নিশিরাত
· Prothom Alo

কাঁটায় কাঁটায় রাত তিনটা। মিটফোর্ড হাসপাতাল মসজিদের ডিজিটাল ঘড়িতে সময় দেখা বলে কাঁটায় কাঁটায় শব্দটা জুতসই হলো কি না বলতে পারছি না। শীতে জমে যাচ্ছি। চা খেতে পেলে ভালো লাগত। হাসপাতালের রাত্রিগুলো শ্লথমতো বয়ে যায়।
Visit chickenroadslot.pro for more information.
একটি বেঞ্চিতে বসে আছি। একটু দূরে বেশ হৃষ্টপুষ্ট একটা কুকুর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আমার দিকে উদাস তাকাচ্ছে। চারদিকে জমে থাকা নিস্তব্ধতা ভেঙেচুরে দূরে কান্নার শব্দ অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ে হঠাৎ। কেউ একজন মারা গেল হয়তো। আমি একটা সিগারেট ধরালাম।
কুকুরটা হঠাৎ খেপে গেল কেন? ঘেউ ঘেউ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। মনে হলো ভয় পেয়েছে কিছু একটা দেখে। ভয় পাওয়ার মতো কী আছে। মৃত্যু?
দাদি বলতেন পশুপাখি নাকি আগে থেকে অনেক কিছু বুঝতে পারে। কাকপক্ষী ডাকলে কিংবা কুকুর কানলে তা নাকি বিপদ ঘনিয়ে আসার লক্ষণ। আমাদের উঠানকোণে চালতাগাছটার নিচে যে শানবাঁধানো টিউবওয়েল; দাদা যেদিন নারকেলগাছ থেকে পড়ে মারা যান, সেদিন ভোরে নাকি একটা কাকপক্ষী ওইটার ওপরে বসে ডাকতে ডাকতে কয়েকটা এমনমতো ঠোকর দেয় যে পরে সেখানে রক্ত জমে থাকতে দেখা যায়। নারকেলগাছে সাপ ছিল। কোন সাপই–বা থাকতে পারে। লাউডগা–জাতীয় নির্বিষ। ভয়ে তার হাতের গ্রিপ ফসকে গেয়েছিল সাপ দেখে।
আমি প্রচলিত কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না, আবার অবিশ্বাসও করি না। এই বিপুল রহস্যময় প্রকৃতির কতটুকুই–বা জানি। দেয়ার আর ম্যানি থিংকস বিটুইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ, ইনডিড।
—লাইটারটা একটু দিবেন ব্রাদার? সিগ্রেট ধরাব। শীতে তো কাঁপাকাঁপি লাগায়ে দিছে।
এই লোক কখন পাশে এসে বসেছে খেয়াল করিনি। আমি কি এতটাই অন্যমনস্ক? আমার সম্পর্কে রানুর যে ধারণা (ভিড়ের মধ্যে লোকে নাকি আমার জাঙ্গিয়া খুলে নিলেও টের পাব না।) তা সব সময়ই উড়িয়ে দিয়ে আসছি, তার কিঞ্চিৎ সত্য সম্ভবত।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও লাইটার এগিয়ে দিলাম। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। এই লোক এখন আলগা পিরিত না দেখালে হয়। একশ্রেণির মানুষ আছে যারা মনে করে কারোর ফেভার নিলে তাকে পুষিয়ে দিতে হবে। ম্যাটেরিয়াল বেনিফিটের বিনিময়ে এসে গালগপ্পো জুড়ে দেবে। এত আদিখ্যেতা ভালো লাগে না। তা ছাড়া, খারাপ কোনো মতলব আছে কি না, কে জানে। গায়ে চাদর জড়ানো। চাদরের মধ্য থেকে ছুরিটুরি বের করে যদি বলে, ‘কী আছে বাইর কর নইলে হান্দায়ে দিমু!’ তাহলে কী করব। এইসব ভেবে একটু অস্বস্তি বোধ করলাম।
—ভর্তি হয়ে এলাম। ওই বিল্ডিংয়ের ছয়তলা। বেড পাইনি এখনো। আমার এক শ্যালকের বন্ধু চাকরি করে মিটফোর্ডে। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনার পেশেন্ট কই? নাকি আপনিই পেশেন্ট?
এই প্রথম লোকটাকে ভালো করে খেয়াল করলাম। বয়স পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন হবে। ভদ্রলোকের মুখে কয়েক দিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি। ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের মতো ঝুলে আছে সদ্য ধরানো সিগারেট। বেশ আরাম করে ধোঁয়া ছাড়ছেন।
—‘কোনো পেশেন্টকে দেখছেন কখনো মাঝরাতে বেড ছেড়ে এসে এভাবে বিড়ি টানতে?’, আমার কুঞ্চিত ভ্রু নিয়ে এমন বিরস-বিমুখ প্রশ্ন বিরক্তির বিজ্ঞাপন টানিয়ে দিল নিঃসন্দেহে।
—রাগ করলেন নাকি ব্রাদার? রাগ করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি সিগারেটের থেকেও বেশি ক্ষতিকর। বিশ্বাস হয় না? এই দেখেন প্রমাণ।
ভদ্রলোক একটু ঝুঁকে তার কপালের বাম দিকে আঙুল দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। দেখে মনে হলো বাজেভাবে কেটে গিয়েছিল। সেলাইয়ের দাগসহ চিহ্নটা স্পষ্ট এখনো।
—মানে?
—মানে বুঝলেন না? সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে। আপনার ভাবির সই ভালো। খেতে বসে হঠাৎ খুবই তুচ্ছ কারণে রেগে গিয়ে গ্লাস ছুড়ে মেরেছিল। রাগ প্রশমনে তিন-তিনটা সেলাই দিতে হয়েছে।
ওনার কথা বলার ধরনে কিছু একটা ছিল। আমি হেসে ফেললাম।
—ভাবির ওপরে দেখছি আপনার খুব রাগ...
বিড়িতে পরপর লম্বা দুটো টান দিয়ে উনি বললেন, ‘নাহ, রাগ নেই। একটা সময়ে গিয়ে এই রাগ-ক্ষোভ-ক্ষুদ্রতার তুচ্ছ জাগতিক আবেগ সীমানাছাড়া হয়ে পড়ে। আপনি স্পোর্টস ফলো করেন?’
—আগে দেখতাম। এখন সময় হয় না তেমন। নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। কেন?
—লাইফ হচ্ছে অনেকটা ফুটবল ম্যাচের মতো। নব্বই মিনিট আপনি দাপিয়ে বেড়াবেন। গোল দেবেন। গোল খাবেন। ইনজুরি হবে। তুমুল রেষারেষির এই ম্যাচ নব্বই মিনিট পার হলে ডেড। তারপর শুধু রেজাল্ট থাকে। হয় আপনি হেরেছেন কিংবা জিতেছেন। ফুটবল ম্যাচ আর লাইফের মধ্যে একটাই পার্থক্য তা হলো, লাইফে কোনো হার-জিত নাই।
—হার-জিত নাই?
—নাহ। যা আছে তা হলো পারসপেকটিভ। ধরা যাক আমি আমার ওয়াইফকে নার্সাসিস্ট বললাম। তাতে কি পুরো সত্যটা বলা হলো? কিংবা আমি ওকে একদম আপাদমস্তক লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে হিসেবে জাহির করলাম, তা-ও পুরোটা বলা হলো না। যদি বলি যে আমার জীবন-যৌবন সব গেল পত্নী-পূজায়। সবটা দিয়েও তবু কানাকড়ি দাম পেলাম না। কিংবা ওই মহিলা নিদারুণ দুঃখবিলাসী। হতাশা আর আক্ষেপ অলংকারের মতো করে পরেছে সারা জীবন ধরে সারা গায়ে। আমি ঘৃণা করি ওর ‘ফুলের মতো জীবনটা নাকি একদম নষ্ট হয়ে গেছে আমার জন্য’ টাইপ দোষারোপ। তাহলেও পুরো সত্যটা বলা হবে না। এ হবে কেবল সত্যের অপলাপ এবং অপভ্রংশ মাত্র।
আমি কিছু বললাম না। একটা ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে। হাসপাতালের রোগক্লিষ্ট গন্ধের মধ্যে এই ফুলের ঘ্রাণ দারুণ পরানবান্ধব মনে হলো। ভদ্রলোক বেশ খানিকক্ষণ ধরে কাশির দমক সামলে বিরক্তিতে থুতু ফেলল। কোথায় যেন মাইকে গান বাজছে।
‘ও টুনির মা তোমার টুনি কথা শোনে না…’।
পুরান ঢাকা আর রাতবিরাতে মাইকে কিংবা সাউন্ডবক্সে গান বাজানো, দুটোকে আলাদা করা যাবে না কখনো, ভাবলাম আমি। আর কী গান—কী তার লিরিকস। অবশ্য গূঢ়ার্থে এই গানের কথা খুবই কমন মানব-আকাঙ্ক্ষার দারুণ দার্শনিক প্রকাশও বটে। বাকি পৃথিবীর কথা জানি না; কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বেহুদা মানুষের যাবতীয় অশান্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো সে তার প্রিয়জনকে কন্ট্রোল করতে পারছে না।
উনি গলা খাঁকারি দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘বুঝলেন ভাই? আমার জীবন নিয়ে আক্ষেপ নাই কোনো। আমি আগাগোড়া একজন বৈষয়িক মানুষ। এই গান-কবিতা এসব আমার বুঝে আসে না। কিন্তু আমার ওয়াইফ ভালো রবীন্দ্রসংগীত গায়। ছোটবেলায় গানের মাস্টার রেখে গান শেখা। ফ্যামিলি ফাংশনে মাঝেমধ্যে গায়। আমি কখনো শুনি, আবার কখনো শুনিই না। তবে একবার একটা গানের কথা খুব মনে ধরছিল। এই রকম অনেকটা, “আমি অকৃতি অধম জেনেও তো কম করে কিছু দাওনি মোরে, যা দিয়েছ তার অযোগ্য ভেবে কেড়েও তো কিছু নাওনি।”
জীবনে অনেক কিছু পাইছি ভাই। শুধু একটা ব্যাপার নিয়া মনটা খচখচ করে। শান্তি পাই না।’
প্রথমে বিরক্তি লাগলেও এখন ভদ্রলোককে যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। আর এমন পরিবেশের কারণেই কি না; মনে হলো কথা বলার মতো একটা লোক যে পাওয়া গেছে তা–ও খারাপ না।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার?’
সিগারেট ক্ষয়ে ক্ষয়ে আগুন ফিল্টারের কাছে এসে গেছে। উনি শানের শীতল বেঞ্চিতে আগুন নিভিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিলেন।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বাপ মারা গেছে যখন তখন আমার বয়স আর কতই–বা হবে। চার কি পাঁচ। তারপর মায়ের বিয়ে হয়ে গেল অন্য জায়গায়। আমার আশ্রয় জোটে বড় চাচার কাছে। চাচার কোনো ছেলেমেয়ে না থাকার দরুন তাদের ঘরে আমি ছেলের মতোই বড় হতে থাকি। তারা যে খুব অবস্থাসম্পন্ন ফ্যামিলি ছিল এমন না। যখন বুঝতে শিখি, তখন জানতাম যে চাচার সহায়-সম্পত্তি সব আমিই পাব। কিন্তু একটা সময় গিয়ে অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানের মতো চাচা ধর্মকর্মের দিকে খুব ঝুঁকে পড়েন। প্রায়ই তাবলিগ জামাতের সঙ্গে সফরে বেরিয়ে পড়তেন। হয়তো তারই প্রভাবে তিনি ঠিক করলেন যে জমিজমা সব বিক্রি করে হজ করতে যাবেন। আমি কানাঘুষা শুনতে পাই এসব খবর।’
একটু থেমে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘একদিন রাতে বাড়ি ফিরে আমাকে বললেন যে আজিজ মুন্সীর কাছে তিনি সব জমি বেচে দেওয়ার কথাবার্তা আজকে পাকাপোক্ত করে এসেছেন। ওখান থেকে আমাকেও কিছু দেবেন। আর আকারে–ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি। এখন নিজের পথ নিজের দেখা উচিত। আমি কিছু বললাম না। সময়মতো জমি বেচা হলো। টাকা এনে উনি নিজের স্টিলের ট্রাংকের মধ্যে রেখে দিলেন। হজে যাওয়ার দিনক্ষণ এগিয়ে আসছে। টাকা জমা দেওয়ার আগের দিন আমি ট্রাংক ভেঙে টাকা নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। এই শক হয়তো চাচা নিতে পারলেন না। কিছুদিন পরেই মারা যান। তার মৃত্যুর খবর শুনে আমার খুব অপরাধবোধ হয়; কিন্তু আর ফিরে যেতে সাহস পাইনি। এমনকি তার লাশেরও মুখোমুখি হতে চাইনি।’
‘আপনি বললেন যে আপনি চলে আসার কিছুদিনের মধ্যেই আপনার চাচা মারা যান। এমনও তো হতে পারত যে টাকাপয়সা জমা দেবার পরেও মারা যেতেন।’
‘তা পারতেন। কিন্তু ডিপ ডাউন বিলিভ করি যে আমি ওইভাবে চলে না এলে হয়তো বেঁচে থাকতেন। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি অনেক। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই একই যন্ত্রণা পাই। কোনোভাবে কাটায়ে উঠতে পারি না। আমি প্রায়শ্চিত্ত করার উপায় খুঁজেছি। অনেক দান-সদকা করেছি। আমি চাইছিলাম একটা লোককে হজে পাঠাব। কিন্তু সেটা করতে হতো আমার পরিবারকে না জানিয়ে। বলছিলাম না? আমার ওয়াইফ অনেক ভালো। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এমন জেদি, একগুঁয়ে। আমার এই আইডিয়াটা ওর কাছে বাজে খরচ বলে মনে হয়েছে।’
‘আপনি কি তাকে সবকিছু বলছেন?’
‘মাথা খারাপ আপনার? সবকিছু কীভাবে বলব! আমি চাই না আমার বউ আমাকে চোর হিসেবে জানুক, আমার মেয়ে তার বাবাকে চোর হিসেবে মনে রাখুক।’
‘তাইলে আমাকে যে বললেন...। চিনি না জানি না, মাত্র কিছুক্ষণ হলো পরিচয় এমন একটা মানুষকে ব্যক্তিগত ব্যাপারে বলা আমার জন্য সহজাত না।’
উনি আমার অস্বস্তি বুঝতে পেরেছেন যেন এমন ভঙ্গিতে বললেন, ‘ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো তো বলতেই হয় একান্ত ঘনিষ্ঠ মানুষকে কিংবা একদম অচেনা কাউকে। তা ছাড়া, মৃত্যুপথযাত্রী একটা মানুষ অচেনা যে কাউকে বলতেই পারে। লাস্ট কনফেশন। মরে গেলে পরে তো আর কাউকে পাচ্ছে না বলার মতো। মুনকার–নাকির চারটা প্রশ্ন করবে। জ্ঞানমূলক প্রশ্ন। তার উত্তরে এসব বলার উপায় নাই।’
‘টুনির মা’ গানের মধ্যে এখন শুধু বিট বাজছে। লোকটার মাথায় গন্ডগোল আছে নাকি? এতক্ষণ তো দিব্যি ভালো মানুষের মতো কথাবার্তা বলছিল। এই মাঝরাতে কি পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে ভাই। পাগলরা অনেক উদ্ভট ব্যাপার সত্যি বলে বিশ্বাস করে।
—মৃত্যুপথযাত্রী কে, আপনি?
—জি, আমি। অবশ্য এই দেশে সবাই মৃত্যুপথযাত্রী। পদে পদে মৃত্যু। কেউ যদি মৃত্যুর ১০১টি উপায় নিয়ে বই লিখতে চায়, বাংলাদেশ তার জন্য একটা প্র্যাকটিক্যাল জমিন হইতে পারে গবেষণার জন্য। বুঝলেন ভাই? রাস্তা পার হচ্ছিলাম। আজরাইল আজকাল ড্রাইভিং শিখছে কি না কে জানে। শালার কই থেকে এক পিকআপ এসে চাপা দিয়ে চলে গেল। মুখে ভোঁতা একটা অভিব্যক্তি নিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বললেন, মাথাটা একদম থেঁতলে গেছে।
এবার আমি নিশ্চিত হলাম যে এই লোক উন্মাদ। কিংবা চন্দ্রগ্রস্ত বলে একটা কথা আছে না? ওই রকম। মাঝেমধ্যে আউলায়ে যায়। এর থেকে নিস্তার পাওয়া যায় কেমনে আমার তা–ই ভাবা উচিত।
আমি সহানুভূতির স্বরে বললাম, ‘আহারে! আপনি তো তাইলে খুব ব্যথা পেয়েছেন। যাক, এখন বাসায় যান। দুইটা নাপা খেয়ে কড়া একটা ঘুম দিন। ঘুমের খুব দরকার আপনার।’
ভদ্রলোক সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না? আপনি ভবন দুইয়ের ছয়তলায় যান। ইউনিট দুইয়ের বেড নম্বর ৮৩–তে দেখবেন আমি চিত হয়ে শুয়ে আছি। তার পাশে বসে কানতেছে যে মহিলা, আমার ওয়াইফ। মেয়ে গেছে ডাক্তার ডাকতে। মনে হয় এই ফাঁকে কাজ ঘটে যাবে। ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেলর ক্ল্যাসিক চিত্রনাট্য। হেহে।’
—আপনার কথা অবিশ্বাস করব কেন। বিশ্বাস করেন ভাই! আপনার সব কথাই বিশ্বাস করছি আমি। আপনার চেহারা দেখলেই বোঝা যায় আপনি সৎ লোক। খামোখা বানিয়ে বলবেন কেন।
—ধন্যবাদ। এমনি মনটা খারাপ। যত যাই বলি না কেন, আপনার ভাবি কেমনে কানতেছে যদি দেখতেন! আমার উচিত বেচারিকে সান্ত্বনা দেওয়া। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে নিতেছেন। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে বা হায়াত মউত আল্লাহর হাতে এই টাইপ কিছু বলা উচিত। যদিও তাতে কতখানি সান্ত্বনা পাইত বলা মুশকিল।
—হুম।
—বুঝলেন ভাই? আমার খুবই কষ্ট লাগছে। আশপাশের বেডের মানুষের জন্যও খারাপ লাগছে। কত অসুবিধার মধ্যে যে এরা হাসপাতালে পড়ে আছে।
—থাক! মন খারাপ কইরেন না। হাসপাতাল তো এমনই। এখানে তো ট্যুরে আসে না কেউ। বিপদে পড়েই আসে। আর বাঙালি তো আসে যখন একদম না এসে আর উপায় নাই তখন।
—তা ঠিক বলছেন। আমি তো কোর্টে আছি, মানে ছিলাম আরকি। আমার মনে হয় হাসপাতাল হইল আপনার মৃত্যুকেন্দ্রিক সমস্যা নিয়া ডিল করে আর আদালত পুরোটাই জীবনকেন্দ্রিক সমস্যার জন্য; দুইটার মধ্যে আমি হাসপাতালকেই অ্যাভয়েড করব। হাসপাতালে আমাদের অসহায়ত্ব বড় নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে। কোর্টে তো দেখা যায় বেশ নাদুসনুদুস—হোঁদল কুতকুত মার্কা প্রবলেমগুলোও হেঁটেচলে বেড়ায়।
—আপনি কোর্টে কী কাজ করতেন? (প্রশ্নটা করেই মনে হলো আবার ভুল করলাম। আবার কোন কেচ্ছা শুরু করে কে জানে। কী দরকার ছিল এই সুযোগটা দেওয়ার!)
—বলতে লজ্জা নাই ভাই, দালালি টাইপের কাজ। ম্যালা চেষ্টাচরিত্র করেও বারটা টপকাতে পারলাম না। আমার সামনে দিয়া কত গরু গাধা পার হয়ে গেল। আমি পারলাম না। সবই কপালের ফের ভাই।
মনে মনে বললাম, ‘কপালের ফেরই। নয়তো মাঝরাতে কি আর এই পাগলের পাল্লায় পড়ি আমি!’
—ভাই কিছু মনে করবেন না। আমি উঠছি। একটু কাজ আছে।
—আচ্ছা। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল ভাই। আর ওই ব্যাপারটা কাউকে বইলেন না।
—আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। কেউ জানবে না।
আমি গিয়ে গেটের সামনে বসে এক কাপ চা খেলাম। বেশ ভালো চা বানায় এরা। তাও আবার পাঁচ টাকায়। এই দোকান সারা রাত খোলা থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো মিটফোর্ড মেডিকেলের আশপাশের কোনো ওষুধের দোকানই সারা রাত খোলা রাখে না। অথচ চা-বিড়ির দোকান খোলা থাকে দিন–রাত চব্বিশ ঘণ্টা।
যাহোক, চা খেয়ে হাসপাতালের মধ্যে ঢুকছি এমন সময় দেখি সি–ব্লকের নিচে একটা জটলা। কান্নাকাটি। হাসপাতালের খুব কমন দৃশ্য। কিন্তু খুব অদ্ভুত, খেয়াল করলাম একটু আগের সেই লোক ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছেন। আমাকে ইশারায় কাছে যেতে বললেন। ভিড় ঠেলে উঁকি দিতেই দমকা বাতাসে মুর্দার মুখের ওপরে ঢাকা দেওয়া কাপড় সরে গেল। আমি আঁতকে উঠলাম। একি! এ তো অবিকল সেই লোকটা। আধবোজা চোখে যেন আমার দিকেই চেয়ে আছে। এদিক–ওদিক তাকিয়ে জটলার মধ্যে মধ্যবয়সী সেই ভদ্রলোককে আর খুঁজে পেলাম না। অ্যাম্বুলেন্সে লাশ তোলা হবে। সেই তাড়ায় ছিটকে সরে এলাম।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেই বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম আবার। সেই কুকুরটা আমাকে দেখতে পেয়ে বার কয়েক ঘেউ ঘেউ করে উঠল। প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে লেজ নাড়ছে। আমি হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। একটু পরেই মসজিদ থেকে ভেসে এল ফজরের আজান।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়