প্রত্যাশার জুলাই, বাস্তবতার বাংলাদেশ

· Prothom Alo

অন্তর্বর্তী সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিল, যখন অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক। তবে এই বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি বড় বাস্তবতাও ছিল। তা হলো পরিবর্তনের প্রত্যাশা ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল এক জাতীয় ঐক্য। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক পুঁজি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল হিমালয়-সমান। সময়ের বিবর্তনে এখন এর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের বিশ্বাসযোগ্য ও অর্থবহ মূল্যায়ন করতে হলে আগে বুঝতে হবে জুলাইয়ের মূল প্রত্যাশা কী ছিল। কারণ, প্রত্যাশা নিয়ে ধারণাগত বিভেদ তৈরি হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক গোষ্ঠীর আন্দোলনের ফল ছিল না। তা ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সমাজের সম্মিলিত উত্থান ও প্রত্যাখ্যান। সে সময় তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। প্রথমত, জাতির ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। তৃতীয়ত, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত হবে। সব মিলিয়ে মানুষ একটি অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিল।

Visit chickenroad-game.rodeo for more information.

অন্তর্বর্তীকালের দোলাচল

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান ইতিহাস নির্মোহভাবে করবে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, অন্তর্বর্তী সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিল, যখন অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক। তবে এই বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি বড় বাস্তবতাও ছিল। তা হলো পরিবর্তনের প্রত্যাশা ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল এক জাতীয় ঐক্য। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক পুঁজি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি। দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে তা কাজে লাগানোর বদলে তারা নিজেদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে। অথচ ঐক্যবদ্ধ জাতির শক্তি কাজে লাগিয়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরও গভীর করা সম্ভব ছিল। তাদের অভিজাততান্ত্রিক ভাবনার কারণে সম্ভবত তা হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সাফল্যের কথাও বলা দরকার। সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অস্থিরতার মধ্যেও বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

আবার তাদের কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বড় সীমাবদ্ধতা ছিল জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করার বদলে রাষ্ট্র পরিচালনায় অতিরিক্ত আমলানির্ভর হয়ে পড়া। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণকে রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনায় সুনির্দিষ্টভাবে অংশীদার করার বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর ক্রমেই সীমিত করা হয়। কতিপয় উপদেষ্টার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাও সরকারের গতিশীলতা নষ্ট করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের কাছে দেশের বিভিন্ন খাতের অংশীজনের চেয়ে বিদেশিরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন।

হোসেন জিল্লুর রহমান

জুলাইয়ের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে গুটিকয় প্রশাসনিক শব্দে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। পরিবর্তনের বিস্তৃত সামাজিক ধারণা ক্রমে ‘সংস্কার’ শব্দের মধ্যে আটকে পড়ে। সংস্কারের আলোচনাও সীমিত হয়ে যায় কিছু বিশেষজ্ঞ, বৈঠক ও ‘যমুনা’র ঘেরাটোপে। এসব বিশেষজ্ঞের অনেকে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত নন। ফলে জাতীয় প্রত্যাশা জনপরিসর থেকে ক্রমে প্রশাসনিক আলোচনায় সংকুচিত হয়।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল আন্দোলনের মালিকানার বিতর্ক। আন্দোলনে কার অবদান বেশি, এ প্রশ্ন সামনে এসে জুলাইয়ের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।

তারুণ্যের শক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিরও একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নের পরিবর্তে তাদের সামনে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়া হয়। ক্ষমতা দায়িত্ব নয়, অনেক ক্ষেত্রে লোভের বিষয় হয়ে ওঠে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার বদলে ঠেলে দেওয়া হয় অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে। বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়নে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, জুলাইয়ের সামাজিক শক্তিকে তারা কতটা ধারণ করতে পেরেছিল সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোযোগ ছিল মূলত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকে। এর প্রয়োজনও ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, বৈষম্য বা প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরির মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো তুলনামূলকভাবে অন্তরালেই থেকে যায়। অথচ জুলাইয়ের প্রত্যাশা শুধু অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করাই ছিল না, ছিল একে ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা।

অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়নে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, জুলাইয়ের সামাজিক শক্তিকে তারা কতটা ধারণ করতে পেরেছিল সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক কতটা বদলানো গেল—ইতিহাসে সে প্রশ্নই বড় হয়ে উঠবে।

নির্বাচিত সরকারের আগমন

অন্তর্বর্তী সরকারের পর একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন নতুন সরকার। তবে তাদের শাসনকালের মাত্র কয়েক মাস পেরিয়েছে। চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। মানুষ অবশ্যই ফলাফল দেখতে চায়, তবে দীর্ঘ অস্থিরতার পর তারা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় ফিরতে চায় না। এ কারণেই অনেক অতৃপ্তি ও অসন্তোষ সত্ত্বেও সমাজ এখনো ধৈর্য ধরে রয়েছে।

ইতিমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আবার চালু হয়েছে, বিরোধী দল সংসদে আছে, অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগও বেড়েছে। অর্থনীতিকে শুধু স্থিতিশীল রাখাই নয়, প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অন্তত উপলব্ধি করা হচ্ছে। এসব ইতিবাচক, তবে জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণের সমার্থক নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি আরও ন্যায়ভিত্তিক এবং জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কয়েকটি সূচকের দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

ইতিমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আবার চালু হয়েছে, বিরোধী দল সংসদে আছে, অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগও বেড়েছে।

প্রথমত, নিয়োগ ও পদায়নের মান। বাংলাদেশে নীতি প্রণয়নের চেয়ে বড় সংকট বাস্তবায়নে। আর বাস্তবায়ন নির্ভর করে দায়িত্বে কে আছেন তার ওপর। ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানো সম্ভব হচ্ছে কি না, সেটিই হবে পরিবর্তনের বড় পরীক্ষা। সরকার কী বলছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সরকার কী করছে। অন্তর্বর্তী ও বর্তমান—উভয় সরকারই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারেনি।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র শিক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা নিয়ে নানা কমিশন গঠন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণদের শিক্ষামুখিতা হ্রাস। এর সূচনা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। সে সময় শিক্ষা নিয়ে যে অরাজকতা শুরু হয়েছিল, তা এখনো চলছে। শুধু বিদ্যায়তনে উপস্থিত থাকলেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা নিয়ে যে নিদারুণ অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ভুগতে হবে। ভবিষ্যতের মানবসম্পদ গঠনের জন্য শিক্ষাকে আবার সমাজের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধে পরিণত করতে ব্যর্থ হলে এর মূল্য আমাদের দীর্ঘ মেয়াদে দিতে হবে।

রাষ্ট্র ও নীতি পরিচালনার ভয়াবহ সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে হামে কয়েক শ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায়। কিছু দুর্বলতা আওয়ামী লীগের শাসনামলেই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মনোযোগের অভাব, বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং পর্দার পেছনে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর তত্পরতা এই সংকটকে মারাত্মক পরিণতি দেয়। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে মনোযোগ দিলেও এখনো হামে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত আছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে গোপনীয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি করায় পরে এটিকে ঘিরে অসম চুক্তির প্রশ্ন উঠেছে। এটি নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণের পরিসর কিছুটা সীমিত করতে পারে। তবে সরকার চাইলে সংসদীয় ও আইনি প্রক্রিয়ায় চুক্তিটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার সুযোগ নিতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমেছে ২-এর ঘরে। অতীতে বাংলাদেশের এমন অবস্থা খুব বেশি দেখা যায়নি। অর্থনীতির মূল্যায়ন কেবল প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে করা না গেলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দারিদ্র্য সংকোচন, কর্মসংস্থান তৈরি এবং নতুন প্রবৃদ্ধির চালক তৈরি হচ্ছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

সাধারণ মানুষ আরও কষ্ট সহ্য করবে, খরচ কমাবে, জীবন আরও সংকুচিত করবে—এই যদি হয় এর অর্থ, তাহলে তা শক্তি নয়, বরং সামাজিক নির্যাতনের ভাষা।

বাংলাদেশ এখনো মূলত দুটি প্রবৃদ্ধির চালকের ওপর নির্ভরশীল—তৈরি পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্স। এই নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন অর্থনৈতিক খাত, সৃজনশীল অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প এগিয়ে নিতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, দক্ষ নীতি বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব নয়। অর্থনীতির রূপান্তর নিয়ে কৌশলী চিন্তার অনুপস্থিতি এখনো স্পষ্ট।

‘সম্ভাবনা’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’—এ দুটি শব্দ ব্যবহারে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্ভাবনার কথা শুনছে। সম্ভাবনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তবে রূপ নেয়। একইভাবে ‘রেজিলিয়েন্স’ বা টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হবে। সাধারণ মানুষ আরও কষ্ট সহ্য করবে, খরচ কমাবে, জীবন আরও সংকুচিত করবে—এই যদি হয় এর অর্থ, তাহলে তা শক্তি নয়, বরং সামাজিক নির্যাতনের ভাষা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষের কষ্টকে স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে না নিয়ে তা কমানোর পথ তৈরি করা।

সামাজিক শক্তির প্রতিবন্ধকতা

জুলাইয়ের মূল্যায়নে সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা, সামাজিক উদ্যোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ের পরিবর্তনের চেষ্টা গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তবে বাস্তবে নাগরিক সক্রিয়তার সামনে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। সামাজিক বিভাজন, অনলাইন হয়রানি, সংকীর্ণ স্বার্থ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে নিরুত্সাহিত করছে।

তারপরেও ভরসার জায়গা আছে। বাংলাদেশের পরিবর্তনের ইতিহাস শুধু রাষ্ট্রীয় নীতির নয়, নাগরিক উদ্যোগেরও। তাই সব পরিবর্তন রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী নয়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে নানা সামাজিক বদল এসেছে মানুষেরই উদ্যোগে। কমিউনিটি পাঠাগার, স্থানীয় শিক্ষা উদ্যোগ, সামাজিক সহযোগিতা, তরুণদের নতুন উদ্ভাবন—এসবও সমাজকে এগিয়ে নেয়। প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন হয় না, অনেক পরিবর্তনের শুরু ছোট ছোট সামাজিক উদ্যোগ থেকেই। তারুণ্যের শক্তির উত্থান অনস্বীকার্য। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের প্রয়োজনে এই শক্তির শুভ বিকাশ ভবিষ্যতে অন্যতম মনোযোগের বিষয় হিসেবে থাকবে।

নাগরিক সক্রিয়তা নানা বাধার মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারীদের ওপর নিগ্রহের ঘটনা প্রায় বিনা বাধায় ঘটতে দেখেছি। অথচ জুলাই আন্দোলনের বড় শক্তি ছিলেন নারীরা। পরিস্থিতির কতটা উত্তরণ হয়েছে, তা এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ। উদ্যোগী চিন্তা ও এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রয়াস আমাদের নাগরিক সক্রিয়তার অন্যতম শক্তি। প্রত্যাশা, সেগুলো আবার ফিরে আসবে।

বাংলাদেশের সামনে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করা। নিজেদের ছোট দেশ ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই রাষ্ট্র মোটেই ছোট নয়। আমাদের স্বার্থই হবে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত বা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। একদিকে ভূ-অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, অন্যদিকে কৌশলগত সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। সক্ষমতা ছাড়া কোনো দেশ তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না।

নাগরিক সক্রিয়তা নানা বাধার মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারীদের ওপর নিগ্রহের ঘটনা প্রায় বিনা বাধায় ঘটতে দেখেছি। অথচ জুলাই আন্দোলনের বড় শক্তি ছিলেন নারীরা। পরিস্থিতির কতটা উত্তরণ হয়েছে, তা এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ।

সবশেষে আবারও ফিরে যেতে হয় জুলাইয়ের মূল প্রত্যাশায়। সেই প্রত্যাশা শুধু সরকারের নয়, রাষ্ট্র ও সমাজেরও চরিত্র পরিবর্তনের। জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছিল সেই আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। এই আকাঙ্ক্ষার শক্তিই সামনে এগোনোর পথে সবচেয়ে বড় পাথেয়।

দুই বছর পর তাই প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব অবশ্যই করতে হবে। তবে কে সফল, কে ব্যর্থ—এই সংকীর্ণ প্রশ্নে আটকে না গিয়ে আরও বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: জুলাই যে সামাজিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল, তা কতটা ধরে রাখা গেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের মতো প্রতিটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার, মর্যাদা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ প্রতে৵ক নাগরিকের। সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই অব্যাহত প্রচেষ্টার দায়িত্ব নবীণ-প্রবীণ, নারী-পুরুষ, সংগঠিত ও অসংগঠিত শক্তি সকলের ওপরই বর্তায়।

  • হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি

Read full story at source