বেহেশতে গেলেও যে আমলের আফসোস রয়ে যাবে

· Prothom Alo

বেহেশত চিরসুখের আবাস। সেখানে কোনো কষ্ট নেই, কোনো দুঃখ নেই, কোনো অভাব নেই। কিন্তু কোরআন জানায়, বেহেশত গিয়েও মানুষ একটা আফসোস করবে। সেই আফসোস হবে দুনিয়ায় থাকতে আরও বেশি আমল না করে আসার জন্য।

বিষয়টি বুঝতে হলে আগে একটি বিষয় জানা দরকার। জান্নাতে সবার মর্যাদা সমান নয়। প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী মর্যাদা দেওয়া হবে।

Visit esporist.org for more information.

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর প্রত্যেকের জন্য তাদের আমল অনুযায়ী মর্যাদা রয়েছে। আর আল্লাহ তাদের আমলের পুরো প্রতিফল দেবেন এবং তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত: ১৯)

এখানে আমল অনুযায়ী মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। মর্যাদা শব্দের জন্য আরবিতে ‘দারাজাত’ ব্যবহার করা হয়েছে; যার মানে স্তর, সিঁড়ি। বেহেশতে ১০০টির বেশি স্তর আছে। এই জীবনে যে যত বেশি ভালো আমল করবে, তিনি তত বেশি উঁচু স্তরে থাকবেন। কেউ তার প্রাপ্যের চেয়ে বেশি পাবেন না এবং কেউ তার প্রাপ্যের কমও পাবেন না।

এখানেই আফসোসের জায়গাটা। বেহেশতে গিয়ে মানুষ বুঝবে, আরও বেশি ভালো আমল করলে আরও উঁচু স্তরে থাকা যেত। কিন্তু সেদিন আর আমল করার কিংবা ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।

কোরআনের শিক্ষা

১. দুনিয়া বীজ বোনার সময়, আখেরাত ফসল তোলার সময়। আল্লাহ বলেছেন, ‘যে পরকালের ফসল চায়, আমি তার ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে দুনিয়ার ফসল চায়, আমি তাকে তা থেকে কিছু দিই, কিন্তু পরকালে তার কোনো অংশ নেই।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ২০)

কৃষক উপযুক্ত সময়ে বীজ বপন না করলে ফসলের মৌসুমে কিছুই পায় না। তেমনই এখানে ভালো কাজ না করলে পরকালে তার প্রতিদান পাওয়ার সুযোগ নেই।

কোরআনের আয়াতে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যে পরকালে জন্য আমল করে, তার প্রতিদান তিনি বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। একটি বীজ থেকে যেমন সাত শ শস্য জন্মায়, তেমনই একটি আমলের সওয়াবও বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে। আর যে শুধু দুনিয়ার পেছনে ছুটবে, সে দুনিয়ায় কিছু পেলেও পরকালে তার কোনো অংশ থাকবে না।

সুরা জুমার, আয়াত: ৫৬হায় আফসোস, আল্লাহর ব্যাপারে আমি যে গাফিলতি করেছি। আর আমি তো উপহাসকারীদের একজন ছিলাম।যে বন্ধুর জন্য কেয়ামত দিবসে আফসোস হবে

২. কেয়ামতের দিনের আফসোসের কথা আছে কোরআনে, ‘হায় আফসোস, আল্লাহর ব্যাপারে আমি যে গাফিলতি করেছি। আর আমি তো উপহাসকারীদের একজন ছিলাম।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৬)

এখানে ‘হাসরাহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ এমন গভীর আফসোস, যা কোনোভাবেই দূর করার সুযোগ নেই। এরপর বলা হয়েছে, আমি তো উপহাসকারীদের একজন ছিলাম। অর্থাৎ সে শুধু নিজে আমল করেনি তা-ই নয়, যারা আমল করত তাদের নিয়েও উপহাস করত। সেই উপহাসই কেয়ামতের দিন গভীর অনুতাপের কারণ হবে।

৩. মৃত্যুর আগমুহূর্তে মানুষের একমাত্র চাওয়া সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে, সে বলে, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে আবার দুনিয়াতে পাঠান। যেন আমি দুনিয়াতে যে সৎকাজ ছেড়ে এসেছি, তা করতে পারি।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০)

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ অর্থ, সম্মান কিংবা দীর্ঘ জীবন চাইবে না। সে চাইবে শুধু আরেকটু সময়—শুধু নেক আমল করার জন্য।

এখানে আরবিতে বলা হয়েছে, ‘লাআল্লি আমালু সালিহান’ মানে হয়তো আমি সৎকাজ করব। ‘হয়তো’ শব্দটি ইঙ্গিত দেয় যে আমল করার ব্যাপারে সে নিজেও নিশ্চিত নয়, তবু আরেকটি সুযোগ চায়। কিন্তু এখন সেই সুযোগ আর নেই।

অথচ আমরা এখন সেই সুযোগের মধ্যেই আছি। ভালো কাজ করার দরজা এখনো আমাদের জন্য খোলা।

৪. ফিরে আসার সময় এখনই। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরে এসো এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো, শাস্তি আসার আগেই। এরপর আর তোমাদের সাহায্য করা হবে না।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৪)

এখানে আরবিতে ‘আনাবা’ বলা হয়েছে, যার মানে বারবার ফেরা। মানুষ যতবার ভুল করবে, ততবারই আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে।

তবে তা শাস্তি আসার আগেই। অর্থাৎ মৃত্যু বা শাস্তি এসে যাওয়ার পর আর সুযোগ থাকবে না।

৫. দোজখবাসীদের ফিরে আসার আকুতি। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তারা সেখানে চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের বের করে দিন। আমরা আগে যা করতাম, তার পরিবর্তে সৎকাজ করব।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)

পরকালে শয়তানের দায়মুক্তি আর অনুসারীদের আক্ষেপ
বেহেশতে গিয়ে যেন উচ্চতর মর্যাদা হারানোর আফসোস করতে না হয়, তার জন্য আসুন আমরা এখনই প্রস্তুতি শুরু করি। যা করার, দুনিয়াতেই করতে হবে।

তারা গলা ফাটিয়ে সেখানে চিৎকার করবে। এবার আর সন্দেহ নয়, বরং নিশ্চয়তা দিয়ে বলবে যে আমাদের (দোজখ থেকে) বের করে দিন, আমরা সৎকাজ করব। কারণ শাস্তি তারা এবার দেখে ফেলেছে।

জবাবে আল্লাহ বলবেন, ‘আমি কি তোমাদের এত দীর্ঘ জীবন দিইনি, যাতে যে উপদেশ গ্রহণ করতে চাইত, সে গ্রহণ করতে পারত? সুযোগ ছিল, সময় ছিল। কিন্তু কাজে লাগানো হয়নি।’

হাদিসের শিক্ষা

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিসকে গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) মনে করো বা গুরুত্ব দিয়ো।

  • এক. বার্ধক্যের আগে যৌবনকে।

  • দুই. অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে।

  • তিন. দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতাকে।

  • চার. ব্যস্ততার আগে অবসরকে

  • পাঁচ. মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৮৪৬)

একটু থামি। এ মুহূর্তে আমাদের অবস্থা যেমনই হোক, সুস্থ থাকি কিংবা অসুস্থ, ব্যস্ত থাকি অথবা অবসরে—আজকের এই সময় আর কখনোই ফিরে আসবে না। যে মুহূর্তটা চলে গেছে, সেটা চিরতরে হারিয়ে গেছে।

বেহেশতে গিয়ে যেন উচ্চতর মর্যাদা হারানোর আফসোস করতে না হয়, তার জন্য আসুন আমরা এখনই প্রস্তুতি শুরু করি। যা করার, দুনিয়াতেই করতে হবে। আজ দুই রাকাত নামাজ বেশি পড়ুন। দোয়া একটু বেশি করুন। সামর্থ্য অনুযায়ী একটু বেশি দান করুন। আর কিছু না হোক হাঁটাচলার সময়ে জিকির করুন, আল্লাহকে স্মরণ করুন। এগুলোই সেই বীজ, যার ফসল আপনি বেহেশতে পাবেন।

একটি হাদিসে আছে, “বেহেশতের অধিবাসীরা (বেহেশতে যাওয়ার পর) অন্য কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবে না, শুধু সেই সময়ের জন্য আফসোস করবে যা তারা দুনিয়াতে আল্লাহর জিকির ছাড়া পার করে এসেছে।” (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ১৮২; বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৫১২)

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মুসলমানের জীবন অতীতের আফসোসে বন্দী থাকার নয়

Read full story at source