যখন বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে ভাবতে হবে

· Prothom Alo

টিকটকে একটা ভিডিও খুব ভাইরাল। দেখা যায়, একটা শিশু সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। পাশে রাস্তায় দাঁড়ানো আরেক শিশু তাকে বলছে, আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। সাইকেল চালানো শিশু বলে, আচ্ছা। তারপর বন্ধু হতে চাওয়া শিশুটা ওই শিশুর সাইকেলের পেছনে ছুটতে শুরু করে। এই ভিডিও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বহু মানুষ শেয়ার করেছে। এই শিশুদের মতো আমরাও ছোটবেলায় সম্ভবত খুব সহজে বন্ধু বানাতে পারতাম। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর আমাদের যখন বিচারবুদ্ধি তৈরি হয়, তখন আমরা বুঝতে পারি, বন্ধু হওয়া সবাই আমাদের প্রকৃত বন্ধু নয়। কেউ কেউ অবশ্য আমাদের সত্যিকারের বন্ধু। আমাদের জীবনে তারা সত্যিই খুব ইতিবাচক প্রভাব রাখে।

Visit moryak.biz for more information.

তবে কিছু বন্ধুকে নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়। সত্যিই কি এই বন্ধু আমাদের জীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তখন এই বন্ধুদের জীবন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তবে ছোটবেলায় বন্ধু বানানো যেমন সহজ, বন্ধুকে আর বন্ধু না মনে করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তত সহজ নয়। কিন্তু কখনো কখনো বন্ধুকে আমাদের ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এই লেখায় আমরা জানব, কোনো বন্ধুত্বকে নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে কি না।

মনে রাখতে হবে, বন্ধুত্ব টিকে থাকার জন্য শুধু ভালো বোঝাপড়া বা মানসিক মিলই যথেষ্ট নয়; শক্তিশালী বন্ধুত্বগুলো নির্ভর করে ছোট ছোট কিন্তু অর্থবহ যত্নের ওপর। যেমন ব্যস্ততার মধ্যেও বন্ধুর মেসেজের উত্তর দেওয়া। বড় কোনো অসুস্থতা বা পরীক্ষার পর খোঁজ নেওয়া। কিংবা বাসায় আরাম করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করলেও কষ্ট করে হলেও বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা। সঠিক বন্ধুর ক্ষেত্রে এসব কাজ খুব একটা ‘পরিশ্রম’ বলে মনে হয় না। কিন্তু কখনো কখনো এমন হয়, বন্ধুত্বের সম্পর্কে তোমাকে যতটা ইফোর্ট দেওয়া বা প্রচেষ্টা করতে হচ্ছে, এর মূল্য ততটা নয়।

নর্দার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি কলেজ অব এডুকেশনের কাউন্সেলিং অ্যান্ড হায়ার এডুকেশন বিভাগের চেয়ারম্যান সুজান ডেগেস-হোয়াইট। তিনি বাজে বন্ধুত্ব নিয়ে একটি বই লিখেছেন। নাম টক্সিক ফ্রেন্ডশিপস: নোয়িং দ্য রুলস অ্যান্ড ডিলিং উইথ দ্য ফ্রেন্ডস হু ব্রেক দেম। তিনি বলেন, ‘বন্ধুত্ব তৈরি করতে হয়। এটি স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা একটি সম্পর্ক। আমাদের নিজের পছন্দের সম্পর্ক।’

এর মানে, বন্ধুত্বের জন্য যত্ন ও সময় দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এমন একটি সম্পর্কের পেছনে তোমাকে অবিরাম মানসিক ও আবেগীয় শক্তি খরচ করে যেতে হবে, যা আসলে তোমাকে আনন্দের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানী ও দম্পতি-পরামর্শক প্যাট্রিস লে গয়ের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কগুলোয় কিছুটা ভারসাম্যহীনতা থাকবেই। ছোটরা স্কুল বদলে অন্য শহরে চলে যায় মা-বাবার সঙ্গে। বড়রা কাজের প্রয়োজনে নতুন শহরে যায়। কর্মক্ষেত্রে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বিয়ে করে। সন্তান হয়। চাকরি বদলায়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের সময় ও মানসিক শক্তির পরিমাণও বদলে যায়। ৫৪ বছর বয়সে একজন মানুষের সক্ষমতা ২০ বছর বয়সের মতো না–ও থাকতে পারে।

তবু এর মানে এই নয় যে তোমাকে দীর্ঘদিনের একপেশে সম্পর্ককে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে হবে। এখানে তিনটি লক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যা থেকে তুমি ভাবতে পারো, সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে কি না।

বন্ধুরা মেসেজের উত্তর না দিলে ভাবি তারা আমাকে উপেক্ষা করছে

১. বন্ধুত্ব হারানোর ভয় ছাড়া যদি নিজের মতো না থাকা যায়

ডেগেস-হোয়াইট বলেন, ‘পৃথিবীর আর কারও সঙ্গে না হোক, অন্তত বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত ও নিজের আসল রূপে থাকা প্রয়োজন।’ এর মানে এই নয় যে প্রতিটি পরিচিত মানুষের কাছে নিজের জীবনের গভীরতম গোপন কথা খুলে বলতে হবে। তবে অন্তত এমন তো হওয়া উচিত যে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে তোমাকে নিজের স্বভাব বদলাতে হবে না।

বন্ধুর আশপাশে তুমি কেমন আচরণ করো, সেটা খেয়াল করো। হতে পারে, তুমি তোমার সাফল্যের খবর আর তাকে বলো না। কারণ, সে জানলে খুশি হওয়ার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক বা ঈর্ষাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, নিজের মতামত তুমি নরম করে বলো। অর্জনগুলো ছোট করে দেখাও। কিংবা আড্ডার সময় নিজেকে আরও সহনশীল বা ঝামেলাহীন হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করো। এগুলো করো শুধু তার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য বা সমালোচনা এড়ানোর জন্য।

এমন পরিস্থিতিতে তুমি আসলে একটি সুস্থ বন্ধুত্বের সবচেয়ে মৌলিক সুবিধাটিই হারিয়ে ফেলো। নিজে যেমন, তেমনভাবে তোমাকে গ্রহণ করা ও বোঝার অনুভূতি আর এই সম্পর্কে থাকে না।

মা–বাবা ইদানীং আমার ওপর অযথা সন্দেহ করছেন

২. সব সময় তোমাকেই যোগাযোগ করতে হয়

অনেকেই বন্ধুত্ব কতটা বেশি, সেটা বিচার করেন, কত বেশি যোগাযোগ হয় তার ওপর। কত ঘন ঘন মেসেজ দেওয়া হয় বা কত নিয়মিত দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত যোগাযোগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত অন্যের যত্ন নেওয়া।

ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টি ফেরারির ভাষায়, ‘ব্যস্ত কোনো বন্ধুও তোমাকে অনুভব করাবে যে তুমি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’ সে হয়তো সব সময় দেখা করার সুযোগ পাবে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই যত ব্যস্ত বা ক্লান্ত থাকুক, যাদের কথা ভাবে, যাদের মূল্য দেয়, তাদের জন্য কিছু না কিছু করার চেষ্টা করে। কেউ হয়তো সামনাসামনি দেখা করার সময় পায় না। তবে সুযোগ পেলে একটা মেসেজ দেয় বা কল করে। কেউ হয়তো শুধু একটি মেসেজ পাঠিয়ে জানায় সে খুব ব্যস্ত, কিন্তু তবু সে তোমার কথা ভাবে কি না।

চিন্তার ব্যাপার তখন হবে, যখন বন্ধুর সঙ্গে তোমাকেই সব সময় যোগাযোগের চেষ্টা করতে হবে। বন্ধুত্ব টিকে থাকবে তোমার প্রচেষ্টার ওপর। এক-দুবার এমন হলে অসুবিধা নেই। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে এমন হতে থাকলে বিষয়টা তোমাকে ভাবতে হবে। তাই কোনো একটি হতাশাজনক সপ্তাহ নিয়ে বেশি না ভেবে গত কয়েক মাস বা কয়েক বছরকে সামগ্রিকভাবে ভেবে দেখতে পারো। কোনো পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে উদ্যোগ কে নেয়? খোঁজ কে রাখে? জন্মদিন কে মনে রাখে? গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পর কে যোগাযোগ করে? কথোপকথন চালিয়ে রাখার চেষ্টা কে করে?

তুমি যদি একেবারেই যোগাযোগ বন্ধ করে দাও, তাহলে কি আদৌ কোনো বন্ধুত্ব অবশিষ্ট থাকবে?

আমার আত্মবিশ্বাস একদম কমে গেছে, বুঝতে পারছি না কী করব

৩. সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করা যায় না

যারা বন্ধুত্বের মূল্য দেয়, তারা সেটি কাজের মাধ্যমে দেখায়। সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলে তারা কিছু একটা করে। ক্ষমা চায়, অস্বস্তিকর আলোচনায় বসে, কিংবা এমন কোনো আচরণ পরিবর্তন করে, যা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে। এভাবেই আমরা সম্পর্কে এগিয়ে যাই।

আবার সামান্য সমস্যাতেই যদি কেউ বিষয়টি এড়িয়ে যায়, গুরুত্ব না দেয় বা সম্পর্ক নিয়ে আর কোনো চেষ্টা না করে, তাহলে সেটি অনেক কিছু বলে দেয়। ডেগেস-হোয়াইট বলেন, ‘এর মানে সম্পর্কটি ধরে রাখার ব্যাপারে তারা আর তোমার মতো চেষ্টা করতে আগ্রহী নয়।’ সময়ের সঙ্গে এসব আচরণ বারবার হতে থাকলে বুঝবে, সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতে সে আসলে তেমন একটা চেষ্টা করতে বা বাঁচিয়ে রাখতে রাজি নয়।

এখন কোনো বন্ধুত্ব যদি আর তোমার কাজে না লাগে, উপকারে না আসে, তখন কী করবে? বেশির ভাগ বন্ধুত্বের সমাপ্তি কোনো নাটকীয় ঝগড়া বা আনুষ্ঠানিক কোনো ‘শেষ কথা’ দিয়ে হয় না। সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। যোগাযোগ কমে যায়, প্রত্যাশাও কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একপেশে হয়ে পড়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি যথাযথ পদ্ধতি।

এর মানে যে তোমার জন্য মাত্র ১০ শতাংশ চেষ্টা করছে, তার জন্য তুমি ৯০ শতাংশ চেষ্টা করবে না। যে নিয়মিত পরিকল্পনা বাতিল করে দেবে, তার নিজের সুবিধার জন্য বারবার নিজের সময়সূচি বদলাবে না। যে বন্ধু তোমার কথায় আগ্রহ দেখায় না বা মনোযোগ দেয় না, তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব। কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলো তাকে বলে ফেলা জরুরি নয়।

যদি সম্পর্কটি স্বাভাবিকভাবেই ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেটি দিয়ে বোঝা যায়, দুজনের মধ্যেই একই অনুভূতি হচ্ছে। মানে এই বন্ধুত্ব এর স্বাভাবিক পরিণতিতে পৌঁছে গেছে।

তবে কিছু পরিস্থিতিতে সরাসরি কথা বলা প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে যদি সে তোমার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়, অথবা এখনো তোমার সঙ্গে আগের মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অথচ তুমি আর সেটা পারছ না।

যত কঠিনই হোক, একটি সত্য মেনে নেওয়া প্রয়োজন—সব বন্ধুত্ব চিরকাল টিকে থাকার জন্য তৈরি হয় না। অনেক সময় কিছু সম্পর্ক, কিছু প্রত্যাশা, এমনকি কিছু মানুষকেও অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

ওয়াশিংটন পোস্ট–এর প্রতিবেদন অবলম্বনে

আমার ধৈর্য খুব কম

Read full story at source