যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধ
· Prothom Alo

ইরানে নতুন করে বড় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাঁচ দিন বিরতির পর বুধবার রাতে এ হামলায় ইরানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। জবাবে কুয়েত ও জর্ডানকে নিশানা বানিয়েছে ইরান। একই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন, সিরিয়া ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশজুড়ে এখন ছড়িয়ে পড়েছে সংঘাত। পরিস্থিতি আরও জটিল করছে পাল্টাপাল্টি হুমকি।
শুধু ওপরের দেশগুলোই নয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বুধবার দিনের বেলা প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার শিকার হচ্ছে সৌদিও। এদিন মিসরের বন্দরে আক্রান্ত হয়েছে দুটি জাহাজ। বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি পথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব আল–মানদেব প্রণালি ঘিরেও উত্তেজনা চলছে।
Visit moryak.biz for more information.
অথচ কয়েক দিন আগেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার দিকে যাচ্ছিল। দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া এ সংঘাত যে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে, তা বন্ধে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছিলেন, আলোচনা ‘ভালো’ চলছে। ইরানও আলোচনার কথা জানিয়েছিল। তবে সে প্রচেষ্টা যে ফলপ্রসূ হয়নি, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে। বৃহস্পতিবার ইরানের খোজেস্তান প্রদেশের আহভাজ শহরেএখন ট্রাম্পের কথায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বুধবার রাতে ইরানে মার্কিন হামলার আগে ফক্স নিউজকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ওদের (ইরান) ওপর কঠোর হামলা চালাব। ওরা কঠিন শাস্তি পাবে।’ আর হামলার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যত দিন মার্কিন হুমকি থাকবে, তত দিন নিজেদের রক্ষায় যা দরকার করবে তেহরান।
এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, গুতেরেস কিছুদিন ধরেই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে আলোচনায় না ফিরলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, সেটাই ঘটছে। এগুলো ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে না।
আইআরজিসির তিন সদস্য নিহত
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম যুদ্ধবিরতি হয় ৮ এপ্রিল। এরপর স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার কথা থাকলেও অগ্রগতি হয়নি। চলছিল উত্তেজনা। এরই মধ্যে ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে দুই দেশ। হরমুজ নিয়ে বিরোধের জেরে সেই স্মারকও কার্যত ভেঙে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ৭ জুলাই থেকে টানা ১৩ দিন পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। এরপর পাঁচ দিন বিরতি ছিল।
এ বিরতির মধ্যেই মূলত আবার আলোচনার আশা জেগেছিল। তবে জর্ডানে মার্কিন একটি ঘাঁটিতে হামলার পর বুধবার রাত থেকে নতুন করে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জর্ডানে হামলার প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা চালানো হয়েছে। আরও হামলার প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে।
হামলায় ক্ষয়ক্ষতির খবর উঠে এসেছে দেশটির গণমাধ্যমে। এর মধ্যে কেশম দ্বীপে হামলায় তিন বেসামরিক ইরানি নিহত হয়েছেন। জানজান প্রদেশে নিহত হয়েছেন আইআরজিসির তিন সদস্য। এ ছাড়া বুশেহর প্রদেশের বুশেহর, জাম ও খোরমোজ শহর, খুজেস্তান প্রদেশের আহভেজ শহর, ফারস প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা, হোরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাস এবং কিশ দ্বীপ আক্রান্ত হয়েছে।
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার সমালোচনা করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক ট্রিটা পারসি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এ হামলায় ট্রাম্পের লক্ষ্য কী? হামলা চালিয়েও ইরানকে আলোচনায় ফেরাতে পারেননি তিনি। আমার মনে হয়, এ মুহূর্তে প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া তাঁর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাই এ যুদ্ধ আবার শুরু করা স্পষ্টতই একটি ভুল।’
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে এবার কি সত্যিই চাপে পড়ে গেল সৌদি আরবমার্কিন এফ–৩৫ ধ্বংসের দাবি
বুধবার রাতের হামলার পর একটি হুমকি দিয়েছিল আইআরজিসি। তা হলো ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ সহায়তায় আজ আগ্রাসনকারীদের শাস্তি দেওয়া হবে।’ এর পর থেকে কুয়েত ও জর্ডানে ব্যাপক হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চলছিল হামলা। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ করপোরেশন কাউন্সিল (জিসিসি)।
আইআরজিসির ভাষ্য, কুয়েতের আলী–আল–সালেম সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তারা। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা থাকেন। এতে ড্রোন রাখার দুটি হ্যাঙ্গার ও একটি জ্বালানি ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। অপর দিকে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, ইরানের হামলায় একটি বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটি একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের। হামলায় ওই ভবনে থাকা এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া জর্ডানের আল–আজরাক বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। বাহিনীটির ভাষ্যমতে, হামলায় ঘাঁটিতে থাকা তিনটি মার্কিন এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। আরও তিনটি যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যদিও এ দাবি নাকচ করে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ–৩৫ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি।
মার্কিন হামলার পর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন ইরানিরা। বৃহস্পতিবার ইরানের কেশম দ্বীপেরাতভর কেঁপেছে দক্ষিণ লেবানন
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির আগপর্যন্ত ইরানে হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। এর পর থেকে ইরানে হামলা বন্ধ করলেও লেবাননে ছাড় দেয়নি তারা। লেবাননে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নির্মূলের কথা বলে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। কয়েক দফায় যুদ্ধবিরতি হলেও কাজে আসেনি।
বুধবার রাতেও ইসরায়েলের হামলায় কেঁপে ওঠে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রাম। উপকূলবর্তী টায়ার শহর পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল বিস্ফোরণের শব্দ। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, ভোর পর্যন্ত আল–মানসুরি, মাজদাল জৌন ও মাজরাত বুয়ুত আল–সিয়াদ গ্রামে বোমায় বিস্ফোরণ ঘটায় ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল সিরিয়ার কুনেইতরা এলাকায়ও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
এদিকে ইরানের যুদ্ধের আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবারও ব্যতিক্রম ছিল না। এদিন উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার বাসিন্দাদের হাসপাতাল থেকে ছয়টি মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারজন আগের ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতায় মোট ৭৩ হাজার ৩৪১ জন নিহত হলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়া ইরানকে সহায়তার তথ্য এলেও ট্রাম্প কেন পাত্তা দিচ্ছেন নাতবু আলোচনার চেষ্টা
সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছালেও শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। জুনে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় আলোচনা শুরু করতে তৎপরতা চালানোর কথা জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি। তিনি বলেন, সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলাদা আলোচনা করছে ইরান। তেহরান চায়, এই নৌপথে তাদের নির্ধারিত পথে জাহাজ চলবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া—হরমুজের দক্ষিণে ওমান উপকূল–সংলগ্ন পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হবে। দুই পক্ষের এ বিরোধে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। ওমান উপকূল দিয়ে কোনো জাহাজ চললে ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে।
মার্কিন সেনাদের মোবাইলের ভিডিও দেখে হামলার ছক কষে ইরান, জব্দ হতে পারে তাঁদের ফোনপ্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র। বৃহস্পতিবার ইরানের রাজধানী তেহরানেইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরানে ওমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণেই বন্ধ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড হলো হরমুজে ইরানের জাহাজে হামলা এবং ইরানের বন্দরে অবরোধ। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিভিন্ন পক্ষ আলোচনা চলার কথা বললেও এখনো কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন গবেষক ট্রিটা পারসি। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই মনে করছে আরও সামরিক অভিযান চালানোর পর যুদ্ধে তারা ভালো অবস্থানে আসবে। এ কারণেই সমঝোতা হতে দেরি হচ্ছে। তবে শেষ কথা হলো আলোচনার ভিত্তিতেই যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
সিআইএ ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: রাশিয়া যেভাবে ‘কলকাঠি’ নাড়ল