কারাবন্দী ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কিত তাঁর ছেলেরা

· Prothom Alo

পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সন্তানেরা বলেছেন, তাঁরা তাঁদের বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কিত। তাঁদের অভিযোগ, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাঁদের বাবার সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছে না।

Visit sportbet.reviews for more information.

ইমরান খানের গ্রেপ্তারের তৃতীয় বার্ষিকীতে কাসিম খান ও সুলাইমান ঈসা খান সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা বলেন, ‘বাবার সর্বশেষ অবস্থা আমরা জানি না। কারণ, সাত মাস ধরে তাঁর পরিবার, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

সাবেক এই তারকা ক্রিকেটার ও রাজনীতিক এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবির মুক্তির দাবিতে গতকাল বুধবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) হাজার হাজার কর্মী।

২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন ইমরান খান। ওই বছর পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। এর এক বছর পর দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান তিনি।

তবে ইমরান ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকারের বিরোধিতার কারণেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব মামলা দেওয়া হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শাহবাজ শরিফ সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন ইমরান। তিনি অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে (যদিও সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে)। এর জেরে তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন–পীড়ন চালায় শাহবাজ সরকার। দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

কাসিম ও সুলাইমান লন্ডন থেকে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন। ২০০৪ সালে ইমরান খান ও তাঁর প্রথম স্ত্রী (এই দুজনের মা) জেমিমা গোল্ডস্মিথের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এর পর থেকেই তাঁরা লন্ডনে বসবাস করছেন।

যুক্তরাজ্য থেকেই বাবার কারাবাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছেন এই দুই ভাই। তাঁদের দাবি, যখনই তাঁরা গণমাধ্যমে কথা বলেন, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাঁদের বাবার সঙ্গে দেখা করার পথ আরও কঠিন করে তোলে। ভিসা দিতে দেরি করে বা অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলে তাঁদের আটকে দেওয়া হয়।

কাসিম খান বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। আমরা সেখানে যেতে চাই, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। আমাদের ভিসা না দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।’

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় সিএনএনকে জানিয়েছে, কাসিম ও সুলাইমান দুজনের কাছেই ‘ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড ফর ওভারসিজ পাকিস্তানিজ’ (প্রবাসী পাকিস্তানিদের জাতীয় পরিচয়পত্র) রয়েছে। এই কার্ড থাকলে তাঁদের পাকিস্তানে প্রবেশের জন্য ভিসার প্রয়োজন নেই।

মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, তাঁদের এই দাবি ‘বিভ্রান্তিকর’। একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে তাঁরা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার হাতিয়ার বানাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে।

তবে কাসিম ও সুলাইমান জানিয়েছেন, তাঁদের ওই কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং তা আর নবায়ন করা হয়নি। তবে তাঁদের এই দাবির বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছু জানায়নি।

চলতি সপ্তাহে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে তাঁদের পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার ‘নিঃশর্ত অধিকার ফিরিয়ে দিতে’ পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনটি বলেছে, এই দুজনকে অবশ্যই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। তাঁদের বেআইনিভাবে যে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

হাইকোর্ট থেকে সমর্থকদের নিয়ে বেরিয়ে আসছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। লাহোর, পাকিস্তান, ২০ ফেব্রুয়ারি

‘সাত কক্ষের বিশেষ কম্পাউন্ড’

সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সরকার বলেছে, ইমরান খান নিয়াজিকে সাত মাস ধরে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে বা তাঁর পরিবার, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না—এমন দাবি তাঁরা ‘কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান’ করছে। সরকারের দাবি, কারাবন্দী ইমরানের সঙ্গে বারবার ও পর্যাপ্ত সাক্ষাতের প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে।

পাকিস্তান সরকারের দাবি, গত ২১ মার্চ সর্বশেষ ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ইমরান। এতেই প্রমাণ হয়, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের পথ ‘বন্ধ করা হয়নি’। বরং একজন হাই-প্রোফাইল বা শীর্ষ বন্দীর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের কারাবিধি, আদালতের আদেশ, অনুমোদিত সময়সূচি এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা হয়ে থাকে।

বিবৃতিতে ইমরান খানের শারীরিক অবস্থাকে ‘স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাঁর স্বাস্থ্যের ‘গুরুতর বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার মতো কোনো অবনতি’ ঘটেনি। চিকিৎসা-পরামর্শ, কারাবিধি ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি ‘নিরবচ্ছিন্নভাবে চিকিৎসা, ওষুধ ও ফলোআপ সেবা পাচ্ছেন’।

বিবৃতিতে ইমরান খানের থাকার জায়গার বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ‘সাত কক্ষের একটি বিশেষ কম্পাউন্ডে’ রাখা হয়েছে, যা মূলত ৩০ থেকে ৩৫ জন বন্দীর থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ৫৭ বাই ১৪ ফুটের একটি করিডর এবং ৩৫ বাই ৩৭ ফুটের একটি লন রয়েছে।

ওই কম্পাউন্ডে রয়েছে বিছানা, তোশক, চারটি বালিশ, কম্বল, টেবিল, চেয়ার, শৌচাগার ও ব্যায়ামের সরঞ্জাম। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, প্রকাশ্যে নির্জন কারাবাস, অবহেলা বা শাস্তিমূলক বঞ্চনার যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব এ ব্যবস্থার কোনো মিল নেই।

তবে সরকারের এই বিবৃতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সন্তুষ্ট করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। সংস্থাটি ইমরানের দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সমর্থকদের গণগ্রেপ্তারকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ পদক্ষেপ বলে আখ্যা দিয়েছে।

কাসিম উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তার হওয়া এসব নেতা-কর্মীর অনেককেই ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ আইনে আটকে রাখা হয়েছে। আর ৮৫ জনকে সামরিক আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে।

বাবার সঙ্গে সরকারের কোনো আপস চুক্তির সম্ভাবনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দুই ছেলে জানান, এর কোনো সম্ভাবনা নেই।

সুলাইমান বলেন, তাঁর বাবা অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের কারাগারে রেখে নিজের মুক্তির জন্য কোনো চুক্তি করবেন না। সবার বিষয়ে একটি সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো আপস করবেন না।

এমন চুক্তির সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করেন কাসিম। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলাও কঠিন বলে জানান তিনি।

কাসিম বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ বাবার স্বাস্থ্যগত কোনো প্রতিবেদন আমাদের দেখাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। তাই আমাদের আশঙ্কা, এর মধ্যে হয়তো তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে।’

কাসিম আরও বলেন, বিশ্বের ‘ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের’ কাছে তাঁরা একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চান। পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে এসব ক্ষমতাধর ব্যক্তির নজর দেওয়া উচিত।

কাসিম বলেন, ‘আমি জানি বিশ্বে এখন অনেক কিছুই ঘটছে। তবে পাকিস্তানের বিষয়টি চরম হতাশাজনক। শুধু ছেলে হিসেবে নয়, বরং পুরো দেশের ৩৫ কোটি মানুষের জায়গা থেকে আমরা এই হতাশার কথা জানাচ্ছি। এসব মানুষ তাঁকে ভোট দিয়েছেন এবং সমর্থন করেন। তাঁরা সবাই চান, তিনি দেশের নেতৃত্ব দিন।

কাসিম আরও বলেন, উল্টো এই মানুষের রায়কে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। আর তাঁরা যাঁকে ক্ষমতায় দেখতে চান, তাঁকে কোনো কারণ ছাড়াই কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে।

Read full story at source