জীবনের মঞ্চে রামেন্দু মজুমদারের ৮৫ বছর

· Prothom Alo

‘জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে আজ মনে হচ্ছে জীবনটা কতই না মূল্যবান। কত সময় অপচয় করেছি। বাঁচার ইচ্ছা তো মানুষের শেষ হয় না। কিন্তু জীবন শেষ হয়।

Visit moryak.biz for more information.

সেটিই চূড়ান্ত সত্য। তাই যে দিনগুলো বাঁচি, যেন অর্থবহ কাজ করতে পারি। মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে পারি।’ জীবনের ৮৫তম বছর পেরিয়ে এসে এই আকাঙ্ক্ষার কথা বললেন দেশের নাটক ও সংস্কৃতি ভুবনের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।

গতকাল রোববার ছিল তাঁর ৮৬তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে ‘ইচ্ছাপূরণ’ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বহুমাত্রিক কর্মময় জীবনের ছবির বই রামেন্দু মজুমদার: স্টেজিং আ লাইফটাইম, আ পিকটোরিয়াল ক্রনিকল। এই দ্বিভাষিক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে জন্মদিনের অনুভূতি জানাতে গিয়ে রামেন্দু মজুমদার এ কথা বলেন।

ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল সন্ধ্যায়। শুরু হয়েছিল ছায়া কর্মকারের গাওয়া ‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু/ কম করে মোরে দাওনি’ রামেন্দু মজুমদারের প্রিয় এই গান দিয়ে।

বইটির প্রকাশক ও সম্পাদক ত্রপা মজুমদার জানালেন, বছর দশেক থেকেই এমন একটি বই প্রকাশের ভাবনা তাঁদের ছিল। এবার তা বাস্তবে রূপ পেল। বইটিতে প্রায় ২০০ ছবি ও ১০টির বেশি লেখা রয়েছে। রামেন্দু মজুমদারের জীবন বহুমুখী কর্মের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। সেসবের পরিচিতি সবিস্তার তুলে আনা দুরূহ। অনেক ছবির মধ্য থেকে বাছাই করে মোটাদাগে তাঁর সেই কর্মময়তার প্রকাশ করার প্রচেষ্টা এতে রয়েছে। লেখকেরা তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করে মূলত এই ছবির বইটিকে আরও মূল্যবান করে তুলেছেন।

বইটিতে মোট সাতটি পর্বে ছবিগুলো সাজানো হয়েছে বলে জানান ত্রপা মজুমদার। শুরু হয়েছে লক্ষ্মীপুরে রামেন্দু মজুমদারের জন্ম ও শিক্ষা নিয়ে। এরপর আছে তাঁর থিয়েটার চর্চা ও বিকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞাপনী সংস্থায় পেশাগত জীবনের কাজ,  নাটক, চলচ্চিত্র ও বেতার–টেলিভিশনে খবর পাঠ নিয়ে একটি পর্ব। আরও আছে তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং শেষে সাংগঠনিক ও অন্যান্য কাজ।

বইটি প্রকাশ করেছে ‘ইচ্ছাপূরণ’ নামের যে প্রতিষ্ঠান, তারও আত্মপ্রকাশ ঘটল এই প্রকাশনা দিয়ে। প্রকাশক ত্রপা মজুমদার জানালেন, তাঁর মেয়ে ‘ইচ্ছা’র নাম অনুসারেই প্রকাশনাটির নামকরণ। ভবিষ্যতে তাঁরা বই নিয়ে ধারাবাহিক কাজ করতে চান।

তাঁদের কথায় রামেন্দু মজুমদার

বইয়ের পরিচিতির পর সঞ্চালক আপন আহসান রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে ডাকলেন তাঁকে নিয়ে কিছু বলতে। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সম্পাদক দেবপ্রসাদ দেবনাথ বললেন, রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে তাঁর ৪০ বছরের সম্পর্ক। কখনো তিনি এমন করে জন্মদিনের অনুষ্ঠান করেন না। আজ এক বিশেষ উপলক্ষ। বাংলাদেশের নাটকে তাঁর ভূমিকা বটবৃক্ষের মতো। নাট্যকর্মীদের প্রাণ দিয়ে, অন্তর দিয়ে কাজ করতে শিখিয়েছেন। দেশে তিনি আধুনিক নাট্যচর্চার অন্যতম স্থপতি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নাটকের পরিচিত পৌঁছে দিয়েছেন আইটিআইয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সারাহ আলী বলেন, রামেন্দু মজুমদার একজন অত্যন্ত সৎ, পরিশ্রমী ও মেধাবী মানুষ। তাঁর বাবা রেজা আলীর সঙ্গে রামেন্দু মজুমদার বিটপীর মাধ্যমে দেশে বিজ্ঞাপনী সংস্থার সৃজনশীল কাজকে বহুদূর সম্প্রসারিত করেছেন।

তরুণ থিয়েটার কর্মী শেকানুল ইসলাম বলেন, রামেন্দু মজুমদার এখনো দেশের থিয়েটার কর্মীদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। যেকোনো সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে যাওয়া যায়। তিনি সাধ্যমতো সমাধানের চেষ্টা করেন। থিয়েটারের নান্দনিকতার বাইরেও তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতাও অসাধারণ। তিনি সব সময় তরুণদের এই শিক্ষাই দিয়েছেন সাংগঠনিকভাবে কিছু করতে না পারলে তা টেকসই হয় না। নাটকের দল থিয়েটার ছাড়াও থিয়েটার পত্রিকা ও থিয়েটার স্কুল পরিচালনা ও আইটিআইয়ের কাজে তিনি তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন।

পরিবারের পক্ষে কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা দীর্ঘদিনের স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, পারিবারিক সম্পর্কের দিক থেকে তিনি ‘খালু’ হলেও তাঁকে ‘কাকা’ বলে ডাকেন। কারণ, তাঁর খালা ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই তাঁদের বাসায় রামেন্দু মজুমদারের নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং তখন তিনি ‘কাকা’ বলেই ডাকতেন। পরে সম্পর্ক বদলালেও সেই ‘ডাক বদলায়নি’। পরিবারের অনেক মধুর স্মৃতি তিনি তুলে ধরেন।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, রামেন্দু মজুমদারের জন্মদিনের কথা মনে করে আজ সারা দিন তিনি সেই ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের নেতৃত্ব, ৬৯–এর গণ–অভ্যুত্থান, ৭০–এর নির্বাচন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে নিমজ্জিত ছিলেন। তিনি স্মৃতি থেকে সেসব তুলে আনেন। প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘শহীদ মুনীর চৌধুরী, কবীর চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, ত্রপা মজুমদারসহ এই পরিবারের ভূমিকা আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ঐতিহ্যের ধারা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমরা যেন আমাদের সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছি। বিভেদ, অসহিষ্ণুতা ক্রমেই প্রবলতর হচ্ছে। আমরা বারবার আন্দোলন করছি, লড়াই করছি, আত্মদান করছি, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আমাদের উত্তরণ হচ্ছে না। এভাবেই কি একই বৃত্তে আমরা আটকে থাকব’—এই জিজ্ঞাসা রাখেন তিনি।

‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক’

সবশেষে নিজের কথা বলতে এলেন রামেন্দু মজুমদার। শুরুতেই স্মরণ করলেন মা–বাবাকে। বাবার উদারনৈতিক চরিত্র কীভাবে তাঁর হৃদয়কে প্রসারিত করেছে, বললেন সে কথা। শ্রদ্ধা জানালেন মায়ের মমতার প্রতিও। এরপর স্ত্রী ও কন্যার কথা বলতে গিয়ে প্রকাশ করলেন নিজের পরিতৃপ্তি ও গর্ব।

তবে তাঁর বক্তব্য মূলত হয়ে উঠল কৃতজ্ঞতার এক দীর্ঘ তালিকা। জীবনের চলার পথে বিচিত্র পেশা ও পরিচয়ের যেসব মানুষের সাহচর্য, সহায়তা, স্নেহ, প্রেরণা, সাহস, শিক্ষা ও বন্ধুত্ব পেয়েছেন, তাঁদের অনেকের নামই তিনি স্মরণ করলেন। তালিকাটি ছিল দীর্ঘ। শুধু নাম উচ্চারণ করেই থামেননি; তাঁদের নানা গুণের কথা বলেছেন, বলেছেন তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়ের দ্যুতিময় স্মৃতির কথাও। তাঁর মার্জিত, কখনো কখনো সরস বর্ণনায় সেই স্মৃতিগুলো যেন শ্রোতাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।

সবশেষে বললেন তাঁর স্বপ্নের সমাজের কথা—একটি সহনশীল, উদার, ঘৃণা ও বিদ্বেষমুক্ত মানবিক সমাজ। যে সমাজের প্রত্যাশা তিনি সারা জীবন নিজের কাজ ও ভাবনায় ধারণ করেছেন। কথা শেষ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করে, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’

অনুষ্ঠান শেষও হয়েছিল ছায়া কর্মকারের পরিবেশনায় কবিগুরুর ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও দাও প্রাণ’ গানটি দিয়ে।

Read full story at source