিক একই রকম লাগবে। তবে এই বিষয়টি আরও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ করার উপায় হলো ABC ত্রিভুজের C কোণকে সমদ্বিখণ্ডিত করে একটি রেখা CD টানা (চিত্র ১৬)।
ছবি ১৬: সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ভূমি সংলগ্ন কোণ দুটি যে সমান, তার প্রমাণএতে পাওয়া যাবে যাবে ACD এবং BCD ত্রিভুজ। SAS নীতি অনুযায়ী, ACD এবং BCD ত্রিভুজ দুটি সর্বসম হয়ে যায়। আসেল এই ত্রিভুজ দুটি একটি আরেকটি আয়নার প্রতিবিম্ব বা উল্টানো রূপ। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই A এবং B কোণের মান দুটি সমান হতে বাধ্য। (কোনো ত্রিভুজের তিনটি বাহুই যদি সমান হয়, তাহলে তাকে সমবাহু ত্রিভুজ বলে। সে ক্ষেত্রে ত্রিভুজটি তিনটি ভিন্ন দিক থেকেই সমদ্বিবাহু, তাই এর তিনটি কোণই সমান হয়।)
০.৯৯৯...এবং ১ কি সমানSAS নীতি অনুযায়ী, ACD এবং BCD ত্রিভুজ দুটি সর্বসম হয়ে যায়। আসেল এই ত্রিভুজ দুটি একটি আরেকটি আয়নার প্রতিবিম্ব বা উল্টানো রূপ।
বৃত্ত কী
বৃত্তের মূল রহস্যই তো হলো এর কেন্দ্র O থেকে সীমানার (পরিধির) যেকোনো বিন্দুর দূরত্ব সবসময় সমান! আর এই দূরত্বকেই আমরা বলি ব্যাসার্ধ বা রেডিয়াস। এছাড়া বৃত্তের আরও কিছু অংশ থাকে। যেমন কেন্দ্র, পরিধি, ব্যাসার্ধ, ব্যাস, জ্যা, বৃত্তচাপ, অর্ধবৃত্ত। নিচে সেগুলো সম্পর্কে আমরা সংক্ষেপে জেনে নিই, কারণ এগুলো পরে আমাদের কাজে লাগবে।
কেন্দ্র হলো বৃত্তের একদম ভেতরের নির্দিষ্ট বিন্দু, যেখান থেকে সীমানার দূরত্ব সমান। এটা ঘড়ির কাঁটার সেই ছোট্ট পিনের মতো! ডায়ালের হাজারটা কাঁটা এদিক-সেদিক ঘুরুক না কেন, যে পিনটি এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে পুরো ঘড়িটাকে সামলায়, সেটাই কেন্দ্র।
পরিধি হলো বৃত্তের চারপাশের সম্পূর্ণ বাঁকানো সীমানা বা মোট দৈর্ঘ্য। সেটা জামার কোমর বা হাতের মাপ নেওয়ার ফিতার মতো! গোল যেকোনো কিছুর চারপাশে ফিতা পেঁচিয়ে তুমি যে পুরো দৈর্ঘ্যটা পাও, সেটাই তার পরিধি।
ব্যাসার্ধ হলো কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত টানা সোজা রেখা। ছোটবেলায় কম্পাস দিয়ে গোল আঁকার সময় পেন্সিল আর কাঁটার মাঝের দূরত্বটাই হলো ব্যাসার্ধ! এই ফাঁকটা যত বড় হবে, বৃত্তটাও হবে ঠিক তত বড়।
চতুর্থ মাত্রায় কি গিট দেওয়া সম্ভববৃত্তের কেন্দ্র ঘড়ির কাঁটার সেই ছোট্ট পিনের মতো! ডায়ালের হাজারটা কাঁটা এদিক-সেদিক ঘুরুক না কেন, যে পিনটি এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে পুরো ঘড়িটাকে সামলায়, সেটাই কেন্দ্র।
ব্যাস হলো কেন্দ্রগামী সোজা রেখা যা পরিধির দুই প্রান্তকে যোগ করে (এটি বৃত্তের বৃহত্তম জ্যা এবং ব্যাসার্ধের দ্বিগুণ)। ফুটবল বা ক্রিকেট বলকে ছুড়ি দিয়ে সোজা আড়াআড়ি দুই ভাগ করার দাগটা আসলে ব্যাস! একদম কেন্দ্র বা মাঝখান দিয়ে যে কাটটা একপাশ থেকে অন্যপাশে চলে যায়, সেটাই ব্যাস (যা ব্যাসার্ধের ডাবল)।
জ্যা হলো পরিধির যেকোনো দুটি বিন্দুকে সংযোগকারী সোজা দাগ (যা কেন্দ্রের ওপর দিয়ে নাও যেতে পারে)। সেটা একটা কেকের ওপর এলোমেলো ছুড়ির টানের মতো! কেন্দ্র পার না হয়ে কেকের যেকোনো দুটো দিক ছুঁয়ে সোজা কেটে দিলে যে দাগটা তৈরি হয়, সেটাই জ্যা।
বৃত্তচাপ হলো পরিধির যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অংশ বা টুকরো। ভাঙা চুড়ির এক টুকরো বাঁকা কাঁচের মতো! পুরো গোল চুড়িটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেলে যে ছোট বাঁকা অংশটা মেঝেতে পড়ে থাকে, সেটাই বৃত্তচাপ।
অর্ধবৃত্ত হলো ব্যাস দিয়ে বিভক্ত বৃত্তের একদম সমান অর্ধেক অংশ। আমাদের জ্যামিতি বক্সে কোণ মাপার যে অর্ধেক গোল স্কেলটা থাকে, সেটাই নিখুঁত অর্ধবৃত্তের সবচেয়ে বাস্তব রূপ।
এগুলো ব্যবহার করেই আমরা থেলিসের উপপাদ্যটা প্রমাণ করবো।
জুতার ফিতা বাঁধার জ্যামিতি!অর্ধবৃত্ত হলো ব্যাস দিয়ে বিভক্ত বৃত্তের একদম সমান অর্ধেক অংশ। আমাদের জ্যামিতি বক্সে কোণ মাপার যে অর্ধেক গোল স্কেলটা থাকে, সেটাই নিখুঁত অর্ধবৃত্তের সবচেয়ে বাস্তব রূপ।
থেলিসের উপপাদ্য
আমরা প্রমাণ করতে চাই যে, চিত্র ১৮-এর অর্ধবৃত্তের ওপর P যদি যেকোনো একটি বিন্দু হয়, কোণ APB = ৯০ ডিগ্রি হবে। এখানে কোণ APB দিয়ে AP এবং PB রেখা দুটির মধ্যবর্তী কোণকে বোঝানো হচ্ছে।
ছবি ১৮: থেলিসের উপপাদ্যের প্রমাণচিত্র অনুযায়ী, অর্ধবৃত্তের কেন্দ্র হলো O। এবার কেন্দ্র O থেকে পরিধির P বিন্দু পর্যন্ত একটি সোজা দাগ (OP) টেনে দাও। একটু খেয়াল করো তো! OA, OB, আর OP—তিনটিই কিন্তু এই একই বৃত্তের ব্যাসার্ধ! কাজেই OA = OB = OP। কারণ একটি বৃত্তের কেন্দ্র থেকে তার পরিধি পর্যন্ত যেকোনো বিন্দু পর্যন্ত টানা সবগুলো রেখাই পরস্পর সমান।
আর OP দাগ টানার সাথে সাথেই থালার ওপর যেন দুটো সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ তৈরি হয়ে গেল! সেগুলো হলো: AOP এবং BOP।
বাম পাশের AOP ত্রিভূজে OA = OP। তাই এর নিচের দুটো কোণই সমান। এই কোণের মান ধরলাম a।
আবার ডান পাশের BOP ত্রিভূজে OB = OP। তাই এর নিচের দুটো কোণও সমান। এই কোণের মান ধরে নিলাম b।
এবার পুরো বড় ত্রিভুজটির APB কোণের দিকে তাকাও। এর তিনটে কোণের মান কত?
A কোণে আছ a। B কোণে আছে b। আর মাথায় থাকা P কোণটিতে আছে (a + b)।
আমরা একটু আগেই প্রমাণ করেছি, যেকোনো ত্রিভুজের তিন কোণের যোগফল সবসময় ১৮০ ডিগ্রি।
কাজেই যুক্তি অনুসারে, a + b + (a + b) = ১৮০ ডিগ্রি।
2a + 2b = ১৮০ ডিগ্রি,
2(a + b) = ১৮০ ডিগ্রি,
কাজেই, a + b = ৯০ ডিগ্রি।
আর a + b-ই তো ছিল APB ত্রিভুজের মাথায় থাকা P কোণটি)! অর্থাৎ, APB = ৯০ ডিগ্রি! (প্রমাণিত)
কী আশ্চর্য আর চমৎকার, তাই না?
শুরুতে যেটা দেখে বিশ্বাস করা কঠিন মনে হচ্ছিল, সঠিক নিয়মে আর যুক্তির আলো ফেলে তাকাতেই কয়েক মিনিটের মধ্যে মনে হলো—‘আরে! এ তো হওয়ারই ছিল, এ ছাড়া তো উপায়ই ছিল না!’
গণিতের সত্যিকারের সৌন্দর্য আর আনন্দ ঠিক এই জায়গাটাতেই লুকিয়ে থাকে!
* ডেভিড অ্যাচিসনের দ্য ওয়ান্ডার বুক অব জিওমেন্ট্রি: আ ম্যাথমেটিক্যাল স্টোরি অবলম্বনেগুড উইল হান্টিং মুভিটি কেন গণিতবিদদের এত অপছন্দ