যে চোখ ঘুমায় না: অ্যালগরিদমের কাঠগড়ায় দুর্নীতিবাজ

· Prothom Alo

বাংলাদেশে দুর্নীতি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি কাঠামোগত মহামারি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ দুর্নীতি ধারণা সূচকে (সিপিআই–২০২৪) বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম স্থানে রয়েছে, স্কোর মাত্র ২৫। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ হারায় শুধু দুর্নীতির কারণে, যা বার্ষিক হিসাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। এই অর্থ যদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যেত, তাহলে বাংলাদেশের চেহারা আজ ভিন্ন হতো। কিন্তু বারবার কমিটি গঠন, তদন্ত ও বিবৃতির পরেও দুর্নীতির শিকড় থাকে অক্ষত। কারণ, আমরা এত কাল দুর্নীতি মোকাবিলা করেছি প্রতিক্রিয়াশীল পদ্ধতিতে ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা। এখন সময় এসেছে একটি স্থায়ী, প্রতিরোধমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো নির্মাণের। এ প্রসঙ্গে সরকারের একটি সাম্প্রতিক উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ নীতি প্রণয়নের কাজ করছে সরকার।

Visit bettingx.bond for more information.

পরিকল্পনা অনুযায়ী জন্মের পর থেকেই একটি শিশুর ডিজিটাল আইডি চালু হবে, যা যুক্ত থাকবে ডিজিটাল ওয়ালেটের সঙ্গে। এই ওয়ালেট ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে এবং দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য এই ব্যবস্থা চালুর কাজ শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে ফাইভ–জি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা ও ব্যবহারকারীদের ১০০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়াও সরকারের অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য। এই ডিজিটাল পরিচয় কাঠামো কেবল সেবা প্রদানের হাতিয়ার নয়, এটিই হতে পারে দুর্নীতি প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে তোলা সম্ভব একটি জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা এনডব্লিউএমএ, যা হবে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বয়ংক্রিয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

বাংলাদেশে বর্তমানে দুদক, এনবিআর, বিএফআইইউ, সিআইডিসহ একাধিক সংস্থা দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করে। কিন্তু এই সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর তথ্য আদান–প্রদানের কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই। কেউ একজন ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনেন, স্ত্রীর নামে গয়না করেন, সন্তানকে বিদেশে পড়ান, কিন্তু কোনো সংস্থার কাছে সম্পূর্ণ চিত্রটি একসঙ্গে থাকে না। এই তথ্যের শূন্যতাই দুর্নীতিবাজদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। প্রস্তাবিত জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সেই আশ্রয় ভেঙে দেবে। এর মূল ভিত্তি হবে সরকারের ঘোষিত ডিজিটাল আইডি কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে গড়া জাতীয় সম্পদ ট্র্যাকিং সিস্টেম। প্রত্যেক নাগরিকের সরকারি–বেসরকারি–নির্বিশেষে সম্পদ অর্জন ও আর্থিক লেনদেন তার ডিজিটাল আইডি নম্বরের বিপরীতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নথিভুক্ত হবে। জমি বা ফ্ল্যাট কেনার দলিল নিবন্ধন, ব্যাংকে মোটা অঙ্কের লেনদেন, বিদেশ ভ্রমণের পাসপোর্ট তথ্য, স্বর্ণ বা হীরা কেনা প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটাল আইডি এন্ট্রি বাধ্যতামূলক হবে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে আপলোড হবে। সরকার ইতিমধ্যে ডিজিটাল ওয়ালেটকে ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এই ওয়ালেট–কেন্দ্রিক লেনদেনের তথ্যপ্রবাহ যদি জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে রিয়েল–টাইমে প্রবাহিত হয়, তাহলে কালোটাকার গতিপথ আর আড়াল থাকে না।

এই ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে একটি বুদ্ধিমান আয়–ব্যয় বিশ্লেষণ সফটওয়্যার, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিতে পরিচালিত হবে। এই সফটওয়্যার প্রত্যেক নাগরিকের বার্ষিক ঘোষিত আয় ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে রিয়েল–টাইম তুলনা করবে। কোনো ব্যক্তির আয় ১০ লাখ টাকা হলে, আর তিনি একই বছর গাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনলে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট পাঠাবে। ৫ থেকে ১০ বছরের সম্পদ বৃদ্ধির প্রবণতা বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক লাফকে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে চিহ্নিত করবে। পরিবারের সব সদস্যের সম্পদ একত্র করে ‘পারিবারিক সম্পদ প্রোফাইল’ তৈরি করবে। কারণ, দুর্নীতিবাজেরা প্রায়ই স্বামী–স্ত্রী বা সন্তানের নামে সম্পদ ছড়িয়ে রাখেন। বিদেশে ভ্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘন ঘন বিদেশ গমন ও উচ্চ মূল্যের হোটেল বিল সম্পদের সঙ্গে মেলানো হবে। ক্রেডিট কার্ড ও ডিজিটাল ওয়ালেট ডেটার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে ডিজিটাল খরচের সম্পূর্ণ চিত্র তৈরি করবে। সন্দেহজনক ক্ষেত্রে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুদক, সিআইডি বা বিএফআইইউকে মামলা তদন্তের নির্দেশনা পাঠাবে মানবিক হস্তক্ষেপের আগেই। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী স্মার্টফোনের দাম আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে, যাতে একজন কৃষক, দিনমজুর বা রিকশাচালকও ডিজিটাল সেবার আওতায় আসতে পারেন। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংযোগের সুফল শুধু ডিজিটাল সেবায় নয়, আর্থিক স্বচ্ছতায়ও আসবে। যখন দেশের প্রত্যেক মানুষ ডিজিটাল ওয়ালেটে লেনদেন করবেন, তখন কালোটাকার সমান্তরাল অর্থনীতি টিকে থাকার জায়গা পাবে না। দুর্নীতি প্রতিরোধে আরও কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ একই সঙ্গে নেওয়া দরকার। সরকারি ক্রয়ে ই–প্রকিউরমেন্ট বাধ্যতামূলক করা দরকার, যেখানে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় হবে এবং মানবিক বিবেচনার সুযোগ ন্যূনতম থাকবে।

হুইসেল ব্লোয়ার সুরক্ষা আইন শক্তিশালী করতে হবে, যেন ভেতর থেকে দুর্নীতির তথ্য দেওয়া ব্যক্তি নিরাপদ থাকেন এবং আর্থিকভাবে পুরস্কৃত হন। বেনামি সম্পত্তি আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং প্রতিটি সম্পদের প্রকৃত মালিক চিহ্নিত করার জন্য ডিজিটাল ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ রেজিস্ট্রি’ চালু করা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী শুধু দাখিল নয়, তা অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন নাগরিক সমাজও যাচাই করতে পারে। এ ছাড়া নগদ লেনদেনের ওপর নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করে সব বড় লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালনা বাধ্যতামূলক করলে কালোটাকার প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষকে কার্যকর করতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য সংযোগ আবশ্যক। দুদক, সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ ও এনবিআরের মধ্যে সরাসরি ডিজিটাল লিংকেজ স্থাপন করতে হবে। বিএফআইইউ ইতিমধ্যে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন সংগ্রহ করে, কিন্তু এই তথ্যগুলো যদি জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ডেটাবেজের সঙ্গে রিয়েল–টাইমে সংযুক্ত থাকে, তাহলে তদন্তের গতি ও নির্ভুলতা বহুগুণ বাড়বে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এফএটিএফের সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ট্র্যাক করাও সম্ভব হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা এই প্রস্তাবের পক্ষে শক্তিশালী সাক্ষ্য দেয়। সিঙ্গাপুর ১৯৬০–এর দশকে এশিয়ার অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ থেকে আজ বিশ্বের তৃতীয় কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ, সিপিআই স্কোর ৮৩। এই রূপান্তর হয়েছে কঠোর সম্পদ ঘোষণা বিধিমালা ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৩ সালে ‘রিয়েল নেম ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম’ চালু করার পর দেশটির সিপিআই স্কোর ২০ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ভারত ‘প্রজেক্ট ইনসাইট’ চালু করার পর ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আয়কর বিভাগের শনাক্তকৃত কর ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অপ্রদর্শিত সম্পদ উদ্ধার ত্বরান্বিত হয়েছে। রুয়ান্ডা ডিজিটাল গভর্ন্যান্সকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিয়ে মাত্র দুই দশকে স্কোর ৫৪–এ উন্নীত করেছে। এস্তোনিয়া সব সরকারি সেবা ডিজিটাল পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করে দুর্নীতির সুযোগ এতটাই কমিয়ে এনেছে যে, দেশটি আজ ইউরোপের অন্যতম স্বচ্ছ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। এই দেশগুলোর প্রতিটির সাফল্যের মূলে আছে একটি অভিন্ন কৌশল—ডিজিটাল পরিচয়কে আর্থিক স্বচ্ছতার কেন্দ্রে বসানো।

দুর্নীতির শাস্তির প্রশ্নে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ শুধু বাজেয়াপ্ত নয়, সুদসহ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার বিধান করতে হবে। দুর্নীতিতে দণ্ডিত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের সরকারি সুযোগ–সুবিধা, পাসপোর্টের সুবিধা ও ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিলের আইন করতে হবে।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে শুধু অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তথ্য অ্যাকসেস করতে পারবে। কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ, দুর্বল নিরাপত্তা উল্টো নতুন বিপদ ডেকে আনতে পারে। দেশে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে স্মার্টফোন নেই অর্থাৎ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। এই ডিভাইস–বৈষম্য দূর না হলে ডিজিটাল আইডি কাঠামো সর্বজনীন হবে না। তাই স্মার্টফোনের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে নামিয়ে আনার সরকারি পরিকল্পনা কেবল ডিজিটাল সংযোগের প্রশ্ন নয়, এটি দুর্নীতি প্রতিরোধ কাঠামোর পূর্বশর্তও বটে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ, কোনো ব্যবস্থাই কার্যকর হয় না যদি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ছাড় দেওয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজ, ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার এবং সরকারের ঘোষিত ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ নীতি এই বিদ্যমান ও পরিকল্পিত ডিজিটাল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা সম্ভব। দুর্নীতি কোনো নৈতিক দুর্বলতার ফল মাত্র নয়, এটি একটি সিস্টেমগত ব্যর্থতা। সিস্টেমের ব্যর্থতা দূর করতে হয় উন্নত সিস্টেম দিয়েই। যখন প্রতিটি লেনদেন ডিজিটাল, প্রতিটি সম্পদ নথিভুক্ত ও প্রতিটি আয়–ব্যয়ের তুলনা স্বয়ংক্রিয়, তখন দুর্নীতি লুকানোর জায়গা সংকুচিত হতে বাধ্য। জন্মের প্রথম দিন থেকে একটি ডিজিটাল পরিচয় নিয়ে যে শিশু বেড়ে উঠবে, সে একটি স্বচ্ছ রাষ্ট্রেরই নাগরিক হবে, যদি আমরা এই মুহূর্তের সুযোগটি কাজে লাগাতে পারি। ডিজিটাল প্রহরীর চোখ এড়ানো কঠিন। সেই চোখ তৈরির সময় এখনই।

*লেখক: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Read full story at source